সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১১.২৪ — বিশ্বরূপ দর্শনে অর্জুনের ভয় ও অস্থিরতা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণংব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্।দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মাধৃতিং…
নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং
ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্।
দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা
ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।।২৪।।

অনুবাদঃ হে বিষ্ণু! তোমার আকাশষ্পর্শী, তেজোময়, বিবিধ বর্ণযুক্ত, বিস্তৃত মুখমন্ডল ও উজ্জ্বল আয়ত চক্ষুবিশিষ্ট তোমাকে দেখে আমার হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে এবং আমি ধৈর্য ও শম অবলম্বন করতে পারছি না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের চব্বিশতম শ্লোক বিশ্বরূপদর্শনের অন্যতম গভীর মুহূর্তকে সামনে নিয়ে আসে। অর্জুন এর আগে কৃষ্ণের মধ্যে অসংখ্য দেবতা, বিচিত্র রূপ, অসীম জ্যোতি এবং সমগ্র বিশ্বজগতের এক মহাসংহত প্রকাশ প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু সেই দর্শন যত গভীর হতে থাকে, বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তরে ভয়ের সঞ্চারও তত প্রবল হয়। তিনি দেখছেন এমন এক রূপ, যার বিস্তার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যার মধ্যে অসংখ্য বর্ণের বিচিত্র প্রকাশ, যার মুখগুলি বিস্তৃত এবং যার বিশাল নয়ন দীপ্তিমান। এই অভিজ্ঞতা কেবল চোখের সামনে দেখা কোনো অতিমানবীয় দৃশ্য নয়। এটি এমন এক অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতা, যেখানে সীমিত মানুষ প্রথমবার অসীম বাস্তবতার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতাকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে। তাই অর্জুনের মুখে উচ্চারিত হয় গভীর আর্তি। তিনি বলেন, হে বিষ্ণু, তোমাকে এই আকাশস্পর্শী, দীপ্তিমান, নানাবর্ণময়, বিস্তৃত মুখবিশিষ্ট এবং প্রজ্বলিত বিশাল নয়নযুক্ত রূপে দেখে আমার অন্তরাত্মা অত্যন্ত বিচলিত হয়েছে। আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছি না এবং কোনো শান্তিও লাভ করছি না।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো নভঃস্পৃশম্। সংস্কৃত নভঃ শব্দের অর্থ আকাশ বা অন্তরীক্ষ এবং স্পৃশ শব্দের সঙ্গে স্পর্শ করার ধারণা যুক্ত। তাই নভঃস্পৃশম্ অর্থ আকাশস্পর্শী। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে আকাশস্পর্শী কথাটি শুধু বিশাল উচ্চতার বর্ণনা নয়। এর মধ্যে অসীম ব্যাপ্তির ধারণা রয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজের চারপাশের জগতকেই নিজের বাস্তবতার পরিসর মনে করে। তার পরিবার, সমাজ, কর্ম, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলেই তার পৃথিবী গড়ে ওঠে। কিন্তু বিশ্বরূপের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুন উপলব্ধি করছেন যে তাঁর পরিচিত পৃথিবী অসীম অস্তিত্বের তুলনায় কত ক্ষুদ্র। আকাশস্পর্শী রূপ তাই মানুষের সীমাবদ্ধ চেতনার সামনে অসীমতার দ্বার খুলে দেয়। এটি অহংকারকে সংকুচিত করে এবং মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করে।

এরপর আসে দীপ্তম্ শব্দটি। এটি দীপ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে জ্বলা, আলো দেওয়া এবং দীপ্ত হওয়ার অর্থ নিহিত। দীপ্ত অর্থ উজ্জ্বল, প্রজ্বলিত, তেজোময় বা আলোকিত। বিশ্বরূপ এখানে অন্ধকারের প্রতীক নয়। বরং তা আলোয় পূর্ণ। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় আলো কেবল বাহ্যিক আলোক নয়। আলো জ্ঞান, চেতনা, সত্য এবং প্রকাশের প্রতীক। অজ্ঞতার অন্ধকারে মানুষ বাস্তবতার কিছু অংশকে দেখে এবং কিছু অংশকে অদৃশ্য রেখে নিজের মতো করে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু পরম সত্যের আলো যখন সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়, তখন সত্যের সুন্দর দিকের পাশাপাশি তার কঠিন ও ভয়ংকর দিকও সামনে আসে। তাই কৃষ্ণের দীপ্ত বিশ্বরূপ একই সঙ্গে জ্ঞানের আলো এবং বাস্তবতার পূর্ণ প্রকাশের প্রতীক।

অनेकবর্ণম্ শব্দটি এই বিশ্বরূপের বহুমাত্রিকতার কথা বলে। অনেক অর্থ বহু এবং বর্ণ অর্থ রং, আভা, প্রকাশ বা বৈশিষ্ট্য। ফলে অনেকবর্ণম্ অর্থ নানাবর্ণময় বা বহু প্রকাশে সমৃদ্ধ। এখানে বর্ণকে কেবল চোখে দেখা রং হিসেবে নিলে শব্দটির গভীরতা কমে যায়। বিশ্বরূপের মধ্যে অসংখ্য রূপ, শক্তি, প্রাণ, প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের প্রকাশ একত্রিত হয়েছে। একের মধ্যে বহু এবং বহুর মধ্যে একের যে ভারতীয় দার্শনিক ধারণা, এই শব্দটি তারই এক চিত্ররূপ। মানুষের পৃথিবীতে আমরা বৈচিত্র্য দেখি এবং সেই বৈচিত্র্যের কারণে বিভাজন তৈরি করি। কিন্তু বিশ্বরূপের মধ্যে অর্জুন দেখতে পান যে অসংখ্য বৈচিত্র্য একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে অবস্থান করছে। সুতরাং অনেকবর্ণম্ বহুত্বের পাশাপাশি ঐক্যেরও প্রতীক।

এরপর শ্লোকের দৃশ্য আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আসে ব্যাত্তাননম্। ব্যাত্ত অর্থ প্রসারিত বা বিস্তৃত এবং আনন অর্থ মুখ। ফলে ব্যাত্তাননম্ অর্থ বিস্তৃত বা উন্মুক্ত মুখবিশিষ্ট। এই পদটির মধ্যেই বিশ্বরূপের সংহারমুখী দিকের আভাস রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত অর্জুন শুধু দীপ্তি, বৈচিত্র্য এবং বিশালতা দেখছিলেন, ততক্ষণ দর্শনের মধ্যে বিস্ময় প্রবল ছিল। কিন্তু বিস্তৃত মুখের দৃশ্য তাঁকে অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সৃষ্টি যেমন আছে, তেমনি বিনাশও আছে। জন্ম যেমন আছে, তেমনি মৃত্যু আছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রকৃতির কঠোর নিয়মও রয়েছে। মানুষ সাধারণত জীবনের আনন্দকে গ্রহণ করতে চায় কিন্তু জীবনের অনিবার্য ক্ষয় ও মৃত্যুকে ভুলে থাকতে চায়। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ সেই অস্বীকারের সুযোগ রাখে না। ব্যাত্তাননম্ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সময়ের প্রবাহে কোনো সৃষ্ট রূপই স্থায়ী নয়।

দীপ্তবিশালনেত্রম্ পদটি বিশ্বরূপের আরেকটি শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। দীপ্ত অর্থ প্রজ্বলিত, বিশাল অর্থ বিস্তৃত এবং নেত্র অর্থ চোখ বা দৃষ্টি। তাই এর অর্থ দাঁড়ায় প্রজ্বলিত বিশাল নয়নযুক্ত। কিন্তু গীতার ভাষায় চোখ কেবল দেখার অঙ্গ নয়। দৃষ্টি এখানে চেতনার প্রতীক। বিশ্বরূপের বিশাল নয়ন যেন এমন এক সর্বব্যাপী দৃষ্টির প্রতীক, যার বাইরে কোনো কিছুই নেই। মানুষের চোখ সীমিত। সে এক সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থান দেখে, নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা দেখে এবং তার অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যে সত্যকে বিচার করে। কিন্তু বিশ্বচেতনার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ নয়। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে যে মহাজাগতিক বাস্তবতা ধারণ করে, তার কাছে কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিশাল নয়ন তাই সর্বদর্শী চেতনার প্রতীক।

এই অসীম দৃশ্যের সামনে অর্জুনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে প্রব্যথিতান্তরাত্মা শব্দে। এটি অত্যন্ত গভীর একটি অভিব্যক্তি। ব্যথ্ ধাতুর সঙ্গে ব্যথা, বিচলন এবং অস্থিরতার ধারণা যুক্ত। প্র উপসর্গ সেই তীব্রতাকে বাড়িয়ে দেয়। অন্তরাত্মা বলতে এখানে মানুষের গভীর অন্তঃসত্তা বা অন্তরের চেতনাকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অর্জুনের শুধু শরীর ভীত নয়। তাঁর অন্তরের গভীরতম স্তর পর্যন্ত এই দর্শনের অভিঘাত পৌঁছে গেছে। তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন যা তাঁর পরিচিত মানসিক কাঠামোকে অতিক্রম করেছে। এই কারণেই তাঁর ভয় সাধারণ ভয়ের মতো নয়। এটি অস্তিত্বের গভীরতা থেকে উঠে আসা এক ধরনের বিচলন।

এরপর আসে ধৃতিং ন বিন্দামি। ধৃতি শব্দটি ধৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ধৃ অর্থ ধারণ করা বা ধরে রাখা। ধৃতি তাই শুধু ধৈর্য নয়। এটি এমন এক অন্তর্গত শক্তি, যার সাহায্যে মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে স্থির রাখে। অর্জুন বলছেন, তিনি সেই ধৃতিকে আর খুঁজে পাচ্ছেন না। অর্থাৎ বিশ্বরূপের অভিঘাতে তাঁর মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য। কারণ অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অসাধারণ যোদ্ধা। তাঁর হাতে অস্ত্র আছে, তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁর সাহস আছে। কিন্তু অসীম বাস্তবতার সামনে বাহ্যিক সাহস যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রকৃত স্থিতিশীলতা তার অন্তরে। সেই অন্তর্গত স্থিরতা যখন কেঁপে ওঠে, তখন বাহ্যিক শক্তিও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শমং চ। শম অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, মানসিক স্থিরতা এবং অন্তরের প্রশমন। ভারতীয় দর্শনে শম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। অস্থির মনকে প্রশান্ত করে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতাই শমের অন্তর্নিহিত ভাব। কিন্তু অর্জুন বলছেন তিনি ধৃতি পাচ্ছেন না এবং শমও পাচ্ছেন না। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে একদিকে স্থির থাকার শক্তি নেই, অন্যদিকে অন্তরের অশান্তিও প্রশমিত হচ্ছে না। এই দুটি শব্দ একসঙ্গে মানুষের মানসিক অবস্থার দুটি দিক প্রকাশ করে। ধৃতি হলো বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি এবং শম হলো অন্তরের অশান্তি শান্ত করার ক্ষমতা। বিশ্বরূপদর্শনের মুহূর্তে অর্জুন উভয়ই হারিয়ে ফেলেছেন।

শ্লোকের শেষে অর্জুন বলেন বিষ্ণো। এটি বিষ্ণু শব্দের সম্বোধনরূপ। বিষ্ণু নামের সঙ্গে সর্বব্যাপী হওয়ার ধারণা যুক্ত। যিনি সর্বত্র ব্যাপ্ত, যিনি সমস্ত অস্তিত্বকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন, তিনিই বিষ্ণু। এই সম্বোধনটির মধ্যে শ্লোকটির গভীরতম তাৎপর্য নিহিত। অর্জুন যে রূপ দেখছেন তা কোনো সীমিত ব্যক্তির রূপ নয়। এটি সর্বব্যাপী চেতনার প্রকাশ। তাই বিশ্বরূপের সামনে অর্জুনের ভয় কেবল একটি ভয়ংকর দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া নয়। এটি অসীমের সামনে সীমিত সত্তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের একটি মৌলিক সমস্যাকে সামনে আনে। মানুষ বাস্তবতাকে নিজের সীমিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিচার করে। সে মনে করে পৃথিবী তার বোঝার মতোই। কিন্তু পরম বাস্তবতা মানুষের ধারণার চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ। বিশ্বরূপদর্শনে অর্জুন সেই সীমার সম্মুখীন হন। তাঁর পরিচিত ধারণাগুলি ভেঙে যেতে থাকে। তিনি দেখেন যে সৌন্দর্য এবং ভয়, সৃষ্টি এবং বিনাশ, আলো এবং অন্ধকার, জীবন এবং মৃত্যু সবকিছু একই মহাজাগতিক বাস্তবতার অংশ। এই উপলব্ধি সহজ নয়। কারণ মানুষ সাধারণত বাস্তবতাকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভাগ করে নিতে চায়। সে সুন্দরকে গ্রহণ করতে চায় এবং ভয়ংকরকে অস্বীকার করতে চায়। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ সেই বিভাজনকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণ বাস্তবতার সামনে মানুষকে দাঁড় করায়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মন সাধারণত পরিচিত কাঠামোর মধ্যে নিরাপত্তা খুঁজে পায়। আমি কে, আমার পরিবার কে, আমার শত্রু কে, আমার কর্তব্য কী এবং আমার ভবিষ্যৎ কী এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়ে মানুষ নিজের একটি মানসিক জগৎ তৈরি করে। কিন্তু হঠাৎ যখন সেই সীমিত জগতের বাইরে অসীম বাস্তবতার অনুভব আসে, তখন পুরোনো মানসিক কাঠামো ভেঙে যেতে পারে। অর্জুনের প্রব্যথিতান্তরাত্মা সেই অভিজ্ঞতারই প্রতীক। তাঁর সামনে এমন এক সত্য প্রকাশিত হয়েছে, যা তাঁর পূর্বপরিচিত জগতের তুলনায় এত বিশাল যে তাঁর মন সেই অভিজ্ঞতাকে সহজে ধারণ করতে পারছে না।

এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। প্রথমে কবির মতো করে অর্জুন বিশ্বরূপের দৃশ্য বর্ণনা করেন। তিনি বলেন এটি আকাশস্পর্শী। এটি দীপ্তিমান। এটি নানাবর্ণময়। এর মুখ বিস্তৃত। এর চোখ বিশাল এবং দীপ্তিমান। কিন্তু শ্লোকটি শুধু বাহ্যিক দৃশ্যের বর্ণনায় শেষ হয় না। দৃশ্য ধীরে ধীরে অর্জুনের অন্তরে প্রবেশ করে। শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক বিশ্বরূপের বর্ণনা পরিণত হয় অন্তরের কাঁপনে। এইভাবে শ্লোকটি দৃশ্য থেকে অনুভূতিতে, অনুভূতি থেকে অস্তিত্বের সংকটে পৌঁছে যায়। এই পরিবর্তনই এর সাহিত্যিক শক্তির অন্যতম প্রধান কারণ।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা গভীর। আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যখন আমাদের পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অনেক বড় হয়ে ওঠে। একজন ছাত্র যখন প্রথম উপলব্ধি করে যে জ্ঞানের জগৎ তার ধারণার চেয়ে অসীম, তখন তার মধ্যে বিস্ময় জন্মায়। একজন বিজ্ঞানী যখন মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে চিন্তা করেন, তখন মানুষের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি হতে পারে। একজন মানুষ যখন জীবনের অনিশ্চয়তা, পরিবর্তন এবং মৃত্যুর অনিবার্যতা উপলব্ধি করেন, তখন তার পরিচিত নিরাপত্তাবোধ কেঁপে উঠতে পারে। এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে বিস্ময় ও ভয় পাশাপাশি থাকতে পারে। গীতার বিশ্বরূপদর্শন সেই মানবিক অভিজ্ঞতাকে এক মহাজাগতিক মাত্রায় প্রকাশ করেছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো সত্যকে গ্রহণ করার সাহস। সত্য শুধু আনন্দদায়ক নয়। সত্য কখনো কখনো আমাদের নিরাপত্তাবোধকে ভেঙে দেয়। সত্য আমাদের অহংকারকে ছোট করে। সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা বৃহত্তর একটি অস্তিত্বের অংশ। অর্জুনের ধৃতি হারিয়ে যাওয়া তাই কেবল দুর্বলতার চিহ্ন নয়। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অভিঘাত। সীমিত মানুষ অসীমের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করছে।

সবশেষে বলা যায়, নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্ এই পদমালার মধ্যে বিশ্বরূপের সম্পূর্ণ একটি দর্শন নিহিত রয়েছে। নভঃস্পৃশম্ প্রকাশ করে অসীম ব্যাপ্তি। দীপ্তম্ প্রকাশ করে জ্ঞান ও চেতনার আলো। অনেকবর্ণম্ প্রকাশ করে একের মধ্যে বহুর অসংখ্য প্রকাশ। ব্যাত্তাননম্ প্রকাশ করে সময় ও সংহারের অনিবার্যতা। দীপ্তবিশালনেত্রম্ প্রকাশ করে সর্বব্যাপী দৃষ্টি। আর প্রব্যথিতান্তরাত্মা, ধৃতিং ন বিন্দামি এবং শমং চ প্রকাশ করে সেই অসীম সত্যের সামনে সীমিত মানবসত্তার গভীর মানসিক অভিঘাত। এই শ্লোক তাই কেবল কৃষ্ণের বিশ্বরূপের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের নিজের সীমা অতিক্রম করে অসীমের সামনে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন অভিজ্ঞতার ভাষা। এখানে বিস্ময় আছে, ভয় আছে, জ্ঞান আছে, আত্মসমর্পণ আছে এবং আছে এমন এক সত্যের আহ্বান, যা মানুষকে তার ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তার বাইরে বৃহত্তর মহাজাগতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে শেখায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 21, 2026 August 21, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি