ভগবদ্গীতা ১১.৪৩ — কৃষ্ণই জগতের পিতা ও শ্রেষ্ঠ গুরু
পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য
ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্।
ন ত্বৎসমোহস্ত্যভ্যধিকঃ কুতোহন্যো
লোকত্রয়েহ প্যপ্রতিমপ্রভাব।।৪৩।।
অনুবাদঃ হে অমিত প্রভাব! তুমি এই চরাচর জগতের পিতা, পূজ্য, গুরু ও গুরুশ্রেষ্ঠ। ত্রিভুবনে তোমার সমান আর কেউ নেই, অতএব তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ অন্য কে হতে পারে?
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের তেতাল্লিশতম শ্লোকটি অর্জুনের চেতনার এক অসাধারণ পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন আর কৃষ্ণকে কেবল তাঁর প্রিয় বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সারথি হিসেবে দেখতে পারছেন না। তাঁর সামনে এমন এক মহিমান্বিত সত্য প্রকাশিত হয়েছে, যা ব্যক্তিগত পরিচয়ের সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। তাই গভীর বিস্ময়, ভক্তি ও বিনয়ের সঙ্গে অর্জুন বলছেন, হে কৃষ্ণ, তুমি এই সমগ্র চরাচর জগতের পিতা, তুমি এর পূজনীয় এবং তুমি গুরুদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। তিনটি লোকের মধ্যেও তোমার সমান কেউ নেই এবং তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। হে অতুলনীয় প্রভাবশালী, তোমার মহিমার কোনো তুলনা নেই।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো পিতাসি। এটি পিতা এবং অসি এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। পিতা শব্দের মূল সংস্কৃত রূপ পিতৃ, যার অর্থ জন্মদাতা বা জনক। অসি এসেছে অস্তিত্ব বোঝানো সংস্কৃত ধাতু অস্ থেকে এবং এর অর্থ তুমি আছ বা তুমি হও। তাই পিতাসি শব্দের সরল অর্থ হলো তুমি পিতা। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে পিতা বলতে কেবল জৈবিক জন্মদাতাকে বোঝানো হয়নি। এখানে পিতা সেই পরম উৎস, যাঁর কাছ থেকে সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি, যাঁর ওপর সৃষ্টি নির্ভরশীল এবং যাঁর দ্বারা সৃষ্টি ধারণ ও পরিচালিত হয়। মানুষের পিতা যেমন তাকে জীবনের সূচনা দেন, তেমনি ঈশ্বরকে এখানে সমগ্র অস্তিত্বের মূল উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে।
এরপর এসেছে লোকস্য চরাচরস্য। লোক শব্দের অর্থ জগৎ, পৃথিবী, জীবজগৎ কিংবা অস্তিত্বের ক্ষেত্র। আর চরাচর শব্দটি চর এবং অচর এই দুই ভাবের সমন্বয়। চর অর্থ চলমান এবং অচর অর্থ অচল বা স্থির। ফলে চরাচর বলতে সমস্ত চলমান এবং অচল সৃষ্টি বোঝায়। মানুষ, পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি বৃক্ষ, পর্বত, নদী এবং পৃথিবীর স্থির উপাদানও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কৃষ্ণকে কোনো একটি জাতি, সমাজ বা নির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠীর পিতা বলা হচ্ছে না। তাঁকে বলা হচ্ছে সমগ্র চরাচর জগতের পিতা। এই একটি শব্দবন্ধের মধ্যেই গীতার বিশ্বজনীনতার একটি গভীর ধারণা প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকের পরবর্তী অংশ হলো ত্বমস্য পূজ্যশ্চ। ত্বম্ অর্থ তুমি এবং অস্য অর্থ এর বা এই জগতের। পূজ্য শব্দটি এসেছে পূজ্ ধাতু থেকে। পূজ্য অর্থ যাঁকে সম্মান করা উচিত, যাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা উচিত এবং যিনি পূজনীয়। এখানে কৃষ্ণকে শুধু সৃষ্টির কারণ হিসেবে দেখানো হয়নি, তাঁকে সেই সৃষ্টির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য রয়েছে। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে তার নিজের অস্তিত্ব তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার ফল নয়, বরং বৃহত্তর কোনো অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত, তখন তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিনয় ও কৃতজ্ঞতার জন্ম হয়।
এরপর অর্জুন বলেন গুরুর্গরীয়ান। গুরু শব্দের সাধারণ অর্থ শিক্ষক বা আচার্য। কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় গুরু শব্দের অর্থ আরও বিস্তৃত। গুরু বলতে এমন একজনকে বোঝায় যিনি জ্ঞানে, মর্যাদায় এবং গুরুত্বে ভারী। ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় গুরু হলেন সেই ব্যক্তি যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে যান। গরীয়ান শব্দটি আরও অধিক মহান বা অধিক শ্রেষ্ঠ এই ভাব প্রকাশ করে। ফলে গুরুর্গরীয়ান কথাটির গভীর অর্থ দাঁড়ায়, তুমি শুধু গুরু নও, তুমি গুরুরও অধিক মহান। তুমি এমন এক পরম শিক্ষক, যাঁর কাছে সমস্ত জ্ঞান শেষ পর্যন্ত এসে মিলিত হয়।
এই বক্তব্য গীতার মূল শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্জুনের সমস্যা কেবল যুদ্ধ করবে কি করবে না সেই প্রশ্ন ছিল না। তাঁর প্রকৃত সমস্যা ছিল জীবনের অর্থ, কর্তব্য, আত্মা, কর্ম, মৃত্যু এবং সত্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি। কৃষ্ণ তাঁকে কেবল যুদ্ধের কৌশল শেখাননি। তিনি অর্জুনের চিন্তার ভিত্তিকেই পরিবর্তন করেছেন। তিনি তাঁকে আত্মার অমরত্ব, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ এবং ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। সেই কারণে কৃষ্ণ এখানে সাধারণ শিক্ষক নন। তিনি এমন গুরু যিনি মানুষের বাইরের আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি তার অন্তর্দৃষ্টিকেও পরিবর্তন করেন।
শ্লোকটির পরবর্তী অংশ আরও শক্তিশালী। অর্জুন বলেন ন ত্বৎসমোস্ত্যভ্যধিকঃ। ন অর্থ নেই, ত্বৎ অর্থ তোমার এবং সম অর্থ সমান বা সমকক্ষ। ফলে ন ত্বৎসমোস্তি অর্থ হলো তোমার সমান কেউ নেই। কিন্তু অর্জুন এখানেই থামেননি। তিনি অভ্যধিক শব্দ ব্যবহার করেছেন। অভ্যধিক অর্থ আরও অধিক বা আরও শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ তোমার সমান কেউ নেই এবং তোমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। এখানে কৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্বকে দুই দিক থেকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই এবং তাঁর ঊর্ধ্বেও কেউ নেই।
এই বক্তব্যের মধ্যে পরম সত্যের একটি গভীর দার্শনিক ধারণা নিহিত আছে। সাধারণ জগতে আমরা তুলনা করে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করি। একজন অন্যজনের চেয়ে জ্ঞানী, শক্তিশালী বা মর্যাদাবান হতে পারেন। কিন্তু পরম সত্যকে যদি সত্যিই পরম বলা হয়, তাহলে তার সমকক্ষ আর কোনো দ্বিতীয় সত্তা থাকতে পারে না। এই কারণেই অর্জুনের ভাষায় কৃষ্ণ কেবল শ্রেষ্ঠদের একজন নন। তিনি শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত মানদণ্ড। তাঁর সঙ্গে তুলনা করার মতো দ্বিতীয় কোনো সত্তা নেই।
এরপর এসেছে কুতোহন্যো। কুতঃ অর্থ কোথায় বা কীভাবে এবং অন্য অর্থ অন্য কেউ। অর্জুন এখানে আসলে কোনো তথ্য জানতে প্রশ্ন করছেন না। এটি একটি অলঙ্কারিক প্রশ্ন। তিনি বলতে চাইছেন, যখন তোমার সমান কেউ নেই এবং তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠও কেউ নেই, তখন অন্য কারও শ্রেষ্ঠত্বের কথা উঠবে কীভাবে। এই বাক্য অর্জুনের ভক্তি ও বিস্ময়ের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
লোকত্রয় শব্দের অর্থ তিনটি লোক। ভারতীয় মহাজাগতিক চিন্তায় তিন লোক বলতে সাধারণভাবে পৃথিবী, মধ্যলোক এবং স্বর্গীয় জগতের ধারণা বোঝানো হয়। বিভিন্ন শাস্ত্রে এই লোকতত্ত্বের ব্যাখ্যা ও বিন্যাসে পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এই শ্লোকে মূল বক্তব্য হলো, অস্তিত্বের সমগ্র মহাজাগতিক পরিসরেও কৃষ্ণের সমকক্ষ কেউ নেই। অর্থাৎ তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কোনো একটি সমাজ, জাতি বা পৃথিবীর সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। এটি সমগ্র বিশ্বজগতের পরিসরে প্রতিষ্ঠিত।
সবশেষে অর্জুন বলেন অপ্রতিমপ্রভাব। অপ্রতিম অর্থ যার কোনো তুলনা নেই এবং প্রভাব অর্থ শক্তি, মহিমা, ঐশ্বর্য বা প্রকাশিত ক্ষমতা। তাই অপ্রতিমপ্রভাব অর্থ হে অতুলনীয় মহিমার অধিকারী। এই শব্দটি শ্লোকটির শেষের শক্তিশালী সমাপ্তি তৈরি করেছে। কৃষ্ণের মহিমা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়। তাঁর প্রভাব সৃষ্টির গভীরতম স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি এমন এক শক্তির প্রতীক, যার কোনো দ্বিতীয় তুলনা নেই।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোককে বিভিন্ন বেদান্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এখানে কৃষ্ণের মধ্যে সেই পরম ব্রহ্মের প্রকাশ দেখা যায়, যা বহুরূপী জগতের অন্তর্নিহিত একমাত্র চৈতন্য। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর, জীব এবং জগতের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে এবং ঈশ্বর সমগ্র অস্তিত্বের আশ্রয় ও নিয়ন্তা। দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে ঈশ্বর এবং জীবের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এবং ঈশ্বর সর্বোচ্চ। ফলে ন ত্বৎসমোস্তি বাক্যটি ঈশ্বরের পরম শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকাশ করে। দর্শনভেদে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। এই শ্লোকে কৃষ্ণকে সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তা হিসেবে নয়, পরম বাস্তবতার প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধি করা হয়েছে।
ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা, পূজ্য এবং গুরু এই তিনটি শব্দ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পিতা জীবনের উৎসের প্রতীক। পূজ্য শ্রদ্ধার কেন্দ্রের প্রতীক। গুরু জ্ঞানের পথপ্রদর্শকের প্রতীক। এই তিনটি সম্পর্ক যখন একই সত্তার মধ্যে মিলিত হয়, তখন ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হয়ে ওঠে। ঈশ্বর শুধু দূরের কোনো শক্তি নন। তিনি আমাদের অস্তিত্বের উৎস, আমাদের শ্রদ্ধার কেন্দ্র এবং আমাদের অজ্ঞতা দূর করার পথপ্রদর্শক।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির গভীরতা রয়েছে। অর্জুন প্রথমে কৃষ্ণকে নিজের বন্ধু হিসেবে দেখতেন। তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলেছেন, কখনো কখনো বন্ধুর স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতায় আচরণ করেছেন। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পর তাঁর সেই পরিচিত দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর পরিচিত কৃষ্ণের অন্তরে এমন এক অসীম সত্তা বিরাজমান, যা তাঁর পূর্বের ধারণার বহু ঊর্ধ্বে। মানুষের জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা ঘটে যখন কোনো গভীর সত্য তার পুরোনো ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। এই অর্থে অর্জুনের পরিবর্তন কেবল ধর্মীয় ঘটনা নয়, এটি চেতনার পরিবর্তনেরও একটি শক্তিশালী প্রতীক।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির সৌন্দর্য এর ভাবের ক্রমোন্নতিতে। প্রথমে কৃষ্ণ পিতা। তারপর তিনি পূজনীয়। এরপর তিনি গুরু। তারপর তিনি গরীয়ান বা আরও মহান। তারপর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠও কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত তিনি অপ্রতিমপ্রভাব, অর্থাৎ অতুলনীয় মহিমার অধিকারী। বক্তব্যটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে মহাজাগতিক উপলব্ধির দিকে উঠে গেছে। এই ক্রমের মধ্য দিয়ে অর্জুনের বিস্ময়, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণ ক্রমশ গভীর হয়েছে।
এই শ্লোকের একটি প্রতীকী পাঠও সম্ভব। পিতা এখানে অস্তিত্বের উৎসের প্রতীক। গুরু জ্ঞানের আলোর প্রতীক। পূজ্য মানুষের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাবোধের প্রতীক। আর অপ্রতিমপ্রভাব পরম সত্যের অতুলনীয়তার প্রতীক। এই দৃষ্টিতে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা হলো নিজের অস্তিত্বের উৎসকে খোঁজা, সত্যের সামনে বিনয়ী হওয়া এবং এমন জ্ঞান লাভ করা যা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। মানুষ প্রায়ই নিজের সাফল্যকে নিজের একান্ত কৃতিত্ব বলে মনে করে। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, আমাদের জীবনের পেছনে রয়েছে পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, প্রকৃতি, পূর্বসূরি এবং অসংখ্য অদৃশ্য সহায়তা। একটি বৃক্ষ যেমন নিজের ফলকে একা সৃষ্টি করে না, তেমনি মানুষও নিজের অস্তিত্ব ও জ্ঞানের সম্পূর্ণ নির্মাতা নয়। এই উপলব্ধি অহংকার কমায় এবং কৃতজ্ঞতা বাড়ায়। আর সত্যিকারের গুরুর ভূমিকা এখানেই। তিনি কেবল তথ্য দেন না, তিনি আমাদের দেখার চোখ পরিবর্তন করেন।
অর্জুনের এই উপলব্ধির মধ্যে তাই একটি সাধারণ মানবিক শিক্ষা রয়েছে। আমরা অনেক সময় যাকে খুব পরিচিত বলে মনে করি, তার গভীরতাকে বুঝতে পারি না। পরিচিতি অনেক সময় উপলব্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কৃষ্ণ অর্জুনের কাছে প্রথমে ছিলেন বন্ধু। বিশ্বরূপ দর্শনের পরে তিনি হয়ে উঠলেন মহাবিশ্বের পরম সত্যের প্রতীক। এই পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাস্তবতার গভীরতা অনেক সময় আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সীমার বাইরে থাকে।
সবশেষে বলা যায়, পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য এই শ্লোকটি কেবল কৃষ্ণের প্রশংসা নয়। এটি অর্জুনের আত্মিক জাগরণের একটি গভীর ঘোষণা। পিতা শব্দে রয়েছে সৃষ্টির উৎসের ধারণা। পূজ্য শব্দে রয়েছে শ্রদ্ধার অনুভূতি। গুরু শব্দে রয়েছে জ্ঞানের পথপ্রদর্শনের ধারণা। গরীয়ান শব্দে রয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। ন ত্বৎসমোস্তি বাক্যে রয়েছে তুলনাহীনতার উপলব্ধি। অভ্যধিক শব্দে রয়েছে পরম শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা। আর অপ্রতিমপ্রভাব শব্দে রয়েছে এমন এক মহিমার স্বীকৃতি, যার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
এই কারণে শ্লোকটির গভীরতম বার্তা হলো, পরম সত্যকে যখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন তার নিজের অহংকার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। সে বুঝতে শেখে যে তার অস্তিত্ব বৃহত্তর কোনো সত্যের সঙ্গে যুক্ত। সে নিজের উৎসকে সম্মান করতে শেখে, জ্ঞানের সামনে মাথা নত করতে শেখে এবং জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধান করতে শেখে। অর্জুনের কণ্ঠে উচ্চারিত এই শ্লোক তাই একই সঙ্গে ভক্তির ভাষা, দর্শনের ভাষা এবং মানবচেতনার জাগরণের ভাষা। এখানে কৃষ্ণ কেবল একজন ব্যক্তি নন। তিনি পিতা, তিনি পূজনীয়, তিনি গুরু এবং তিনি সেই পরম মহিমা যার কোনো তুলনা নেই।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!