ভগবদ্গীতা ১১.২৬ — বিশ্বরূপে যোদ্ধাদের প্রবেশ ও কালের মহাশক্তি
অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ
সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ।
ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ
সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।। ১১.২৬।।
অনুবাদঃ এই ধৃতরাষ্ট্রের সমস্ত পুত্র এবং তাঁদের সঙ্গে রাজাদের সমবায়, ভীষ্ম, দ্রোণ, সূতপুত্র কর্ণ এবং আমাদের পক্ষের প্রধান প্রধান যোদ্ধারাও—সকলেই তোমার মধ্যে প্রবেশ করছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ে অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেন, তখন তাঁর চোখের সামনে কুরুক্ষেত্রের পরিচিত মানুষগুলো আর কেবল মানুষ হিসেবে থাকে না। তিনি দেখতে পান ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ, তাঁদের সঙ্গে অসংখ্য রাজা, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং নিজের পক্ষের প্রধান যোদ্ধারাও সেই মহাবিশ্বরূপের মধ্যে প্রবেশ করছে। একাদশ অধ্যায়ের ছাব্বিশতম শ্লোকে এই বিস্ময়কর দৃশ্যেরই প্রকাশ ঘটেছে। শ্লোকটি হলো “অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ। ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাসৌ সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।। ১১.২৬।। ” সহজ অর্থে বলা যায়, ধৃতরাষ্ট্রের সমস্ত পুত্র এবং তাঁদের সঙ্গে রাজাদের সমাবেশ, ভীষ্ম, দ্রোণ, সূতপুত্র কর্ণ এবং আমাদের পক্ষের প্রধান প্রধান যোদ্ধারাও তোমার মধ্যে প্রবেশ করছে। কিন্তু এই শ্লোককে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের একটি দৃশ্যের বর্ণনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ, চরিত্রগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য এবং বিশ্বরূপের দার্শনিক প্রেক্ষাপট একত্রে বিচার করলে বোঝা যায়, এই শ্লোক আসলে মানুষের পরিচয়, সম্পর্ক, কর্তব্য, ক্ষমতা, অহংকার এবং মহাজাগতিক সত্যের এক গভীর ব্যাখ্যা।
শ্লোকটির শুরু “অমী” শব্দ দিয়ে। সংস্কৃত “অমী” বলতে ঐসব বা এইসব বোঝায়। শব্দটি এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অর্জুন যেন নিজের চোখের সামনে উপস্থিত ব্যক্তিদের একে একে নির্দেশ করছেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা, রাজারা, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং নিজের পক্ষের বীরেরা সবাই তাঁর দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ অবস্থায় অর্জুন তাঁদের প্রত্যেককে আলাদা পরিচয়ে দেখতেন। কেউ শত্রু, কেউ গুরু, কেউ পিতামহ, কেউ বন্ধু এবং কেউ নিজের পক্ষের সহযোদ্ধা। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের মুহূর্তে তাঁদের এই পৃথক পরিচয় একটি বৃহত্তর সত্যের মধ্যে মিলিত হয়ে যাচ্ছে। “অমী” তাই কেবল একটি নির্দেশবাচক সর্বনাম নয়। এটি মানুষের সীমিত দৃষ্টির সামনে উপস্থিত বহুবিধ সত্তার প্রতীক।
এরপর আসে “ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ”। এর সরল অর্থ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ। এখানে মূলত কৌরবদের বোঝানো হয়েছে। ধৃতরাষ্ট্রের চরিত্র মহাভারতের নৈতিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তিনি জন্মগতভাবে অন্ধ ছিলেন এবং তাঁর পুত্রদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তাঁর বিচারবোধকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তাই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের কেবল একটি রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে দেখলে অর্থটি অসম্পূর্ণ থাকে। প্রতীকী অর্থে তাঁরা অন্ধ আসক্তি, ক্ষমতার মোহ এবং আত্মীয়তার নামে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতার প্রতিনিধিত্ব করেন। মানুষের জীবনে যখন ভালোবাসা ন্যায়বোধকে অতিক্রম করে যায় এবং আপনজনের প্রতি পক্ষপাত সত্যকে আড়াল করে দেয়, তখন সেই অবস্থাকে ধৃতরাষ্ট্রের মানসিকতার সঙ্গে তুলনা করা যায়।
“সর্বে” শব্দটির মধ্যেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। এর অর্থ সকলেই। একজনও বাদ নেই। এই সর্বগ্রাসী শব্দটি দেখিয়ে দেয় যে বিশ্বরূপ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পক্ষকে আলাদা করে দেখছে না। কৌরবপক্ষের মানুষ যেমন এর মধ্যে রয়েছে, তেমনি পাণ্ডবপক্ষের মানুষও এর বাইরে নয়। মানুষের চোখে শত্রু ও মিত্রের বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহাজাগতিক দৃষ্টিতে উভয় পক্ষই একই বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ। এই উপলব্ধি গীতার দার্শনিক চিন্তার একটি মৌলিক দিককে সামনে আনে। ব্যক্তি নিজের অবস্থানকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে বিচার করে, কিন্তু পরম সত্যের দৃষ্টিতে ব্যক্তি নিজেই বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশমাত্র।
“অবনিপালসঙ্ঘৈঃ” শব্দটি আরও আকর্ষণীয়। “অবনি” অর্থ পৃথিবী এবং “পাল” অর্থ রক্ষক বা পালনকারী। সুতরাং “অবনিপাল” অর্থ পৃথিবীর রক্ষক, অর্থাৎ রাজা। “সঙ্ঘ” অর্থ সমষ্টি বা সমাবেশ। তাই “অবনিপালসঙ্ঘৈঃ” বলতে রাজাদের সমাবেশ বোঝায়। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় রাজা কেবল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। তাঁর প্রধান কর্তব্য ছিল প্রজারক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আমাদের দেখায়, রাজশক্তি যখন ন্যায়ের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার অধীন হয়ে যায়, তখন সেই শক্তিই ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে এই শব্দের মধ্যে রাজনীতি ও নৈতিকতার একটি গভীর সম্পর্কও নিহিত রয়েছে।
এরপর উচ্চারিত হয়েছে “ভীষ্মো দ্রোণঃ”। ভীষ্ম ও দ্রোণ কেবল কুরুক্ষেত্রের দুই মহাবীর নন। তাঁরা অর্জুনের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভীষ্ম ছিলেন তাঁর পিতামহতুল্য এবং দ্রোণ ছিলেন তাঁর গুরু। ফলে তাঁদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের অংশ হিসেবে দেখা অর্জুনের জন্য সহজ ছিল না। ভীষ্ম নামের সঙ্গে ভয়, কঠোরতা এবং মহাপ্রতিজ্ঞার ভাব যুক্ত। তাঁর প্রকৃত নাম দেবব্রত হলেও তাঁর ভয়ংকর প্রতিজ্ঞার কারণে তিনি ভীষ্ম নামে পরিচিত হন। তাঁর চরিত্রে কর্তব্য, প্রতিজ্ঞা, আনুগত্য এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব একসঙ্গে উপস্থিত। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মহৎ হয়েও এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন যেখানে তাঁর কর্তব্যবোধ তাঁকে কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছিল। এখানেই ভীষ্মের চরিত্র একটি চিরন্তন প্রশ্নের জন্ম দেয়। একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মহৎ হলেই কি তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়। মহাভারত এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। বরং ভীষ্মের জীবনের মধ্য দিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে কর্তব্য এবং ন্যায় কখনো কখনো কত কঠিন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
দ্রোণও একই ধরনের নৈতিক জটিলতার প্রতীক। তিনি ছিলেন কৌরব ও পাণ্ডব উভয়ের গুরু এবং অস্ত্রবিদ্যার অসাধারণ শিক্ষক। অর্জুন তাঁর প্রিয় শিষ্যদের একজন। তবু যুদ্ধের সময় দ্রোণ কৌরবপক্ষে অবস্থান করেন। ফলে দ্রোণের মধ্যে জ্ঞান, কর্তব্য, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংঘাত ফুটে ওঠে। জ্ঞান থাকা মানেই সবসময় নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় না। কখনো কখনো মানুষ তার সম্পর্ক, দায়িত্ব, সামাজিক অবস্থান এবং অতীত প্রতিশ্রুতির দ্বারা এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে যে সত্যকে উপলব্ধি করেও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে ওঠে। এই কারণেই দ্রোণ চরিত্রটি মানুষের নৈতিক জীবনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি।
এরপর আসে “সূতপুত্র” শব্দটি। এর আক্ষরিক অর্থ সূতের পুত্র। এখানে কর্ণকে বোঝানো হয়েছে। কর্ণের পরিচয় মহাভারতের অন্যতম জটিল ও বেদনাময় পরিচয়। তাঁর প্রকৃত জন্মপরিচয় একরকম, কিন্তু সামাজিক পরিচয় অন্যরকম। তাঁকে সূতপুত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল। এই পরিচয়ের কারণে তাঁকে সামাজিক অবজ্ঞা ও স্বীকৃতির সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কর্ণের চরিত্র তাই জন্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত প্রতিভা, বন্ধুত্ব, আনুগত্য এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে একত্রে সামনে নিয়ে আসে। মানুষের প্রকৃত মূল্য কি তার জন্মে, না তার কর্মে, এই প্রশ্ন কর্ণের জীবনের মাধ্যমে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়ে দেন যে মানুষের প্রতিভা ও মহত্ত্বকে কেবল সামাজিক পরিচয়ের মাধ্যমে বিচার করা যায় না।
শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো “সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ”। এর অর্থ আমাদের পক্ষের প্রধান যোদ্ধারাও। এখানে অর্জুন হঠাৎ উপলব্ধি করছেন যে বিশ্বরূপের মধ্যে শুধু তাঁর শত্রুরাই নয়, তাঁর নিজের পক্ষের বীরেরাও অবস্থান করছে। এই একটি উপলব্ধি বিশ্বরূপের দর্শনকে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রা দেয়। যদি কেবল কৌরবরা সেখানে থাকত, তবে অর্জুন হয়তো এটিকে শত্রুদের ধ্বংসের দৃশ্য হিসেবে দেখতে পারতেন। কিন্তু যখন পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধারাও একই বিশ্বরূপের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন শত্রু ও মিত্রের সাধারণ বিভাজন অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিশ্বরূপ কোনো পক্ষের নয়। বিশ্বরূপ সমগ্রতার প্রতীক।
এখানে “ত্বাম্” শব্দটির গভীরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। “ত্বাম্” অর্থ তোমাকে বা তোমার মধ্যে। শ্লোকের সমস্ত চরিত্রের পরিচয় শেষ পর্যন্ত এসে মিলিত হচ্ছে এই এক কেন্দ্রের মধ্যে। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র, রাজারা, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধারা প্রত্যেকে আলাদা মানুষ। তাঁদের আলাদা ইতিহাস, আলাদা সম্পর্ক এবং আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু বিশ্বরূপের মধ্যে তাঁরা সবাই একই মহাজাগতিক সত্যের অন্তর্ভুক্ত। এই “ত্বাম্” যেন ঘোষণা করে যে বহুত্বের পেছনে একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোককে অদ্বৈত ভাবনার আলোতেও দেখা যায়। মানুষের চোখে জগৎ বহুরূপী। অসংখ্য ব্যক্তি, সম্পর্ক, পরিচয় এবং সংঘাত রয়েছে। কিন্তু পরম সত্যের দৃষ্টিতে এই বহুত্ব একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধন কিংবা অর্জুন কেউই অস্তিত্বের চূড়ান্ত কেন্দ্র নয়। প্রত্যেকেই বৃহত্তর সত্তার অংশ। বিশিষ্টাদ্বৈত ভাবনায়ও এই দৃশ্যের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। জগত ও জীব ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে। বিশ্বরূপ সেই সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে তোলে। ভক্তির দৃষ্টিতে এই উপলব্ধি আরও আবেগময়। অর্জুন এতদিন কৃষ্ণকে বন্ধু হিসেবে দেখেছেন। এখন সেই বন্ধুর মধ্যেই তিনি সমগ্র বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে মহাজাগতিক উপলব্ধির দিকে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছে।
এই শ্লোকের একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। মানুষের নিজের মধ্যেই একটি কুরুক্ষেত্র রয়েছে। সেখানে কর্তব্যের সঙ্গে আবেগের, ন্যায়ের সঙ্গে স্বার্থের, ভালোবাসার সঙ্গে কঠোর সিদ্ধান্তের এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে বৃহত্তর সত্যের সংঘাত ঘটে। অর্জুনের সংকট সেই অন্তর্দ্বন্দ্বেরই এক মহাকাব্যিক রূপ। বিশ্বরূপদর্শন যেন সেই অন্তর্জগতকে একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা। মানুষ যখন নিজের জীবনের সমস্ত সম্পর্ক, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, দায়িত্ব এবং দ্বন্দ্বকে এক বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখতে শেখে, তখন তার পুরোনো আত্মপরিচয় কেঁপে ওঠে। সে বুঝতে পারে, তার ব্যক্তিগত গল্পের চেয়েও জীবন অনেক বড়।
এই শ্লোক আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় যুক্ত করি। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক মত, সামাজিক গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ আমাদের দৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। ফলে আমরা সহজেই পৃথিবীকে নিজের এবং পরের ভাগে ভাগ করি। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টি সেই সংকীর্ণ বিভাজনকে অতিক্রম করে। একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেমন কেবল একজন নেতার সিদ্ধান্ত নয়, তার প্রভাব সমাজ, অর্থনীতি, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়তে পারে। একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও কখনো কখনো বহু মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই গীতার এই শ্লোক আমাদের বৃহত্তর পরিণতি দেখতে শেখায়।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। অর্জুন যেন যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যপটে একে একে চরিত্রগুলোকে দেখতে পাচ্ছেন। প্রথমে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা, তারপর রাজাদের সমাবেশ, তারপর ভীষ্ম, দ্রোণ এবং কর্ণ, এবং শেষে নিজের পক্ষের প্রধান যোদ্ধারা। এই ক্রমে দৃষ্টি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছু এসে মিলিত হয় কৃষ্ণের বিশ্বরূপে। ফলে শ্লোকটি একই সঙ্গে একটি দৃশ্য, একটি দর্শন এবং একটি মানসিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, “অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ” দিয়ে শুরু হওয়া এই শ্লোকটি শুধু কুরুক্ষেত্রের যোদ্ধাদের পরিচয় বহন করে না। এটি মানুষের সীমিত দৃষ্টির সামনে একটি অসীম বাস্তবতাকে উন্মুক্ত করে। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা আমাদের আসক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজারা ক্ষমতার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভীষ্ম কর্তব্য ও নৈতিকতার সংঘাতকে সামনে আনেন। দ্রোণ জ্ঞান ও আনুগত্যের দ্বন্দ্ব দেখান। কর্ণ পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আর পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধারা মনে করিয়ে দেয় যে ন্যায়ের পথেও সংগ্রাম থাকে। কিন্তু বিশ্বরূপের মধ্যে এঁরা সবাই একসঙ্গে অবস্থান করেন। এখানেই শ্লোকটির চূড়ান্ত শিক্ষা। মানুষ নিজের পরিচয়, সম্পর্ক এবং পক্ষকে যতই গুরুত্বপূর্ণ মনে করুক, তার অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর সত্যের অংশ। ব্যক্তিগত অহংকারের সীমা অতিক্রম করে যখন মানুষ সেই বৃহত্তর সমগ্রতাকে দেখতে শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। গীতার বিশ্বরূপ তাই কেবল দেবতার অসীম রূপ নয়। এটি মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টির সীমা ভেঙে দিয়ে সমগ্র অস্তিত্বকে একসঙ্গে দেখার আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!