ভগবদ্গীতা ১১.৫০ — বিশ্বরূপ থেকে কৃষ্ণের সৌম্যরূপে প্রত্যাবর্তন
সঞ্জয় উবাচ
ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা
স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ।
আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং
ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।।৫০।।
অনুবাদঃ সঞ্জয় ধৃরাষ্ট্রকে বললেন- মহাত্মা বাসুদেব অর্জুনকে এভাবেই বলে তাঁর চতুর্ভুজ রূপ দেখালেন এবং পুনরায় দ্বিভুজ সৌম্যমূর্তি ধারণ করে ভীত অর্জুনকে আশ্বস্ত করলেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের পঞ্চাশতম শ্লোকটি বিশ্বরূপ দর্শনের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতি। এর আগের শ্লোকগুলোতে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের এমন এক বিশ্বব্যাপী রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেখানে সমগ্র সৃষ্টির অসীমতা, মহিমা, শক্তি এবং ধ্বংসের ভয়ংকর বাস্তবতা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই দৃশ্য অর্জুনকে যেমন বিস্মিত করেছিল, তেমনি গভীরভাবে ভীতও করেছিল। তাই বিশ্বরূপ দর্শনের পর কৃষ্ণ আবার তাঁর পরিচিত ও কোমল রূপে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রূপ পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এর মধ্যে ঈশ্বরের মহিমা, করুণা, মানবমনের সীমাবদ্ধতা এবং ভক্তির গভীর সম্পর্ক একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকটির শুরুতে বলা হয়েছে ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা। এখানে ইতি শব্দের অর্থ এইভাবে বা এই কথা বলে। অর্জুনম্ অর্থ অর্জুনকে এবং বাসুদেব শব্দটি শ্রীকৃষ্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাসুদেবের পুত্র হিসেবে কৃষ্ণকে বাসুদেব বলা হয়। আবার আধ্যাত্মিক অর্থে বাসুদেব নামটি সেই সর্বব্যাপী পরম সত্তাকেও নির্দেশ করে যিনি সমগ্র অস্তিত্বের অন্তরে বিরাজমান। কৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর বিশ্বরূপের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথা বলার পর এবার তাঁর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে ফিরে তাকাচ্ছেন। বিশ্বরূপে তিনি ছিলেন সমগ্র সৃষ্টির মহাজাগতিক প্রকাশ। কিন্তু অর্জুনের কাছে তিনি আবার সেই পরিচিত কৃষ্ণ হয়ে উঠছেন যাঁর সঙ্গে তিনি কথা বলেন, যাঁর কাছে নিজের দ্বিধা প্রকাশ করেন এবং যাঁকে বন্ধু ও পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেন।
তথোক্ত্বা শব্দটি গঠিত হয়েছে তথা এবং উক্ত্বা থেকে। তথা অর্থ সেইভাবে এবং উক্ত্বা অর্থ বলে বা বলার পর। এই শব্দটি শ্লোকের মধ্যে একটি পরিবর্তনের সূচনা করে। কৃষ্ণ তাঁর বক্তব্য শেষ করে অর্জুনের মানসিক অবস্থার দিকে ফিরে আসছেন। এরপর রয়েছে স্বকং রূপং। স্বক অর্থ নিজের বা নিজস্ব এবং রূপ অর্থ আকৃতি, অবয়ব, প্রকাশিত সত্তা বা স্বরূপ। তাই স্বকং রূপং অর্থ নিজের রূপ। কিন্তু এখানে নিজের রূপ বলতে শুধু একটি বাহ্যিক শরীরকে বোঝানো হচ্ছে না। এটি কৃষ্ণের সেই পরিচিত ও সৌম্য প্রকাশকে বোঝায় যা অর্জুনের কাছে সহজবোধ্য এবং আশ্বাসদায়ক।
এরপর এসেছে দর্শয়ামাস শব্দটি। এর মূল ধাতু দৃশ্ যার অর্থ দেখা। দর্শন, দর্শয়তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত শব্দের উৎস এই ধাতু। দর্শয়ামাসের অর্থ তিনি দেখালেন বা দর্শন করালেন। এই শব্দের মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক ভাব রয়েছে। ঈশ্বরকে দেখা কেবল মানুষের চোখের ক্ষমতার বিষয় নয়। ঈশ্বরের প্রকাশও প্রয়োজন। বিশ্বরূপ দর্শনের সময় কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দিয়েছিলেন। আবার এখানে তিনি নিজেই তাঁর সৌম্য রূপ প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ ঈশ্বরের দর্শন মানুষের সাধনা ও উপলব্ধির পাশাপাশি ঈশ্বরের কৃপা ও আত্মপ্রকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ভূয়ঃ শব্দের অর্থ আবার বা পুনরায়। এই ছোট শব্দটির মধ্যেই শ্লোকটির নাটকীয় পরিবর্তন নিহিত রয়েছে। অর্জুন প্রথমে কৃষ্ণকে একজন পরিচিত মানবীয় সত্তা হিসেবে জানতেন। পরে তিনি সেই কৃষ্ণের মধ্যেই সমগ্র বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করলেন। এখন সেই অসীম বিশ্বরূপের পর কৃষ্ণ আবার পরিচিত রূপে ফিরে আসছেন। এর মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক সত্য রয়েছে। অসীম এবং সীমিত রূপ পরস্পরের বিরোধী নয়। একই পরম সত্তা কখনও মহাজাগতিক মহিমায় প্রকাশিত হতে পারেন এবং কখনও ভক্তের কাছে কোমল ও পরিচিত রূপে আবির্ভূত হতে পারেন।
শ্লোকটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো আশ্বাসয়ামাস। এর অর্থ আশ্বস্ত করলেন, সান্ত্বনা দিলেন বা ভরসা দিলেন। আশ্বাস শব্দটি বাংলা ভাষাতেও প্রচলিত। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে আশ্বাসের অর্থ আরও গভীর। কৃষ্ণ কেবল অর্জুনকে বলছেন না যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তিনি এমন একটি রূপে ফিরে আসছেন যা অর্জুনের মনকে আবার স্থির করতে পারে। অর্থাৎ তিনি অর্জুনের মানসিক অবস্থাকে বুঝছেন এবং সেই অনুযায়ী নিজের প্রকাশকে পরিবর্তন করছেন। এখানেই ঈশ্বরের করুণাময় দিকটি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর বলা হয়েছে ভীতমেনম্। ভীত শব্দটির মূল ধাতু ভী যার অর্থ ভয় পাওয়া। ভীত অর্থ ভয়গ্রস্ত বা আতঙ্কিত। এনম্ অর্থ তাঁকে। অর্থাৎ ভীত অর্জুনকে কৃষ্ণ আশ্বস্ত করলেন। বিশ্বরূপ দর্শনের সময় অর্জুনের ভয় কোনো দুর্বলতার প্রতীক মাত্র নয়। বরং এটি মানুষের সীমিত চেতনার সামনে অসীম বাস্তবতার উপস্থিতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ পরিচিত জগৎ ও সীমিত অভিজ্ঞতার মধ্যে বাস করে। যখন তার সামনে এমন একটি বাস্তবতা প্রকাশিত হয় যা তার সমস্ত পরিচিত ধারণাকে অতিক্রম করে যায়, তখন বিস্ময় ও ভয় একই সঙ্গে জন্ম নিতে পারে।
এরপর এসেছে ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা। ভূত্বা অর্থ হয়ে বা ধারণ করে এবং পুনঃ অর্থ আবার। সৌম্যবপুঃ শব্দটি বিশেষভাবে কাব্যিক। সৌম্য শব্দের মধ্যে কোমলতা, শান্তি, স্নিগ্ধতা ও মনোরমতার ভাব রয়েছে। বপুঃ অর্থ দেহ, অবয়ব বা রূপ। তাই সৌম্যবপুঃ অর্থ কোমল, শান্ত ও মনোরম রূপ। যে কৃষ্ণ কিছুক্ষণ আগেই অসীম বিশ্বরূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন, সেই তিনিই আবার সৌম্যরূপে ফিরে এলেন। এটি গীতার এক গভীর সৌন্দর্য। ঈশ্বর কেবল ভয়ংকর শক্তির আধার নন। তিনি একই সঙ্গে শান্তি, সৌন্দর্য, স্নেহ এবং আশ্রয়ের উৎস।
শ্লোকটির শেষে ব্যবহৃত হয়েছে মহাত্মা শব্দটি। মহৎ এবং আত্মা এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে মহাত্মা। মহৎ অর্থ মহান এবং আত্মা অর্থ অন্তঃসত্তা বা স্বসত্তা। তাই মহাত্মা অর্থ মহান আত্মাসম্পন্ন সত্তা। কৃষ্ণের ক্ষেত্রে এই শব্দটি তাঁর অসীম মহত্ত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে। এখানে একটি অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। যিনি সমগ্র মহাবিশ্বকে ধারণ করেন, যিনি বিশ্বরূপে অসীম শক্তির প্রকাশ ঘটান, তিনিই আবার একজন ভীত মানুষের সামনে কোমল ও আশ্বাসদায়ক রূপ ধারণ করেন। মহত্ত্বের প্রকৃত প্রকাশ এখানেই। সত্যিকারের মহত্ত্ব কেবল শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে নয়। প্রয়োজনের সময় সেই শক্তিকে সংযত করে অন্যকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্যেও মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি ঈশ্বরের দুই ধরনের প্রকাশের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক দেখায়। একদিকে রয়েছে বিশ্বরূপের ঐশ্বর্য, যেখানে ঈশ্বর সমগ্র সৃষ্টির অসীম শক্তি ও মহিমা হিসেবে প্রকাশিত। অন্যদিকে রয়েছে সৌম্যরূপ, যেখানে ঈশ্বর ভক্তের কাছে পরিচিত, কোমল ও সম্পর্কযোগ্য হয়ে ওঠেন। ভক্তি দর্শনের ভাষায় বলা যায়, ঈশ্বরের মধ্যে যেমন ঐশ্বর্য রয়েছে, তেমনি মাধুর্যও রয়েছে। বিশ্বরূপে অর্জুন ঈশ্বরের ঐশ্বর্য উপলব্ধি করেছিলেন। সৌম্যরূপে তিনি ঈশ্বরের মাধুর্য আবার অনুভব করলেন।
অদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই ঘটনাকে আরও গভীরভাবে দেখা যায়। রূপের পার্থক্য থাকলেও অন্তর্নিহিত সত্তা এক। বিশ্বরূপ এবং সৌম্যরূপ দুটি ভিন্ন প্রকাশ হলেও তাদের ভিত্তি একই পরম সত্তা। ফলে বাহ্যিক রূপের পরিবর্তন প্রকৃত সত্তার পরিবর্তন নয়। ঈশ্বর কখনও মহাবিশ্বের অসীম প্রকাশ হিসেবে ধরা দেন এবং কখনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে উপলব্ধ হন। রূপের বৈচিত্র্যের মধ্যেও সত্তার ঐক্য অটুট থাকে।
বিশিষ্টাদ্বৈত ভাবনায় এই শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়। ঈশ্বর অসীম এবং সর্বশক্তিমান হলেও তিনি ভক্তের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার প্রতি উদাসীন নন। অর্জুন যখন বিশ্বরূপ দেখে ভীত হয়ে পড়লেন, কৃষ্ণ তাঁর ভয়কে উপেক্ষা করেননি। বরং নিজের রূপ পরিবর্তন করে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। এতে বোঝা যায় ঈশ্বরের মহিমার পাশাপাশি তাঁর করুণাও তাঁর স্বরূপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ গভীর। মানুষের মন অসীমতা এবং অজানার সামনে সহজেই অস্থির হয়ে যেতে পারে। জীবনের বড় কোনো সত্য হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালে প্রথমে বিস্ময় জন্মায়। পরে সেই বিস্ময় ভয়ে পরিণত হতে পারে। তখন মানুষের প্রয়োজন হয় পরিচিত কোনো আশ্রয়ের। অর্জুনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কৃষ্ণের সৌম্যরূপ সেই পরিচিত আশ্রয়ের প্রতীক। তিনি অর্জুনকে এমন একটি অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন যেখানে অর্জুন আবার চিন্তা করতে, বুঝতে এবং নিজের কর্তব্যের দিকে তাকাতে পারেন।
এই কারণে সৌম্যরূপকে শুধু সুন্দর রূপ হিসেবে দেখলে শ্লোকটির গভীরতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। এটি মানসিক স্থিতির প্রতীক। বিশ্বরূপ মানুষকে দেখায় বাস্তবতার বিশালতা। সৌম্যরূপ মানুষকে সেই বিশাল বাস্তবতার মধ্যে নিজের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। একটি আমাদের বিস্মিত করে। অন্যটি আমাদের স্থির করে। একটি আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যটি আমাদের ভরসা দেয় যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারি।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে কৃষ্ণ বলেন। তারপর তিনি নিজের রূপ দেখান। এরপর ভীত অর্জুনকে আশ্বস্ত করেন। এখানে দর্শন ও অনুভূতি পাশাপাশি এগিয়েছে। কৃষ্ণ শুধু জ্ঞান দেননি। তিনি অর্জুনের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন প্রকৃত শিক্ষক বা পথপ্রদর্শকের বৈশিষ্ট্য এখানেই। শুধু সত্য বলা যথেষ্ট নয়। শ্রোতা সেই সত্য গ্রহণ করার মতো মানসিক অবস্থায় আছে কি না, সেটিও বুঝতে হয়।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষার্থী যখন ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা ও দায়িত্বের কথা একসঙ্গে ভাবে, তখন সেই বিশাল সম্ভাবনা তাকে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি ভীতও করতে পারে। একজন ভালো শিক্ষক তখন তাকে আরও ভয় দেখান না। বরং বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দেন এবং বলেন যে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। একইভাবে একজন ভালো নেতা মানুষের সামনে বড় ভবিষ্যতের স্বপ্ন তুলে ধরেন, কিন্তু সেই স্বপ্নের ভারে মানুষ যখন বিচলিত হয় তখন তাকে নিরাপত্তা ও আস্থা দেন। কৃষ্ণের আচরণের মধ্যে এই নেতৃত্বের গভীর শিক্ষা রয়েছে।
এই শ্লোক তাই আমাদের শেখায় যে সত্যের দুটি দিক রয়েছে। সত্য আমাদের পরিচিত সীমা ভেঙে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে আমাদের নতুন আশ্রয়ও দিতে পারে। জীবনের গভীর সত্য কখনও ভয়ংকর হতে পারে। মৃত্যু, পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সত্য উপলব্ধি করলে মানুষ অস্থির হতে পারে। কিন্তু সেই সত্যকে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজন একটি স্থির অন্তর। কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই স্থিরতা ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এই যে ঈশ্বর শুধু অসীম শক্তি নন, তিনি আশ্রয়ও। বিশ্বরূপে কৃষ্ণ দেখিয়েছেন তাঁর অসীমতা। সৌম্যরূপে তিনি দেখিয়েছেন তাঁর করুণা। বিশ্বরূপে অর্জুন দেখেছেন মহাবিশ্বের রহস্য। সৌম্যরূপে তিনি আবার ফিরে পেয়েছেন তাঁর প্রিয় কৃষ্ণকে। ফলে ১১.৫০ শ্লোকটি শুধু একটি রূপান্তরের বর্ণনা নয়। এটি ভয় থেকে শান্তির দিকে, বিস্ময় থেকে উপলব্ধির দিকে এবং মহিমা থেকে মাধুর্যের দিকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা।
অর্জুনের ভয় আমাদের নিজেদের জীবনেরও প্রতিচ্ছবি। আমরা যখন অজানা ভবিষ্যৎ, বিশাল দায়িত্ব বা জীবনের কঠিন সত্যের সামনে দাঁড়াই, তখন অনেক সময় মনে হয় আমরা আর সামলাতে পারছি না। তখন প্রয়োজন হয় এমন একটি আশ্বাসের যা আমাদের বাস্তবতা থেকে পালাতে শেখায় না, বরং বাস্তবতার সামনে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। কৃষ্ণের সৌম্যরূপ সেই আশ্বাসেরই প্রতীক। তিনি বাস্তবতাকে ছোট করেননি। বরং অর্জুনকে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মতো স্থির করে তুলেছেন।
অতএব ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্য হলো অসীমতার মধ্যেও করুণা আছে, মহিমার মধ্যেও মাধুর্য আছে এবং ভয়ের মধ্যেও আশ্বাসের সম্ভাবনা আছে। কৃষ্ণ বিশ্বরূপ থেকে সৌম্যরূপে ফিরে এসে যেন মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করেছেন। মানুষ সবসময় অসীম সত্যকে এক মুহূর্তে ধারণ করতে পারে না। কখনও তাকে ধীরে ধীরে সেই সত্যের কাছে যেতে হয়। কখনও তাকে মহিমার দর্শন পেতে হয়। আবার কখনও সেই মহিমার ভার সামলানোর জন্য প্রয়োজন হয় কোমল আশ্রয়ের। এই দুইয়ের সমন্বয়েই পূর্ণ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে। শ্রীকৃষ্ণ তাই এখানে শুধু বিশ্বস্রষ্টা বা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর হিসেবে নন, একজন করুণাময় পথপ্রদর্শক হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছেন। তিনি অর্জুনকে অসীমতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন এবং তারপর সেই অসীমতার মধ্যেই তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। এই কারণেই গীতার ১১.৫০ শ্লোক মানুষের অন্তরে ভয়ের পরিবর্তে বিশ্বাস, অস্থিরতার পরিবর্তে স্থিরতা এবং অজানার পরিবর্তে আশ্রয়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!