ভগবদ্গীতা ১১.৩৫ — বিশ্বরূপ দর্শনে অর্জুনের ভয় ও আত্মসমর্পণ
সঞ্জয় উবাচ
এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য
কৃতাঞ্জলির্বেপমানঃ কিরীটী।
নমস্কৃত্বা ভুয় এবাহ কৃষ্ণং
সগদগদং ভীতভীতঃ প্রণম্য।।৩৫।।
অনুবাদঃ সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন- হে রাজন্! ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী শ্রবণ করে অর্জুন অত্যন্ত ভীত হয়ে কম্পিত কলেবরে কৃতাঞ্জলিপুটে প্রণাম করে গদগদ বাক্যে শ্রীকৃষ্ণকে বললেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের পঁয়ত্রিশতম শ্লোকটি অর্জুনের অন্তর্জগতের এক গভীর পরিবর্তনের মুহূর্তকে ধারণ করে। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, এই শ্লোক তারই একটি জীবন্ত মানসিক প্রতিচ্ছবি। শ্লোকটি হলো এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য কৃতাঞ্জলির্বেপমানঃ কিরীটী নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং সগদ্গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য। এর সরল অর্থ হলো কেশবের সেই বাণী শুনে কিরীটধারী অর্জুন কাঁপতে কাঁপতে দুই হাত জোড় করলেন। পুনরায় কৃষ্ণকে নমস্কার ও প্রণাম করে অত্যন্ত ভীত এবং আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু এই সরল অনুবাদের অন্তরালে মানুষের সীমাবদ্ধতা, ঈশ্বরের অসীমতা, ভয়, বিস্ময়, ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং অহংকারের বিলুপ্তির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো এতচ্ছ্রুত্বা। এটি এতৎ এবং শ্রুত্বা এই দুই অংশের সন্ধিবদ্ধ রূপ। এতৎ অর্থ এই এবং শ্রুত্বা এসেছে সংস্কৃত শ্রু ধাতু থেকে, যার অর্থ শোনা। শ্রু ধাতুর সঙ্গে ত্বা প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শ্রুত্বা রূপটি তৈরি হয়েছে। তাই এতচ্ছ্রুত্বার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় এই কথা শুনে বা এই বিষয়টি শ্রবণ করে। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে শ্রুত্বা কেবল কানে কোনো শব্দ প্রবেশ করার অর্থ বহন করে না। কৃষ্ণের কথা অর্জুন শুনেছেন এবং সেই কথা তাঁর চেতনার গভীরে প্রবেশ করেছে। তিনি এমন একটি সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন যা তাঁর পরিচিত মানবিক চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে গেছে। তাই শ্রুত্বা এখানে শুধু শ্রবণ নয়, উপলব্ধির সূচনাও।
এরপর এসেছে বচনং কেশবস্য। বচন শব্দটি সংস্কৃত বচ্ ধাতু থেকে এসেছে। বচ্ ধাতুর অর্থ বলা, কথা বলা বা উচ্চারণ করা। সেই অর্থে বচন হলো কথা, বক্তব্য, উক্তি, বাণী বা উপদেশ। কেশবস্য অর্থ কেশবের। কেশব কৃষ্ণের একটি প্রসিদ্ধ নাম এবং এই নামের ব্যাখ্যায় প্রাচীন ঐতিহ্যে একাধিক ব্যুৎপত্তিগত ধারা দেখা যায়। একদিকে কেশের সঙ্গে নামটির সম্পর্ক স্থাপন করা হয় এবং অন্যদিকে কেশী নামক অসুরের বধের সঙ্গে কেশব নামের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই শ্লোকে কেশব নামটির তাৎপর্য আরও গভীর। অর্জুন যাঁকে কেশব বলে সম্বোধন করছেন, তিনি একই সঙ্গে তাঁর বন্ধু, সারথি এবং পরম ঈশ্বর। মানুষের কাছে পরিচিত একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যে যখন মহাজাগতিক সত্তার প্রকাশ ঘটে, তখন পরিচিতির জায়গায় বিস্ময় এবং ভক্তি জন্ম নেয়। কেশবস্য বচন তাই শুধু একজন বন্ধুর কথা নয়। এটি সেই সত্তার বাণী, যাঁর মধ্যে অর্জুন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অসীম শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
কৃতাঞ্জলি শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম সুন্দর শব্দ। কৃত অর্থ করা বা সম্পন্ন করা এবং অঞ্জলি অর্থ দুই হাত একত্র করে শ্রদ্ধা নিবেদনের ভঙ্গি। তাই কৃতাঞ্জলি অর্থ দুই হাত জোড় করা। ভারতীয় সংস্কৃতিতে অঞ্জলি কেবল একটি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নয়। এটি শ্রদ্ধা, বিনয় এবং আত্মসমর্পণের প্রতীক। অর্জুনের হাত একসময় ছিল অস্ত্র ধারণের হাত। সেই হাত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু বিশ্বরূপের সামনে সেই হাত এখন জোড় হয়েছে। এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের শক্তি যখন অসীমের সামনে দাঁড়ায়, তখন শক্তির অহংকার বিনয়ে পরিণত হতে পারে। কৃতাঞ্জলি সেই বিনয়ের দৃশ্যমান প্রতীক।
বেপমানঃ শব্দটি এসেছে বেপ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ কাঁপা বা কম্পিত হওয়া। বেপমানঃ অর্থ কাঁপতে থাকা বা কম্পমান। অর্জুনের শরীর কাঁপছে। কিন্তু এই কম্পনকে শুধু সাধারণ ভয় বলে ব্যাখ্যা করলে শ্লোকটির গভীরতা ধরা যায় না। এখানে ভয়ের সঙ্গে মিশে আছে বিস্ময়, শ্রদ্ধা এবং অস্তিত্বের গভীর অভিঘাত। মানুষ যখন এমন কোনো বাস্তবতার সামনে দাঁড়ায় যা তার বোধের সীমাকে অতিক্রম করে, তখন তার শরীরও সেই অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া জানায়। অর্জুনের কম্পন তাই কেবল দুর্বলতার প্রকাশ নয়। এটি অসীমের সামনে সীমিত মানুষের অস্তিত্বগত প্রতিক্রিয়া।
এরপর কবি অর্জুনকে কিরীটী নামে অভিহিত করেছেন। কিরীট অর্থ মুকুট এবং কিরীটী অর্থ যিনি কিরীট ধারণ করেন। অর্জুন ছিলেন মহাবীর, রাজপুত্র এবং অতুলনীয় ধনুর্ধর। তাঁর কিরীট তাঁর বীরত্ব, মর্যাদা এবং রাজকীয় পরিচয়ের প্রতীক। অথচ সেই কিরীটধারী বীরই এখন কাঁপছেন। এর মধ্যে গীতার একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। মানুষের পদ, ক্ষমতা, জ্ঞান, সম্পদ এবং বীরত্ব যত বড়ই হোক, অসীম সত্যের সামনে তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। কিরীটী শব্দটি তাই একদিকে অর্জুনের মহিমা স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে সেই মহিমার সীমাও প্রকাশ করে।
নমস্কৃত্বা শব্দটি নম্ ধাতু থেকে এসেছে। নম্ অর্থ নত হওয়া বা ঝুঁকে পড়া। নমস্কার শব্দের মধ্যেও এই নত হওয়ার ভাব নিহিত রয়েছে। অর্জুন প্রথমে কৃষ্ণের কথা শুনলেন, তারপর তাঁর হাত জোড় হলো, শরীর কাঁপল এবং এরপর তিনি নমস্কার করলেন। এখানে শ্লোকের ভাষার মধ্যেই অর্জুনের মানসিক পরিবর্তনের ধারাটি প্রকাশিত হয়েছে। জ্ঞান যখন সত্যিকারভাবে হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন তা মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনে। অর্জুনের নমস্কার সেই পরিবর্তনের বাহ্যিক প্রকাশ।
ভূয়ঃ শব্দের অর্থ আবার বা পুনরায়। অর্জুন আবার কৃষ্ণকে প্রণাম করলেন। এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কৃষ্ণকে তিনি আগে বন্ধু হিসেবে প্রণাম করেছেন, কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পরে সেই প্রণামের অর্থ বদলে গেছে। আগে যে সম্পর্কের মধ্যে ছিল বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতা, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে ঐশ্বর্যবোধ এবং গভীর শ্রদ্ধা। একই কৃষ্ণ এখন অর্জুনের কাছে আরও গভীর অর্থে প্রকাশিত।
সগদ্গদং শব্দটি এই শ্লোকের আবেগময় দিকটিকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। গদ্গদ অর্থ আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া বা স্বর অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। সগদ্গদং অর্থ আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে। অর্জুন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন যেখানে তাঁর অনুভূতি ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাঁর শরীর কাঁপছে এবং কণ্ঠও আবেগে ভারী হয়ে উঠছে। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন অনুভূতি এত গভীর হয় যে সাধারণ ভাষা আর সেই অনুভূতিকে ধারণ করতে পারে না। অর্জুনের সগদ্গদ কণ্ঠ সেই সীমার প্রতীক।
ভীতভীতঃ শব্দটি ভীত শব্দের পুনরুক্ত রূপ। ভীত অর্থ ভয়প্রাপ্ত এবং ভীতভীত অর্থ অত্যন্ত ভীত বা গভীরভাবে ভীতসন্ত্রস্ত। সংস্কৃত ভাষায় কোনো শব্দের পুনরুক্তি অনেক সময় তীব্রতা প্রকাশ করে। এখানে সেই তীব্রতাই ফুটে উঠেছে। অর্জুনের ভয় সাধারণ কোনো বিপদের ভয় নয়। তিনি এমন এক মহাশক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যার মধ্যে সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহারের বিরাট সত্য একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। তাই তাঁর ভয় অস্তিত্বের গভীর স্তরে পৌঁছেছে।
শেষে এসেছে প্রণম্য। এটি প্রণম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রণম্ গঠিত হয়েছে প্র উপসর্গ এবং নম্ ধাতুর সমন্বয়ে। নম্ অর্থ নত হওয়া এবং প্র উপসর্গ সেই নতি বা অগ্রসর হয়ে অবনত হওয়ার ভাবকে আরও স্পষ্ট করে। প্রণম্য অর্থ প্রণাম করে বা নত হয়ে। লক্ষণীয় বিষয় হলো শ্লোকে নমস্কৃত্বা এবং প্রণম্য উভয় ধরনের নত হওয়ার ভাব এসেছে। এই পুনরাবৃত্তি শুধু ভাষার অলংকার নয়। এটি অর্জুনের অন্তরের গভীর আত্মসমর্পণকে প্রকাশ করে।
পুরো শ্লোকটিকে যদি একটি মানসিক যাত্রা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে একটি অসাধারণ ক্রম আমাদের সামনে আসে। অর্জুন প্রথমে শুনলেন। তারপর তাঁর হাত জোড় হলো। তাঁর শরীর কাঁপল। তিনি নমস্কার করলেন। তাঁর কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হলো। তিনি গভীরভাবে ভীত হলেন এবং শেষে আবার প্রণাম করলেন। অর্থাৎ শ্রবণ থেকে শুরু হয়ে এই অভিজ্ঞতা আত্মসমর্পণে পৌঁছেছে। এই কারণেই শ্লোকটি শুধু একটি ঘটনা বর্ণনা করে না। এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের ছবি আঁকে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের কেন্দ্রে রয়েছে সীমিত মানুষ এবং অসীম বাস্তবতার সম্পর্ক। অর্জুন এতক্ষণ কৃষ্ণকে একজন বন্ধু হিসেবে চিনেছেন। তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁকে নিজের সারথি করেছেন এবং বন্ধুর মতো আচরণ করেছেন। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পরে তাঁর সেই পরিচিত ধারণা ভেঙে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর সামনে যে সত্তা দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কেবল একজন মানুষ নন। তাঁর মধ্যেই অসংখ্য রূপ, অসংখ্য শক্তি এবং সমগ্র বিশ্বজগতের প্রকাশ ঘটেছে। এই উপলব্ধি অর্জুনকে কাঁপিয়ে দেয়। মানুষের বুদ্ধি যখন অসীমের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন বিস্ময় এবং ভয় একসঙ্গে জন্ম নিতে পারে। গীতার এই শ্লোক সেই অভিজ্ঞতারই কাব্যিক প্রকাশ।
এই কারণে ভয় এবং ভক্তির সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তি মানেই কেবল স্নেহ বা আনন্দ নয়। ঈশ্বরের মহত্ত্ব উপলব্ধি করলে মানুষের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা এবং বিস্ময়ও জন্ম নিতে পারে। অর্জুনের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের স্বাভাবিকতা ধীরে ধীরে ঐশ্বরিক মহিমার উপলব্ধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তিনি কৃষ্ণকে এখন শুধু সখা হিসেবে দেখছেন না। তিনি তাঁকে এমন এক মহাশক্তি হিসেবে উপলব্ধি করছেন যার সামনে মানুষের অহংকার ক্ষুদ্র হয়ে যায়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। কিরীট এখানে মানবিক ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক। কৃতাঞ্জলি আত্মসমর্পণের প্রতীক। বেপমানঃ মানুষের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধির প্রতীক। সগদ্গদং ভাষার সীমাবদ্ধতার প্রতীক এবং ভীতভীতঃ অসীমের সামনে অস্তিত্বগত বিস্ময়ের প্রতীক। আর প্রণম্য অহংকারের নত হওয়ার প্রতীক। এই অর্থে পুরো শ্লোকটিকে মানুষের অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে এবং পরিচিতির সীমা থেকে গভীর উপলব্ধির দিকে যাত্রা হিসেবেও পড়া যায়।
আধুনিক মানুষের জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ আজ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অর্থ, জ্ঞান এবং ক্ষমতার মাধ্যমে নিজের সামর্থ্যকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্বের বিশালতা, প্রকৃতির শক্তি, সময়ের প্রবাহ এবং জীবনের অনিশ্চয়তার সামনে মানুষ এখনও সীমাবদ্ধ। একজন মানুষ যত সফলই হোক, এমন মুহূর্ত তার জীবনে আসতে পারে যখন সে উপলব্ধি করবে যে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সেই উপলব্ধি যদি তাকে ভেঙে না দিয়ে বিনয়ী করে, তাহলে সেটিই তার পরিণত হওয়ার সূচনা। অর্জুনের কৃতাঞ্জলি সেই বিনয়েরই প্রতীক।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি শিশু যখন প্রথমবার বিশাল সমুদ্র দেখে, তখন তার মনে একসঙ্গে আনন্দ, বিস্ময় এবং সামান্য ভয়ের জন্ম হতে পারে। কারণ সে বুঝতে পারে যে তার সামনে এমন এক বিশালতা রয়েছে যা তার ছোট্ট অভিজ্ঞতার সীমাকে অতিক্রম করে। অর্জুনের অভিজ্ঞতা তার চেয়েও অসীম। তাঁর সামনে কোনো সাধারণ সমুদ্র নয়, সমগ্র বিশ্বজগতের এক জীবন্ত মহারূপ প্রকাশিত হয়েছে। তাই তাঁর শরীর কাঁপছে, তাঁর কণ্ঠ আবেগে ভারী এবং তাঁর হাত প্রণামের ভঙ্গিতে যুক্ত হয়েছে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। খুব অল্প কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে ব্যাস অর্জুনের সম্পূর্ণ মানসিক দৃশ্যটি চোখের সামনে উপস্থিত করেছেন। তিনি শুনছেন, কাঁপছেন, হাত জোড় করছেন, প্রণাম করছেন, আবেগে কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে কথা বলছেন। এখানে বর্ণনা শুধু বাহ্যিক নয়। শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি অর্জুনের অন্তরের অবস্থাকে প্রকাশ করছে। এই কারণে শ্লোকটি একই সঙ্গে কাব্যিক, নাটকীয়, মনস্তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক।
সবশেষে বলা যায়, এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য শ্লোকটি মানুষের আত্মিক যাত্রার একটি গভীর মুহূর্তকে ধারণ করে। এখানে শ্রবণ জ্ঞানে পরিণত হয়, জ্ঞান বিস্ময়ে রূপ নেয়, বিস্ময় ভয়ের জন্ম দেয়, ভয় বিনয়ে পরিণত হয় এবং বিনয় আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে যায়। কিরীটধারী অর্জুনের কাঁপতে থাকা শরীর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের মহত্ত্ব কখনো নিজের শক্তির অহংকারে নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করার ক্ষমতায়। দুই হাতের অঞ্জলি তাই শুধু প্রণামের ভঙ্গি নয়। এটি মানুষের সীমিত অহংকারের সামনে অসীম সত্যের প্রতি নত হওয়ার প্রতীক। আর অর্জুনের সগদ্গদ কণ্ঠ যেন আমাদের বলে যে কিছু সত্য এত গভীর যে সেগুলোকে কেবল ভাষায় বলা যায় না। সেগুলোকে অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিনম্র হয়ে তার সামনে দাঁড়াতে হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!