ভগবদ্গীতা ১১.৩২ — কৃষ্ণের কালরূপ ও জগতের ক্ষয়
শ্রীভগবানুবাচ
কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।
ঋতেহপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে
যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।৩২।।
অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন- আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল এবং এই সমস্ত লোক সংহার করতে এক্ষণে প্রবৃত্ত হয়েছি। তোমরা (পান্ডবেরা) ছাড়া উভয়-পক্ষীয় সমস্ত যোদ্ধারাই নিহত হবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের বত্রিশতম শ্লোক ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী উচ্চারণ। বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন যখন ভয়, বিস্ময় ও অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নে অভিভূত হয়ে কৃষ্ণকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে চান, তখন কৃষ্ণ বলেন, “কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃত্ প্রবৃদ্ধঃ”। অর্থাৎ আমি কাল, জগতের ক্ষয়সাধনকারী প্রবল কাল। এই একটি বাক্যের মধ্যেই সময়, মৃত্যু, পরিবর্তন, ইতিহাস, নিয়তি, মানবকর্ম এবং মহাজাগতিক সত্য সম্পর্কে এক বিশাল দর্শন নিহিত রয়েছে। এটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে উচ্চারিত একটি ভয়ঙ্কর বাক্য নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এমন একটি সত্যের প্রকাশ, যা প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার সীমা অতিক্রম করে আজও মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও সভ্যতাকে বোঝার ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
কাল শব্দটি সংস্কৃত ভাষার একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও বহুমাত্রিক শব্দ। সাধারণভাবে কাল বলতে সময়কে বোঝানো হয়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে কাল কেবল ঘড়ির কাঁটায় পরিমাপ করা সময় নয়। কাল হলো সেই শক্তি যার প্রবাহে সমস্ত সৃষ্টি পরিবর্তিত হয়। যা আজ জন্ম নেয়, তা কালক্রমে বৃদ্ধি পায়, পরিণত হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং একসময় তার বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলে। তাই কাল একই সঙ্গে সময়, পরিবর্তন, ক্ষয়, মৃত্যু এবং রূপান্তরের প্রতীক। মানুষের কাছে সময় কখনো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, কখনো অতীতের স্মৃতি, আবার কখনো অনিবার্য মৃত্যুর পূর্বাভাস। কিন্তু কৃষ্ণের কাছে কাল এই সমস্ত সীমিত অর্থ অতিক্রম করে মহাজাগতিক শক্তির রূপ ধারণ করেছে।
অস্মি শব্দের অর্থ আমি। এটি সংস্কৃত অস্ ধাতু থেকে এসেছে। অস্ ধাতুর মূল অর্থ হওয়া, থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়া। কিন্তু এই শ্লোকে অস্মি শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কৃষ্ণ বলেননি যে তিনি কালের অধীন, কিংবা কাল তাঁর একটি শক্তি। তিনি সরাসরি বলেন, আমি কাল। অর্থাৎ বিশ্বরূপের মধ্যে যে সময় সমস্ত সৃষ্টি ও জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করছে, সেই মহাজাগতিক কালের সঙ্গেই কৃষ্ণ নিজের পরিচয় প্রকাশ করছেন। এখানে ব্যক্তিগত কৃষ্ণ ধীরে ধীরে মহাজাগতিক কৃষ্ণে পরিণত হন। অর্জুনের সারথি হিসেবে যাঁকে সে এতদিন দেখেছে, তিনি হঠাৎ এমন এক মহাশক্তির পরিচয় দেন যার সামনে সমগ্র মানবজগত ক্ষুদ্র ও নশ্বর।
লোকক্ষয়কৃত্ শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লোক অর্থ জগৎ, মানুষ, জীবসমাজ কিংবা অস্তিত্বের কোনো স্তর। ক্ষয় অর্থ হ্রাস, অবসান, বিলয় বা ধ্বংস। কৃত্ শব্দটি কৃ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। ফলে লোকক্ষয়কৃত্ অর্থ দাঁড়ায় জগতের ক্ষয়সাধনকারী। এখানে কৃষ্ণ কেবল একজন ধ্বংসকারী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন না। তিনি এমন এক মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার কথা বলছেন যেখানে সমস্ত সৃষ্ট রূপ একদিন তার বর্তমান অবস্থা হারায়। জন্মের সঙ্গে মৃত্যুর সম্ভাবনা যেমন যুক্ত, তেমনি সৃষ্টির সঙ্গে সংহারের সম্ভাবনাও যুক্ত। এই অর্থে ধ্বংস সৃষ্টির বিপরীত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সৃষ্টিরই একটি অনিবার্য পর্যায়।
প্রবৃদ্ধঃ শব্দটি এসেছে প্র এবং বৃদ্ধি অর্থবাহী ধাতুর সমন্বয় থেকে। এর মধ্যে প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, শক্তিশালী হয়ে ওঠা কিংবা পূর্ণ শক্তিতে প্রকাশিত হওয়ার অর্থ রয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধ কাল বলতে এমন এক কালকে বোঝানো হয়েছে, যে তার প্রবল সংহারশক্তিতে সক্রিয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন যে ভয়ঙ্কর বিশ্বরূপ দেখছেন, তার মধ্যে কাল যেন নিজের পূর্ণ শক্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। অসংখ্য যোদ্ধা সেই মহাজাগতিক প্রবাহের মধ্যে প্রবেশ করছে। তাদের ব্যক্তিগত শক্তি, বীরত্ব, অস্ত্র, রাজ্য ও পরিচয় কালের সামনে অর্থহীন হয়ে পড়ছে।
লোকান্ সমাহর্তুম্ ইহ প্রবৃত্তঃ অংশটিও অত্যন্ত গভীর। লোকান্ অর্থ লোকসমূহকে এবং সমাহর্তুম্ অর্থ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা, সংহার করা বা নিজের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া। সমাহরণ শব্দের মধ্যে শুধু ধ্বংসের ধারণা নেই। এর মধ্যে একত্র করা, প্রত্যাহার করা এবং প্রকাশিত অবস্থাকে অন্য অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ভাবও রয়েছে। ভারতীয় মহাজাগতিক চিন্তায় তাই সংহার মানেই সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীনতা নয়। সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহার একটি বৃহত্তর চক্রের অংশ। যে রূপ প্রকাশিত হয়েছে, একসময় সেই রূপ বিলীন হয়। আবার অন্য কোনো রূপে প্রকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে কৃষ্ণের কালরূপকে কেবল ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখলে এর দার্শনিক গভীরতা পুরোপুরি ধরা যায় না।
ইহ প্রবৃত্তঃ অর্থ এখানে আমি প্রবৃত্ত হয়েছি বা কার্যরত আছি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখানে কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়। গীতার দৃষ্টিতে এটি বৃহত্তর নৈতিক ও ঐতিহাসিক সংকটের ক্ষেত্র। অর্জুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার আত্মীয়, শিক্ষক, বন্ধু ও পরিচিত মানুষ। সে মনে করছে তার হাতে তাদের জীবন ও মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে। কিন্তু কৃষ্ণ তাকে একটি বৃহত্তর সত্য দেখাচ্ছেন। মানুষের ব্যক্তিগত কর্ম গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইতিহাসের সমস্ত পরিণতি কোনো একজন ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। সময়ের প্রবাহ মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অনেক বৃহৎ।
এই কারণেই শ্লোকের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণ বলেন, তোমাকে বাদ দিয়েও প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীতে যারা অবস্থান করছে সেই সমস্ত যোদ্ধা থাকবে না। ঋতে অর্থ ব্যতীত বা ছাড়া। অপি অর্থ এমনকি। ত্বাম্ অর্থ তোমাকে। ন ভবিষ্যন্তি অর্থ থাকবে না। এখানে কৃষ্ণ অর্জুনের একটি গভীর মানসিক ভ্রান্তি দূর করছেন। অর্জুন মনে করছিল, সে যুদ্ধ করলে এই মানুষগুলোর মৃত্যু ঘটবে এবং সে নিজেই সেই মৃত্যুর মূল কারণ হবে। কৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছেন যে মহাজাগতিক ঘটনাপ্রবাহ তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের চেয়েও বৃহৎ। সে একমাত্র কর্তা নয়। তার কর্তব্য আছে, কিন্তু সে বিশ্বপ্রক্রিয়ার একমাত্র নিয়ামক নয়।
এই কথার মধ্যে কর্মযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলা হয়নি। বরং নিজের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে বলা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের কর্মকে মহাবিশ্বের একমাত্র কারণ বলে মনে না করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মানুষ কাজ করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজের নৈতিক দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ফলাফল অসংখ্য কারণের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়। তাই কর্মের ক্ষেত্রে সততা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতাও প্রয়োজন।
কালকে যদি আমরা কেবল ঘড়ির সময় হিসেবে দেখি, তাহলে এই শ্লোকের গভীরতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। ঘড়ি সময়কে মাপে, কিন্তু কাল জীবনকে পরিবর্তন করে। একটি শিশু ধীরে ধীরে বড় হয়। যৌবন একসময় বার্ধক্যে পৌঁছে। একটি সম্পর্কের রূপ বদলে যায়। একটি সভ্যতা পরিবর্তিত হয়। একটি রাজনৈতিক শক্তি উঠে আসে এবং একসময় পতিত হয়। একটি সাম্রাজ্য পৃথিবী কাঁপিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কাল তার ক্ষমতাকেও ইতিহাসের পাতায় পরিণত করে। এই অর্থে কাল হলো পরিবর্তনের মহাশক্তি।
মানবজীবনে কাল একটি কঠিন শিক্ষক। মানুষ সাধারণত বর্তমান অবস্থাকে স্থায়ী বলে মনে করতে চায়। একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি মনে করতে পারেন তাঁর ক্ষমতা চিরস্থায়ী। একজন ধনী মানুষ ভাবতে পারেন তাঁর সম্পদই তাঁর নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়। একজন তরুণ ভাবতে পারে তার বর্তমান শক্তি সবসময় থাকবে। কিন্তু কাল কাউকেই স্থায়ী অবস্থানে থাকতে দেয় না। সময় সবকিছুকে পরিবর্তন করে। তাই কাল মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বাস্তব শিক্ষা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যত শক্তিশালীই হই, আমাদের দৃশ্যমান অস্তিত্বের একটি সীমা রয়েছে।
এই কারণেই “কালোহস্মি” শুধু মৃত্যুর ঘোষণা নয়। এটি অস্থায়িত্বের ঘোষণা। মানুষের শরীর পরিবর্তিত হয়। চিন্তা পরিবর্তিত হয়। সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়। সমাজ পরিবর্তিত হয়। রাষ্ট্র পরিবর্তিত হয়। সভ্যতা পরিবর্তিত হয়। ইতিহাসের কোনো অধ্যায় চিরকাল একই থাকে না। কাল সবকিছুকে প্রবাহমান রাখে। এই প্রবাহের মধ্যে যে মানুষ পরিবর্তনকে বুঝতে শেখে, সে জীবনের প্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরে। যদি সব দৃশ্যমান বস্তু কালের অধীন হয়, তাহলে কালের অতীত কী। যদি শরীর পরিবর্তনশীল হয়, তবে আত্মার প্রকৃতি কী। গীতার বৃহত্তর দর্শনে দেহকে পরিবর্তনশীল এবং আত্মাকে নিত্য বলা হয়েছে। তাই কালতত্ত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষকে কেবল মৃত্যুর দিকে নয়, আত্মতত্ত্বের দিকেও নিয়ে যায়। যে মানুষ বুঝতে পারে যে তার দৃশ্যমান পরিচয় পরিবর্তনশীল, সে নিজের অস্তিত্বের আরও গভীর স্তর অনুসন্ধান করার সুযোগ পায়।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে পড়া যায়। পরিবর্তনশীল জগত কালের অধীন। যে জগতে সৃষ্টি ও বিলয় আছে, সেখানে কোনো রূপই চূড়ান্তভাবে স্থায়ী নয়। কিন্তু পরম সত্যকে পরিবর্তনের অতীত হিসেবে ভাবা হয়। ফলে কাল আমাদের দৃশ্যমান জগতের প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে এবং একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে যে পরিবর্তনের সাক্ষী কে। এই প্রশ্ন মানুষকে বাহ্যিক জগতের ক্ষয় থেকে অন্তর্গত সত্যের অনুসন্ধানে নিয়ে যায়।
সাংখ্যদর্শনের আলোতেও এই শ্লোকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের পারস্পরিক ক্রিয়ায় প্রকৃতির নানা রূপ প্রকাশিত হয়। যা প্রকাশিত হয়েছে তা পরিবর্তিত হবে। এই পরিবর্তনের প্রবাহকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে কাল একটি মৌলিক ধারণা। তাই কালকে প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতার এক গভীর প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও “কাল” একটি অসাধারণ প্রতীক। এটি কখনো মৃত্যুর প্রতীক, কখনো নিয়তির প্রতীক, কখনো ইতিহাসের প্রতীক, আবার কখনো পুরোনো ব্যবস্থার পতন ও নতুন ব্যবস্থার আগমনের প্রতীক। সাহিত্যিক অর্থে কাল একই সঙ্গে বিচারক, ধ্বংসকারী এবং রূপান্তরের শক্তি। মানুষের যত অহংকার, যত ক্ষমতা এবং যত সাফল্য থাকুক না কেন, কাল শেষ পর্যন্ত তাকে ইতিহাসের বৃহত্তর ধারার মধ্যে স্থাপন করে।
আধুনিক রাজনৈতিক জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কোনো শাসক, সরকার বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাসে এমন অনেক সাম্রাজ্য ছিল যেগুলো একসময় নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করত। কিন্তু সময় তাদের পরিবর্তন করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে। রাষ্ট্রের সীমা বদলেছে। রাজনৈতিক মতবাদ বদলেছে। এক যুগের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অন্য যুগে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই কাল রাজনীতির জন্যও একটি মৌলিক শিক্ষা বহন করে। ক্ষমতা সাময়িক এবং ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে “কালোহস্মি” মানুষের মৃত্যুচেতনা এবং পরিবর্তনের ভয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে। মানুষ প্রায়ই হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়। সে চায় প্রিয় মানুষ, সম্পর্ক, পরিচয় ও বর্তমান পরিস্থিতি একই রকম থাকুক। কিন্তু বাস্তবতা তা অনুমতি দেয় না। জীবন পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনকে মেনে নেওয়া মানে জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো জীবনের অস্থায়িত্বকে বুঝে বর্তমানকে আরও অর্থপূর্ণভাবে গ্রহণ করা।
একটি নদীর সঙ্গে কালকে তুলনা করা যায়। আমরা নদীর দিকে তাকিয়ে বলি নদী একই আছে। কিন্তু নদীর জল প্রতিক্ষণ বদলে যাচ্ছে। যে জল এখন চোখের সামনে আছে, কিছুক্ষণ পর সেটি অন্যত্র চলে যাবে। তবুও নদীর প্রবাহ অটুট থাকে। মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন। আমরা বলি আমি একই মানুষ, কিন্তু আমাদের শরীর, চিন্তা, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং অনুভূতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যক্তির রূপ বদলায়, কিন্তু পরিবর্তনের প্রবাহ চলতে থাকে। এই প্রবাহের গভীর প্রতীক হলো কাল।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত মানুষের অহংকার সম্পর্কে। মানুষ ভাবে সে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে। মানুষ প্রকৃতির অনেক রহস্য বুঝেছে, রোগের চিকিৎসা উন্নত করেছে, মহাকাশে পৌঁছেছে এবং অসংখ্য শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। কিন্তু সময়কে থামাতে পারেনি। অতীতকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারেনি। মৃত্যুর অনিবার্যতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেনি। ফলে আধুনিক মানুষও সেই একই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যার সামনে অর্জুন দাঁড়িয়েছিলেন।
“কালোহস্মি” তাই ভয়ের বাক্য হওয়ার পাশাপাশি জাগরণের বাক্য। এটি বলে যে জীবন সীমাহীন নয়। সময় সীমিত। এই সীমাবদ্ধতাই জীবনের মূল্য বাড়ায়। যদি মানুষের কাছে অসীম সময় থাকত, তাহলে কোনো কাজের জরুরি মূল্য থাকত না। কিন্তু সময় সীমিত বলেই কর্তব্যের মূল্য আছে, সম্পর্কের মূল্য আছে, সত্যের মূল্য আছে এবং একটি অর্থপূর্ণ জীবন গড়ার মূল্য আছে।
এই শ্লোক আমাদের আরও শেখায় যে পরিবর্তনকে শত্রু হিসেবে দেখলে জীবনকে বোঝা কঠিন হয়ে যায়। পরিবর্তনই জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একটি পুরোনো রূপের অবসান কখনো কখনো নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। একটি যুগের পতন অন্য যুগের সূচনা করতে পারে। একটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নতুন পথ খুলে দিতে পারে। একটি সম্পর্কের পরিবর্তন মানুষকে নিজের সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিতে পারে। তাই কাল ধ্বংস করে ঠিকই, কিন্তু সেই ধ্বংসের মধ্যেই রূপান্তরের সম্ভাবনাও থাকে।
শেষ পর্যন্ত “কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃত্ প্রবৃদ্ধঃ” আমাদের সামনে যে সত্যটি স্থাপন করে তা হলো মানুষের জীবন বৃহত্তর মহাজাগতিক প্রবাহের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অর্থপূর্ণ অংশ। মানুষ নশ্বর, ক্ষমতা নশ্বর, শরীর নশ্বর, সভ্যতা নশ্বর এবং দৃশ্যমান জগতের প্রতিটি রূপ পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই নশ্বরতার উপলব্ধিই মানুষকে তার কর্তব্য, আত্মপরিচয় এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে ভাবতে শেখায়। কৃষ্ণ যখন বলেন “আমি কাল”, তখন তিনি শুধু ধ্বংসের কথা বলেন না। তিনি সময়ের অনিবার্যতা, পরিবর্তনের সত্য, অহংকারের সীমা, কর্মের দায়িত্ব এবং অস্তিত্বের গভীর রহস্যকে একসঙ্গে প্রকাশ করেন।
এই কারণে গীতার এই শ্লোককে শুধু যুদ্ধের শ্লোক হিসেবে দেখা যায় না। এটি মানুষের অস্তিত্বের শ্লোক। এটি ইতিহাসের শ্লোক। এটি সময়ের শ্লোক। এটি মৃত্যুচেতনার শ্লোক। একই সঙ্গে এটি আত্মঅনুসন্ধানেরও শ্লোক। “কালোহস্মি” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা সময়ের মধ্যে বাস করি, পরিবর্তনের মধ্যে বাস করি এবং নশ্বরতার মধ্যে বাস করি। কিন্তু সেই নশ্বরতার মধ্যেই আমাদের কর্তব্য, জ্ঞান, নৈতিকতা এবং আত্মসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। কাল সব দৃশ্যমান রূপকে পরিবর্তিত করে, আর সেই পরিবর্তনের সত্য উপলব্ধি করেই মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে জীবনের প্রকৃত প্রশ্ন শুধু কতদিন বাঁচব তা নয়, বরং যে সময়টুকু পেয়েছি তার অর্থ কীভাবে উপলব্ধি করব।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!