ভগবদ্গীতা ১২.১৪ — আদর্শ ভক্তের গুণ ও ঈশ্বরের প্রিয়তা
সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।
ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।১৪।।
অনুবাদঃ যিনি সমস্ত জীবের প্রতি দ্বেষশূন্য, বন্ধু-ভাবাপন্ন, কৃপালু, মমত্ববুদ্ধিশূন্য, নিরহঙ্কার, সুখে ও দুঃখে সম ভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল, সর্বদা সন্তুষ্ট, সর্বদা ভক্তিযোগে যুক্ত, সংযত স্বভাব, দৃঢ় সংকল্পযুক্ত এবং যাঁর মন ও বুুদ্ধি সর্বদা আমাতে অর্পিত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃত ভক্তের অন্তর্গত স্বরূপকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ। এর সরল অর্থ হলো যিনি সর্বদা সন্তুষ্ট, সর্বদা যোগযুক্ত, যিনি নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করেছেন, যাঁর সংকল্প দৃঢ়, যিনি তাঁর মন ও বুদ্ধি আমার মধ্যে অর্পণ করেছেন এবং যিনি আমার ভক্ত, তিনিই আমার প্রিয়। এই একটি শ্লোকের মধ্যে গীতা একজন আদর্শ ভক্তের বাহ্যিক পরিচয় নয়, তাঁর অন্তরের প্রকৃতি, মানসিক স্থিতি, চিন্তার পবিত্রতা, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সন্তুষ্টঃ। সন্তুষ্ট শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু তুষ্ এবং এর সঙ্গে সম্ উপসর্গের সম্পর্ক রয়েছে। তুষ্ ধাতুর অর্থ তৃপ্ত হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া এবং প্রসন্ন হওয়া। সম্ উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর মধ্যে পূর্ণতার ভাব প্রকাশ পেয়েছে। ফলে সন্তুষ্টি বলতে এখানে কেবল কোনো বস্তু পাওয়া বা ইচ্ছা পূরণ হওয়ার পরের আনন্দ বোঝানো হয়নি। গীতার সন্তুষ্টি হলো এমন এক অন্তর্গত তৃপ্তি যেখানে মানুষের শান্তি বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে না। সাধারণ মানুষ মনে করে আমি যখন যা চাই তা পাব তখন আমি সুখী হব। কিন্তু গীতার ভক্ত ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন যে প্রকৃত শান্তি চাহিদার অসীম বিস্তারে নয়, বরং চেতনার গভীরতায় নিহিত। তাই সন্তুষ্টি এখানে অলসতা নয়, কর্মবিমুখতা নয় এবং উন্নতির আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করাও নয়। বরং নিজের কর্তব্য সম্পূর্ণভাবে পালন করে ফলের পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও অন্তরের শান্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখাই প্রকৃত সন্তুষ্টি।
এরপর এসেছে সততম শব্দ। এর অর্থ সর্বদা, নিরন্তর এবং অবিরত। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে ভক্তির সম্পর্ক কোনো বিশেষ সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেবল পূজার সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করা এবং জীবনের অন্যান্য সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চলা গীতার আদর্শ ভক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সতত যোগের অর্থ হলো জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নিজের চেতনার গভীরে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করা। কাজ করার সময় কাজের মধ্যেই ঈশ্বরস্মরণ, মানুষের সঙ্গে আচরণের সময় মানবিকতার মধ্যে ঈশ্বরকে অনুভব করা, বিপদের সময় বিশ্বাস ধরে রাখা এবং আনন্দের সময় অহংকারে না ভেসে যাওয়া হলো সতত যোগের প্রকাশ। অর্থাৎ ঈশ্বরসচেতনতা জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ নয়, বরং জীবনযাপনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
যোগী শব্দটি এসেছে সংস্কৃত যুজ্ ধাতু থেকে। যুজ্ ধাতুর অর্থ যুক্ত করা, সংযুক্ত হওয়া এবং একত্রিত করা। এই দৃষ্টিতে যোগী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নিজের বিচ্ছিন্ন মন, বুদ্ধি, কর্ম ও চেতনাকে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যোগকে যদি কেবল শারীরিক ব্যায়াম হিসেবে দেখা হয় তবে এই শ্লোকের গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এখানে যোগ মানে অন্তরের ঐক্য। মানুষের মন একদিকে চায়, বুদ্ধি অন্যদিকে বিচার করে এবং ইন্দ্রিয় তাকে আবার অন্যদিকে টেনে নিয়ে যায়। এই অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে যখন মানুষ সত্যের দিকে নিজের সমগ্র সত্তাকে পরিচালিত করেন তখন তিনি যোগী হয়ে ওঠেন।
যতাত্মা শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যত অর্থ সংযত এবং আত্মা অর্থ নিজের অন্তঃসত্তা বা অন্তঃকরণ। যতাত্মা হলেন যিনি নিজের মন, ইন্দ্রিয় এবং অন্তর্গত প্রবৃত্তিকে সংযত করতে শিখেছেন। এখানে সংযম মানে নিজের ইচ্ছাকে জোর করে হত্যা করা নয়। বরং ইচ্ছাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। একটি প্রশিক্ষিত ঘোড়া যেমন শক্তিশালী হয়েও নিয়ন্ত্রিত পথে চলে, তেমনি সংযত মন তার শক্তিকে হারায় না, বরং সেই শক্তি সঠিক কাজে ব্যবহার করতে শেখে। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধের দাস, নিজের লোভের দাস, নিজের আকাঙ্ক্ষার দাস কিংবা নিজের ইন্দ্রিয়ের দাস, সে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও অন্তরে স্বাধীন নয়। গীতার যতাত্মা সেই অন্তর্গত স্বাধীনতার প্রতীক যেখানে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে পরিচালনা করতে শেখেন।
দৃঢ়নিশ্চয় শব্দটি এই আধ্যাত্মিক চরিত্রের আরেকটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। দৃঢ় অর্থ অটল, শক্ত এবং সহজে বিচলিত হয় না। নিশ্চয় অর্থ সিদ্ধান্ত, প্রত্যয় বা নিশ্চিত সংকল্প। তাই দৃঢ়নিশ্চয় হলেন সেই ব্যক্তি যাঁর সত্যের প্রতি বিশ্বাস পরিস্থিতির পরিবর্তনে সহজে নষ্ট হয় না। আধ্যাত্মিক জীবনে নানা পরীক্ষা আসে। কখনো সাফল্য আসে, কখনো ব্যর্থতা। কখনো প্রশংসা পাওয়া যায়, কখনো নিন্দা। কখনো পথ সহজ মনে হয়, কখনো সবকিছু কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু যার সংকল্প গভীর, সে সাময়িক পরিস্থিতির দ্বারা নিজের পথ পরিবর্তন করে না। দৃঢ়নিশ্চয় তাই আধ্যাত্মিক জীবনের মেরুদণ্ডের মতো। বিশ্বাস যখন গভীর উপলব্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মানুষ অস্থায়ী আবেগের দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর অংশগুলোর একটি হলো ময্যর্পিতমনোবুদ্ধি। এর অর্থ যার মন এবং বুদ্ধি আমার মধ্যে অর্পিত। ময্য শব্দের অর্থ আমার মধ্যে বা আমার প্রতি। অর্পিত শব্দটি অর্প্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ প্রদান করা, নিবেদন করা বা সমর্পণ করা। মন ও বুদ্ধি মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবনের দুটি প্রধান শক্তি। মন অনুভব করে, আকাঙ্ক্ষা করে এবং নানা দিকে ছুটে যায়। বুদ্ধি বিচার করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং কোন পথ গ্রহণ করা উচিত তা নির্ধারণ করে। কৃষ্ণ যখন বলেন মন ও বুদ্ধি আমার মধ্যে অর্পণ করতে হবে তখন তিনি মানুষের সমগ্র অন্তর্জগতকে ঈশ্বরের দিকে পরিচালিত করার কথা বলছেন। শুধু আবেগ দিয়ে ভক্তি পূর্ণ হয় না এবং শুধু বুদ্ধি দিয়েও ভক্তির পরিপূর্ণতা আসে না। হৃদয়ের ভালোবাসা এবং বুদ্ধির সত্যবোধ যখন একই কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয় তখনই ভক্তি পূর্ণতা লাভ করে।
মদ্ভক্ত শব্দটির মধ্যেও ভক্তির প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে। ভক্ত শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ভজ্ ধাতুর মধ্যে সেবা করা, উপাসনা করা, গ্রহণ করা এবং অংশগ্রহণ করার ভাব রয়েছে। তাই ভক্তি কেবল আবেগপূর্ণ ভালোবাসা নয়। ভক্তি হলো ঈশ্বরের সঙ্গে জীবনের একটি গভীর সম্পর্ক। একজন প্রকৃত ভক্ত ঈশ্বরকে শুধু মন্দিরে খোঁজেন না। তিনি নিজের কর্মে, চিন্তায়, আচরণে এবং মানুষের প্রতি ব্যবহারে ঈশ্বরসচেতনতা প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে ভক্তি জীবনের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হয়ে ওঠে।
সবশেষে কৃষ্ণ বলেন স মে প্রিয়ঃ। অর্থাৎ তিনি আমার প্রিয়। এই কথাটিই পুরো শ্লোকের চূড়ান্ত তাৎপর্য প্রকাশ করে। ঈশ্বরের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সম্পদের প্রয়োজন নেই। মানুষের অন্তরের গুণই এখানে মুখ্য। যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট, সংযত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত এবং যার মন ও বুদ্ধি ঈশ্বরের কাছে নিবেদিত, তিনি ঈশ্বরের প্রিয়। এখানে প্রিয় হওয়ার ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল আবেগের সম্পর্ক নয়। বরং যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে সত্য, সংযম, প্রেম এবং ঈশ্বরসচেতনতার পথে পরিচালিত করেন, তাঁর অস্তিত্বই ঈশ্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক ভক্তি, জ্ঞান এবং কর্মের একটি সুন্দর সমন্বয় প্রকাশ করে। ভক্তির দৃষ্টিতে মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে। জ্ঞানের দৃষ্টিতে সে উপলব্ধি করে যে তার সীমাবদ্ধ অহংই জীবনের চূড়ান্ত সত্য নয়। কর্মের দৃষ্টিতে সে নিজের কর্তব্য পালন করে কিন্তু ফলের ওপর নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে নির্ভরশীল করে না। যোগের দৃষ্টিতে সে মনকে একাগ্র করে এবং নিজের চেতনার বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করে। ফলে এই শ্লোককে শুধু ভক্তির একটি সংজ্ঞা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এটি মানুষের অন্তর্গত রূপান্তরের একটি দর্শন।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অশান্তির একটি বড় কারণ হলো তার মন ও বুদ্ধির মধ্যে দ্বন্দ্ব। মন অনেক কিছু চায়, কিন্তু বুদ্ধি জানে সবকিছু পাওয়া সম্ভব নয়। মন অতীতের স্মৃতিতে আটকে থাকে এবং ভবিষ্যতের কল্পনায় ছুটে যায়। বুদ্ধি বর্তমানের বাস্তবতা বিচার করার চেষ্টা করে। এই বিচ্ছিন্নতার কারণে মানুষ নিজের মধ্যেই অস্থির হয়ে ওঠে। যখন মন এবং বুদ্ধি একটি উচ্চতর আদর্শের কাছে নিবেদিত হয় তখন এই বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাই ময্যর্পিতমনোবুদ্ধি শুধু ধর্মীয় সমর্পণের কথা বলে না, এটি অন্তর্গত ঐক্যেরও কথা বলে।
সন্তুষ্টির প্রতীক হলো অন্তরের শান্তি। যোগের প্রতীক হলো ঐক্য। যতাত্মার প্রতীক হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ। দৃঢ়নিশ্চয়ের প্রতীক হলো আধ্যাত্মিক স্থিরতা। আর মন ও বুদ্ধির সমর্পণ হলো অহংকেন্দ্রিকতা থেকে ঈশ্বরকেন্দ্রিকতার যাত্রা। এই দৃষ্টিতে পুরো শ্লোকটি মানুষের আত্মিক বিবর্তনের একটি প্রতীকী চিত্র। মানুষ প্রথমে বাইরের জগৎ থেকে সুখ খোঁজে। পরে উপলব্ধি করে যে বাইরের জগৎ পরিবর্তনশীল। তখন সে নিজের অন্তরের দিকে ফিরে আসে। নিজের মনকে সংযত করে, বুদ্ধিকে পরিশুদ্ধ করে, একটি উচ্চতর সত্যের ওপর দৃঢ় হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সমগ্র সত্তাকে সেই সত্যের কাছে সমর্পণ করে। এই যাত্রাই ভক্তির গভীরতম রূপ।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ মানুষ প্রযুক্তি, তথ্য এবং ভোগের দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেলেও মানসিক অস্থিরতা কমেনি। মানুষ অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করে, সামাজিক স্বীকৃতির ওপর নিজের মূল্য নির্ধারণ করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। এই পরিস্থিতিতে গীতার সন্তুষ্টির শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত শান্তি অসীম অর্জনের মধ্যে নয়। মানুষ যত বেশি অর্জন করবে তত বেশি চাইবে যদি তার অন্তরে সন্তুষ্টির ভিত্তি না থাকে। কিন্তু সন্তুষ্ট মানুষ চেষ্টা করা বন্ধ করেন না। তিনি চেষ্টা করেন, কর্তব্য পালন করেন এবং উন্নতি করেন, কিন্তু নিজের শান্তিকে কেবল ফলাফলের সঙ্গে বেঁধে রাখেন না।
একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পেলেন এবং তিনি আনন্দিত হলেন, কিন্তু অহংকারী হলেন না। আবার ব্যর্থ হলেন এবং কষ্ট পেলেন, কিন্তু নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মানুষ বলে মনে করলেন না। তিনি নিজের কর্তব্য পালন করে ফলকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করলেন। এই অবস্থার মধ্যেই ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির ব্যবহারিক প্রকাশ দেখা যায়। আবার কেউ অপমানিত হওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেকে সংযত করলেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলেন। এটি যতাত্মার প্রকাশ। কেউ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের নৈতিক আদর্শ ত্যাগ করলেন না। এটি দৃঢ়নিশ্চয়ের প্রকাশ। আর কেউ সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থায় ঈশ্বরের প্রতি নিজের বিশ্বাস ধরে রাখলেন। এটি সতত যোগের প্রকাশ।
এই পুরো শ্লোককে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদী যেমন নিরন্তর প্রবাহিত হয় কিন্তু তার একটি নির্দিষ্ট দিক থাকে, তেমনি একজন যোগীর জীবনও ক্রিয়াশীল কিন্তু দিকহীন নয়। সন্তুষ্টি তার অন্তরের শান্তি, সংযম তার তীর, দৃঢ়নিশ্চয় তার প্রবাহের দিক এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণ তার গন্তব্য। নদী যদি নিজের পথ হারায় তবে তার প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মনও যদি উচ্চতর উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে তবে তার শক্তি আকাঙ্ক্ষা, ভয়, লোভ এবং অস্থিরতায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যখন মন ও বুদ্ধি একটি উচ্চতর সত্যের দিকে প্রবাহিত হয় তখন জীবনের শক্তি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো প্রকৃত ভক্তি মানুষের বাহ্যিক আচরণকে শুধু পরিবর্তন করে না, তার অস্তিত্বের কেন্দ্রকেই পরিবর্তন করে। সাধারণ মানুষ নিজের চারপাশের জগতকে কেন্দ্র করে জীবন পরিচালনা করেন। তিনি ভাবেন আমি কী পেলাম, মানুষ আমাকে কীভাবে দেখছে, আমার সাফল্য কতটা এবং আমার ভবিষ্যৎ কী হবে। কিন্তু ভক্তের চেতনা ধীরে ধীরে এই আমি কেন্দ্রিকতা থেকে ঈশ্বরকেন্দ্রিকতার দিকে অগ্রসর হয়। তখন প্রশ্নটি শুধু আমি কী পেলাম থাকে না। প্রশ্ন হয়ে ওঠে আমি কীভাবে সত্যের পথে থাকব, কীভাবে আমার কর্তব্য পালন করব এবং কীভাবে আমার জীবনকে ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করব।
সুতরাং সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ শ্লোকটি কেবল একজন ভক্তের প্রশংসা নয়। এটি মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। সন্তুষ্টি শেখায় অন্তরের শান্তি, যোগ শেখায় ঐক্য, আত্মসংযম শেখায় স্বাধীনতা, দৃঢ়নিশ্চয় শেখায় স্থিরতা, মন ও বুদ্ধির সমর্পণ শেখায় অহংকে অতিক্রম করতে এবং ভক্তি শেখায় প্রেমের মাধ্যমে পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে। এই সব গুণ যখন একজন মানুষের মধ্যে একত্রিত হয় তখন তাঁর জীবন কেবল বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় হয় না, বরং তাঁর চিন্তা, আচরণ, কর্ম এবং অস্তিত্বের গভীরে একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর ঘটে। সেই কারণেই কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত বলেন যে এমন ভক্তই তাঁর প্রিয়। এই প্রিয়তা কোনো বাহ্যিক পুরস্কার নয়। এটি সেই গভীর ঐক্যের প্রকাশ যেখানে মানুষের অন্তর সত্য, প্রেম, সংযম, শান্তি এবং ঈশ্বরসচেতনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!