ভগবদ্গীতা ১১.২১ — বিশ্বরূপে দেবতা ও ঋষিদের স্তব
অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি
কেচিদ্ ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি।
স্বস্তীত্যুক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ
স্তুবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ।।২১।।
অনুবাদঃ সমস্ত দেবতারা তোমার শরণাগত হয়ে তোমাতেই প্রবেশ করছেন। কেউ কেউ ভীত হয়ে করজোড়ে তোমার গুণগান করছেন। মহর্ষি ও সিদ্ধেরা ‘জগতের কল্যাণ হোক’ বলে প্রচুর স্তুতি বাক্যের দ্বারা তোমার স্তব করছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের একুশতম শ্লোক বিশ্বরূপদর্শনের এমন একটি মুহূর্তকে তুলে ধরে, যেখানে অর্জুনের সামনে প্রকাশিত হয়েছে অসীমের এক গভীর ও বিস্ময়কর চিত্র। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ তখন আর কেবল একজন প্রিয় সখা বা সারথির রূপে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর মধ্যে যেন সমগ্র দেবজগৎ, ঋষিজগৎ এবং অস্তিত্বের অসংখ্য শক্তি একত্রিত হয়ে গেছে। অর্জুন দেখছেন দেবতাদের বিভিন্ন সমষ্টি সেই বিশ্বরূপের মধ্যে প্রবেশ করছে। কেউ কেউ ভয়ে অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে তাঁকে স্তব করছে। আবার মহর্ষি ও সিদ্ধদের সমষ্টি মঙ্গলকামনার বাণী উচ্চারণ করে অসংখ্য উৎকৃষ্ট স্তোত্রের মাধ্যমে তাঁকে স্তুতি করছে। এই একটি দৃশ্যের মধ্যেই বিস্ময়, ভয়, জ্ঞান, শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের এক গভীর আধ্যাত্মিক সমন্বয় ঘটেছে।
শ্লোকটির সূচনা হয়েছে অমী শব্দ দিয়ে। সংস্কৃত ভাষায় অমী একটি নির্দেশবাচক সর্বনাম। এর অর্থ এইসব বা ঐসব। অর্জুন যেন তাঁর সামনে উপস্থিত অসংখ্য দেবসত্তাকে দেখিয়ে বলছেন যে এইসব দেবতাও সেই মহাবিশ্বরূপের মধ্যে প্রবেশ করছে। এর পরেই এসেছে হি শব্দ। এটি একটি অব্যয় এবং বক্তব্যের মধ্যে নিশ্চয়তা ও দৃঢ়তা প্রকাশ করে। অর্জুনের বক্তব্য কোনো কল্পনা নয়। তিনি যে দৃশ্য দেখছেন, সেটি তাঁর কাছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। ত্বাম শব্দের অর্থ তোমাকে বা তোমার মধ্যে। এখানে কৃষ্ণের ব্যক্তিগত রূপের চেয়ে তাঁর সর্বব্যাপী বিশ্বরূপই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এরপর এসেছে সুরসঙ্ঘাঃ। সুর অর্থ দেবতা এবং সঙ্ঘ অর্থ সমষ্টি বা সংঘ। ফলে সুরসঙ্ঘাঃ বলতে বোঝায় দেবতাদের সমষ্টি বা দেবগণের বিভিন্ন সম্প্রদায়। আর বিশন্তি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বিশ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ প্রবেশ করা। ফলে দেবতাদের কৃষ্ণের মধ্যে প্রবেশ করার দৃশ্যটি কেবল কোনো স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এর মধ্যে রয়েছে সমস্ত শক্তির একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে অবস্থানের গভীর দার্শনিক ধারণা।
এই প্রবেশের ধারণাটি গীতার বিশ্বরূপ দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ নিজেকে পৃথক একটি সত্তা হিসেবে অনুভব করে। সে ভাবে আমি আলাদা, অন্য মানুষ আলাদা, প্রকৃতি আলাদা এবং জগতের বিভিন্ন শক্তিও আলাদা। কিন্তু বিশ্বরূপের সামনে সেই পৃথকতার ধারণা ভেঙে যায়। অসংখ্য দেবতা, অসংখ্য শক্তি এবং অসংখ্য অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর পরম বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে। এখানে বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের একটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয়েছে। যে সমস্ত শক্তিকে আমরা আলাদা বলে দেখি, তারা শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অর্থে বিশন্তি শব্দটি কেবল প্রবেশ করার অর্থ বহন করে না। এটি বহুত্বের অন্তর্নিহিত ঐক্যের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এরপর শ্লোকে এসেছে কেচিদ্ ভীতাঃ। কেচিদ্ অর্থ কেউ কেউ এবং ভীতাঃ অর্থ ভীত বা ভয়গ্রস্ত। এখানে একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বরূপের সামনে সবাই একইভাবে প্রতিক্রিয়া করছে না। কেউ বিস্মিত, কেউ ভীত, কেউ অঞ্জলিবদ্ধ, কেউ স্তুতিতে নিমগ্ন। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে অসীম বাস্তবতার উপলব্ধি মানুষের মনে একমাত্র অনুভূতি সৃষ্টি করে না। অসীমকে যখন সীমিত চেতনা উপলব্ধি করতে চায়, তখন সেখানে বিস্ময় এবং ভয়ের জন্ম হতে পারে। কারণ মানুষ তখন বুঝতে পারে তার পরিচিত জগতের সীমা কত ক্ষুদ্র এবং তার নিজের অস্তিত্ব কত সীমাবদ্ধ।
ভীতাঃ শব্দটি এসেছে ভী ধাতু থেকে, যার অর্থ ভয় পাওয়া। কিন্তু এখানে এই ভয়কে সাধারণ দুর্বলতা হিসেবে দেখলে শ্লোকটির গভীরতা বোঝা যায় না। বিশ্বরূপের সামনে যে ভয় সৃষ্টি হয়েছে, তা অসীমের সামনে সীমিত সত্তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ যখন হঠাৎ উপলব্ধি করে যে তার পরিচিত সমস্ত শক্তির পেছনে এমন এক মহাশক্তি রয়েছে যা তার বুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের মহত্তর ভয়ের জন্ম হয়। এই ভয় কখনও মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার কখনও তাকে অহংকার থেকে মুক্ত করে। গীতার এই প্রসঙ্গে ভয় ধীরে ধীরে বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়।
এই বিনয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক হলো প্রাঞ্জলয়ঃ শব্দটি। অঞ্জলি অর্থ দুই হাত একত্র করে শ্রদ্ধা বা প্রার্থনার ভঙ্গি। প্রাঞ্জলি অর্থ অঞ্জলিবদ্ধ। ফলে প্রাঞ্জলয়ঃ বলতে বোঝানো হয়েছে যারা হাত জোড় করে দাঁড়িয়েছে। মানুষের জীবনে দুই হাত জোড় করা একটি অত্যন্ত গভীর প্রতীক। এটি শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা, অহংকারকে নত করা এবং নিজের চেয়ে বৃহত্তর কোনো সত্যের সামনে শ্রদ্ধায় দাঁড়ানো। মানুষ যখন বলে আমি সব জানি না, আমি সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তখনই তার মধ্যে সত্য উপলব্ধির একটি নতুন দরজা খুলতে শুরু করে। বিশ্বরূপের সামনে অঞ্জলি সেই বিনয়েরই প্রতীক।
এরপর এসেছে গৃণন্তি শব্দটি। এর সঙ্গে উচ্চারণ, ঘোষণা, স্তব বা প্রশংসার ভাব যুক্ত। অর্থাৎ যারা ভীত হয়েছে তারা নীরব হয়ে যায়নি। তারা অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে সেই মহাশক্তির স্তব করছে। এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর দেখা যায়। ভয় যদি জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা আতঙ্কে থেমে থাকে না। তা শ্রদ্ধায় পরিণত হতে পারে। আর শ্রদ্ধা যখন হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা ভক্তির ভাষা লাভ করে। এই কারণেই বিশ্বরূপের সামনে ভয় শেষ পর্যন্ত প্রার্থনার রূপ নিচ্ছে।
শ্লোকটির পরবর্তী অংশে এসেছে স্বস্তীত্যুক্ত্বা। স্বস্তি শব্দটি সংস্কৃত সু এবং অস্তি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। সু অর্থ শুভ বা ভালো এবং অস্তি অর্থ আছে বা থাকা। এই অর্থে স্বস্তির গভীর ভাব হলো শুভভাবে থাকা, কল্যাণের মধ্যে থাকা বা মঙ্গল প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সাধারণভাবে স্বস্তি শব্দের অর্থ মঙ্গল, কল্যাণ, শান্তি বা শুভ অবস্থা। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে স্বস্তি শুধু ব্যক্তিগত সুখের কামনা নয়। এটি সমগ্র অস্তিত্বের মঙ্গল ও সামঞ্জস্যের আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বরূপের ভয়ংকর মহিমার মধ্যেও ঋষি ও সিদ্ধরা মঙ্গল কামনা করছে। অর্থাৎ মহাজাগতিক শক্তির সামনে দাঁড়িয়েও তাদের প্রার্থনার কেন্দ্রে রয়েছে কল্যাণ।
উক্ত্বা শব্দটি এসেছে বলা অর্থবোধক ধাতু থেকে এবং এর অর্থ বলে বা উচ্চারণ করে। ফলে স্বস্তীত্যুক্ত্বা অর্থ স্বস্তি বা মঙ্গল হোক এই কথা উচ্চারণ করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে মঙ্গলকামনা এখানে শুধু একটি অন্তর্গত অনুভূতি নয়। তা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষের সংস্কৃতিতে প্রার্থনা, মন্ত্র এবং স্তোত্রের যে গুরুত্ব রয়েছে, এই শব্দটি তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষ কোনো মহান সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতিকে শব্দে প্রকাশ করে। সেই শব্দ কখনও প্রার্থনা হয়, কখনও স্তোত্র হয় এবং কখনও মঙ্গলকামনা হয়ে ওঠে।
এরপর এসেছে মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ। মহর্ষি শব্দটি মহা এবং ঋষি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। মহা অর্থ মহান এবং ঋষি বলতে বোঝায় সত্যদ্রষ্টা বা জ্ঞানদ্রষ্টা। তাই মহর্ষি শুধু একজন সাধু বা জ্ঞানী ব্যক্তি নন। তিনি এমন একজন যিনি গভীর সত্য উপলব্ধি করেছেন। সিদ্ধ শব্দের সঙ্গে সিদ্ধ হওয়া, সম্পূর্ণতা এবং আধ্যাত্মিক সাফল্যের ধারণা যুক্ত। ফলে মহর্ষি ও সিদ্ধদের সমষ্টি বলতে এমন এক আধ্যাত্মিক জগতকে বোঝানো হয়েছে যেখানে জ্ঞান ও সাধনার পরিপূর্ণতার প্রতিনিধিরা উপস্থিত। তাঁরা বিশ্বরূপের সামনে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে না থেকে স্তুতির মাধ্যমে নিজেদের উপলব্ধি প্রকাশ করছে।
স্তুবন্তি শব্দটি এসেছে স্তু ধাতু থেকে। এর অর্থ প্রশংসা করা, বন্দনা করা বা স্তুতি করা। স্তুতিভিঃ শব্দটি একই মূল থেকে এসেছে এবং এর অর্থ স্তুতির মাধ্যমে বা স্তোত্রের দ্বারা। পুষ্কলাভিঃ অর্থ প্রচুর, সমৃদ্ধ, পূর্ণ বা উৎকৃষ্ট। ফলে পুষ্কলাভিঃ স্তুতিভিঃ বলতে বোঝায় সমৃদ্ধ, ব্যাপক ও উৎকৃষ্ট স্তোত্রের মাধ্যমে স্তুতি করা। এখানে শুধু সংখ্যার প্রাচুর্য বোঝানো হয় না। এর মধ্যে ভাবের পূর্ণতা এবং মহিমার গভীরতাও রয়েছে। যে সত্যকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, তাকে উপলব্ধি করার পর জ্ঞানী ও সিদ্ধরা অসংখ্য স্তোত্রের মাধ্যমে সেই মহিমা প্রকাশ করার চেষ্টা করছে।
এই শ্লোকের দার্শনিক অর্থ অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে পরম সত্য এক এবং বহুত্ব সেই এক সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ। দেবতাদের কৃষ্ণের মধ্যে প্রবেশের দৃশ্যকে সেই একত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। বহু শক্তি এবং বহু সত্তা শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর পরম বাস্তবতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে ভক্তিমূলক দর্শনে এখানে ঈশ্বরের সর্বোচ্চ মহিমা এবং জীবের নির্ভরতার সম্পর্ক স্পষ্ট। দেবতা, ঋষি এবং সিদ্ধরাও সেই পরম সত্তার সামনে নিজেদের নত করছে। এতে বোঝা যায় যে ঈশ্বরীয় বাস্তবতার সামনে জ্ঞান, শক্তি বা সিদ্ধি কোনো কিছুকেই অহংকারের কারণ করা যায় না।
এই শ্লোকের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন তার নিজের সীমাবদ্ধতা হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতির বিশালতা, মহাবিশ্বের অসীমতা, গভীর জ্ঞান, জীবনের অনিশ্চয়তা কিংবা অস্তিত্বের রহস্যের সামনে দাঁড়ালে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব করে। সেই অনুভূতি কখনও ভয় সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই ভয় যদি আত্মজ্ঞান ও বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়, তবে তা ধ্বংসাত্মক নয়। বরং তা মানুষকে পরিণত করে। গীতার বিশ্বরূপের সামনে ভীত সত্তাদের অঞ্জলিবদ্ধ হওয়া সেই মানসিক রূপান্তরের প্রতীক।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অসাধারণ। এখানে কোনো স্থির দৃশ্য নেই। সবকিছু যেন চলমান। দেবতারা প্রবেশ করছে। কেউ ভয়ে হাত জোড় করছে। কেউ স্তব করছে। মহর্ষি ও সিদ্ধরা মঙ্গলবাণী উচ্চারণ করছে। আবার তারা অসংখ্য স্তুতির মাধ্যমে বিশ্বরূপের মহিমা ঘোষণা করছে। কয়েকটি ক্রিয়াপদের মধ্য দিয়ে একটি বিশাল মহাজাগতিক দৃশ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্যের মধ্যে একই সঙ্গে ভয় ও সৌন্দর্য, শক্তি ও কোমলতা, বিস্ময় ও ভক্তি উপস্থিত।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোক একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আধুনিক মানুষ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং জ্ঞানের মাধ্যমে বিপুল ক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে কখনও কখনও তার মনে হতে পারে যে সে নিজের জীবন ও পৃথিবীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু বিশ্বরূপের শিক্ষা হলো মানুষের ক্ষমতা যতই বৃদ্ধি পাক, অস্তিত্বের বিশালতার সামনে তার সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। নিজের সীমা উপলব্ধি করা দুর্বলতা নয়। বরং সেটিই জ্ঞানের সূচনা হতে পারে। যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে পারে, তার মধ্যেই সত্যিকারের বিনয় জন্ম নিতে পারে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত ভয় থেকে ভক্তিতে উত্তরণের শিক্ষা। প্রথমে আছে অসীমের দর্শন। তারপর আসে বিস্ময় ও ভয়। সেই ভয় মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে। তারপর সে অঞ্জলিবদ্ধ হয়। অঞ্জলি অহংকারের নতি নির্দেশ করে। এরপর আসে স্বস্তি বা মঙ্গলের প্রার্থনা। শেষে আসে স্তুতি। অর্থাৎ মানুষের অন্তর্গত যাত্রাটি যেন ভয় থেকে শ্রদ্ধায়, শ্রদ্ধা থেকে বিনয়ে এবং বিনয় থেকে ভক্তিতে পৌঁছে যায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.২১ তাই কেবল দেবতা ও ঋষিদের একটি মহাজাগতিক দৃশ্যের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের চেতনার একটি গভীর প্রতিচ্ছবি। অমী আমাদের অসংখ্য সত্তার কথা মনে করায়। সুরসঙ্ঘাঃ বহুত্বের কথা বলে। বিশন্তি সেই বহুত্বের পরম আশ্রয়ের কথা প্রকাশ করে। ভীতাঃ অসীমের সামনে সীমিত সত্তার বিস্ময় ও ভয়ের কথা বলে। প্রাঞ্জলয়ঃ অহংকারের নতি ও আত্মসমর্পণের প্রতীক হয়ে ওঠে। স্বস্তি কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। মহর্ষি ও সিদ্ধ জ্ঞান ও সাধনার পূর্ণতার প্রতীক। আর স্তুতি ও পুষ্কল স্তোত্র সেই পরম সত্যের প্রতি ভাষায় প্রকাশিত শ্রদ্ধার রূপ।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোক যেন আমাদের একটি চিরন্তন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র সত্তার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর অস্তিত্বের দিকে তাকায়, তখন প্রথমে তার মনে বিস্ময় জন্মায়। কখনও ভয়ও আসে। কিন্তু সেই ভয় যদি তাকে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেটিই আধ্যাত্মিক জাগরণের সূচনা হতে পারে। বিশ্বরূপের সামনে অঞ্জলিবদ্ধ দেবতারা এবং স্তুতিতে নিমগ্ন মহর্ষি ও সিদ্ধরা যেন সেই শিক্ষাই দিচ্ছেন। অসীমের সামনে সত্যিকারের জ্ঞানী সে নয় যে নিজের মহত্ত্ব ঘোষণা করে। সত্যিকারের জ্ঞানী সে, যে অসীমের মহত্ত্ব উপলব্ধি করে বিনয়ে মাথা নত করতে শেখে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!