ভগবদ্গীতা ১১.৫৫ — কর্ম, ভক্তি ও অনাসক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরলাভ
মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পান্ডব।।৫৫।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! যিনি আমার অকৈতব সেবা করেন, আমার প্রতি নিষ্ঠাপরায়ণ, আমার ভক্ত, জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত এবং সমস্ত প্রাণীর প্রতি শত্রুভাব রহিত, তিনিই আমাকে লাভ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের পঞ্চান্নতম শ্লোকটি বিশ্বরূপদর্শনের পর্বের এক গভীর সমাপ্তি। অর্জুন যখন কৃষ্ণের অসীম ও ভয়ংকর বিশ্বরূপ দর্শন করে বিস্ময়, ভয় এবং ভক্তিতে অভিভূত হয়ে পড়েছেন, তখন কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত তাঁকে জানিয়ে দেন ঈশ্বরকে লাভ করার প্রকৃত পথ কী। সেই পথ কেবল কোনো বিশেষ আচার অনুষ্ঠান বা বাহ্যিক উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের কর্ম, লক্ষ্য, হৃদয়, আসক্তি এবং অন্য জীবের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুর মধ্য দিয়েই সেই পথ নির্মিত হয়। তাই এই শ্লোকটি গীতার কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, অনাসক্তি এবং সর্বজনীন নৈতিকতার এক অসাধারণ সমন্বয়।
শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো, যে ব্যক্তি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কর্ম করে, ঈশ্বরকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি স্থাপন করে, সংসারিক আসক্তি থেকে মুক্ত থাকে এবং সকল জীবের প্রতি বৈরভাব পরিত্যাগ করে, সেই ব্যক্তি ঈশ্বরকে লাভ করে। এখানে কৃষ্ণ ভক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ তুলে ধরেছেন। এই ভক্তি কেবল আবেগ নয়। এটি জীবনের প্রতিটি স্তরকে ঈশ্বরমুখী করে তোলার একটি সাধনা।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো মৎকর্মকৃত্। শব্দটি মৎ, কর্ম এবং কৃত্ এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। মৎ অর্থ আমার। কর্ম অর্থ কাজ বা কর্তব্য। কৃত্ অর্থ যিনি করেন। সংস্কৃত কৃত্ শব্দটি কৃ ধাতু থেকে এসেছে। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কোনো কাজকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ফলে মৎকর্মকৃত্ এর সরল অর্থ হলো যে আমার জন্য কর্ম করে। কিন্তু এখানে আমার জন্য কর্ম করার অর্থ কেবল কৃষ্ণের নামে কোনো ধর্মীয় কাজ করা নয়। গীতার বৃহত্তর দর্শনের আলোকে এর অর্থ হলো নিজের কর্তব্যকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে সম্পাদন করা। একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষা দানের কাজকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে পারেন। একজন চিকিৎসক মানুষের সেবাকে ঈশ্বরসেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। একজন কৃষক তাঁর শ্রমকে পবিত্র কর্তব্য হিসেবে দেখতে পারেন। একজন প্রশাসক জনগণের কল্যাণকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার প্রদর্শন না করে একটি বৃহত্তর দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। কাজের বাহ্যিক রূপ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অন্তরের উদ্দেশ্য যদি উচ্চতর হয়, তবে সেই কর্ম মৎকর্মের ভাব ধারণ করতে পারে।
এরপর এসেছে মৎপরমঃ। মৎ অর্থ আমার এবং পরম অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ বা চূড়ান্ত। মৎপরমঃ অর্থ যার কাছে আমি পরম বা যে আমাকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। এখানে কৃষ্ণ শুধু কী করতে হবে তা বলেননি, কেন করতে হবে সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন। মানুষের জীবনে কর্মের পাশাপাশি একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। কেউ অর্থকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য করতে পারে, কেউ ক্ষমতাকে, কেউ খ্যাতিকে, কেউ সামাজিক মর্যাদাকে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এগুলো পরিবর্তনশীল। কৃষ্ণ অর্জুনকে এমন একটি লক্ষ্য গ্রহণ করতে বলছেন যা পরিবর্তনশীল জগতের কোনো সাময়িক অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঈশ্বরকে পরম লক্ষ্য করা মানে জীবনের সমস্ত কর্মকে একটি উচ্চতর সত্যের দিকে পরিচালিত করা।
মৎকর্মকৃত্ এবং মৎপরমঃ এই দুটি শব্দ পাশাপাশি বসানোর মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমটি কর্মের দিক নির্দেশ করে এবং দ্বিতীয়টি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্দেশ করে। মানুষ ভালো কাজ করতেই পারে, কিন্তু সেই ভালো কাজের পেছনে যদি শুধু খ্যাতি, অর্থ বা প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে তার অন্তর্গত উদ্দেশ্য এখনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কৃষ্ণের শিক্ষা হলো কর্মকে শুধু ভালো করলেই হবে না, কর্মের উদ্দেশ্যকেও উচ্চতর করতে হবে। কর্ম হবে ঈশ্বরমুখী এবং লক্ষ্য হবে ঈশ্বরকেন্দ্রিক।
এরপর এসেছে মদ্ভক্তঃ। মদ্ভক্তঃ শব্দটি মদ্ এবং ভক্ত এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। মদ্ অর্থ আমার এবং ভক্ত অর্থ ভক্ত। ভক্ত শব্দটির উৎস সংস্কৃত ভজ্ ধাতু। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশ নেওয়া, সেবা করা, আশ্রয় নেওয়া এবং উপাসনা করার অর্থ নিহিত রয়েছে। এই কারণে ভক্তি শব্দটির অর্থ শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়। ভক্তি হলো ঈশ্বরের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা। ভক্ত ঈশ্বরকে কেবল দূরের কোনো শক্তি হিসেবে দেখেন না। তিনি ঈশ্বরকে আশ্রয়, আদর্শ এবং পরম প্রিয় হিসেবে গ্রহণ করেন।
এই কারণে মদ্ভক্তঃ বলতে কেবল যে ব্যক্তি ঈশ্বরের পূজা করে তাকে বোঝালে শব্দটির গভীরতা সম্পূর্ণ প্রকাশ পায় না। প্রকৃত ভক্তি মানুষের চিন্তা, কর্ম এবং চরিত্রকে পরিবর্তন করে। ভক্তি যদি মানুষের মধ্যে অহংকার বাড়ায়, অন্যের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে অথবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করার প্রবণতা সৃষ্টি করে, তবে তা এই শ্লোকের ভক্তির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কৃষ্ণের কাছে ভক্তি হলো এমন একটি অন্তরাবস্থা যা মানুষকে ঈশ্বরমুখী করার পাশাপাশি তার আচরণকেও নির্মল করে।
এরপর এসেছে সঙ্গবর্জিতঃ। সঙ্গ অর্থ সংযোগ, সংশ্লেষ, আসক্তি বা কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকা। বর্জিত অর্থ পরিত্যক্ত বা মুক্ত। সঙ্গবর্জিতঃ অর্থ আসক্তি থেকে মুক্ত। এই শব্দটি গীতার অনাসক্তি দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে অনাসক্তি মানে সম্পর্কহীনতা নয়। মানুষ পরিবারকে ভালোবাসবে, বন্ধুদের ভালোবাসবে, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে, নিজের কাজ করবে এবং জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করবে। কিন্তু কোনো কিছু যেন তার চেতনার ওপর এমন আধিপত্য বিস্তার না করে যে সেটি হারানোর ভয়ে তার বিবেক, স্বাধীনতা এবং নৈতিকতা ধ্বংস হয়ে যায়।
ভালোবাসা এবং আসক্তির মধ্যে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, কিন্তু আসক্তি মানুষকে ভয় ও নির্ভরতার মধ্যে বন্দী করে। একজন মানুষ কোনো কাজ ভালোবেসে করতে পারেন, কিন্তু কাজের ফলকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানালে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। তিনি সফল হলে অহংকারে ভাসেন এবং ব্যর্থ হলে নিজের অস্তিত্বকেই মূল্যহীন মনে করতে পারেন। গীতার অনাসক্তি এই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির শিক্ষা দেয়। কাজ করো, কিন্তু কাজের ফলের কাছে নিজের আত্মাকে বন্ধক রেখো না।
এরপর শ্লোকে এসেছে নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু। এটি সমগ্র শ্লোকের নৈতিক হৃদয়। নির্বৈর শব্দটি নির্ এবং বৈর এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। বৈর অর্থ শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিরোধ বা প্রতিহিংসা। নির্ উপসর্গের অর্থ বিহীন বা মুক্ত। তাই নির্বৈর অর্থ বৈরভাবহীন। আর সর্বভূতেষু অর্থ সকল জীবের প্রতি। ভূত শব্দটি এখানে কোনো অশরীরী সত্তাকে বোঝায় না। সংস্কৃত ভূত শব্দটি ভূ ধাতু থেকে এসেছে এবং যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। তাই সর্বভূতেষু বলতে সকল জীব বা সকল অস্তিত্বশীল সত্তাকে বোঝানো হয়েছে।
কৃষ্ণের শিক্ষা এখানে অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি বলেননি যে কেবল নিজের প্রিয়জনের প্রতি ভালো হও। তিনি বলেছেন সকল জীবের প্রতি নির্বৈর হও। এর মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক মানবতাবোধ রয়েছে। ঈশ্বরকে ভালোবাসার সত্যতা কেবল পূজা বা প্রার্থনার মধ্যে প্রকাশ পায় না। তা প্রকাশ পায় আমরা অন্য জীবকে কীভাবে দেখি এবং কীভাবে আচরণ করি তার মধ্যেও। একজন মানুষ ঈশ্বরের ভক্ত বলে দাবি করলেও যদি তার হৃদয় অহংকার, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসায় পূর্ণ থাকে, তবে তার ভক্তির প্রকৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
নির্বৈরতা মানে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা নয়। অন্যায়ের প্রতিরোধ করা এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ পোষণ করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু তাঁর অন্তরে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা না থাকতেও পারে। একজন বিচারক অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু সেই শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত ঘৃণা নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা। একজন রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু তার অন্তরের উদ্দেশ্য যদি কেবল প্রতিশোধ না হয়ে ন্যায় ও কল্যাণ হয়, তাহলে সেটি নির্বৈরতার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তাই নির্বৈরতা দুর্বলতা নয়। এটি প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়কে ধারণ করার শক্তি।
এরপর আসে যঃ স মামেতি। যঃ অর্থ যে এবং সঃ অর্থ সে। মাম্ অর্থ আমাকে। এতি শব্দটি ই ধাতু থেকে এসেছে। ই ধাতুর অর্থ যাওয়া বা গমন করা। আক্ষরিকভাবে মামেতি অর্থ আমার কাছে আসে বা আমাকে লাভ করে। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে এর তাৎপর্য অনেক গভীর। এখানে ঈশ্বরকে লাভ করা কোনো ভৌগোলিক গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। এটি চেতনার একটি উচ্চতর অবস্থায় উপনীত হওয়া। মানুষের কর্ম, লক্ষ্য, হৃদয় এবং সম্পর্ক যখন ঈশ্বরমুখী হয়ে ওঠে, তখন তার জীবন ধীরে ধীরে ঈশ্বরলাভের দিকে অগ্রসর হয়।
এই শ্লোককে যদি মানুষের অন্তর্জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মৎকর্মকৃত্ হলো কর্মের পরিবর্তন, মৎপরমঃ হলো জীবনের লক্ষ্যের পরিবর্তন, মদ্ভক্তঃ হলো হৃদয়ের পরিবর্তন, সঙ্গবর্জিতঃ হলো আসক্তির পরিবর্তন এবং নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু হলো অন্য জীবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এই সমস্ত পরিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি হলো মামেতি। অর্থাৎ ঈশ্বরলাভ আসলে মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের একটি রূপান্তর।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোক কর্মযোগ ও ভক্তিযোগকে একসূত্রে যুক্ত করেছে। কর্মযোগ শেখায় কর্ম করো কিন্তু কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না। ভক্তিযোগ শেখায় ঈশ্বরকে হৃদয়ের পরম আশ্রয় করো। এই শ্লোকে দুটি পথ এক হয়ে গেছে। কর্ম হবে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে এবং হৃদয় থাকবে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত। ফলে কর্ম আর নিছক জাগতিক সাফল্যের উপায় থাকে না। কর্ম হয়ে ওঠে সাধনা।
জ্ঞানযোগের সঙ্গেও এই শ্লোকের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ আসক্তি ত্যাগ করতে হলে মানুষকে নিজের আসক্তির প্রকৃতি বুঝতে হয়। বৈরভাব ত্যাগ করতে হলে নিজের অহংকারকে চিনতে হয়। ঈশ্বরকে পরম লক্ষ্য করতে হলে জগতের ক্ষণস্থায়ী লক্ষ্যগুলোর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে হয়। তাই এই শ্লোকের ভক্তি অন্ধ আবেগ নয়। এটি জ্ঞান দ্বারা পরিশুদ্ধ এবং কর্ম দ্বারা প্রকাশিত একটি ভক্তি।
অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে সর্বভূতের প্রতি নির্বৈরতা বিশেষ অর্থ বহন করে। যদি সমস্ত জীবের অন্তরে একই পরম আত্মতত্ত্ব বিরাজমান থাকে, তবে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত নিজের গভীরতর ঐক্যকেই অস্বীকার করা। এই দৃষ্টিতে নির্বৈরতা শুধু নৈতিক আদর্শ নয়, এটি আত্মতত্ত্বের উপলব্ধির একটি প্রকাশ। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বরের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে মদ্ভক্তঃ পদটির গভীরতা ব্যাখ্যা করা যায়। জীব ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বর তার পরম আশ্রয়। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য স্বীকৃত হলেও ভক্তি ও ঈশ্বরাশ্রয়ই ঈশ্বরলাভের প্রধান পথ। ফলে বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও এই শ্লোকের ভক্তি, ঈশ্বরকেন্দ্রিকতা এবং নৈতিকতার গুরুত্ব অটুট থাকে।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান মানুষ নিজের পরিচয়কে অনেক সময় পেশা, অর্থ, সামাজিক মর্যাদা, সাফল্য এবং অন্যের স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। ফলে কোনো একটি বিষয় হারিয়ে গেলে তার আত্মপরিচয়ও সংকটে পড়ে। সঙ্গবর্জিতঃ আমাদের শেখায় যে জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু কোনো সাময়িক বিষয়ের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে ফেলতে নেই। সামাজিক যোগাযোগ, অর্থ, কর্মজীবন এবং সাফল্য সবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই মানুষের অন্তর্গত মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়।
একজন শিক্ষক যদি শুধু নিজের প্রশংসার জন্য পড়ান, তবে তাঁর কাজের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত স্বীকৃতি। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন যে জ্ঞান প্রদান একটি বৃহত্তর দায়িত্ব এবং মানুষের জীবনে আলো সৃষ্টি করার একটি সুযোগ, তাহলে তাঁর কর্মের অন্তর্গত অর্থ বদলে যায়। একজন চিকিৎসক যদি শুধু অর্থের জন্য চিকিৎসা করেন, তাহলে পেশাটি তার কাছে একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যদি তিনি রোগীর সেবাকে একটি মানবিক কর্তব্য হিসেবে দেখেন, তাহলে তাঁর কর্মের মধ্যে মৎকর্মের ভাব প্রকাশ পেতে পারে। একইভাবে একজন প্রশাসক যদি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেন, তবে ক্ষমতা তাকে অহংকারী করতে পারে। কিন্তু যদি তিনি ক্ষমতাকে মানুষের সেবার একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য উচ্চতর হয়ে ওঠে।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই শিক্ষা দিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে। তাই এই শ্লোক কোনো নির্জন আশ্রমের জন্য সীমাবদ্ধ শিক্ষা নয়। এটি জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতির মধ্যেও প্রযোজ্য। মানুষকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু সেই কর্তব্য যেন ব্যক্তিগত অহংকার ও প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত না হয়। লক্ষ্যকে উচ্চতর করতে হবে, কর্মকে নিবেদন করতে হবে, আসক্তি থেকে মুক্ত হতে হবে এবং সকল জীবের প্রতি অকারণ বৈরভাব ত্যাগ করতে হবে।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। কৃষ্ণ প্রথমে মানুষের কর্মের কথা বলেছেন। তারপর সেই কর্মের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এরপর হৃদয়ের ভক্তির কথা বলেছেন। তারপর মনের আসক্তি ত্যাগের কথা বলেছেন। সবশেষে অন্য জীবের প্রতি বৈরভাবহীনতার কথা বলেছেন। তারপর একটি মাত্র বাক্যে সমগ্র সাধনার ফল ঘোষণা করেছেন। যে এমন হয়, সে আমাকে লাভ করে। যেন মানুষের হাত থেকে শুরু করে তার লক্ষ্য, হৃদয়, মন এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত তার সমগ্র অস্তিত্ব ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরলাভ কোনো বিচ্ছিন্ন আচার নয়। এটি মানুষের জীবনকে ভিতর থেকে পরিবর্তন করার একটি প্রক্রিয়া। কর্মকে পবিত্র করতে হবে। জীবনের লক্ষ্যকে উচ্চ করতে হবে। হৃদয়কে ভক্তিতে পূর্ণ করতে হবে। আসক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হবে। সকল জীবের প্রতি অকারণ বৈরভাব ত্যাগ করতে হবে। তখন ঈশ্বরলাভ কেবল একটি ধর্মীয় ধারণা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানুষের চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশের প্রতীক।
শেষ পর্যন্ত ১১.৫৫ শ্লোকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা মানুষের জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা নয়। বরং জীবনের মধ্যেই থেকে জীবনকে পবিত্র করার শিক্ষা। কর্ম থাকবে, কিন্তু কর্মের মধ্যে অহংকার থাকবে না। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু আঁকড়ে ধরা থাকবে না। কর্তব্য থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থাকবে না। ভক্তি থাকবে, কিন্তু সংকীর্ণতা থাকবে না। সকল জীবের প্রতি সম্মান থাকবে এবং জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
এই কারণেই মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ এবং নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু এই কয়েকটি শব্দ আসলে একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। এখানে কর্ম আছে, কিন্তু কর্মের মধ্যে আত্মনিবেদন আছে। এখানে ভক্তি আছে, কিন্তু ভক্তির মধ্যে মানবিকতা আছে। এখানে অনাসক্তি আছে, কিন্তু অনাসক্তির মধ্যে নিষ্ঠুরতা নেই। এখানে বৈরহীনতা আছে, কিন্তু অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নেই। আর এই সবকিছুর সমন্বিত পরিণতি হলো মামেতি, অর্থাৎ ঈশ্বরের নিকট উপনীত হওয়া। গীতার এই শিক্ষা তাই কেবল অর্জুনের জন্য নয়। মানুষের প্রতিদিনের কর্ম, সম্পর্ক, সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং অন্তর্জীবনের জন্যও এটি এক গভীর পথনির্দেশ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!