ভগবদ্গীতা ১১.২৫ — বিশ্বরূপে প্রলয় ও মৃত্যুর ভয়
দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি
দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি।
দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম
প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।২৫।।
অনুবাদঃ হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! ভয়ংকর দন্তযুক্ত ও প্রলয়াগ্নি তুল্য তোমার মুখসকল দেখে আমার দিকভ্রম হচ্ছে এবং আমি শান্তি পাচ্ছি না। তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের পঁচিশতম শ্লোক বিশ্বরূপ দর্শনের এমন এক মুহূর্তকে সামনে নিয়ে আসে, যখন অর্জুনের চোখের সামনে ঈশ্বরের অসীম মহিমা আর শুধু সৌন্দর্য, জ্যোতি ও সৃষ্টির বিস্ময় হয়ে থাকে না, বরং তার সঙ্গে প্রকাশ পায় ধ্বংস, মৃত্যু এবং কালের অনিবার্য শক্তি। তিনি কৃষ্ণের অসংখ্য মুখের মধ্যে এমন ভয়ংকর মুখ দেখতে পান, যেগুলো দন্তের ভয়াবহতায় করাল এবং প্রলয়কালীন অগ্নির মতো জ্বলন্ত বলে মনে হয়। সেই দৃশ্য তাঁর অন্তরের সমস্ত স্থিরতা নষ্ট করে দেয়। তিনি আর নিজের অবস্থান বুঝতে পারেন না। কোন দিকে যাবেন, কী করবেন, কীভাবে এই অসীম রূপের সামনে নিজেকে স্থির রাখবেন, কিছুই বুঝতে পারেন না। তাই তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে গভীর আর্তি। হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, আমার প্রতি প্রসন্ন হোন।
এই শ্লোকের শুরুতেই রয়েছে দংষ্ট্রাকরালানি শব্দটি। সংস্কৃত দংষ্ট্রা শব্দের সঙ্গে দংশ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ কামড়ানো বা দংশন করা। দংষ্ট্রা তাই সাধারণ দাঁত নয়, বরং এমন ধারালো দন্ত যা দংশন ও গ্রাসের শক্তিকে প্রকাশ করে। এর সঙ্গে করাল শব্দ যুক্ত হয়ে সৃষ্টি করেছে আরও ভয়ংকর একটি চিত্র। করাল অর্থ বিকট, ভয়াবহ, ভীতিজনক এবং এমন এক রূপ যা মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তাবোধকে নাড়া দেয়। ফলে দংষ্ট্রাকরালানি মুখানি বলতে শুধু ভয়ংকর মুখ বোঝানো হয়নি। এখানে এমন মুখের কথা বলা হয়েছে যা অস্তিত্বকে গ্রাস করার ক্ষমতার প্রতীক। এই মুখগুলো পরবর্তী শ্লোকগুলোর আলোকে মৃত্যুর দ্বার হিসেবেও প্রতিভাত হয়। জীবনের সমস্ত পরিচিত রূপ যেন সেই মুখের মধ্যে প্রবেশ করে আবার অন্য এক পরিণতির দিকে চলে যাচ্ছে।
মুখ শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সংস্কৃতে মুখ শুধু মুখমণ্ডল নয়, কোনো কিছুর সম্মুখভাগ কিংবা প্রবেশদ্বারকেও বোঝাতে পারে। এই শ্লোকে কৃষ্ণের মুখ তাই কেবল একটি শারীরিক অঙ্গ নয়। বিশ্বরূপের প্রেক্ষাপটে মুখ হয়ে উঠেছে সৃষ্টির বিলয়ের প্রতীকী দ্বার। যে মুখ থেকে বাণী প্রকাশিত হতে পারে, যে মুখে সৌন্দর্য দেখা যেতে পারে, সেই মুখই আবার সবকিছুকে গ্রাস করতে পারে। এর মধ্যেই রয়েছে বিশ্বরূপের রহস্য। সৃষ্টির যে শক্তি জীবনকে প্রকাশ করে, একই মহাশক্তির মধ্যে ধ্বংসের শক্তিও অন্তর্নিহিত। কৃষ্ণের মুখ তাই এখানে একই সঙ্গে প্রকাশের স্থান এবং বিলয়ের স্থান।
এরপর আসে দৃষ্ট্বৈব শব্দটি। দৃষ্ট্বা অর্থ দেখে এবং এব অর্থই বা মাত্র। ফলে দৃষ্ট্বৈবের অর্থ দাঁড়ায় দেখেই বা দেখামাত্রই। এই একটি ছোট শব্দ অর্জুনের মানসিক অবস্থাকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করে। তিনি দীর্ঘ চিন্তা করে ভীত হননি। তিনি কোনো যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে আতঙ্কিত হননি। বিশ্বরূপের ভয়ংকর মুখগুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চেতনার উপর তার অভিঘাত পড়েছে। এই দৃশ্য এতটাই প্রবল যে তাঁর পরিচিত মানসিক কাঠামো আর তাকে ধারণ করতে পারছে না।
কালানলসন্নিভানি শব্দটি এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কাল অর্থ সময় এবং অনল অর্থ অগ্নি। কালানল অর্থ কালের অগ্নি। সন্নিভ অর্থ সদৃশ বা অনুরূপ। ফলে কালানলসন্নিভানি বলতে বোঝানো হয়েছে কালরূপ অগ্নির সদৃশ সেই মুখসমূহ। এখানে কালকে শুধু ঘড়ির কাঁটার চলন হিসেবে দেখা যায় না। কাল হলো সেই অনিবার্য শক্তি যা সবকিছুকে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। জন্মের পর মৃত্যু আসে, নির্মাণের পর ক্ষয় আসে, উত্থানের পর পতন আসে এবং কোনো অবস্থাই চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে না। কাল তাই গীতার এই অংশে অস্তিত্বের অনিবার্য পরিণতির শক্তি। আর অনল সেই শক্তির ধ্বংস ও রূপান্তরের প্রতীক। আগুন যেমন এক রূপকে অন্য রূপে পরিবর্তিত করে, তেমনই কালও সমস্ত দৃশ্যমান অস্তিত্বকে পরিবর্তনের ধারায় নিয়ে যায়।
এই কারণে কালানলসন্নিভানি মুখগুলোকে শুধু আগুনের মতো দেখতে বলা হয়নি। তাদের মধ্যে যে ধ্বংসশক্তি অর্জুন অনুভব করছেন, সেটিই কালাগ্নির সঙ্গে তুলনার মূল কারণ। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে মঙ্গল, সৌন্দর্য, করুণা ও রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বিশ্বরূপদর্শন সেই সীমিত ধারণাকে ভেঙে দেয়। এখানে ঈশ্বর কেবল রক্ষাকারী নন। তিনি সৃষ্টির পাশাপাশি স্থিতি, পরিবর্তন এবং বিলয়েরও অন্তর্নিহিত শক্তি। তাই বিশ্বরূপের ভয়ংকরতা আসলে ঈশ্বরের কোনো পৃথক বা অশুভ রূপ নয়। এটি বিশ্বব্যবস্থার সেই অংশের প্রকাশ, যাকে মানুষ সাধারণত নিজের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে চায়।
এরপর অর্জুন বলেন দিশো ন জানে। দিশ অর্থ দিক এবং জানে শব্দটি জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। আক্ষরিকভাবে এর অর্থ আমি দিকসমূহ জানি না। কিন্তু এখানে এর অর্থ শুধু পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর বা দক্ষিণ ভুলে যাওয়া নয়। অর্জুন বলতে চাইছেন যে তাঁর মানসিক দিকনির্দেশ হারিয়ে গেছে। তিনি জানেন না কোথায় দাঁড়াবেন, কী করবেন এবং কোন পথ গ্রহণ করবেন। এই দিকভ্রান্তি মানুষের গভীর অস্তিত্বগত সংকটের প্রতীক। যখন পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অপরিচিত হয়ে যায়, তখন মানুষের বাহ্যিক পথের পাশাপাশি অন্তরের পথও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অর্জুনের ক্ষেত্রে সেই অবস্থাই ঘটেছে।
ন লভে চ শর্ম বাক্যাংশটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লভে এসেছে লাভ ধাতু থেকে, যার অর্থ পাওয়া বা অর্জন করা। শর্ম অর্থ শান্তি, স্বস্তি, সুখ, নিরাপত্তা এবং অন্তরের প্রশান্তি। তাই ন লভে চ শর্ম অর্থ আমি কোনো শান্তি বা স্বস্তি পাচ্ছি না। এখানে অর্জুন জয় বা শক্তির কথা বলছেন না। তিনি বলছেন শান্তির কথা। বিশ্বরূপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারছেন যে বাহ্যিক শক্তি দিয়ে এই অভিজ্ঞতার মোকাবিলা করা যায় না। মানুষের গভীরতম প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত অন্তরের আশ্রয় ও শান্তি।
এই শ্লোকের শেষাংশে আসে প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস। প্রসীদ শব্দটি প্র এবং সদ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত এবং এর অর্থ প্রসন্ন হওয়া, সদয় হওয়া, অনুগ্রহ করা কিংবা কৃপা করা। অর্জুন এখানে কৃষ্ণের কাছে শুধু ভয় থেকে মুক্তি চাইছেন না। তিনি ঈশ্বরের অনুগ্রহ চাইছেন। দেবেশ অর্থ দেবগণের ঈশ্বর বা প্রভু। এই সম্বোধন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্জুনের কৃষ্ণ সম্পর্কিত উপলব্ধি এখানে আরও গভীর হয়েছে। যাঁকে তিনি বন্ধু হিসেবে চিনতেন, যাঁর সঙ্গে তিনি হাস্যপরিহাস করতেন, সেই কৃষ্ণই এখন তাঁর কাছে দেবেশ হয়ে উঠেছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে যে মহাজাগতিক সত্য এতদিন আবৃত ছিল, বিশ্বরূপের মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে।
জগন্নিবাস শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গভীর দার্শনিক শব্দ। জগত শব্দটির সঙ্গে গম ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে চলমানতা ও পরিবর্তনের ভাব নিহিত। জগত হলো যা ক্রমাগত চলছে, পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাচ্ছে। নিবাস এসেছে নি এবং বস ধাতু থেকে এবং এর অর্থ বাসস্থান, আশ্রয় বা আবাস। তাই জগন্নিবাস অর্থ এমন এক সত্তা যার মধ্যে জগত অবস্থান করে এবং যিনি জগতের আশ্রয়। এই শব্দটি কৃষ্ণকে শুধু জগতের একজন অংশ হিসেবে নয়, বরং সমগ্র জগতের ভিত্তি ও আশ্রয় হিসেবে প্রকাশ করে। জগত তাঁর মধ্যে অবস্থান করে। আবার তিনিই জগতের অন্তর্নিহিত সত্য।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সৃষ্টি ও ধ্বংসকে আলাদা বাস্তবতা হিসেবে না দেখা। মানুষ সাধারণত সৃষ্টি পছন্দ করে এবং ধ্বংসকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। জন্মকে স্বাগত জানায় কিন্তু মৃত্যুকে ভয় করে। সাফল্যকে গ্রহণ করে কিন্তু পতনকে অস্বীকার করতে চায়। অথচ বিশ্বরূপদর্শন দেখায় যে সৃষ্টি ও বিলয় একই বিশ্বপ্রক্রিয়ার অংশ। যে সময় জন্মকে এগিয়ে নিয়ে আসে, সেই সময়ই একদিন জীবনের বর্তমান রূপকে পরিবর্তিত করে। যে প্রকৃতি জীবনকে সৃষ্টি করে, সেই প্রকৃতিই আবার পুরোনো রূপকে বিলীন করে নতুন রূপের পথ তৈরি করে। তাই কালানলকে কেবল ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ অর্থ বোঝা যায় না। এটি পরিবর্তনেরও প্রতীক।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোক অনিত্য জগতের প্রকৃতিকে উপলব্ধি করার একটি শক্তিশালী প্রতীক হতে পারে। দৃশ্যমান জগৎ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো রূপ স্থায়ী নয়। মানুষ নিজের শরীর, পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা এবং সম্পর্ককে স্থায়ী বলে মনে করতে চায়। কিন্তু কাল সবকিছুকে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। এই পরিবর্তনশীলতার অন্তরালে যে চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান, গীতার বিশ্বরূপ সেই অনুসন্ধানকে আরও গভীর করে। ভক্তির দৃষ্টিতে আবার এই শ্লোকের কেন্দ্রবিন্দু হলো আত্মসমর্পণ। যখন মানুষের সীমিত বোধ অসীম বাস্তবতার সামনে এসে থেমে যায়, তখন তার মুখে উচ্চারিত হয় প্রসীদ। অর্থাৎ হে প্রভু, আপনি অনুগ্রহ করুন এবং আমাকে এই সত্য ধারণ করার শক্তি দিন।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন তার পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অপরিচিত হয়ে ওঠে। বড় কোনো পরিবর্তন, গভীর ক্ষতি, কঠিন বাস্তবতা অথবা জীবনের অনিত্যতার আকস্মিক উপলব্ধি মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে যখন সে আর জানে না কোন দিকে যাবে। তখন অর্জুনের মতো তার মনেও যেন উচ্চারিত হয় দিশো ন জানে। পরিচিত মানচিত্র হারিয়ে যায়। নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়। শান্তি দূরে সরে যায়। এই অর্থে অর্জুনের অভিজ্ঞতা শুধু একটি পৌরাণিক চরিত্রের অভিজ্ঞতা নয়। এটি মানুষের চিরন্তন মানসিক অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির গঠনও অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে আসে দন্তের ভয়াবহতা। তারপর আসে কালাগ্নির উপমা। এরপর আসে দিকভ্রান্তি। তারপর শান্তিহীনতা। সবশেষে আসে ঈশ্বরের কাছে প্রসন্নতার আবেদন। অর্থাৎ শ্লোকের আবেগ ধীরে ধীরে ভয়ের গভীরতা থেকে আত্মসমর্পণের দিকে এগিয়ে যায়। এই কারণেই শ্লোকটি শুধু একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং মানুষের ভয়, বিস্ময়, অসহায়ত্ব এবং আশ্রয়প্রার্থনার এক গভীর কাব্যিক প্রকাশ।
মানবজীবনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক আমাদের একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্যের সামনে দাঁড় করায়। আমরা যতই শক্তিশালী হই, সময়ের ঊর্ধ্বে যেতে পারি না। আমরা যতই জ্ঞান অর্জন করি, জীবনের সব রহস্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা যতই পরিকল্পনা করি, ভবিষ্যৎ আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এই উপলব্ধি মানুষকে দুর্বল করার জন্য নয়। বরং এটি অহংকারকে সীমিত করে এবং বাস্তবতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করে। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে সে বৃহত্তর এক বিশ্বপ্রক্রিয়ার অংশ, তখন তার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যেতে পারে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর প্রতীকী অর্থ সম্ভবত এখানেই যে কৃষ্ণ একই সঙ্গে কালানল এবং জগন্নিবাস। একদিকে তিনি সেই কালশক্তি, যার সামনে কোনো পার্থিব রূপ স্থায়ী নয়। অন্যদিকে তিনিই সেই আশ্রয়, যার মধ্যে সমগ্র জগত অবস্থান করে। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেও আশ্রয় আছে এবং পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে। মানুষের দৃষ্টিতে মৃত্যু ও বিলয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে সেগুলোও মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার অংশ।
অর্জুনের দিকভ্রান্তি তাই শেষ পর্যন্ত কেবল ভয়ের গল্প নয়। এটি মানুষের সীমিত চেতনার সঙ্গে অসীম বাস্তবতার সংঘর্ষের প্রতীক। তিনি যখন বলেন দিশো ন জানে, তখন তিনি যেন স্বীকার করছেন যে তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞান এই অসীমতার সামনে অপর্যাপ্ত। আর যখন বলেন প্রসীদ, তখন সেই সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি আত্মসমর্পণে পরিণত হয়। এই আত্মসমর্পণ পরাজয়ের লক্ষণ নয়। এটি সত্যের সামনে অহংকারের নত হওয়া।
সুতরাং দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে বিশ্বকে বুঝতে হলে শুধু তার সৌন্দর্যের দিকে তাকালে হবে না। তার পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিলয়ের দিকটিও বুঝতে হবে। কালকে অস্বীকার করলে জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। মৃত্যুকে বুঝতে না পারলে জীবনের মূল্যও সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। আর নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার না করলে অসীমের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জন্মায় না। এই শ্লোকে অর্জুন সেই উপলব্ধির এক গভীর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের ভাষাগত, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সব অর্থ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। দংষ্ট্রা আমাদের স্মরণ করায় জীবনের গ্রাসকে। করাল প্রকাশ করে সেই গ্রাসের ভয়াবহতাকে। কালানল স্মরণ করায় সময়ের অনিবার্য শক্তিকে। দিশো ন জানে প্রকাশ করে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে। শর্ম প্রকাশ করে অন্তরের শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে। আর প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস প্রকাশ করে সেই চূড়ান্ত আশ্রয়ের সন্ধানকে, যেখানে মানুষ তার ভয়, বিভ্রান্তি ও অহংকার নিয়ে এসে অসীমের সামনে দাঁড়ায়। বিশ্বরূপের এই ভয়ংকর মুখ তাই কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়। এটি মানুষের চোখ খুলে দেওয়ার প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যে জগতকে স্থায়ী মনে করি তা আসলে পরিবর্তনশীল, আর সেই পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে রয়েছে এমন এক মহাসত্য, যার সামনে মানুষ শেষ পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলে, হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, প্রসন্ন হোন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!