সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১১.৩০ — বিশ্বরূপে মহাকালের সংহার

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ।তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রংভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।৩০।।
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং
ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।৩০।।

অনুবাদঃ হে বিষ্ণু! তুমি তোমার জ্বলন্ত মুখসমূহের দ্বারা সকল লোককে গ্রাস করছ এবং তোমার তেজোরাশির দ্বারা সমগ্র জগৎকে আবৃত করে সন্তপ্ত করছ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায় বিশ্বরূপদর্শনযোগে অর্জুন যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, তা মানবচিন্তার ইতিহাসে ঈশ্বরের অন্যতম গভীর ও বিস্ময়কর প্রকাশ। কৃষ্ণের বিশ্বরূপে অর্জুন একই সঙ্গে সৃষ্টির মহিমা, অসীম শক্তি, জ্যোতি, সময় এবং সংহারের অনিবার্য সত্য প্রত্যক্ষ করেন। একাদশ অধ্যায়ের ত্রিশতম শ্লোকে সেই ভয়ংকর অথচ মহিমান্বিত রূপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এখানে কৃষ্ণের অসংখ্য মুখ জ্বলন্ত অগ্নির মতো প্রতীয়মান হচ্ছে। সেই মুখসমূহ যেন চারদিক থেকে সমগ্র জগতকে লেহন করতে করতে গ্রাস করছে। তাঁর প্রবল তেজে সমস্ত জগৎ পূর্ণ হয়ে উঠছে এবং সেই উগ্র দীপ্তি সমগ্র অস্তিত্বকে উত্তপ্ত করছে। শ্লোকটির ভাষা তাই শুধু কোনো যুদ্ধের দৃশ্য বর্ণনা করে না। এটি সৃষ্টি ও সংহারের মহাজাগতিক সত্যকে একটি শক্তিশালী কাব্যিক প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করে।

শ্লোকটির মূল পাঠ হলো লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ তেজোভিরাপূর্য জগত্ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো। এর সহজ অর্থ হলো, হে বিষ্ণু, তুমি তোমার জ্বলন্ত মুখসমূহ দিয়ে চারদিক থেকে সমস্ত লোককে লেহন করতে করতে গ্রাস করছ। তোমার তেজে সমগ্র জগৎ পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং তোমার উগ্র দীপ্তিগুলি সমস্ত জগতকে উত্তপ্ত করছে। এই অনুবাদ যতটা সরল, এর অন্তর্নিহিত অর্থ ততটাই গভীর। কারণ এখানে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ যেন বিশ্বরূপের একটি করে স্তর উন্মোচন করে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ লেলিহ্যসে। শব্দটির মূল ধাতু হলো লিহ্। এর প্রাথমিক অর্থ লেহন করা বা জিহ্বা দিয়ে চাটা। কিন্তু এই শ্লোকে শব্দটি কেবল সাধারণ লেহনের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। জ্বলন্ত অগ্নিশিখা যেমন কোনো বস্তুকে স্পর্শ করে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে টেনে নেয়, তেমন একটি দৃশ্য এখানে কল্পনা করা হয়েছে। কৃষ্ণের জ্বলন্ত মুখসমূহ যেন অগ্নিশিখার মতো সমস্ত সৃষ্টিকে স্পর্শ করছে এবং ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। এই শব্দের সঙ্গে পরবর্তী গ্রসমানঃ শব্দটি যুক্ত হওয়ায় দৃশ্যটি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গ্রসমানঃ শব্দটি গ্রস্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ গিলে ফেলা, গ্রাস করা বা ভক্ষণ করা। অর্থাৎ লেলিহ্যসে যেখানে লেহনের জীবন্ত চিত্র তৈরি করছে, গ্রসমানঃ সেখানে সেই লেহনের পরিণতি হিসেবে সম্পূর্ণ গ্রাসের ধারণা প্রকাশ করছে। কবির ভাষায় তাই সংহার কেবল একটি আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি এমন এক মহাজাগতিক প্রক্রিয়া, যেখানে সৃষ্টির রূপ ধীরে ধীরে বৃহত্তর অস্তিত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

এরপর এসেছে সমন্তাৎ শব্দটি। এর অর্থ চারদিক থেকে, সর্বদিক থেকে অথবা সম্পূর্ণভাবে। এই একটি শব্দই বিশ্বরূপের অসীমতার ধারণাকে শক্তিশালী করে। কৃষ্ণের সংহারশক্তি কোনো নির্দিষ্ট স্থান, ব্যক্তি বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সর্বত্র বিস্তৃত। তার পরেই এসেছে লোকান্ সমগ্রান্। লোক অর্থ জগত বা জীবসমাজ এবং সমগ্র অর্থ সম্পূর্ণ। অর্থাৎ এখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী নয়, সমগ্র জগতের কথাই বলা হয়েছে। এই ভাষা অর্জুনকে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি যে মানুষদের দেখছেন, তারা কেবল একটি বৃহৎ মহাজাগতিক পরিবর্তনের ক্ষুদ্র অংশ। ব্যক্তির মৃত্যু এখানে একটি বৃহত্তর কালচক্রের মধ্যে স্থাপিত হয়েছে।

বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ শব্দবন্ধটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বদন অর্থ মুখ এবং জ্বলদ্ভিঃ অর্থ জ্বলন্ত বা দীপ্তিমান। ফলে জ্বলন্ত মুখসমূহের একটি শক্তিশালী চিত্র এখানে ফুটে ওঠে। কৃষ্ণের মুখ এখানে মানুষের পরিচিত মুখ নয়। এগুলি যেন অসংখ্য অগ্নিদ্বার, যার মধ্যে প্রবেশ করছে জগতের সমস্ত সীমাবদ্ধ রূপ। আগুন যেমন নিজের সামনে থাকা বস্তুকে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃতিতে রূপান্তরিত করে, তেমনই বিশ্বরূপের এই অগ্নিমুখ সমস্ত পৃথক অস্তিত্বকে এক বৃহত্তর মহাশক্তির মধ্যে টেনে নিচ্ছে। তাই জ্বলন্ত মুখ কেবল ভয়ের প্রতীক নয়। এটি রূপান্তরেরও প্রতীক।

এরপর আসে তেজোভিরাপূর্য জগত্ সমগ্রম্। তেজ শব্দের অর্থ আলো, দীপ্তি, শক্তি, জ্যোতি এবং প্রভা। ভারতীয় দর্শনে তেজ কেবল বাহ্যিক আলোর ধারণা নয়। এটি শক্তি, প্রাণশক্তি এবং ঈশ্বরীয় দীপ্তিরও প্রতীক। আপূর্য অর্থ পূর্ণ করে বা ভরিয়ে দিয়ে। ফলে তেজোভিরাপূর্য জগত্ সমগ্রম্ অর্থ দাঁড়ায় ঈশ্বরীয় তেজে সমগ্র জগত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এখানে একটি অসাধারণ বৈপরীত্য দেখা যায়। একই বিশ্বরূপ একদিকে জগতকে গ্রাস করছে, অন্যদিকে সেই জগতকেই নিজের তেজে পূর্ণ করছে। অর্থাৎ কৃষ্ণের বিশ্বরূপের মধ্যে সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহার পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। তারা একই মহাশক্তির বিভিন্ন প্রকাশ।

ভাসস্তবোগ্রাঃ শব্দবন্ধে কৃষ্ণের দীপ্তির আরেকটি দিক প্রকাশিত হয়েছে। ভাস অর্থ আলো বা দীপ্তি এবং উগ্র অর্থ প্রবল, তীব্র বা ভয়ংকর। এখানে আলো এমন একটি শক্তি, যা কেবল আলোকিত করে না, দহনও করে। সাধারণ আলো আমাদের পথ দেখায় এবং অন্ধকার দূর করে। কিন্তু বিশ্বরূপের আলো এমন এক মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক, যার সামনে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সমস্ত সীমা ক্ষুদ্র হয়ে যায়। এই কারণেই সেই দীপ্তিকে উগ্র বলা হয়েছে।

শেষে এসেছে প্রতপন্তি শব্দটি। এর মূল ধাতু তপ্। এর অর্থ তাপ দেওয়া, উত্তপ্ত করা বা দগ্ধ করা। এই ধাতু থেকেই তপস্যা শব্দের ধারণাও এসেছে। ফলে তাপের মধ্যে যেমন দহনের অর্থ রয়েছে, তেমনই কঠোর সাধনা ও আত্মশুদ্ধির ধারণাও রয়েছে। এই দৃষ্টিতে বিশ্বরূপের অগ্নি শুধু ধ্বংসের আগুন নয়। এটি এমন এক আগুন, যা পুরোনো রূপকে ভেঙে নতুন রূপের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। যে জিনিস অপরিবর্তনীয় বলে মনে হয়, সময়ের তাপে সেটিও পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনই জীবনের অন্যতম মৌলিক সত্য।

শ্লোকটির শেষ শব্দ বিষ্ণো বিশেষভাবে অর্থবহ। অর্জুন কৃষ্ণকে বিষ্ণু নামে সম্বোধন করছেন। বিষ্ণু নামের সঙ্গে সর্বব্যাপী ও সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকার ধারণা যুক্ত। যে সত্তা সমস্ত জগতকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন, তাঁর বিশ্বরূপেই আবার সমস্ত সৃষ্টি অবস্থান করছে এবং সেই সত্তার মধ্যেই সবকিছু একদিন বিলীন হচ্ছে। এখানে বিষ্ণু নামটি তাই শুধু একটি দেবনাম নয়। এটি সর্বব্যাপী অস্তিত্বের একটি দার্শনিক ধারণা। সৃষ্টি তাঁর বাইরে নয় এবং সংহারও তাঁর বাইরে নয়।

এই শ্লোকের গভীর দর্শন বুঝতে হলে সৃষ্টি ও সংহারকে পাশাপাশি দেখতে হয়। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সৃষ্টি আনন্দের এবং ধ্বংস দুঃখের। কিন্তু প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ধ্বংস ও সৃষ্টি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি পাতা ঝরে পড়ে বলেই নতুন পাতার জন্মের জন্য স্থান তৈরি হয়। একটি ঋতু শেষ হয় বলেই অন্য ঋতু আসে। একটি সভ্যতার অবসান থেকে অন্য সভ্যতার উত্থান ঘটে। একটি পুরোনো চিন্তার মৃত্যু থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম হয়। বিশ্বরূপের অগ্নিমুখ তাই কেবল মৃত্যুর প্রতীক নয়। এটি পরিবর্তনের প্রতীক। এটি জানিয়ে দেয় যে কোনো সীমাবদ্ধ রূপ চিরকাল একই অবস্থায় থাকতে পারে না।

এই ভাবনার সঙ্গে গীতার কালতত্ত্বেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তী শ্লোকে কৃষ্ণ নিজেকে কালরূপে প্রকাশ করেন এবং বলেন যে তিনি লোকক্ষয়কারী কাল। ফলে এই শ্লোককে সময়ের মহাশক্তির আলোতেও পড়া যায়। সময় কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন নয়। সময় রাজাকে সাধারণ মানুষের মতোই অতিক্রম করে। সাম্রাজ্য, সভ্যতা, প্রতিষ্ঠান, সম্পদ, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত পরিচয় সবই সময়ের প্রবাহে পরিবর্তিত হয়। বিশ্বরূপের জ্বলন্ত মুখ যেন সেই সময়েরই দৃশ্যমান প্রতীক। সময় সব সীমাবদ্ধ রূপকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে এবং নতুন রূপের জন্য পথ তৈরি করে।

অদ্বৈত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। বহুরূপী জগতের সমস্ত বৈচিত্র্য একটি বৃহত্তর পরম সত্যের মধ্যে অবস্থান করছে। সৃষ্টি এবং ধ্বংসকে সম্পূর্ণ পৃথক শক্তি হিসেবে না দেখে একই পরম বাস্তবতার দুটি প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। যে সত্তা প্রকাশ করে, সেই সত্তাই আবার অপ্রয়োজনীয় বা পুরোনো রূপকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে। ফলে ধ্বংসের মধ্যেও ঐক্যের সত্য নিহিত থাকে। জগতের অসংখ্য রূপ পরিবর্তিত হলেও অস্তিত্বের মূল প্রবাহ অব্যাহত থাকে।

এই শ্লোককে মনস্তাত্ত্বিক অর্থেও বোঝা যায়। মানুষের ভেতরেও অনেক কিছু সময়ের সঙ্গে গ্রাস হয়ে যায়। শৈশবের পরিচয় বিলীন হয়, কৈশোরের চিন্তা বদলে যায়, পুরোনো বিশ্বাস ভেঙে যায় এবং নতুন উপলব্ধি জন্ম নেয়। মানুষ অনেক সময় এই পরিবর্তনকে নিজের অস্তিত্বের সংকট বলে মনে করে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, একটি পুরোনো পরিচয়ের বিলয় অনেক সময় একটি পরিণত সত্তার জন্মের প্রস্তুতি। সেই অর্থে অন্তরের অগ্নিও একটি রূপান্তরের অগ্নি। অহংকার, অজ্ঞতা এবং অন্ধ আসক্তি যখন জ্ঞানের তাপে পুড়ে যায়, তখন মানুষের মধ্যে নতুন উপলব্ধির জন্ম হতে পারে।

সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ শক্তিশালী। লেলিহ্যসে শব্দে প্রথমে আসে লেহনের চিত্র। গ্রসমানঃ শব্দে সেই লেহন গ্রাসে পরিণত হয়। জ্বলন্ত মুখের চিত্রে আগুনের দৃশ্য আরও স্পষ্ট হয়। তেজ শব্দে আলো ও শক্তির বিস্তার ঘটে। উগ্র দীপ্তির মাধ্যমে সেই আলো ভয়ংকর হয়ে ওঠে এবং প্রতপন্তি শব্দে তা দহনের চূড়ান্ত অনুভূতিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ শব্দগুলির ধারাবাহিকতা নিজেই একটি নাটকীয় দৃশ্য নির্মাণ করে। লেহন থেকে গ্রাস, গ্রাস থেকে দীপ্তি, দীপ্তি থেকে তাপ এবং তাপ থেকে দহন। এই ক্রমটি বিশ্বরূপের ভয়ংকর সৌন্দর্যকে ভাষার মধ্যেই জীবন্ত করে তোলে।

আধুনিক মানুষের জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা প্রায়ই অর্থ, ক্ষমতা, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠা কিংবা সামাজিক পরিচয়কে স্থায়ী বলে ধরে নিই। একটি প্রতিষ্ঠান মনে করে তার সাফল্য চিরকাল থাকবে। একটি রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে স্থায়ী মনে করতে পারে। একজন মানুষ নিজের বর্তমান পরিচয়কে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বলে ধরে নিতে পারে। কিন্তু ইতিহাস দেখায় যে পরিবর্তনই স্থায়ী। যে সাম্রাজ্য একদিন অপ্রতিরোধ্য মনে হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের পৃষ্ঠা। যে প্রযুক্তি একসময় বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল, তা পরে পুরোনো হয়ে যায়। যে মানুষ একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল, সময়ের প্রবাহে তার অবস্থানও পরিবর্তিত হয়। বিশ্বরূপের জ্বলন্ত মুখ আমাদের এই অনিত্যতার সত্যের সামনে দাঁড় করায়।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্য হলো কৃষ্ণ একই সঙ্গে আলো এবং আগুন, সৃষ্টির আশ্রয় এবং সংহারের শক্তি, সর্বব্যাপী সত্তা এবং গ্রাসকারী মহাশক্তি। এখানে ঈশ্বরকে শুধু কোমলতা বা সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়নি। বিশ্বরূপের ঈশ্বর অস্তিত্বের সম্পূর্ণতা। সেখানে সৌন্দর্য যেমন আছে, ভয়ও আছে। জন্ম যেমন আছে, মৃত্যু তেমনই আছে। সৃষ্টি যেমন আছে, সংহারও তেমনই আছে। এই পূর্ণতাই বিশ্বরূপের প্রকৃত মহিমা।

লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ তেজোভিরাপূর্য জগত্ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো এই কারণে কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক ঘোষণা। যে রূপ জন্ম নেয়, তার পরিবর্তন অনিবার্য। যে সৃষ্টি প্রকাশিত হয়, তার একদিন বিলয় ঘটবে। কিন্তু বিলয় মানেই অস্তিত্বের সম্পূর্ণ শেষ নয়। এক রূপের অবসান অন্য রূপের সম্ভাবনা তৈরি করে। ঈশ্বরীয় তেজ তাই একই সঙ্গে প্রকাশ, শক্তি, পরিবর্তন, সংহার এবং পুনর্গঠনের প্রতীক।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের একটি কঠিন অথচ মুক্তিদায়ক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। মানুষ নিজের সীমিত দৃষ্টিতে জীবনকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখে। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন এবং বিলয় একই মহাজাগতিক প্রবাহের অংশ। কৃষ্ণের জ্বলন্ত মুখ সেই প্রবাহের সংহারী দিককে প্রকাশ করে। তাঁর তেজ সেই একই প্রবাহের সর্বব্যাপী শক্তিকে প্রকাশ করে। আর বিষ্ণু সম্বোধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই পরিবর্তনের অন্তরালে রয়েছে সর্বব্যাপী এক পরম বাস্তবতা। তাই শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা হলো, পরিবর্তনকে অস্বীকার করে স্থায়িত্ব পাওয়া যায় না। বরং পরিবর্তনের সত্যকে উপলব্ধি করেই মানুষ চিরন্তনের সন্ধান করতে শেখে। বিশ্বরূপের অগ্নিমুখ সেই অনন্ত সত্যেরই এক ভয়ংকর, মহিমান্বিত এবং গভীর প্রতীক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 21, 2026 August 21, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি