ভগবদ্গীতা ১১.২০ — বিশ্বরূপে সমগ্র জগতের প্রকাশ
দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি
ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ।
দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং
লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্।।২০।।
অনুবাদঃ তুমি একাই স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষ ও দশদিক পরিব্যাপ্ত করে আছ। হে মহাত্মন! তোমার এই অদ্ভুত ও ভয়ংকর রূপ দর্শন করে ত্রিলোক অত্যন্ত ভীত হচ্ছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের বিশতম শ্লোক বিশ্বরূপদর্শনের এমন একটি গভীর মুহূর্তকে তুলে ধরে, যখন অর্জুন আর কৃষ্ণকে কেবল তাঁর পরিচিত মানবিক রূপে দেখছেন না। তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়েছে এমন এক মহাজাগতিক রূপ, যার মধ্যে স্বর্গ, পৃথিবী, সমস্ত দিক এবং তিনটি লোক একসঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। অর্জুনের উপলব্ধি এখানে ব্যক্তিগত দর্শন থেকে মহাজাগতিক উপলব্ধিতে উন্নীত হয়। তিনি দেখতে পান যে যে কৃষ্ণকে এতদিন তিনি বন্ধু, সখা ও রথচালক হিসেবে চিনেছেন, সেই কৃষ্ণের মধ্যেই সমগ্র অস্তিত্বের এক বিরাট ও সীমাহীন প্রকাশ বিদ্যমান। তাই এই শ্লোক শুধু একটি অলৌকিক দৃশ্যের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি অতিক্রম করে অস্তিত্বের বৃহত্তর ঐক্য উপলব্ধি করার এক অসাধারণ দার্শনিক মুহূর্ত।
শ্লোকটি শুরু হয়েছে দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ এই ভাব দিয়ে। এখানে দ্যাবা বলতে স্বর্গ বা ঊর্ধ্বলোক এবং পৃথিবী বলতে পার্থিব জগতকে বোঝানো হয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী অন্তর বা অবকাশও কৃষ্ণের দ্বারা পরিব্যাপ্ত। এর সঙ্গে সমস্ত দিকের কথাও যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষ্ণের বিশ্বরূপ কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন পর্যন্ত এবং এক দিক থেকে অন্য সব দিক পর্যন্ত সমগ্র অস্তিত্বের ক্ষেত্র তাঁর দ্বারা পূর্ণ। এখানে ব্যাপ্ত শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কোনো একটি বস্তু যেমন কোনো স্থান দখল করে থাকে, ব্যাপ্ত শব্দটি সেই সাধারণ অর্থের চেয়ে অনেক গভীর। এখানে ব্যাপ্তি বলতে এমন এক সর্বব্যাপী উপস্থিতির ধারণা প্রকাশিত হয়েছে, যার বাইরে কোনো অস্তিত্বকে আলাদা করে স্থাপন করা যায় না।
এই প্রসঙ্গে ত্বয়া একেন শব্দদ্বয়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ত্বয়া অর্থ তোমার দ্বারা এবং একেন অর্থ একমাত্র তোমার দ্বারা। অর্থাৎ অর্জুনের উপলব্ধিতে এই সমগ্র মহাজগতের অন্তরালে একটি ঐক্যবদ্ধ পরম সত্তার উপস্থিতি রয়েছে। বাহ্যিকভাবে জগতের মধ্যে অসংখ্য রূপ, প্রাণী, শক্তি, ঘটনা ও অবস্থার বৈচিত্র্য দেখা যায়। কিন্তু সেই বহুত্বের অন্তরে একটি ঐক্য কাজ করছে। এই একত্বের ধারণাই বিশ্বরূপদর্শনের অন্যতম প্রধান দার্শনিক ভিত্তি। বহু রূপের অন্তরে এক, অসংখ্য প্রকাশের অন্তরে এক পরম উপস্থিতি এবং বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়া অস্তিত্বের অন্তরে একটি বৃহত্তর ঐক্য এই শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
দিশশ্চ সর্বাঃ কথাটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমস্ত দিক বলতে কেবল পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণের মতো ভৌগোলিক দিক বোঝানো হচ্ছে না। এর মধ্যে মহাবিশ্বের স্থানগত সীমাহীনতার একটি ধারণা নিহিত রয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজের অবস্থানকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে দেখে। তার কাছে সামনে ও পেছনে, কাছে ও দূরে, আমার জগৎ ও বাইরের জগৎ আলাদা হয়ে ওঠে। কিন্তু বিশ্বরূপের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুন বুঝতে পারেন যে এই সমস্ত স্থানগত বিভাজন পরম বাস্তবতার কাছে ক্ষুদ্র। কোনো একটি দিক তাঁর বাইরে নয়। কোনো একটি অঞ্চল তাঁর উপস্থিতির বাইরে নয়। এই উপলব্ধি ঈশ্বরের সর্বব্যাপিত্বের ধারণাকে গভীরতর করে।
এরপর আসে দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদম্। অর্জুন কৃষ্ণের যে রূপ দেখছেন, তাকে তিনি একই সঙ্গে অদ্ভুত এবং উগ্র বলে অভিহিত করছেন। অদ্ভুত অর্থ বিস্ময়কর, অভাবনীয় এবং সাধারণ অভিজ্ঞতার অতীত। আর উগ্র অর্থ প্রবল, তীব্র এবং ভয়ঙ্কর। এই দুটি শব্দ একসঙ্গে ব্যবহৃত হওয়া অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে। কারণ পরম সত্য কেবল আনন্দদায়ক ও কোমল নয়। তা মানুষের পরিচিত মানসিক সীমার বাইরে। সত্য যত বৃহৎ হয়, তার সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা তত স্পষ্ট হয়। তাই বিশ্বরূপ অর্জুনকে যেমন বিস্মিত করেছে, তেমনি তাকে বিচলিতও করেছে। তিনি সৌন্দর্য দেখছেন, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের অন্তরে অসীম শক্তির প্রকাশও দেখছেন। তিনি মহিমা দেখছেন, কিন্তু সেই মহিমার মধ্যে এমন এক শক্তি অনুভব করছেন যার সামনে ব্যক্তিমানবের সমস্ত অহং অত্যন্ত ক্ষুদ্র হয়ে যায়।
রূপ শব্দটির অর্থ এখানে শুধু আকৃতি বা চেহারা নয়। সংস্কৃত রূপ শব্দের মধ্যে দৃশ্যমান প্রকাশের ধারণা রয়েছে। যে বাস্তবতা সাধারণত মানুষের ইন্দ্রিয়ের সীমার বাইরে, বিশ্বরূপের মাধ্যমে সেই মহাজাগতিক সত্য যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণের রূপ তাই কোনো একটি মানবদেহের আকৃতি নয়। এটি সমগ্র অস্তিত্বের এক মহাজাগতিক প্রকাশ। অর্জুন যে বিশ্ব দেখছেন তা কৃষ্ণের বাইরে আলাদা কোনো বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত নয়। বরং সমস্ত জগত তাঁর রূপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে উঠেছে।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং। লোকত্রয় বলতে তিন লোক বোঝানো হয়েছে। বৈদিক ও পুরাণীয় ভাবনায় স্বর্গ, মর্ত্য এবং অধোলোককে তিনটি প্রধান অস্তিত্বস্তর হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এখানে লোকত্রয়ের অর্থ কেবল পুরাণের তিনটি ভৌগোলিক জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতীকী অর্থে এটি সমগ্র অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তরকে বোঝাতে পারে। ঊর্ধ্বজগত মানুষের আদর্শ ও দেবীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হতে পারে। মধ্যজগত মানবজীবনের কর্ম, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার প্রতীক হতে পারে। নিম্নজগত মানুষের প্রবৃত্তি, অন্ধকার ও সীমাবদ্ধতার প্রতীক হতে পারে। কৃষ্ণের বিশ্বরূপে এই সব স্তরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ অস্তিত্বের কোনো স্তরই সেই মহাজাগতিক ঐক্যের বাইরে নয়।
প্রব্যথিত শব্দটি এই শ্লোকের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। এর মধ্যে বিচলিত হওয়া, কেঁপে ওঠা এবং গভীরভাবে অস্থির হওয়ার অর্থ রয়েছে। অর্জুন এখানে শুধু নিজের ভয় প্রকাশ করছেন না। তিনি বলছেন যে তিন লোকই এই রূপ দেখে প্রব্যথিত হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বরূপের শক্তি এত ব্যাপক যে তার অভিঘাত সমগ্র মহাজাগতিক অস্তিত্বকে স্পর্শ করছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা রয়েছে। মানুষ যখন সত্যকে নিজের সীমিত ধারণার মধ্যে দেখতে চায়, তখন সত্যের প্রকৃত বিশালতা তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বরূপ মানুষের আরামদায়ক ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং তাকে বৃহত্তর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।
শ্লোকের শেষ শব্দ মহাত্মন্ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহা এবং আত্মন্ এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে মহাত্মা শব্দটি গঠিত। মহা অর্থ মহান বা অসীম এবং আত্মন্ অর্থ আত্মা বা সত্তা। অর্জুন কৃষ্ণকে হে মহাত্মা বলে সম্বোধন করছেন। এই সম্বোধনের মধ্যে তাঁর উপলব্ধির পরিবর্তন স্পষ্ট। যাকে তিনি এতদিন ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে চিনতেন, এখন তাঁর মধ্যে এমন এক মহত্তর সত্তার প্রকাশ দেখছেন যা ব্যক্তিসীমা অতিক্রম করেছে। মহাত্মন্ তাই শুধু সম্মানসূচক সম্বোধন নয়। এটি অর্জুনের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির গভীরতা প্রকাশ করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের মধ্যে একত্ব এবং বহুত্বের একটি চমৎকার সম্পর্ক দেখা যায়। জগতে আমরা অসংখ্য রূপ দেখি। মানুষ আলাদা, প্রাণী আলাদা, প্রকৃতি আলাদা, গ্রহ ও নক্ষত্র আলাদা। কিন্তু বিশ্বরূপদর্শনের দৃষ্টিতে এই বহুত্বের অন্তরে একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই ধারণাকে পরম ব্রহ্মের সর্বব্যাপী বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে সমগ্র জগতকে ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত বাস্তবতা হিসেবে বোঝা যায়। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য বজায় থাকলেও ঈশ্বরের সর্বব্যাপী শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন দার্শনিক মতের মধ্যে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও এই শ্লোক মানুষের সীমিত দৃষ্টিকে অতিক্রম করে বৃহত্তর মহাজাগতিক সত্যের দিকে তাকানোর আহ্বান জানায়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই শ্লোকের গুরুত্ব অসাধারণ। মানুষ সাধারণত নিজের জীবনকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে বিচার করে। আমার পরিবার, আমার পরিচয়, আমার সাফল্য, আমার ব্যর্থতা, আমার সম্পদ এবং আমার অবস্থান এইসব ধারণা তার অস্তিত্বের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু বিশ্বরূপদর্শন সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করে। মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ। সে মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। তার সুখ, দুঃখ, সাফল্য ও ব্যর্থতা বৃহত্তর অস্তিত্বের প্রবাহের মধ্যে অবস্থিত। এই উপলব্ধি অহংকে ধ্বংস করার জন্য নয়। বরং অহংকে তার যথাযথ অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
এই শ্লোকের একটি গভীর প্রতীকী অর্থ হলো আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী সমস্ত অবকাশের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি। আকাশকে আমরা অসীম সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখতে পারি এবং পৃথিবীকে বাস্তব জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখতে পারি। তাদের মধ্যবর্তী অবকাশ মানুষের অস্তিত্বের ক্ষেত্র। এই সমগ্র ক্ষেত্রই যখন পরম সত্তার দ্বারা পরিব্যাপ্ত বলে উপলব্ধ হয়, তখন আধ্যাত্মিকতার অর্থ শুধু মন্দির বা নির্দিষ্ট উপাসনাস্থলে সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তখন একটি বৃহত্তর ঐশ্বরিক উপস্থিতির সম্ভাবনা দেখা যায়।
আধুনিক মানুষের জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের অসংখ্য বিভাজনের মধ্যে মানুষ নিজেকে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। বিশ্বরূপের ধারণা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে অস্তিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। পৃথিবীর একটি অংশ অন্য অংশের সঙ্গে যুক্ত। মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তি সমাজের সঙ্গে যুক্ত। সমাজ বৃহত্তর মানবসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত। এই আন্তঃসম্পর্কের উপলব্ধি মানুষকে আরও দায়িত্বশীল এবং বিনয়ী করে তুলতে পারে।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি ছোট পিঁপড়ে যদি একটি বিশাল শহরের রাস্তার উপর হাঁটে, তবে তার কাছে শহরটি কেবল রাস্তা, ভবন এবং আশপাশের কিছু দৃশ্যের সমষ্টি। কিন্তু যদি সে সম্পূর্ণ শহরটিকে একসঙ্গে দেখতে পারত, তাহলে তার পরিচিত জগতের ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যেত। অর্জুনের বিশ্বরূপদর্শনও এক অর্থে সীমিত দৃষ্টির পরিবর্তে সমগ্রতার দৃষ্টি লাভ। তবে এটি কেবল আকাশ থেকে পৃথিবী দেখার মতো কোনো দৃশ্য নয়। এটি অস্তিত্বের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন অংশকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে সত্যকে আমরা যতটা সীমিত করে বুঝি, সত্য নিজে তার চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ অর্জুনকে দেখায় যে ঈশ্বরকে কেবল একটি পরিচিত মানবিক আকৃতির মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তাঁর প্রকাশ স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী অবকাশে, সমস্ত দিকের মধ্যে এবং সমস্ত অস্তিত্বস্তরের মধ্যে বিস্তৃত। কিন্তু সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। তাই একই রূপ অদ্ভুত এবং উগ্র। তা আনন্দ দেয়, বিস্মিত করে, আবার মানুষের অহংকেও কাঁপিয়ে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, গীতার একাদশ অধ্যায়ের বিশতম শ্লোক মানুষের দৃষ্টিকে সীমিত ব্যক্তি থেকে অসীম সমগ্রতার দিকে নিয়ে যায়। দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং আমাদের অস্তিত্বের বিস্তৃত ক্ষেত্রের কথা মনে করায়। ব্যাপ্তং আমাদের সর্বব্যাপী পরম উপস্থিতির কথা জানায়। ত্বয়ৈকেন বহুত্বের অন্তরে একত্বের অনুভূতি জাগায়। দিশশ্চ সর্বাঃ স্থানগত সীমাহীনতার কথা প্রকাশ করে। অদ্ভুতং রূপম্ মানুষের অভিজ্ঞতার অতীত মহিমাকে তুলে ধরে। উগ্রং সেই মহিমার তীব্র ও ভয়ঙ্কর দিক প্রকাশ করে। লোকত্রয়ং সমগ্র অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং প্রব্যথিতং দেখায় যে পরম সত্যের মুখোমুখি হলে সীমিত চেতনা কেঁপে উঠতে পারে। আর মহাত্মন্ শব্দে অর্জুনের উপলব্ধি পূর্ণতা পায়। তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণ কেবল তাঁর পরিচিত সখা নন। তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এমন এক মহাজাগতিক সত্তা, যার মধ্যে সমগ্র অস্তিত্ব পরিব্যাপ্ত। এই কারণেই এই শ্লোক কেবল বিশ্বরূপের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের চেতনার সীমা ভেঙে অসীমের দিকে তাকানোর এক গভীর আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!