Related

Share

166

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on August 10, 2026


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোক মানবজীবনের কর্মতত্ত্ব সম্পর্কে এক গভীর এবং চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকটি হলো কর্ম্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যঞ্চ বিকর্ম্মণঃ অকর্ম্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্ম্মণো গতিঃ। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে কর্ম কী বিকর্ম কী এবং অকর্ম কী তা যথাযথভাবে জানা প্রত্যেক মানুষের জন্য অপরিহার্য। কারণ কর্মের গতি অত্যন্ত গভীর সূক্ষ্ম এবং দুর্বোধ্য। বাহ্যিকভাবে একই কাজ দেখতে একরকম হলেও তার উদ্দেশ্য মানসিকতা কর্তব্যবোধ এবং চেতনার ভিন্নতার কারণে তার প্রকৃত মূল্য ও ফল সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। তাই কর্মকে কেবল বাহ্যিক কার্যকলাপ হিসেবে বিচার করলে তার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা যায় না।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কর্ম্মণো যার মূল সংস্কৃত ধাতু কৃ। কৃ ধাতুর অর্থ করা সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। এই ধাতুর সঙ্গে মন প্রত্যয় যুক্ত হয়ে কর্ম শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। কর্ম্মণো শব্দটি কর্ম শব্দের ষষ্ঠী বিভক্তি যার অর্থ কর্মের অথবা কর্ম সম্বন্ধে। বাংলা ভাষায় কর্ম বলতে কাজ কর্তব্য আচরণ ক্রিয়া বা দায়িত্বকে বোঝায়। আক্ষরিক অর্থে কর্ম হলো যা করা হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে কর্ম কেবল বাহ্যিক কাজ নয় বরং সেই কাজের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মানসিক অবস্থা এবং নৈতিক ভিত্তিও কর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই কাজ যদি স্বার্থপরতার জন্য করা হয় তবে তার প্রকৃতি একরকম হয় আর যদি নিঃস্বার্থভাবে কর্তব্যবোধ থেকে করা হয় তবে তার প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। এই কারণেই গীতা কর্মকে কেবল বাহ্যিক আচরণ হিসেবে নয় বরং অন্তরের চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করে।

হি এবং অপি এই দুটি অব্যয় শব্দ শ্লোকের অর্থকে আরও দৃঢ় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। হি শব্দের অর্থ নিশ্চয়ই বা প্রকৃতপক্ষে এবং অপি শব্দের অর্থ এছাড়াও বা এমনকি। এই দুটি শব্দের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে কর্ম সম্পর্কে জানা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং অপরিহার্য। মানুষের জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কর্মের প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট উপলব্ধি থাকা আবশ্যক।

বোদ্ধব্যং শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বুধ ধাতু থেকে যার অর্থ জানা জাগ্রত হওয়া বা উপলব্ধি করা। বুধ ধাতু থেকেই বোধ শব্দের সৃষ্টি। বোদ্ধব্যং অর্থ জানা উচিত অথবা উপলব্ধি করা কর্তব্য। এখানে কেবল তথ্যগত জ্ঞানকে বোঝানো হয়নি বরং এমন এক উপলব্ধিকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের চিন্তা চরিত্র এবং জীবনদর্শনকে পরিবর্তন করে দেয়। গীতার ভাষায় প্রকৃত জ্ঞান তখনই অর্জিত হয় যখন তা মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং আত্মিক উন্নতির পথ খুলে দেয়।

বিকর্ম্মণঃ শব্দটি গঠিত হয়েছে বি উপসর্গ এবং কর্ম শব্দের সমন্বয়ে। বি উপসর্গের অর্থ বিচ্যুতি বিপরীততা অথবা বিকৃতি। তাই বিকর্ম বলতে বোঝায় এমন কর্ম যা নৈতিকতা ধর্ম বা শাস্ত্রসম্মত আদর্শ থেকে বিচ্যুত। বাংলা অর্থে এটি নিষিদ্ধ কর্ম অন্যায় কাজ অথবা অধর্মমূলক আচরণকে নির্দেশ করে। বিকর্ম এমন সব কাজকে বোঝায় যা মানুষকে আত্মিক অবনতি এবং দুঃখের দিকে নিয়ে যায়। লোভ হিংসা প্রতারণা অন্যের অধিকার হরণ কিংবা স্বার্থের জন্য অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বিকর্মের বাস্তব উদাহরণ। দার্শনিকভাবে বিকর্ম মানুষের চেতনাকে সংকুচিত করে এবং তাকে কর্মফলের বন্ধনে আরও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে।

অকর্ম্মণঃ শব্দটি অ এবং কর্ম শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। অ উপসর্গের অর্থ নয় বা অভাব। আক্ষরিক অর্থে অকর্ম মানে কর্মের অনুপস্থিতি। কিন্তু গীতার দর্শনে অকর্মের অর্থ মোটেও অলসতা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়। বরং এমন কর্ম যা সম্পাদিত হলেও কর্মফলের আসক্তি সৃষ্টি করে না তাকেই প্রকৃত অকর্ম বলা হয়েছে। একজন ব্যক্তি যদি নিজের কর্তব্য সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন কিন্তু তার বিনিময়ে ব্যক্তিগত লাভ সম্মান বা প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা না রাখেন তবে সেই কর্ম অকর্মে পরিণত হয়। এই শিক্ষা গীতার নিষ্কাম কর্মযোগের অন্যতম ভিত্তি। পদ্মপাতার উপর জল যেমন অবস্থান করেও তাকে ভিজিয়ে দিতে পারে না তেমনি নিষ্কাম কর্ম মানুষের আত্মাকে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ করে না।

গহনা শব্দটির উৎপত্তি গাহ ধাতু থেকে যার অর্থ গভীরে প্রবেশ করা। এই শব্দের অর্থ গভীর দুর্বোধ্য এবং রহস্যময়। গতিঃ শব্দটি গম ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ যাওয়া বা অগ্রসর হওয়া। এখানে গতি বলতে কেবল চলাচল বোঝানো হয়নি বরং কর্মের কার্যকারণ কর্মফল এবং তার সুদূরপ্রসারী পরিণতিকেও বোঝানো হয়েছে। তাই গহনা কর্ম্মণো গতিঃ এই বাক্যের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেছেন যে কর্মের প্রকৃত ফলাফল এবং তার কার্যপ্রক্রিয়া এতটাই সূক্ষ্ম যে তা সাধারণ বিচারবুদ্ধি দিয়ে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা কঠিন।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের জীবনে কেবল কাজ করাই যথেষ্ট নয় বরং সেই কাজের উদ্দেশ্য নৈতিকতা এবং চেতনা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে দুটি কাজ একই রকম দেখালেও অন্তরের মনোভাবের কারণে তাদের ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। একজন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর শরীর কেটে দেন জীবন রক্ষার জন্য আর একজন অপরাধী একই কাজ করে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। বাহ্যিক কাজ একই হলেও উদ্দেশ্যের পার্থক্যের কারণে একটি কল্যাণকর কর্ম এবং অন্যটি বিকর্ম। এই উদাহরণ প্রমাণ করে যে কর্মের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের দ্বারা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের গুরুত্ব অত্যন্ত বিস্তৃত। অদ্বৈত বেদান্তের মতে জ্ঞানী ব্যক্তি নিজেকে কর্মের প্রকৃত কর্তা মনে করেন না। তাই তিনি কর্ম করেও কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হন না। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন অনুসারে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত কর্মই প্রকৃত কর্ম এবং ঈশ্বরবিমুখ কর্ম বিকর্মে পরিণত হয়। দ্বৈত দর্শন শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বরের আদেশ অনুসারে কর্তব্য পালনই ধর্ম এবং তার বিরুদ্ধাচরণই বিকর্ম। এই তিনটি দর্শনের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তারা সবাই একমত যে কর্মের প্রকৃতি বাহ্যিক আচরণে নয় বরং অন্তরের অবস্থায় নির্ভর করে।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কর্ম মানুষের জীবনযাত্রার অবিরাম প্রবাহের প্রতীক। বিকর্ম পথভ্রষ্টতা নৈতিক অবক্ষয় এবং আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। অকর্ম অন্তরের মুক্তি সমতা এবং অনাসক্তির প্রতীক। আর গহনা কর্ম্মণো গতিঃ মানুষের জীবনে কর্মফলের সেই সূক্ষ্ম এবং রহস্যময় নিয়মের প্রতীক যা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও অবশ্যম্ভাবীভাবে কার্যকর হয়।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষক যদি কেবল বেতনের জন্য পাঠদান করেন তবে তা এক ধরনের কর্ম। কিন্তু যদি তিনি আন্তরিকভাবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের জন্য শিক্ষা দেন তবে সেই একই কাজ আরও উচ্চতর অর্থ ধারণ করে। একজন সমাজসেবী যদি কেবল খ্যাতির জন্য দান করেন তবে তা কর্মফলের আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ কর্ম। কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণে দান করলে সেই কর্ম আত্মিক উন্নতির মাধ্যম হয়ে ওঠে। ইতিহাস সাহিত্য এবং মানবজীবনের অসংখ্য উদাহরণ এই সত্যকে সমর্থন করে যে কর্মের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক রূপে নয় বরং তার অন্তর্নিহিত চেতনা ও উদ্দেশ্যে নিহিত থাকে।

সার্বিকভাবে এই শ্লোক মানবজীবনের অন্যতম গভীর নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা বহন করে। এটি আমাদের শেখায় যে কর্ম বিকর্ম এবং অকর্মের পার্থক্য বোঝা ছাড়া সত্যিকার জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। কর্ম কেবল বাহ্যিক কাজ নয় বরং মানুষের অন্তরের ইচ্ছা চিন্তা উদ্দেশ্য এবং চেতনার প্রতিফলন। বিকর্ম মানুষকে অশান্তি ও বন্ধনের দিকে নিয়ে যায় আর নিষ্কাম অকর্ম মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে। তাই শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেছেন যে কর্মের গতি অত্যন্ত গভীর এবং দুর্বোধ্য। এই উপলব্ধি মানুষকে আত্মবিশ্লেষণ নৈতিকতা কর্তব্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে সত্য জ্ঞান ও মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে।

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: August 10, 2026 August 10, 2026

More insight about 166

More insight about 166