সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১২.১৫ — যে ভক্ত কারও অশান্তির কারণ হন না

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃহর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।১৫।।
যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।১৫।।

অনুবাদঃ যাঁর থেকে কেউ উদ্বেগ প্রাপ্ত হয় না, যিনি কারও দ্বারা উদ্বেগ প্রাপ্ত হন না এবং যিনি হর্ষ, ক্রোধ, ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভক্তের অন্তর্গত চরিত্রের এক অসাধারণ পরিচয় তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ। এই শ্লোকের মধ্যে এমন একজন মানুষের চিত্র পাওয়া যায় যিনি নিজের আচরণ দ্বারা অন্যের মনে ভয়, অশান্তি বা উদ্বেগ সৃষ্টি করেন না এবং অন্য মানুষের আচরণেও নিজে সহজে বিচলিত হয়ে পড়েন না। তিনি হর্ষ, অমর্ষ, ভয় ও উদ্বেগের মতো মানসিক আলোড়নের বন্ধন থেকে মুক্ত। তাই তিনি ভগবানের প্রিয়। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়, মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র, সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক শান্তি এবং আত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে।

যস্মাৎ শব্দটি সংস্কৃত যদ্ সর্বনামের একটি রূপ। এর অর্থ যার কারণে, যাঁর কারণে অথবা যাহার থেকে। ন শব্দটি নিষেধ প্রকাশ করে এবং উদ্বিজতে শব্দটি সংস্কৃত উদ্ উপসর্গ ও বিজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে কেঁপে ওঠা, ভয় পাওয়া, বিচলিত হওয়া অথবা অস্থির হয়ে পড়ার ভাব রয়েছে। তাই ন উদ্বিজতে অর্থ বিচলিত হয় না, আতঙ্কিত হয় না অথবা মানসিকভাবে কেঁপে ওঠে না। লোক শব্দের অর্থ মানুষ, জনগণ, সমাজ অথবা জীবসমষ্টি। এই অর্থে যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো বলতে বোঝায় যার কারণে মানুষ বিচলিত হয় না। আবার লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ বলতে বোঝায় যে ব্যক্তি অন্য মানুষের কারণেও বিচলিত হয় না। শ্লোকের এই দুই অংশের মধ্যে একটি গভীর ভারসাম্য রয়েছে। প্রথম অংশে ব্যক্তির সামাজিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয় অংশে ব্যক্তির অন্তর্গত মানসিক স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে।

হর্ষ শব্দটি সংস্কৃত হৃষ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে আনন্দে উৎফুল্ল হওয়া, প্রবল আনন্দ অনুভব করা এবং উচ্ছ্বসিত হওয়ার ভাব রয়েছে। এখানে সাধারণ আনন্দ বোঝানো হয়নি। এমন আনন্দ বোঝানো হয়েছে যা বাহ্যিক সাফল্য, প্রশংসা, লাভ অথবা ইন্দ্রিয়সুখের কারণে মনকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে। অমর্ষ শব্দের মধ্যে অ নিষেধবোধক অংশ এবং মর্ষ ভাব রয়েছে। মর্ষের সঙ্গে সহ্য করা বা সহনশীলতার ধারণা যুক্ত। ফলে অমর্ষ হলো অসহনশীলতা, অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পারা, অপমান সহ্য করতে না পারা অথবা অন্তরে বিরক্তি ও ঈর্ষার জন্ম নেওয়া। ভয় শব্দের অর্থ আশঙ্কা, আতঙ্ক বা বিপদের অনুভূতি। উদ্বেগ হলো অন্তরের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা, ব্যাকুলতা অথবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অশান্ত মানসিক প্রত্যাশা। মুক্ত শব্দটি সংস্কৃত মুচ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর মূল অর্থ হলো বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসা বা আবদ্ধতা থেকে স্বাধীন হওয়া। আর প্রিয় শব্দটি প্রী ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ ভালোবাসার পাত্র, আনন্দদায়ক অথবা স্নেহের যোগ্য।

এই শব্দগুলোর সমষ্টিগত অর্থ অত্যন্ত গভীর। কৃষ্ণ এখানে এমন একজন মানুষকে বোঝাচ্ছেন যিনি নিজের দ্বারা অন্যের মনে অশান্তি সৃষ্টি করেন না এবং অন্যের আচরণ দ্বারা নিজের অন্তরের শান্তিও হারান না। সাধারণ মানুষের জীবনে এই দুটি অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য পাওয়া কঠিন। কেউ হয়তো নিজে শান্ত থাকতে চান কিন্তু তাঁর আচরণে অন্যরা অশান্ত হয়। আবার কেউ অন্যকে কষ্ট দেন না কিন্তু অন্যের সামান্য কথাতেই নিজে গভীরভাবে আহত হয়ে পড়েন। গীতার আদর্শ ভক্ত এই দুই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠেছেন। তাঁর উপস্থিতি অন্যের জন্য নিরাপত্তা ও প্রশান্তির কারণ এবং অন্যের আচরণ তাঁর অন্তরের শান্তির ওপর সহজে কর্তৃত্ব করতে পারে না।

এই শিক্ষা মানবজীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। আমরা অনেক সময় মনে করি আমাদের অশান্তির কারণ বাইরের মানুষ। কেউ আমাকে অপমান করেছে তাই আমি রাগ করেছি। কেউ আমাকে অবহেলা করেছে তাই আমি কষ্ট পেয়েছি। কেউ আমার প্রশংসা করেছে তাই আমি আনন্দিত হয়েছি। কেউ আমার সাফল্যকে স্বীকার করেনি তাই আমি অমর্ষান্বিত হয়েছি। কিন্তু গীতা মানুষের মনকে আরও গভীরভাবে দেখতে শেখায়। বাহ্যিক ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনার সঙ্গে আমাদের মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কটি আমাদের অন্তর্জগতের সঙ্গে যুক্ত। যে ব্যক্তি নিজের চেতনাকে পরিশুদ্ধ করতে শুরু করেন তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে অন্যের আচরণ সবসময় তাঁর অন্তরের শান্তির ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখে না।

লোকান্নোদ্বিজতে এই কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ সবকিছু সহ্য করে চুপ করে থাকবে অথবা অন্যায় দেখেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বরং এর অর্থ হলো অন্যের আচরণ যেন নিজের বিচারবুদ্ধি, কর্তব্যবোধ এবং অন্তরের স্থিতিকে অকারণে নষ্ট করতে না পারে। কেউ অন্যায় করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কেউ অপমান করলে যথাযথভাবে প্রতিবাদ করা যেতে পারে। কেউ ক্ষতি করলে নিজেকে রক্ষা করাও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই কাজ যেন প্রতিহিংসা, অন্ধ ক্রোধ বা অস্থিরতার দ্বারা পরিচালিত না হয়। এখানেই গীতার শিক্ষা দুর্বলতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। সত্যিকারের শান্তি হলো এমন শক্তি যেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে কিন্তু নিজের অন্তরকে বিদ্বেষের হাতে সমর্পণ করে না।

হর্ষ, অমর্ষ, ভয় ও উদ্বেগ এই চারটি শব্দ মানুষের মানসিক জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থাকে নির্দেশ করে। অতিরিক্ত হর্ষ মানুষকে বাস্তবতা ভুলিয়ে দিতে পারে। সাফল্যের আনন্দে মানুষ যদি নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায় তাহলে সেই আনন্দ অহংকারে পরিণত হতে পারে। অমর্ষ মানুষকে অন্যের বিরুদ্ধে বিষাক্ত করে তোলে। অন্যের সাফল্যকে নিজের পরাজয় মনে করলে হৃদয়ে ঈর্ষা জন্ম নেয়। ভয় মানুষের শক্তিকে সংকুচিত করে এবং তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে যা তার প্রকৃত বিবেচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদ্বেগ মানুষকে এমন ভবিষ্যতের মধ্যে বসবাস করায় যা এখনও ঘটেনি। ফলে বর্তমান মুহূর্তের শান্তি হারিয়ে যায়। কৃষ্ণ এই আবেগগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন মুক্ত হতে। অর্থাৎ আবেগ থাকবে কিন্তু মানুষ আবেগের দাস হবে না।

এই জায়গায় মুক্ত শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। মুক্ত মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়। একজন ভক্ত আনন্দ অনুভব করবেন, দুঃখ অনুভব করবেন, ভালোবাসবেন, করুণা করবেন এবং জীবনের নানা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। কিন্তু তিনি জানবেন যে কোনো একটি আবেগই তাঁর সম্পূর্ণ সত্তা নয়। আনন্দ এলো বলে তিনি নিজেকে হারাবেন না। দুঃখ এলো বলে নিজেকে ধ্বংস করবেন না। ভয় এলো বলে সত্য থেকে সরে যাবেন না। অপমান এলো বলে প্রতিহিংসায় জ্বলবেন না। এই ভারসাম্যই মানসিক স্বাধীনতার পরিচয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীনতার একটি গভীর ধারণা প্রকাশ করে। মানুষ সাধারণত মনে করে স্বাধীনতা হলো বাইরের পরিস্থিতিকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু পৃথিবীকে সম্পূর্ণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। অন্য মানুষ কী বলবে, কে প্রশংসা করবে, কে নিন্দা করবে, কখন সাফল্য আসবে, কখন ব্যর্থতা আসবে, কখন অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং কখন প্রতিকূলতা দেখা দেবে এসব সবসময় আমাদের হাতে থাকে না। কিন্তু নিজের প্রতিক্রিয়া, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের চেতনার ওপর ধীরে ধীরে কর্তৃত্ব অর্জন করা সম্ভব। গীতার দৃষ্টিতে এই অন্তর্গত স্বাধীনতাই অধিক মূল্যবান।

বেদান্তীয় দৃষ্টিতে এই শিক্ষা আরও গভীর। আত্মা নিজে পরিবর্তনশীল নয়, কিন্তু মন পরিবর্তনশীল। সুখ আসে এবং চলে যায়। দুঃখ আসে এবং চলে যায়। প্রশংসা আসে এবং চলে যায়। নিন্দাও আসে এবং চলে যায়। ভয় আসে এবং চলে যায়। উদ্বেগ আসে এবং চলে যায়। মানুষের সত্য সত্তাকে যদি সে এই পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলোর সঙ্গে এক করে ফেলে তবে সে প্রতিনিয়ত অস্থির থাকবে। কিন্তু যখন সে নিজের চেতনাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করে তখন সে বুঝতে শেখে যে মনের মধ্যে যে ঢেউ উঠছে তা তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সত্য নয়। এই উপলব্ধি থেকেই সমত্ব ও স্থিতি জন্ম নেয়।

ভক্তির দৃষ্টিতে শ্লোকটির অর্থ আরও সুন্দর। ভক্ত নিজের জীবনের কেন্দ্র হিসেবে অহংকারকে রাখেন না। তাঁর জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন ঈশ্বর। যখন মানুষ নিজের চারপাশে সবকিছু ঘুরছে এমন ধারণা ত্যাগ করে ঈশ্বরকেন্দ্রিক হয় তখন অন্যের প্রশংসা বা নিন্দার গুরুত্ব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তখন সে নিজের মূল্য নির্ধারণের জন্য বাইরের স্বীকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে না। তার অন্তরে একটি গভীর আশ্রয় তৈরি হয়। সেই আশ্রয় থেকেই সে মানুষের প্রতি মৈত্রী, করুণা ও সহনশীলতা প্রকাশ করতে পারে।

এই শ্লোককে একটি গভীর প্রতীকের মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন স্থির প্রদীপের কথা ভাবা যেতে পারে। চারপাশে বাতাস আছে। কখনও বাতাস শান্ত, কখনও প্রবল। তবু প্রদীপ যদি সুরক্ষিত স্থানে থাকে তবে বাতাসের প্রতিটি পরিবর্তনে তার আলো নিভে যায় না। মানুষের মনও তেমন। পৃথিবীতে প্রশংসা থাকবে, নিন্দা থাকবে, লাভ থাকবে, ক্ষতি থাকবে, বন্ধুত্ব থাকবে, বিরোধিতা থাকবে। কিন্তু যার অন্তরের আশ্রয় গভীর হয়েছে সে প্রতিটি বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে দুলিয়ে দেয় না। সে পরিস্থিতির মধ্যে থাকে কিন্তু পরিস্থিতির দাস হয় না।

সমুদ্রের উপমাও এখানে যথার্থ। অসংখ্য নদী সমুদ্রে এসে মিশে যায়। বৃষ্টি পড়ে। ঝড় ওঠে। ঢেউ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সমুদ্রের গভীরতা কেবল ওপরের ঢেউ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তেমনি মানুষের জীবনে নানা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা আসতে পারে। কোনো দিন আনন্দ বেশি হতে পারে, কোনো দিন দুঃখ। কোনো দিন মানুষ সম্মানিত হতে পারে, কোনো দিন অপমানিত। কোনো দিন ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল মনে হতে পারে, কোনো দিন অনিশ্চিত। কিন্তু যার চেতনা গভীর সে জানে যে এই পরিবর্তনশীল ঢেউ তার সমগ্র সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করে না।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর। কর্মক্ষেত্রে কেউ সমালোচনা করলে একজন মানুষ সঙ্গে সঙ্গে রাগ করতে পারেন। আবার কেউ প্রশংসা করলে অতিরিক্ত আত্মতুষ্ট হতে পারেন। গীতার শিক্ষা হলো প্রথমে নিজের অন্তরকে স্থির করা এবং তারপর বিষয়টি বিচার করা। সমালোচনার মধ্যে সত্য থাকলে তা গ্রহণ করতে হবে। অন্যায় থাকলে যথাযথভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নিজের অন্তরের ভারসাম্যকে অকারণ ক্রোধের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে অন্যের সাফল্য দেখে অমর্ষান্বিত হওয়ার পরিবর্তে বোঝা দরকার যে অন্যের সাফল্য আমার অস্তিত্বকে ছোট করে না। প্রত্যেক মানুষের জীবনের পথ আলাদা।

পারিবারিক জীবনেও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কাছের মানুষের কাছ থেকেই অনেক সময় বেশি প্রত্যাশা তৈরি হয়। প্রত্যাশা পূরণ না হলে অভিমান, রাগ, অমর্ষ এবং উদ্বেগ জন্ম নেয়। যদি একজন মানুষ বুঝতে পারেন যে ভালোবাসার অর্থ অন্যকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করা নয়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে স্বাধীনতা ও শান্তি বৃদ্ধি পায়। যে মানুষ অন্যকে ভয় দেখিয়ে ভালোবাসা আদায় করতে চান না এবং অন্যের প্রতিটি আচরণকে নিজের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে পরিণত করেন না, তিনি সম্পর্ককে অনেক বেশি সুস্থ ও গভীর করতে পারেন।

এই শ্লোকের একটি বিশেষ সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। একজন মানুষের চরিত্র শুধু সে একা থাকলে প্রকাশ পায় না। সে অন্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার মধ্যেও তার আধ্যাত্মিকতার পরিচয় প্রকাশিত হয়। কেউ যদি ধর্মের কথা বলেন কিন্তু তাঁর উপস্থিতিতে মানুষ ভয় পায়, তাঁর কথায় অন্যরা অপমানিত হয় এবং তাঁর আচরণে অশান্তি সৃষ্টি হয় তাহলে তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এখনও অসম্পূর্ণ। সত্যিকারের ভক্তির একটি লক্ষণ হলো মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা, মমতা এবং প্রশান্তির অনুভূতি সৃষ্টি করা।

এই কারণে যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি অন্যকে অকারণে ভয় দেখান না, নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য অন্যকে অপমান করেন না, দুর্বল মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন না এবং নিজের অহংকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যের শান্তি নষ্ট করেন না তিনি সমাজে এক ধরনের নীরব কল্যাণ সৃষ্টি করেন। তাঁর উপস্থিতি যেন একটি শান্ত ছায়ার মতো। মানুষ তাঁর কাছে এসে নিজের অস্তিত্বকে নিরাপদ মনে করতে পারে।

আবার লোকান্নোদ্বিজতে অংশটি সেই ব্যক্তির অন্তর্গত শক্তির কথা বলে। সমাজ সবসময় শান্ত থাকবে না। মানুষ সবসময় ন্যায়পরায়ণ হবে না। কেউ ভুল বুঝবে, কেউ অপমান করবে, কেউ বিরোধিতা করবে, কেউ অন্যায়ভাবে সমালোচনা করবে। এই সবকিছুর মধ্যেও নিজের চেতনাকে স্থির রাখার ক্ষমতা অর্জন করতে হয়। এর অর্থ নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। বরং বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করা এবং প্রতিক্রিয়ার আগে নিজের অন্তরকে স্থির করা।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে একজন সত্যিকারের ভক্ত পৃথিবী থেকে পালিয়ে শান্তি খোঁজেন না। তিনি পৃথিবীর মধ্যেই থেকে শান্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। তিনি অন্যের জন্য ভয় নন এবং অন্যের ভয়েও নিজের অন্তরকে হারান না। তিনি আনন্দ পান কিন্তু আনন্দের দাস হন না। তিনি দুঃখ অনুভব করেন কিন্তু দুঃখের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। তিনি অন্যের সাফল্যে অমর্ষান্বিত হন না। তিনি বিপদের সময় ভয়কে নিজের বিবেকের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেন না। তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্বশীল থাকেন কিন্তু উদ্বেগকে নিজের জীবনের কেন্দ্র বানান না।

শেষে স চ মে প্রিয়ঃ এই অংশটি সমগ্র শিক্ষাকে ঈশ্বরীয় সম্পর্কের মধ্যে স্থাপন করেছে। কৃষ্ণ বলেন এমন মানুষ আমার প্রিয়। অর্থাৎ ভগবানের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য শুধু বাহ্যিক আচার যথেষ্ট নয়। মানুষের অন্তরের গুণও গুরুত্বপূর্ণ। তার আচরণে অন্যের প্রতি নিরাপত্তা থাকবে, তার মনে অন্যের প্রতি অকারণ বিদ্বেষ থাকবে না এবং তার নিজের মনও বাহ্যিক ঘটনার দ্বারা সহজে বিপর্যস্ত হবে না। তার ভক্তি তার চরিত্রে প্রকাশিত হবে। তার ঈশ্বরচেতনা তার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত হবে।

সুতরাং যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ কেবল একটি সংস্কৃত পদের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতা, সামাজিক দায়িত্ব, আবেগীয় ভারসাম্য, নৈতিক শক্তি এবং আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার এক গভীর দর্শন। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের শান্ত মানুষ সেই নয় যে পৃথিবীকে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করতে পেরেছে। সত্যিকারের শান্ত মানুষ সেই যে পৃথিবীর পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও নিজের অন্তরের সত্যকে ধরে রাখতে পেরেছে। যে নিজে অন্যের অশান্তির কারণ হয় না এবং অন্যের অশান্তিকেও নিজের অন্তরের প্রভু হতে দেয় না, যে হর্ষ, অমর্ষ, ভয় ও উদ্বেগের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেই মানুষই প্রকৃত অর্থে শান্ত, স্বাধীন এবং ভগবানের প্রিয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি