Related

Share

ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৫তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: ত্রিভুবনের রাজ্যও কেন প্রত্যাখ্যান করলেন অর্জুন?

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিন্নু মহীকৃতে। 
নিহত্য ধার্ত্তরাষ্ট্রান্ নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দ্দন॥

অনুবাদ: অর্জুনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, নৈতিক বোধ এবং মানবিক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। এখানে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে ‘জনার্দন’ সম্বোধন করে গভীর বেদনায় প্রশ্ন করছেন—যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করেই তিন জগতের রাজ্যও লাভ করা যায়, তবুও সেই রাজ্য তাঁর কাম্য নয় তাহলে কেবল পৃথিবীর রাজ্যের জন্য এমন ভয়ংকর কর্ম কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই প্রশ্নের মধ্যে কেবল যুদ্ধবিমুখতা নয়, বরং মানুষের বিবেক, কর্তব্য, আত্মীয়তা এবং প্রকৃত সুখ সম্পর্কে এক চিরন্তন দার্শনিক অনুসন্ধান নিহিত রয়েছে।

শ্লোকটির শব্দগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘অপি’ (अपि) একটি সংস্কৃত অব্যয়, যার অর্থ ‘এমনকি’, ‘যদিও’ বা ‘অপেক্ষাকৃত অধিক’। এখানে এটি সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সীমাকে নির্দেশ করছে—অর্থাৎ ‘এমনকি যদি তিন জগতের রাজ্যও লাভ করা যায়’। ‘ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘ত্রৈলোক্য’ (তিন জগত—স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল) এবং ‘রাজ্য’ (শাসনক্ষমতা বা সাম্রাজ্য) শব্দের সমন্বয়ে। ‘ত্রৈলোক্য’ শব্দটির মূল ‘ত্রি’ (তিন) এবং ‘লোক’ (জগৎ) এর সঙ্গে ‘রাজ্য’ যুক্ত হয়ে ‘ত্রিভুবনের রাজ্য’ অর্থ প্রকাশ করেছে। ষষ্ঠী বিভক্তির ‘স্য’ প্রত্যয় যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে—‘ত্রিভুবনের রাজ্যের’। ‘হেতোঃ’ শব্দটি ‘হেতু’ থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ কারণ, উদ্দেশ্য বা নিমিত্ত। ‘কিন্নু’ দুটি অব্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত—‘কিম্’ (কি) এবং ‘নু’ (নিশ্চয়ই বা তবে) এটি প্রশ্নের গভীরতা ও আবেগকে তীব্র করে। ‘মহীকৃতে’ শব্দে ‘মহী’ অর্থ পৃথিবী এবং ‘কৃতে’ অর্থ ‘জন্য’ বা ‘উদ্দেশ্যে’ অর্থাৎ ‘পৃথিবীর রাজ্যের জন্য’। ‘নিহত্য’ শব্দটি √হন্ (হত্যা করা) ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ‘হত্যা করে’ বা ‘বধ করে’। ‘ধার্ত্তরাষ্ট্রান্’ শব্দটি ‘ধৃতরাষ্ট্র’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ’ বা কৌরববৃন্দ। ‘নঃ’ অর্থ ‘আমাদের’, ‘কা’ অর্থ ‘কী’, ‘প্রীতিঃ’ অর্থ আনন্দ, সন্তুষ্টি বা তৃপ্তি, এবং ‘স্যাৎ’ অর্থ ‘হতে পারে’। আর ‘জনার্দন’ শব্দটি ‘জন’ (মানুষ) এবং √অর্দ্ (দমন করা, কষ্ট দূর করা) ধাতু থেকে উৎপন্ন এর অর্থ—‘যিনি মানুষের দুঃখ দূর করেন এবং দুষ্টদের দমন করেন’, যা শ্রীকৃষ্ণের এক প্রসিদ্ধ নাম।

আক্ষরিক অর্থে শ্লোকটির বক্তব্য হলো—“হে জনার্দন! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করে যদি তিন জগতের রাজ্যও লাভ করা যায়, তবুও আমাদের কোনো আনন্দ হবে না তাহলে পৃথিবীর রাজ্যের জন্য তো কথাই নেই।” কিন্তু এই আক্ষরিক অর্থের অন্তরালে রয়েছে এক গভীর মানবিক উপলব্ধি। অর্জুন এখানে ঘোষণা করছেন যে ক্ষমতা, সম্পদ বা সাম্রাজ্য কখনোই মানুষের প্রকৃত সুখের উৎস হতে পারে না, যদি সেই প্রাপ্তির মূল্য হয় আপনজনের রক্ত, বিবেকের যন্ত্রণা এবং আত্মিক শান্তির বিনাশ।

প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের মানসিক অবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি কেবল একজন যোদ্ধা নন তিনি একই সঙ্গে পুত্র, ভাই, শিষ্য, জামাতা, নাতি ও আত্মীয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে যাদের বিরুদ্ধে তাঁকে অস্ত্র ধারণ করতে হবে, তারা তাঁরই প্রিয়জন। ফলে তাঁর সামনে এক ভয়াবহ নৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ জিতলে রাজ্য লাভ হবে, কিন্তু সেই রাজ্যে ভাগ করে নেওয়ার মতো প্রিয় মানুষগুলোই যদি আর না থাকে, তবে সেই জয়ের মূল্য কোথায়? এই প্রশ্ন আজও প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য মানুষের জীবনের এক মৌলিক সত্যকে উদ্ভাসিত করে—বাহ্যিক সাফল্য কখনোই অন্তরের শান্তির বিকল্প হতে পারে না। মানুষ প্রায়ই মনে করে যে অর্থ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা বা খ্যাতিই সুখের মূল উৎস কিন্তু অর্জুন দেখিয়ে দিচ্ছেন, নৈতিকতা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে অর্জিত যেকোনো সাফল্য শেষ পর্যন্ত শূন্যতাই এনে দেয়। প্রকৃত আনন্দ সেই জীবনে, যেখানে কর্ম ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সম্পর্ক ভালোবাসায় সুরক্ষিত এবং বিবেক নির্মল থাকে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গুরুত্ব অপরিসীম। বেদান্ত মতে, জাগতিক ভোগ ও রাজ্য সাময়িক আত্মার শান্তিই প্রকৃত আনন্দ। তাই ত্রিভুবনের রাজ্যও আত্মিক তৃপ্তি দিতে পারে না। সাংখ্য দর্শনের আলোকে অর্জুন তখন প্রকৃতির মোহ ও আসক্তির মধ্যে আবদ্ধ কিন্তু এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তাঁর অন্তরে বিবেকের জাগরণ শুরু হয়েছে। কর্মযোগের দৃষ্টিতে তিনি তখনো ফলের বিচার করছেন—জয় বা রাজ্য লাভ তাঁর বিবেচনার বিষয় পরে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে শিক্ষা দেবেন যে কর্তব্য পালনই মুখ্য, ফলের প্রতি আসক্তি নয়। নীতিদর্শনের আলোকে এই শ্লোক মানবসভ্যতার এক চিরন্তন প্রশ্ন উত্থাপন করে—ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কত দূর পর্যন্ত সহিংসতা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে?

প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘ত্রৈলোক্যরাজ্য’ প্রতীক অসীম ক্ষমতা, জাগতিক আকাঙ্ক্ষা ও সর্বোচ্চ ভোগের ‘ধার্ত্তরাষ্ট্রান্’ প্রতীক মানুষের অন্তরের আসক্তি, অহংকার ও আত্মীয়তার বন্ধনের ‘নিহত্য’ প্রতীক বাহ্যিক শত্রুর পাশাপাশি অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তিকে দমন করার প্রয়োজনীয়তার আর ‘জনার্দন’ প্রতীক সেই অন্তর্নিহিত ঈশ্বরীয় প্রজ্ঞার, যা নৈতিক সংকটে মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করে।

মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্জুন এমন এক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন, যাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানে Moral Injury বা ‘নৈতিক আঘাত’ বলা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে তাঁর কর্তব্য ও নৈতিক বিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন গভীর মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়। অর্জুনের হৃদয়ের যন্ত্রণা এই নৈতিক সংঘাতেরই প্রকাশ।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি এমন একটি উচ্চপদ লাভের সুযোগ পেলেন, যার জন্য তাঁকে নির্দোষ সহকর্মীর ক্ষতি করতে হবে। বাহ্যিকভাবে তিনি সফল হবেন, কিন্তু অন্তরে শান্তি পাবেন কি? অথবা কোনো ব্যবসায়ী অসৎ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করলেন সমাজ তাঁকে সফল বললেও তাঁর বিবেক যদি প্রতিনিয়ত তাকে তাড়িত করে, তবে সেই সম্পদের প্রকৃত মূল্য কতটুকু? অর্জুনের প্রশ্ন এই বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি—সত্যিকারের সুখ কি কেবল প্রাপ্তিতে, নাকি প্রাপ্তির নৈতিকতায়?

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি কেবল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উচ্চারিত একটি আবেগঘন উক্তি নয় এটি মানবজীবনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা, আত্মিক শান্তি এবং সত্যের সন্ধান সম্পর্কে এক অনন্ত শিক্ষা। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা, সাম্রাজ্য বা বাহ্যিক সাফল্য মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। প্রকৃত প্রীতি, প্রকৃত তৃপ্তি এবং প্রকৃত জয় সেই জীবনেই নিহিত, যেখানে ন্যায়, বিবেক, করুণা এবং আত্মশান্তি সমানভাবে বিকশিত হয়। অর্জুনের এই প্রশ্ন তাই যুগে যুগে মানুষকে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়—যে সাফল্য মানবিকতা হারিয়ে অর্জিত হয়, তা কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয় আর যে আনন্দ বিবেককে অস্বীকার করে অর্জিত হয়, তা কখনোই সত্যিকারের আনন্দ হতে পারে না।


 ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: পাপ, স্বজনবধ ও অর্জুনের নৈতিক দ্বন্দ্ব

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 24, 2026 July 28, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৫তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: ত্রিভুবনের রাজ্যও কেন প্রত্যাখ্যান করলেন অর্জুন?

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৫তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: ত্রিভুবনের রাজ্যও কেন প্রত্যাখ্যান করলেন অর্জুন?