ভগবদ্গীতা ১১.২২ — বিশ্বরূপে দেবতা ও দিব্য সত্তাদের বিস্ময়
রুদ্রাদিত্যা বসবো যে চ সাধ্যা
বিশ্বেহশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ।
গন্ধর্বযক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা
বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে।।২২।।
অনুবাদঃ রুদ্রগণ, আদিত্যগণ, সাধ্য নামক দেবতারা, বসুগণ, বিশ্বদেবগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুতগণ, পিতৃগণ, গন্ধর্বগণ, যক্ষগণ, অসুরগণ ও সিদ্ধগণ সকলেই বিস্মৃত হয়ে তোমাকে দর্শন করছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের এক অসাধারণ মুহূর্ত ফুটে উঠেছে। অর্জুনের সামনে তখন আর কেবল তাঁর পরিচিত সখা কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে নেই। তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এমন এক অসীম বিশ্বসত্তা, যার মধ্যে দেবতা, প্রকৃতির শক্তি, পিতৃগণ, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর এবং সিদ্ধগণ পর্যন্ত নিজেদের স্থান খুঁজে পাচ্ছে। শ্লোকটি তাই শুধু দেবতাদের একটি তালিকা নয়। এর অন্তরে রয়েছে সমগ্র সৃষ্টিজগতের বহুত্বকে একটি পরম ঐক্যের মধ্যে দেখার গভীর দর্শন। শ্লোকটির শুরুতেই বলা হয়েছে রুদ্রগণ, আদিত্যগণ, বসুগণ, সাধ্যগণ, বিশ্বেদেবগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুতগণ এবং উষ্মপাগণ কৃষ্ণের সেই বিশ্বরূপ দর্শন করছেন। তাঁদের সঙ্গে গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর এবং সিদ্ধগণের সমাবেশও উপস্থিত। শেষে বলা হয়েছে যে সকলেই বিস্মিত হয়ে তাঁকে দেখছে। এই শেষ অনুভূতিটিই সমগ্র শ্লোকের প্রাণ।
রুদ্র শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত রুদ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। রুদ্ এর মধ্যে ক্রন্দন বা প্রবল আবেগের ধারণা আছে। বৈদিক সাহিত্যে রুদ্র কেবল ভয়ংকর বা ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক নন। তাঁর সঙ্গে রোগনাশ, আরোগ্য এবং প্রকৃতির প্রবল শক্তির ধারণাও যুক্ত। ফলে বিশ্বরূপে রুদ্রদের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধ্বংস এবং সৃষ্টির মধ্যে প্রকৃতপক্ষে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পুরাতন রূপ ভেঙে না গেলে নতুন রূপের জন্ম হয় না। যে শক্তিকে আমরা ধ্বংস বলে ভয় করি, বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে সেটিও পরিবর্তনের একটি অপরিহার্য উপাদান। রুদ্ররাও যখন বিশ্বরূপের সামনে বিস্মিত হয়ে দাঁড়ান, তখন বোঝা যায় যে ধ্বংসের শক্তিও পরম সত্তার তুলনায় সীমিত।
এরপর এসেছে আদিত্যগণের কথা। আদিত্য শব্দটি অদিতির সন্তান অর্থে ব্যবহৃত হয়। অদিতি বৈদিক ভাবনায় অসীমতা, অখণ্ডতা এবং বন্ধনহীনতার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সন্তানরা আদিত্য নামে পরিচিত। সূর্য এবং বিশ্বশৃঙ্খলার সঙ্গে তাঁদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আদিত্যদের উপস্থিতি বিশ্বরূপের মধ্যে আলো, জীবন, নিয়ম এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অন্তর্ভুক্তিকে নির্দেশ করে। যে সূর্য মানুষের কাছে আলো ও জীবনের এক মহান উৎস, সেই সূর্যজাতীয় শক্তিও এখানে পরম বিশ্বসত্তার একটি অংশমাত্র। এই উপলব্ধি মানুষকে তার পরিচিত মহিমার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের দিকে তাকাতে শেখায়।
বসু শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত বস্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। বস্ এর অর্থ অবস্থান করা। আবার বসু অর্থ মূল্যবান সম্পদ বা ঐশ্বর্য। বসুগণ তাই প্রকৃতির মৌলিক শক্তি এবং বিশ্বে অবস্থানকারী মূল্যবান উপাদানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেন। মানুষের জীবন প্রকৃতির অসংখ্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল। জল, আগুন, বায়ু, ভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বিশ্বরূপের সামনে সেই সমস্ত শক্তিও একটি বৃহত্তর সমগ্রতার অংশ। বসুগণের বিস্ময় তাই প্রকৃতির শক্তির নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
সাধ্য শব্দটি এসেছে সাধ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত ভাব থেকে। সাধ্ অর্থ সম্পন্ন করা, অর্জন করা বা সিদ্ধ করা। সাধ্য অর্থ যা সাধন করা যায় বা অর্জনযোগ্য। সাধ্যগণের উপস্থিতি যেন মানবজীবনের সাধনা এবং অর্জনের ধারণাকে মহাজাগতিক স্তরে নিয়ে যায়। মানুষ জীবনে নানা লক্ষ্য স্থির করে। জ্ঞান অর্জন, সাফল্য লাভ, সত্য উপলব্ধি এবং আত্মোন্নতি তার সাধনার অংশ। কিন্তু গীতার বিশ্বরূপ আমাদের দেখায় যে অর্জনের সমস্ত ধারণারও একটি বৃহত্তর পরিসর আছে। ব্যক্তির সাধনা যতই গভীর হোক, পরম সত্যের সামনে তার উপলব্ধি এখনও সীমিত।
বিশ্বেদেবগণ নামের মধ্যেই বিশ্ব বা সর্বজনীনতার ধারণা রয়েছে। তাঁরা দেবীয় শক্তির একটি সমষ্টিগত রূপ। এই শ্লোকে তাঁদের অন্তর্ভুক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু নির্দিষ্ট কোনো দেবতা নয়, দেবীয়তার সামগ্রিক ধারণাটিও কৃষ্ণের বিশ্বরূপের সামনে উপস্থিত। অর্থাৎ বিশ্বরূপ এমন কোনো সংকীর্ণ ঈশ্বরভাব নয়, যা কেবল একটি বিশেষ শক্তিকে ধারণ করে। বরং সমস্ত দেবীয় শক্তি তার মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য লাভ করেছে।
অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের কথাও এখানে এসেছে। অশ্বিন শব্দটি অশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অশ্বিনীরা বৈদিক ঐতিহ্যে যমজ দেবতা হিসেবে পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে চিকিৎসা, আরোগ্য, গতি এবং পুনরুদ্ধারের ধারণা যুক্ত। জীবনের যে শক্তি ভাঙা জিনিসকে পুনরায় সুস্থ করে, যে শক্তি অসুস্থতাকে অতিক্রম করে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে, সেই শক্তিও বিশ্বরূপের সামনে বিস্মিত। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে আরোগ্যও বিশ্বব্যবস্থার একটি বিশেষ প্রকাশ, কিন্তু পরম সমগ্রতা তার চেয়েও বৃহৎ।
মরুতগণ ঝড়, বায়ু এবং প্রবল প্রকৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের মধ্যে গতি, শব্দ, শক্তি এবং অস্থিরতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায়। পৃথিবীর প্রকৃতি কখনও শান্ত, কখনও প্রচণ্ড। কখনও বাতাস মৃদু, কখনও ঝড় প্রবল। এই পরিবর্তনশীল শক্তির প্রতীক মরুতগণও যখন কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেন, তখন প্রকৃতির সমস্ত গতিশীলতার একটি বৃহত্তর উৎসের দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশ্বরূপ যেন একই সঙ্গে স্থিরতা এবং গতি, সৃষ্টি এবং ধ্বংস, আলো এবং অন্ধকারকে ধারণ করে আছে।
উষ্মপাগণের উল্লেখ শ্লোকটিকে আরও বিস্তৃত করে। উষ্মপা শব্দটি উষ্মা এবং পা এই দুটি ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। উষ্মা অর্থ তাপ বা উষ্ণতা এবং পা অর্থ পান করা বা গ্রহণ করা। বৈদিক ঐতিহ্যে উষ্মপাগণ পিতৃগণের একটি শ্রেণি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের উপস্থিতি বোঝায় যে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ কেবল দেবতাদের জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পূর্বপুরুষ, অতীত এবং পিতৃলোকের ধারণাও সেই বিশ্বসত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মানুষের অস্তিত্ব যেমন বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং অতীতের উত্তরাধিকার। বিশ্বরূপ সেই অতীতকেও নিজের মধ্যে ধারণ করে।
এরপর এসেছে গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর এবং সিদ্ধদের কথা। গন্ধর্বরা দেবীয় সংগীত, সৌন্দর্য এবং শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁদের উপস্থিতি যেন বিশ্বরূপের সামনে সৌন্দর্যের বিস্ময়কে প্রকাশ করে। পৃথিবীতে যত শিল্প, সংগীত, কাব্য এবং সৌন্দর্য আমরা অনুভব করি, তা যেন অসীম সৌন্দর্যের এক ক্ষুদ্র প্রতিফলন। গন্ধর্বরা নিজেরাই সৌন্দর্যের প্রতীক হয়েও যখন বিশ্বরূপের সামনে বিস্মিত হন, তখন বোঝা যায় যে সীমিত সৌন্দর্য অসীম সৌন্দর্যের সামনে কত ক্ষুদ্র।
যক্ষদের সঙ্গে প্রকৃতির গুপ্ত সম্পদ এবং অদৃশ্য শক্তির ধারণা যুক্ত। তারা যেন সেই সমস্ত শক্তির প্রতীক, যা আমাদের চোখের সামনে সরাসরি প্রকাশিত না হলেও অস্তিত্বের গভীরে কাজ করে। বিশ্বরূপের সামনে যক্ষদের উপস্থিতি বোঝায় যে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য উভয় জগতই পরম সত্তার অন্তর্ভুক্ত। কোনো কিছু চোখে দেখা যাচ্ছে না বলে তা অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না। বিশ্বরূপের ধারণা দৃশ্যমান জগতের সীমা অতিক্রম করে অদৃশ্য বাস্তবতার দিকেও আমাদের দৃষ্টি নিয়ে যায়।
অসুর শব্দটির ইতিহাসও অত্যন্ত গভীর। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে অসুর শব্দটি সবসময় পরবর্তী পুরাণীয় অর্থে অশুভ বা দেববিরোধী শক্তি বোঝাত না। পরবর্তী কালে সুর ও অসুরের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গীতার এই শ্লোকে অসুরদেরও বিশ্বরূপের দর্শক হিসেবে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। পরম বাস্তবতার সামনে আলো ও অন্ধকার, অনুকূল ও প্রতিকূল, দেবীয় ও অসুরীয় শক্তির পৃথক অস্তিত্বও বৃহত্তর সমগ্রতার মধ্যে অবস্থান করে। এখানে কোনো দ্বন্দ্বকে মহাবিশ্বের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়নি। বরং দ্বন্দ্বসহ সমগ্র অস্তিত্বকে এক বিশ্বসত্তার মধ্যে দেখা হয়েছে।
সিদ্ধসঙ্ঘ শব্দটি সিদ্ধ এবং সংঘের সমন্বয়ে গঠিত। সিদ্ধ অর্থ সাধনায় সফল বা অর্জিত অবস্থায় উপনীত ব্যক্তি। সংঘ অর্থ সমাবেশ বা সমষ্টি। তাই সিদ্ধসঙ্ঘ অর্থ সিদ্ধদের সমাবেশ। তাঁরা এমন সত্তার প্রতীক, যারা সাধনা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির মাধ্যমে উচ্চতর অবস্থায় পৌঁছেছেন। কিন্তু তাঁরাও বিশ্বরূপের সামনে বিস্মিত। এই দৃশ্য মানুষের জন্য একটি গভীর শিক্ষা বহন করে। যত জ্ঞানই অর্জিত হোক, যত সাধনাই সম্পন্ন হোক, পরম সত্যের পরিধি মানুষের অর্জিত জ্ঞানের চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ।
এই সমস্ত নামের পর শ্লোকে যে ক্রিয়াপদটি এসেছে তা হলো বীক্ষন্তে। এটি কেবল দেখা নয়, মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার অর্থ বহন করে। তাঁরা কৃষ্ণের বিশ্বরূপকে গভীরভাবে দেখছেন। আর সেই দর্শনের ফল হয়েছে বিস্ময়। বিস্মিত শব্দটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাধারণ আনন্দ বা আশ্চর্য নয়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে পরিচিত চিন্তার কাঠামো ভেঙে যায় এবং চেতনা এমন এক বিশালতার মুখোমুখি হয়, যা তার পূর্বপরিচিত ধারণার বাইরে। বিশ্বরূপদর্শনের বিস্ময় তাই জ্ঞানের বিপরীত নয়। বরং জ্ঞানের সীমা উপলব্ধি করার একটি উচ্চতর মুহূর্ত।
এই শ্লোকের শেষ শব্দগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ হলো সর্বে। অর্থাৎ সকলেই। রুদ্র থেকে সিদ্ধ পর্যন্ত, দেবতা থেকে অসুর পর্যন্ত, প্রকৃতির শক্তি থেকে আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত সত্তা পর্যন্ত সবাই বিশ্বরূপের সামনে বিস্মিত। এই সর্বে শব্দটি সমগ্র শ্লোকের অর্থকে একটি পূর্ণতা দেয়। কারণ এখানে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া হয়নি। পরম সত্যের সামনে সমস্ত সত্তাই সীমাবদ্ধ। এই উপলব্ধি ভারতীয় দর্শনের ঐক্যের ধারণাকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোককে বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। পৃথিবীতে আমরা অসংখ্য নাম, রূপ, শক্তি এবং পরিচয় দেখি। কেউ প্রকৃতির শক্তির প্রতীক, কেউ আলো ও শৃঙ্খলার প্রতীক, কেউ ধ্বংসের, কেউ আরোগ্যের, কেউ সৌন্দর্যের, কেউ সম্পদের, কেউ সাধনার। কিন্তু বিশ্বরূপের মধ্যে তারা বিচ্ছিন্ন নয়। তারা একটি বৃহত্তর সমগ্রতার অংশ। অদ্বৈত ভাবনায় এই বহুত্বের অন্তরালে এক পরম বাস্তবতার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত ভাবনায় জগত এবং জীবের বহুত্ব পরম পুরুষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে। ভিন্ন দর্শন ভিন্ন ভাষায় ব্যাখ্যা করলেও এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় অনুভূতি হলো বহুত্বের অন্তর্নিহিত ঐক্য।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের গভীর শিক্ষা রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে সমগ্র জগতের কেন্দ্র মনে করে। নিজের সাফল্য, ব্যর্থতা, পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা এবং সমস্যাকে এত বড় করে দেখে যে বৃহত্তর বাস্তবতাকে ভুলে যায়। বিশ্বরূপের শিক্ষা সেই অহংকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তাকে যথাযথ অবস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য। মানুষ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সে একা নয়। তার জীবন একটি বিশাল সম্পর্কের জগতের অংশ। তার অস্তিত্ব প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস, পূর্বপুরুষ এবং অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে যুক্ত।
এই শ্লোককে একটি বিশাল অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেখানে কেউ বাঁশি বাজায়, কেউ বেহালা বাজায়, কেউ ঢোল বাজায় এবং কেউ সুরের নেতৃত্ব দেয়। প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব স্বর রয়েছে। কিন্তু সবকটি স্বর একত্রিত না হলে সম্পূর্ণ সঙ্গীত তৈরি হয় না। ঠিক তেমনি রুদ্র, আদিত্য, বসু, সাধ্য, অশ্বিনী, মরুত, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর এবং সিদ্ধ প্রত্যেকেই অস্তিত্বের একটি বিশেষ শক্তির প্রতীক। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ সেই সম্পূর্ণ সঙ্গীত, যার মধ্যে সব বিচ্ছিন্ন সুর এক হয়ে যায়।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। কবি প্রথমে একের পর এক দেবীয় ও অতিমানবীয় সত্তার নাম উচ্চারণ করেছেন। রুদ্র, আদিত্য, বসু, সাধ্য, বিশ্বেদেব, অশ্বিনী, মরুত, উষ্মপা, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর এবং সিদ্ধ। এই দীর্ঘ তালিকা পাঠকের মনে ক্রমশ একটি বিশাল মহাজাগতিক দৃশ্য নির্মাণ করে। তারপর হঠাৎ বলা হয় সকলেই বিস্মিত হয়ে তোমাকে দেখছে। এর ফলে পাঠকের মনেও একটি অনুভূতি তৈরি হয় যে এই বিশ্বরূপ কোনো সাধারণ দৃশ্য নয়। এটি এমন এক দৃশ্য যার সামনে অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তর পর্যন্ত থমকে দাঁড়িয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.২২ এর এই শ্লোক আমাদের এমন একটি বিশ্বদৃষ্টির সামনে দাঁড় করায় যেখানে দেবতা ও মানুষ, প্রকৃতি ও অতিপ্রাকৃত, আলো ও অন্ধকার, সৌন্দর্য ও শক্তি, অতীত ও বর্তমান, সাধনা ও সীমাবদ্ধতা সবকিছু একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে অবস্থান করছে। রুদ্র ধ্বংসের শক্তি, আদিত্য আলোর শক্তি, বসু প্রকৃতির ঐশ্বর্য, সাধ্য সাধনার সম্ভাবনা, অশ্বিনী আরোগ্যের প্রতীক, মরুত গতিশীলতার প্রতীক, উষ্মপা পূর্বপুরুষের স্মৃতি, গন্ধর্ব সৌন্দর্য, যক্ষ গুপ্ত শক্তি, অসুর বিরোধী প্রবণতা এবং সিদ্ধ আধ্যাত্মিক সিদ্ধির প্রতীক হিসেবে পাঠ করা যায়। কিন্তু এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে সেই বিশ্বরূপ, যার সামনে সবাই দর্শক এবং সবাই বিস্মিত। এই বিস্ময়ই শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা। মানুষ যতই জানুক, যতই অর্জন করুক এবং যতই নিজের শক্তির ওপর গর্ব করুক, অসীমের সামনে তাকে শেষ পর্যন্ত বিস্ময়ের মধ্যেই দাঁড়াতে হয়। সেই বিস্ময় ভয়ের নয় শুধু। এটি নিজের ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করে মহাবিশ্বের বৃহত্তর সত্যকে অনুভব করার একটি দরজা। আর সেই কারণেই এই শ্লোক কেবল প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের একটি পঙক্তি নয়। এটি মানুষের অহং থেকে মহত্ত্বের দিকে, বিচ্ছিন্নতা থেকে ঐক্যের দিকে এবং সীমিত জ্ঞান থেকে অসীম বিস্ময়ের দিকে যাত্রার এক চিরন্তন আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!