ভগবদ্গীতা ১১.৩৭ — বিশ্বরূপে কৃষ্ণের মহত্ত্ব ও অর্জুনের প্রণতি
কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্মহাত্মন্
গরীয়সে ব্রহ্মণোহপ্যাদিকর্ত্রে।
অনন্ত দেবেশ জগন্নিবাস
ত্বমক্ষরং সদসত্তৎপরং যৎ।।৩৭।।
অনুবাদঃ হে মহাত্মন! তুমি এমন কি ব্রহ্মা থেকেও শ্রেষ্ঠ এবং আদি সৃষ্টিকর্তা। সকলে তোমাকে কেন নমস্কার করবেন না? হে অনন্ত! হে দেবেশ! হে জগন্নিবাস! তুমি সৎ ও অসৎ উভয়ের অতীত অক্ষরতত্ত্ব ব্রহ্ম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের ৩৭তম শ্লোকটি বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুনের অন্তর্গত উপলব্ধির এক অসাধারণ প্রকাশ। বিশ্বরূপে কৃষ্ণকে প্রত্যক্ষ করার পর অর্জুনের কাছে আর কৃষ্ণ কেবল তাঁর সখা, রথচালক কিংবা যাদববংশীয় এক মহাপুরুষ নন। তাঁর চোখের সামনে প্রকাশিত হয়েছে এমন এক মহাসত্তা, যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি, দেবতা, মানুষ, প্রকৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের বহুমাত্রিক রূপ একত্রিত হয়েছে। সেই বিস্ময়কর উপলব্ধির পর অর্জুন প্রশ্ন করেন, কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্মহাত্মন্। অর্থাৎ হে মহাত্মা, আপনাকে প্রণাম না করার কারণই বা কী থাকতে পারে। এই প্রশ্ন আসলে কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়। এটি এমন একটি অলঙ্কারিক প্রশ্ন যার মধ্য দিয়ে অর্জুন নিজের উপলব্ধির একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করছেন। যিনি সর্বমহান, যাঁর সামনে সমস্ত সীমাবদ্ধতা ক্ষুদ্র হয়ে যায়, তাঁকে প্রণাম না করে থাকার কোনো যুক্তি নেই।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কস্মাচ্চ। সংস্কৃত কস্মাৎ শব্দের অর্থ কেন বা কোন কারণে। এর সঙ্গে চ শব্দ যুক্ত হয়ে সন্ধির মাধ্যমে কস্মাচ্চ রূপ নিয়েছে। ব্যাকরণগতভাবে এটি কারণ নির্দেশক প্রশ্নের ভাব প্রকাশ করে। কিন্তু অর্জুনের মুখে এই প্রশ্নের মধ্যে বিস্ময় ও আত্মসমর্পণের আবেগ রয়েছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে জানতে চাইছেন না যে কেন প্রণাম করতে হবে। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে এমন মহাসত্তার সামনে প্রণাম স্বাভাবিক এবং অনিবার্য। এরপর এসেছে নমেরন্ শব্দটি, যার মূল ধাতু নম্। নম্ ধাতুর অর্থ নত হওয়া, মাথা ঝুঁকানো, শ্রদ্ধায় আত্মসমর্পণ করা। এই ধাতু থেকেই নমস্কার, নমন এবং নমঃ প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি। তাই এখানে প্রণাম কেবল বাহ্যিকভাবে মাথা নত করার বিষয় নয়। এটি অহংকারের নতি এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার প্রতীক।
অর্জুন কৃষ্ণকে সম্বোধন করছেন মহাত্মন্ বলে। মহাত্মা শব্দটি গঠিত হয়েছে মহা এবং আত্মা এই দুটি অংশ থেকে। মহা অর্থ মহান বা বিশাল এবং আত্মা অর্থ অন্তঃসত্তা, আত্মস্বরূপ বা নিজস্ব সত্তা। তাই মহাত্মা অর্থ এমন এক মহান সত্তা যার অস্তিত্ব সংকীর্ণ ব্যক্তিসত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ অর্থে মহাত্মা বলতে মহৎ চরিত্রের মানুষকে বোঝানো হলেও এই শ্লোকে শব্দটির অর্থ অনেক গভীর। বিশ্বরূপ দর্শনের প্রেক্ষাপটে মহাত্মা এমন এক সত্তাকে নির্দেশ করে যাঁর মধ্যে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বসত্তার প্রকাশ ঘটেছে। অর্জুনের কাছে কৃষ্ণ এখন ব্যক্তিমানুষের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি মহাজাগতিক সত্তার প্রকাশ।
এরপর অর্জুন বলেন গরীয়সে। এই শব্দটি গুরু শব্দের উৎকর্ষসূচক রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত। গুরু শব্দের একটি প্রাথমিক অর্থ হলো ভারী। পরবর্তীকালে এর অর্থ হয়েছে মহান, গুরুতর, শ্রদ্ধেয় এবং জ্ঞানদাতা। গরীয়সে সেই অধিকতর গুরু বা অধিকতর মহান সত্তার প্রতি নির্দেশ করে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে অর্জুন বোঝাচ্ছেন যে কৃষ্ণের মহত্ত্ব সাধারণ তুলনার বিষয় নয়। তিনি এমন এক মহত্ত্বের অধিকারী যার সামনে অন্য সমস্ত মহত্ত্ব ক্ষুদ্র হয়ে যায়। মানুষের জীবনে এই উপলব্ধির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ যখন নিজের জ্ঞান, ক্ষমতা ও সাফল্যকে সর্বোচ্চ বলে মনে করে, তখন তার মধ্যে অহংকার জন্মায়। কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতার সামনে দাঁড়ালে সে বুঝতে পারে যে তার অর্জন সীমিত। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রকৃত বিনয় জন্ম নেয়।
এই শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ব্রহ্মণোহপ্যাদিকর্ত্রে। এখানে ব্রহ্মণঃ শব্দটি প্রসঙ্গ অনুযায়ী ব্রহ্মার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মারও। এর সঙ্গে অপি যুক্ত হয়ে অর্থ দাঁড়ায় ব্রহ্মারও। এরপর এসেছে আদিকর্ত্রে। এটি আদি এবং কর্তৃ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। আদি অর্থ প্রথম বা সূচনাকারী এবং কর্তৃ অর্থ কর্তা বা কার্যসম্পাদনকারী। সুতরাং আদিকর্তা অর্থ প্রথম কর্তা বা মূল কারণ। অর্জুনের বক্তব্য অত্যন্ত গভীর। ব্রহ্মা যিনি সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত সৃষ্টিকর্তা দেবতা, তাঁরও যে একটি পরম উৎস রয়েছে, অর্জুন সেই উৎস হিসেবে কৃষ্ণকে উপলব্ধি করছেন। অর্থাৎ কৃষ্ণ কেবল সৃষ্টির একটি অংশ নন। তিনি সৃষ্টির কারণেরও কারণ।
এরপর আসে অনন্ত শব্দটি। অনন্ত গঠিত হয়েছে না অর্থবোধক উপসর্গ এবং অন্ত শব্দের সমন্বয়ে। অন্ত অর্থ শেষ, সীমা বা প্রান্ত। অনন্ত অর্থ যার কোনো অন্ত নেই। বিশ্বরূপ দর্শনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই শব্দটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্জুন যে বিশ্বরূপ দেখেছেন তার কোনো নির্দিষ্ট শুরু বা শেষ তিনি নির্ণয় করতে পারছেন না। তাই অনন্ত এখানে শুধু অসীম সংখ্যার ধারণা নয়। এটি এমন এক অস্তিত্বের ধারণা যা স্থান, কাল এবং সীমার সাধারণ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়। মানবজীবনে অনন্ত শব্দটি আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে জন্ম নিই এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জীবনযাপন করি। আমাদের জ্ঞানও সীমিত। কিন্তু অস্তিত্বের ব্যাপ্তি আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ। অনন্ত সেই বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক।
অর্জুন এরপর কৃষ্ণকে দেবেশ বলে সম্বোধন করেন। দেবেশ শব্দটি দেব এবং ঈশ এই দুটি অংশে গঠিত। দেব অর্থ দেবতা বা ঐশ্বরিক শক্তি এবং ঈশ অর্থ অধিপতি বা প্রভু। সুতরাং দেবেশ অর্থ দেবতাদেরও অধিপতি। এই শব্দের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণের অবস্থানকে দেবতাদের মধ্যে আর একজন দেবতা হিসেবে নয় বরং দেবশক্তির সর্বোচ্চ নিয়ন্তা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। অর্জুনের উপলব্ধিতে কৃষ্ণের মহত্ত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দেবতারাও তাঁর বৃহত্তর ঐশ্বরিক বাস্তবতার অন্তর্ভুক্ত।
জগন্নিবাস শব্দটিও অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। জগত এবং নিবাস শব্দের সমন্বয়ে এর গঠন। জগত অর্থ সমগ্র বিশ্ব এবং নিবাস অর্থ বাসস্থান বা আশ্রয়। তাই জগন্নিবাস অর্থ যাঁর মধ্যে জগত অবস্থান করে অথবা যিনি জগতের আশ্রয়। এই ধারণাটি ভারতীয় দর্শনের একটি মৌলিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। ঈশ্বর শুধু দূরে অবস্থানকারী কোনো সত্তা নন। সমগ্র জগত তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং তিনিও জগতের অন্তরালে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ সৃষ্টির সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কেবল স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক নয়। তিনি অস্তিত্বের আশ্রয়, ভিত্তি এবং অন্তর্নিহিত সত্য।
এরপর অর্জুন বলেন ত্বমক্ষরম্। ত্বম্ অর্থ তুমি বা আপনিই এবং অক্ষরম্ অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। অক্ষর শব্দটি অ এবং ক্ষর এই দুটি অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্ষর ধাতুর অর্থ ক্ষয় হওয়া, ঝরে যাওয়া বা পরিবর্তিত হওয়া। অক্ষর অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা বিনষ্ট হয় না। এখানে অক্ষর শব্দটি বাংলা ভাষায় প্রচলিত বর্ণ বা অক্ষর অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। গীতার দার্শনিক প্রেক্ষাপটে অক্ষর হলো অবিনশ্বর সত্য। দৃশ্যমান পৃথিবীর সবকিছু পরিবর্তনশীল। শরীর পরিবর্তিত হয়, সমাজ পরিবর্তিত হয়, রাষ্ট্র পরিবর্তিত হয়, সভ্যতা পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের চিন্তাভাবনাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তরালে এমন একটি সত্যের অনুসন্ধান ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান বিষয়, যা নিজে ক্ষয়প্রাপ্ত নয়। অক্ষর সেই চিরস্থায়ী সত্যের প্রতীক।
শ্লোকের শেষ অংশ সদসত্তৎপরং যৎ অত্যন্ত দার্শনিক। সদ্ অর্থ অস্তিত্বশীল বা প্রকাশিত এবং অসৎ অর্থ অনস্তিত্বশীল বা অপ্রকাশিত। এখানে সৎ ও অসৎকে ভালো এবং মন্দ হিসেবে বোঝা ঠিক নয়। এগুলো অস্তিত্বের প্রকৃতি এবং প্রকাশের বিভিন্ন স্তর নির্দেশ করে। অর্জুন বলছেন কৃষ্ণ কেবল সৎ নন এবং কেবল অসৎও নন। তিনি সৎ ও অসতেরও পরম। তৎ পরম অর্থ তারও ঊর্ধ্বে বা তারও অতীত। অর্থাৎ যে পরম সত্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অস্তিত্বের সীমাকে অতিক্রম করে, কৃষ্ণ সেই পরম সত্যের সঙ্গে অভিন্নভাবে উপলব্ধ হচ্ছেন।
এই বক্তব্য ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এটি পরম ব্রহ্মের দিকে নির্দেশ করে, যেখানে নাম, রূপ ও পরিবর্তনের অন্তরালে এক অদ্বিতীয় চৈতন্যতত্ত্ব বিদ্যমান। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর জগতের অন্তর্যামী এবং জগত তাঁর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। সেই দৃষ্টিতে জগন্নিবাস শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর সর্বোচ্চ স্বাধীন সত্তা এবং জীব ও জগত তাঁর ওপর নির্ভরশীল। সেই দৃষ্টিতে দেবেশ ও আদিকর্তা শব্দ দুটি ঈশ্বরের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে প্রকাশ করে। দর্শনভেদে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন। কৃষ্ণকে এখানে সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তার বাইরে সর্বোচ্চ বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে।
এই শ্লোকের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও রয়েছে। অর্জুনের মানসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল সংশয় ও বিষাদ দিয়ে। তিনি যুদ্ধ করতে পারছিলেন না, কর্তব্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত ছিলেন এবং আত্মীয়স্বজনকে সামনে দেখে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণের জ্ঞান গ্রহণ করতে করতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। বিশ্বরূপ দর্শনের পর তাঁর ব্যক্তিগত সংকট একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক বাস্তবতার মধ্যে নতুন অর্থ লাভ করে। তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি ইতিহাসের কেন্দ্র নন। তিনি বৃহত্তর এক বিশ্বব্যবস্থার অংশ। এই উপলব্ধিই তাঁকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়। তাই নম্ ধাতুর নত হওয়ার অর্থ এখানে শুধু শরীরের নতি নয়। এটি মানসিক অহংকারের নতি।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অসাধারণ। অর্জুন একের পর এক সম্বোধনের মাধ্যমে কৃষ্ণের মহত্ত্বকে ক্রমশ বিস্তৃত করছেন। প্রথমে মহাত্মা, তারপর গরীয়ান, তারপর ব্রহ্মারও আদিকর্তা, তারপর অনন্ত, দেবেশ এবং জগন্নিবাস। শেষে তিনি পৌঁছাচ্ছেন অক্ষর এবং সৎ ও অসতেরও অতীত পরম তত্ত্বের ধারণায়। অর্থাৎ ভাষা এখানে একটি সীমিত মানবিক উপায় হয়ে অসীমকে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। যতই অর্জুন কৃষ্ণকে বর্ণনা করছেন, ততই বোঝা যাচ্ছে যে কোনো একটি শব্দ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারছে না। তাই একের পর এক বিশেষণ যুক্ত হচ্ছে।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা গভীর। আমরা প্রতিদিন পরিবর্তনের মধ্যে বাস করি। সাফল্য ও ব্যর্থতা আসে এবং চলে যায়। অর্থ, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা এবং সম্পর্কের অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। মানুষ যখন নিজেকে এই পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলে, তখন সামান্য পরিবর্তনও তার মনে গভীর অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু অক্ষর ধারণা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় যে পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও কি কোনো স্থায়ী সত্য রয়েছে। জগন্নিবাস ধারণা মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। সে বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ। আর নমস্কারের ভাব শেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে অহংকারী না করে বিনয়ী করে।
এই কারণে কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্মহাত্মন্ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের কাছেও ফিরে আসে। যখন মানুষ সত্যিই মহত্ত্বকে উপলব্ধি করে, তখন তার সামনে দুটি পথ থাকে। সে নিজের অহংকার আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে, অথবা বৃহত্তর সত্যের সামনে নত হতে পারে। অর্জুন দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন। তাঁর প্রণাম দুর্বলতার চিহ্ন নয়। এটি উপলব্ধির চিহ্ন। তিনি বুঝেছেন যে সত্যের সামনে অহংকার ধরে রাখা অর্থ নিজের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করা।
সুতরাং গীতার একাদশ অধ্যায়ের ৩৭তম শ্লোক কেবল কৃষ্ণের প্রশংসা নয়। এটি অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক ঘোষণা। মহাত্মা আমাদের বৃহত্তর সত্তার কথা মনে করায়। আদিকর্তা আমাদের কারণের কারণ অনুসন্ধান করতে শেখায়। অনন্ত আমাদের সীমাবদ্ধতার বাইরে তাকাতে শেখায়। দেবেশ সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের ধারণা প্রকাশ করে। জগন্নিবাস আমাদের অস্তিত্বের আশ্রয়ের কথা স্মরণ করায়। অক্ষর পরিবর্তনের মধ্যে স্থায়ী সত্যের অনুসন্ধান জাগায়। আর সদসত্তৎপরং যৎ আমাদের নিয়ে যায় এমন এক পরম বাস্তবতার দিকে, যা প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত উভয় অস্তিত্বের সীমাকেও অতিক্রম করে।
এই শ্লোকের সারকথা তাই এক গভীর উপলব্ধিতে এসে মিলিত হয়। মানুষ যতদিন নিজেকেই সবকিছুর কেন্দ্র মনে করে, ততদিন তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্ব একটি অসীম বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় বিনয়, বিস্ময়, ভক্তি এবং সত্যের প্রতি আত্মসমর্পণ। অর্জুনের কণ্ঠে উচ্চারিত কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্মহাত্মন্ সেই আত্মসমর্পণেরই ভাষা। সীমিত মানুষের পক্ষ থেকে অসীম সত্যের সামনে এটি এক গভীর প্রণাম।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!