ভগবদ্গীতা ১২.১২ — অভ্যাস, জ্ঞান, ধ্যান ও কর্মফল ত্যাগের শ্রেষ্ঠতা
শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজজ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছন্তিরনন্তরম্।।১২।।
অনুবাদঃ তুমি যদি এই প্রকার অভ্যাস করতে সক্ষম না হও, তা হলে জ্ঞানের অনুশীলন কর। জ্ঞান থেকে ধ্যান শ্রেষ্ঠ এবং ধ্যান থেকে কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ, কেন না এই প্রকার কর্মফল ত্যাগের শান্তি লাভ হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোক মানবজীবনের আধ্যাত্মিক সাধনা, জ্ঞান, ধ্যান, কর্ম এবং অন্তরের শান্তির মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, অভ্যাসের চেয়ে জ্ঞান শ্রেয়, জ্ঞানের চেয়ে ধ্যান শ্রেয় এবং ধ্যানের চেয়েও কর্মফলের ত্যাগ শ্রেয়। আর সেই ত্যাগের পরেই শান্তির আবির্ভাব ঘটে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের অন্তর্জগতের বিবর্তনের একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। মানুষ কীভাবে বাহ্যিক অনুশীলন থেকে অন্তরের উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়, কীভাবে জ্ঞান ধ্যানের মাধ্যমে জীবন্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় এবং কীভাবে কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে মানুষ প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে, এই শ্লোক সেই সত্যকেই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে।
এখানে শ্রেয়ঃ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেয়ঃ বলতে বোঝায় অধিকতর কল্যাণকর, উৎকৃষ্ট, মঙ্গলময় বা পরম হিতকর। সাধারণভাবে যা ভালো লাগে তা সবসময় শ্রেয় নয়। মানুষের জীবনে এমন অনেক বিষয় আছে যা মুহূর্তে আনন্দ দেয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। আবার এমন অনেক সত্য আছে যা প্রথমে কঠিন মনে হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করে। গীতার দর্শনে এই শ্রেয়সের ধারণা অত্যন্ত গভীর। প্রেয়স মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে আকর্ষণ করে, আর শ্রেয়স মানুষকে চূড়ান্ত কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। তাই এখানে শ্রেয়ঃ শব্দটি কেবল ভালো অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এটি এমন এক কল্যাণের দিকে নির্দেশ করছে যা মানুষের চেতনা ও জীবনকে গভীরভাবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম।
জ্ঞানম্ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে। জ্ঞা ধাতুর অর্থ জানা, উপলব্ধি করা, চিনতে পারা এবং সত্যকে অনুধাবন করা। কিন্তু গীতার জ্ঞান কেবল বই পড়ে অর্জিত তথ্য নয়। কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা এবং সেই সত্যকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ জানতে পারেন যে আত্মা অবিনশ্বর, কিন্তু সেই জ্ঞান যদি তাঁর ভয়, আসক্তি, অহংকার এবং জীবনযাপনে কোনো পরিবর্তন না আনে, তাহলে সেটি এখনো গভীর আত্মজ্ঞান হয়ে ওঠেনি। গীতার জ্ঞান এমন একটি উপলব্ধি যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং তাকে নিজের প্রকৃত সত্তা, কর্ম, জগৎ এবং ঈশ্বর সম্পর্কে গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
অভ্যাস শব্দটি পুনঃপুন চর্চা বা নিয়মিত অনুশীলনের ধারণা বহন করে। আধ্যাত্মিক সাধনায় অভ্যাস বলতে নিয়মিত জপ, ধ্যান, ঈশ্বরস্মরণ, মনসংযম বা নির্দিষ্ট সাধনার অনুশীলন বোঝানো যেতে পারে। মানুষের মন অত্যন্ত চঞ্চল এবং পরিবর্তনশীল। তাই একদিনের সাধনা দিয়ে মনকে স্থির করা সম্ভব নয়। পুনঃপুন অনুশীলনের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট পথে অভ্যস্ত হয়। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে দেখাচ্ছেন যে শুধু অভ্যাসই চূড়ান্ত নয়। অভ্যাস মানুষের মনকে প্রস্তুত করতে পারে, কিন্তু সেই অভ্যাসের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সত্য উপলব্ধি না হলে তা যান্ত্রিক আচরণে পরিণত হতে পারে। তাই অভ্যাসের চেয়ে জ্ঞানকে শ্রেয় বলা হয়েছে।
এরপর আসে ধ্যান। ধ্যান শব্দের মধ্যে গভীর মনোনিবেশের ধারণা রয়েছে। সাধারণ চিন্তা হলো মনের স্বাভাবিক প্রবাহ, যেখানে এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় মন ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। ধ্যান হলো সেই চেতনাকে সচেতনভাবে একটি সত্য, একটি ভাব, একটি উপলব্ধি বা ঈশ্বরের মধ্যে স্থিত করা। জ্ঞান মানুষকে সত্য সম্পর্কে ধারণা দেয়, আর ধ্যান সেই সত্যকে অন্তরের অভিজ্ঞতায় গভীর করে। তাই জ্ঞান কেবল বুদ্ধির বিষয় হয়ে থাকলে তার পূর্ণতা আসে না। ধ্যানের মাধ্যমে সেই জ্ঞান চেতনার গভীরে প্রবেশ করে।
শ্রীকৃষ্ণ বলেন জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে। অর্থাৎ জ্ঞানের তুলনায় ধ্যান উৎকৃষ্ট। এর অর্থ জ্ঞান অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং জ্ঞানের পূর্ণতা ধ্যানে। একজন মানুষ কোনো সত্য সম্পর্কে জানতে পারেন, কিন্তু যতক্ষণ না তিনি সেই সত্যকে নিজের অন্তরে স্থাপন করছেন, ততক্ষণ সেই জ্ঞান তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। ধ্যান সেই পরিবর্তনের সেতু। জ্ঞান যেখানে বলে সত্য কী, ধ্যান সেখানে সেই সত্যের সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক স্থাপন করে।
কিন্তু এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর অংশ হলো কর্মফলত্যাগ। কর্মফলত্যাগ শব্দটি তিনটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। কর্ম অর্থ কাজ, ফল অর্থ সেই কাজের প্রত্যাশিত পরিণাম এবং ত্যাগ অর্থ আসক্তি ও অধিকারবোধ থেকে মুক্ত হওয়া। তাই কর্মফলত্যাগের প্রকৃত অর্থ কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়। এটি কর্মের ফলের প্রতি মানসিক আসক্তি ত্যাগ করা। মানুষ কাজ করবে, কর্তব্য পালন করবে, চেষ্টা করবে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিষ্ঠা প্রদর্শন করবে। কিন্তু সেই কাজের ফলাফলকে নিজের সুখ, অহংকার এবং আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানাবে না।
এই বিষয়টি গীতার কর্মযোগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষ সাধারণত কাজ করার পর ফলের সঙ্গে নিজের মানসিক অবস্থাকে যুক্ত করে। সে মনে করে সফল হলে সে সুখী হবে এবং ব্যর্থ হলে সে দুঃখী হবে। প্রশংসা পেলে সে নিজেকে মূল্যবান মনে করে এবং নিন্দা পেলে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে। লাভ হলে সে আনন্দিত হয় এবং ক্ষতি হলে ভেঙে পড়ে। এইভাবে মানুষের মন কর্মের চেয়ে কর্মফলের প্রতি বেশি আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কৃষ্ণ সেই বন্ধন থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছেন।
কর্মফলত্যাগের অর্থ তাই দায়িত্বহীনতা নয়। বরং এটি আরও গভীর দায়িত্ববোধ। ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত ব্যক্তি প্রায়ই নিজের কাজের মধ্যেও অস্থির থাকে, কারণ তার মন সবসময় ভবিষ্যৎ ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি কর্মফলত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করে, সে বর্তমান কর্মের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। সে জানে তার কর্তব্য হলো যথাসাধ্য সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা, কিন্তু প্রতিটি বাহ্যিক ফলাফল তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে তার কর্ম আরও স্বচ্ছ, স্থির এবং নির্ভার হয়ে ওঠে।
এরপর শ্লোকে এসেছে ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্। অর্থাৎ ত্যাগের পরেই শান্তি। এখানে শান্তি শব্দটি শুধু বাইরের সংঘাতহীন অবস্থাকে বোঝায় না। এটি অন্তরের প্রশান্তি, দ্বন্দ্বের প্রশমন এবং আকাঙ্ক্ষার অস্থিরতা থেকে মুক্তিকে নির্দেশ করে। মানুষের বাহ্যিক জীবন সম্পূর্ণ সমস্যামুক্ত না হলেও তার অন্তরে শান্তি থাকতে পারে। আবার বাহ্যিকভাবে সবকিছু ভালো থাকা সত্ত্বেও তার ভিতরে গভীর অশান্তি থাকতে পারে। তাই গীতার শান্তি কোনো পরিস্থিতির দান নয়। এটি আসক্তি ও অহংকারের ভার কমে গেলে অন্তর থেকে উদ্ভাসিত হয়।
অনন্তরম্ শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ তার পরেই বা অব্যবহিত পরে। অর্থাৎ ত্যাগের সঙ্গে শান্তির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যখন মানুষ ফলের প্রতি নিজের মানসিক অধিকারবোধ ত্যাগ করতে পারে, তখনই তার ভিতরে এক ধরনের স্বাধীনতা জন্মায়। সে আর ফলাফলের দাস থাকে না। সে সাফল্যের জন্য কাজ করে কিন্তু সাফল্যের অহংকারে আবদ্ধ হয় না। সে ব্যর্থতার সম্মুখীন হয় কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিচার হিসেবে গ্রহণ করে না। এই স্বাধীনতাই শান্তির ভিত্তি।
এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসেবেও দেখা যায়। অভ্যাস হলো অনুশীলনের স্তর, জ্ঞান হলো বোঝার স্তর, ধ্যান হলো উপলব্ধিকে অন্তরে স্থাপন করার স্তর, কর্মফলত্যাগ হলো আসক্তির বন্ধন থেকে মুক্তির স্তর এবং শান্তি হলো সেই মুক্তির স্বাভাবিক ফল। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি কোনো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উপদেশ নয়। বরং এটি মানুষের চেতনাকে ধীরে ধীরে পরিণত করার একটি গভীর পথনির্দেশ।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, জ্ঞান মানুষের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই জ্ঞান লাভের জন্য মনকে শুদ্ধ ও স্থির করা প্রয়োজন। কর্মফলের প্রতি আসক্তি মনকে অস্থির রাখে এবং অহংকারকে শক্তিশালী করে। তাই কর্মফলত্যাগ মনকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে আত্মতত্ত্বের উপলব্ধি আরও সহজ হয়। অন্যদিকে ভক্তির দৃষ্টিতে কর্মফলত্যাগ হলো নিজের কর্মের ফল ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করা। তখন কর্মের কেন্দ্রে আর ব্যক্তিগত লাভ থাকে না। কর্ম পরিণত হয় ঈশ্বরার্পণে।
মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও এই শ্লোক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো এমন বিষয়ের সঙ্গে নিজের মানসিক শান্তিকে যুক্ত করা যা সম্পূর্ণভাবে তার নিয়ন্ত্রণে নেই। একজন ছাত্র পড়াশোনা করতে পারে কিন্তু পরীক্ষার প্রতিটি ফল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একজন ব্যবসায়ী পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করতে পারেন কিন্তু বাজারের প্রতিটি পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। একজন শিল্পী নিষ্ঠার সঙ্গে সৃষ্টি করতে পারেন কিন্তু দর্শক তাঁর সৃষ্টিকে কীভাবে গ্রহণ করবে তা পুরোপুরি তাঁর হাতে থাকে না। কর্মফলত্যাগ মানুষকে শেখায় নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ফলাফলের সঙ্গে নিজের আত্মমূল্যকে বেঁধে না রাখতে।
এই শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়। একজন শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে পড়ান এবং ছাত্রদের উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, তাহলে সেটিই তাঁর কর্তব্য। ছাত্ররা প্রত্যাশিত ফল করবে কি না তা সম্পূর্ণভাবে তাঁর হাতে নেই। একজন অভিভাবক সন্তানের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সন্তানের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। একজন কর্মী নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করতে পারেন, কিন্তু পদোন্নতি কখন হবে তা সবসময় তাঁর হাতে থাকে না। কর্মফলত্যাগ এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং মানুষকে নিষ্ক্রিয় না করে আরও স্থিরভাবে কাজ করতে শেখায়।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সাহিত্যিক সৌন্দর্যও রয়েছে। কয়েকটি শব্দের মধ্যে একটি পূর্ণ আধ্যাত্মিক গতিপথ তৈরি হয়েছে। অভ্যাস থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে ধ্যান, ধ্যান থেকে কর্মফলত্যাগ এবং কর্মফলত্যাগ থেকে শান্তি। শুরুতে রয়েছে মানুষের প্রচেষ্টা এবং শেষে রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি। অর্থাৎ সাধনার উদ্দেশ্য কেবল কোনো বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা নয়, বরং এমন এক চেতনা অর্জন করা যেখানে মানুষ নিজের কর্মের মধ্যেই স্বাধীনতা অনুভব করতে পারে।
এই কারণে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষকে কর্ম থেকে দূরে সরে যেতে বলা নয়, বরং কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে বলা। জ্ঞান মানুষকে সত্যের দিকে নিয়ে যায়, ধ্যান সেই সত্যকে হৃদয়ে স্থাপন করে এবং কর্মফলত্যাগ সেই উপলব্ধিকে বাস্তব জীবনের কর্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষ যখন নিজের কর্তব্য পালন করে কিন্তু ফলের প্রতি অহংকেন্দ্রিক আসক্তি ত্যাগ করে, তখন তার কর্ম ধীরে ধীরে বন্ধনের কারণ না হয়ে মুক্তির পথ হয়ে ওঠে।
অতএব শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে এবং ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্ শ্লোকটি মানুষের আত্মিক ও মানসিক মুক্তির একটি অসাধারণ দর্শন। এর ভাষাগত সৌন্দর্যের মধ্যে যেমন গভীর সংস্কৃত শব্দতত্ত্ব রয়েছে, তেমনি এর দার্শনিক গভীরতার মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, ধ্যান, কর্ম, ত্যাগ এবং শান্তির পারস্পরিক সম্পর্ক। এর প্রতীকী অর্থে অভ্যাস থেকে উপলব্ধি এবং উপলব্ধি থেকে আসক্তিমুক্তির যাত্রা প্রকাশিত হয়েছে। আর মানবজীবনের জন্য এর চূড়ান্ত শিক্ষা হলো নিজের কর্তব্যকে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করা, সত্যকে জানা, সেই সত্যে মনকে স্থির করা এবং কর্মের ফলের প্রতি অহংকারপূর্ণ অধিকারবোধ ত্যাগ করা। কারণ মানুষ যতক্ষণ ফলকে আঁকড়ে ধরে থাকে ততক্ষণ তার মন ফলাফলের সঙ্গে ওঠানামা করে। কিন্তু যখন সে কর্ম করে এবং ফলকে মুক্ত করে দিতে শেখে, তখন তার অন্তরে এমন এক শান্তি জন্ম নেয় যা বাহ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতার উপর নির্ভরশীল নয়। এই শান্তিই গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত অন্তর্মুক্তির সূচনা এবং কর্মের মধ্য দিয়েই উপলব্ধ হওয়া এক গভীর আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা।
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!