ভগবদ্গীতা ১২.১৭ — সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে পরিণত ভক্তের লক্ষণ
যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।
শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিষঃ।।১৭।।
অনুবাদঃ যিনি প্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে হৃষ্ট হন না এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে দ্বেষ করেন না, যিনি প্রিয় বস্তুর বিয়োগে শোক করেন না, অপ্রাপ্ত ইষ্ট বস্তু আকাঙ্ক্ষা করেন না এবং শুভ ও অশুভ সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করেছেন এবং যিনি ভক্তিযুক্ত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকটি একজন পরিণত ভক্তের অন্তর্জগতের এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি। শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ।” অর্থাৎ যিনি কোনো প্রাপ্তিতে অতিরিক্ত উল্লসিত হন না, কোনো অপ্রিয় বিষয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন না, কোনো বিয়োগ বা ক্ষতির কারণে শোকে নিমজ্জিত হন না, কোনো অপ্রাপ্ত বস্তুর জন্য আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হন না, যিনি শুভ ও অশুভের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করেছেন এবং যিনি ভক্তিতে পরিপূর্ণ, সেই ব্যক্তিই শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়। এই শ্লোকের সৌন্দর্য এখানেই যে এখানে ভক্তির পরিচয় কোনো বাহ্যিক পোশাক, আচার বা সামাজিক পরিচয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। মানুষের অন্তরের অবস্থাকেই প্রকৃত ভক্তির মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ “যঃ”। সংস্কৃত যদ্ সর্বনাম থেকে এর উৎপত্তি এবং এর অর্থ যিনি বা যে ব্যক্তি। শ্লোকে এই শব্দটি এমন একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে যার মধ্যে পরবর্তী সব গুণ বিদ্যমান। এরপর এসেছে “হৃষ্যতি”। এটি সংস্কৃত হৃষ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ আনন্দিত হওয়া, উল্লসিত হওয়া বা কোনো প্রাপ্তিতে অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে ওঠা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন “ন হৃষ্যতি”, তখন তিনি আনন্দ অনুভব করাকে নিষিদ্ধ করছেন না। তিনি এমন আনন্দের কথা বলছেন যেখানে মানুষ বাহ্যিক লাভের সঙ্গে নিজের অন্তরের শান্তিকে বেঁধে ফেলে। কোনো সম্পদ পাওয়া, প্রশংসা পাওয়া, সাফল্য অর্জন করা বা নিজের ইচ্ছা পূর্ণ হওয়ার পর যদি মানুষের মন এমনভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠে যে সে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে ভুলে যায়, তাহলে সেই আনন্দও এক ধরনের বন্ধনে পরিণত হয়। তাই “ন হৃষ্যতি” অর্থ আনন্দহীন হওয়া নয়, বরং আনন্দের মধ্যেও অন্তরের সমত্ব বজায় রাখা।
এরপর এসেছে “দ্বেষ্টি”। এর মূল সংস্কৃত ধাতু দ্বিষ্ এবং এর অর্থ ঘৃণা করা, বিদ্বেষ করা বা শত্রুতা পোষণ করা। “ন দ্বেষ্টি” অর্থ তিনি বিদ্বেষ করেন না। এর অর্থ এই নয় যে একজন ভক্ত অন্যায় ও অন্যায়কার্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবেন না। বরং তিনি অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিনতে পারেন, প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে অবস্থানও নিতে পারেন, কিন্তু তার অন্তরে ঘৃণা ও প্রতিহিংসার আগুন পুষে রাখেন না। কারণ বিদ্বেষ প্রথমে যাকে উদ্দেশ্য করে জন্মায়, পরে সেই বিদ্বেষের বিষ মানুষের নিজের মনকেই দগ্ধ করতে থাকে। একজন জ্ঞানী মানুষ তাই অন্যায়ের বিরোধিতা করতে পারেন কিন্তু অন্যায়ের প্রতি ঘৃণায় নিজের চিত্তকে কলুষিত করেন না। এখানেই নৈতিক দৃঢ়তা ও অন্তরের পবিত্রতার মধ্যে সমন্বয় ঘটে।
“শোচতি” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শুচ্ ধাতু থেকে। এর অর্থ শোক করা, দুঃখ করা, অনুতাপ করা বা কোনো ক্ষতির কারণে কাতর হওয়া। “ন শোচতি” অর্থ তিনি শোক করেন না। এই কথাটিকেও আক্ষরিকভাবে অনুভূতিহীনতা হিসেবে বোঝা উচিত নয়। গীতা মানুষকে পাথরের মতো আবেগহীন হতে শিক্ষা দেয় না। প্রিয়জনের মৃত্যু, বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা বা ক্ষতিতে দুঃখ অনুভব করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু দুঃখ যখন মানুষের চেতনাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে এবং তাকে বর্তমান জীবন, কর্তব্য ও আত্মস্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তখন সেই শোক বন্ধনে পরিণত হয়। তাই “ন শোচতি” এর গভীর অর্থ হলো দুঃখ অনুভূত হলেও দুঃখ যেন মানুষকে নিজের প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারে।
এরপর এসেছে “কাঙ্ক্ষতি”। এই শব্দের অর্থ আকাঙ্ক্ষা করা, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হওয়া বা ভবিষ্যৎ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় অস্থির থাকা। “ন কাঙ্ক্ষতি” অর্থ তিনি আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হন না। এখানে আবার কর্মবিমুখতার শিক্ষা নেই। মানুষ চেষ্টা করবে, পরিশ্রম করবে, নিজের কর্তব্য পালন করবে এবং ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য পরিকল্পনাও করবে। কিন্তু তার অন্তরের শান্তি যেন কোনো নির্দিষ্ট ফল পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল না হয়। আকাঙ্ক্ষা যখন সীমাহীন হয়ে যায় তখন মানুষ বর্তমানকে হারিয়ে ভবিষ্যতের একটি কল্পিত সুখের পেছনে ছুটতে থাকে। গীতা সেই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে বলে।
এই চারটি শব্দকে একসঙ্গে দেখলে মানুষের মানসিক জীবনের একটি গভীর চিত্র পাওয়া যায়। মানুষ যা পায় তার জন্য উল্লসিত হয়, যা অপছন্দ করে তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, যা হারায় তার জন্য শোক করে এবং যা পায়নি তার জন্য আকাঙ্ক্ষা করে। অর্থাৎ অতীত তাকে শোকে আবদ্ধ করে, বর্তমান তাকে হর্ষ ও দ্বেষের মধ্যে দোলায় এবং ভবিষ্যৎ তাকে আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অস্থির রাখে। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো এই মানসিক দোলাচলের ঊর্ধ্বে উঠে এমন এক অন্তর্গত স্থিরতা অর্জন করা যেখানে বাহ্যিক পরিবর্তন মানুষের চেতনার কেন্দ্রকে বারবার নাড়িয়ে দিতে পারে না।
এরপর শ্লোকে এসেছে “শুভাশুভপরিত্যাগী”। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাসবদ্ধ পদ। “শুভ” অর্থ মঙ্গলময়, কল্যাণকর, অনুকূল বা পুণ্যজনক এবং “অশুভ” অর্থ তার বিপরীত, অর্থাৎ অমঙ্গলজনক, অনিষ্টকর বা প্রতিকূল। “পরিত্যাগী” শব্দটি পরিত্যাগ থেকে এসেছে এবং এর সঙ্গে সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া বা আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া। তাই “শুভাশুভপরিত্যাগী” এর আক্ষরিক অর্থ শুভ ও অশুভ উভয়ের পরিত্যাগকারী। তবে এর অর্থ ভালো ও মন্দের নৈতিক পার্থক্য অস্বীকার করা নয়। গীতা কখনো অন্যায় ও ন্যায়কে একই বলে না। এখানে মূলত শুভ ও অশুভ ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগের কথা বলা হয়েছে। একজন মানুষ ভালো কাজ করেও যদি নিজের ভালোত্ব নিয়ে অহংকারে ভরে ওঠেন, তবে সেই শুভ কর্মও তার বন্ধনের কারণ হতে পারে। আবার অশুভ ফল এলে যদি তিনি নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে ব্যর্থ বলে মনে করেন, তাহলেও তিনি ফলের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। তাই ভক্ত শুভ কাজ করবেন, অশুভ থেকে বিরত থাকবেন, কিন্তু কোনো ফলকেই নিজের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি বানাবেন না।
“ভক্তিমান্” শব্দটি এই শ্লোকের প্রাণ। এটি ভক্তি শব্দ থেকে এসেছে এবং ভক্তির সঙ্গে সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ভজ্ ধাতুর মধ্যে সেবা করা, গ্রহণ করা, অংশগ্রহণ করা, আশ্রয় নেওয়া এবং উপাসনার ভাব রয়েছে। ভক্তিমান্ অর্থ যাঁর ভক্তি আছে, যিনি ঈশ্বরের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত। কিন্তু গীতার ভক্তি কেবল আবেগের নাম নয়। এটি জীবনের কেন্দ্র পরিবর্তনের নাম। সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছা, নিজের লাভ, নিজের সম্মান এবং নিজের সুখকে জীবনের কেন্দ্র করে। ভক্ত ধীরে ধীরে সেই কেন্দ্রকে নিজের কাছ থেকে ঈশ্বরের দিকে স্থানান্তর করেন। তিনি বলতে শেখেন যে আমার কর্ম আমার, কিন্তু তার চূড়ান্ত ফলের অধিকার ঈশ্বরের। আমার চেষ্টা আমার কর্তব্য, কিন্তু ফলের ওপর আমার অহংকারের অধিকার নেই।
শ্লোকের শেষ অংশ “স মে প্রিয়ঃ”। “সঃ” অর্থ সেই ব্যক্তি, “মে” অর্থ আমার এবং “প্রিয়ঃ” অর্থ প্রিয়। অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আমার প্রিয়। এখানে শ্রীকৃষ্ণ একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য বাহ্যিক পরিচয় মুখ্য নয়। মানুষের অন্তরের গুণই এখানে প্রধান। যে মানুষ সুখে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না, দুঃখে ভেঙে পড়ে না, বিদ্বেষে নিজের মনকে কলুষিত করে না, আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয় না এবং নিজের কর্মফল ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করতে পারে, সেই মানুষ ঈশ্বরের প্রিয় হয়ে ওঠে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমি কি আমার সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্পদ, সম্মান, সম্পর্ক, সুখ ও দুঃখের সমষ্টি, নাকি এগুলোর পরিবর্তনকে যে চেতনা প্রত্যক্ষ করে সেই চেতনার মধ্যে আমার প্রকৃত পরিচয় নিহিত। বেদান্তের আলোকে মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ ও মনের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন বাহ্যিক পরিবর্তন তার আত্মপরিচয়কে নাড়া দেয়। সাফল্য এলে সে নিজেকে বড় মনে করে এবং ব্যর্থতা এলে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে। কিন্তু আত্মস্বরূপের উপলব্ধি গভীর হলে মানুষ বুঝতে শুরু করে যে সুখ ও দুঃখ পরিবর্তনশীল, কিন্তু চৈতন্য তাদের সাক্ষী। এই উপলব্ধিই তাকে হর্ষ, দ্বেষ, শোক ও আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই অনাসক্তি কোনো শুষ্ক উদাসীনতা নয়। এখানে মানুষের হৃদয় শূন্য হয় না, বরং হৃদয়ের কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়। আগে মানুষের হৃদয়ের কেন্দ্র থাকে বস্তু, ব্যক্তি, সাফল্য বা নিজের ইচ্ছা। ভক্তির মাধ্যমে সেই কেন্দ্র ঈশ্বরের দিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে পৃথিবীর প্রতি দায়িত্ব থেকে মানুষ পালিয়ে যায় না, বরং আরও বিশুদ্ধভাবে নিজের কর্তব্য পালন করতে শেখে। সে ভালো কাজ করে কারণ তা কর্তব্য এবং ঈশ্বরের সেবা হিসেবে অনুভূত হয়। সে ফলের জন্য কাজ করে না, বরং কাজকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মানসিক অস্থিরতার বড় একটি কারণ হলো নিজের সুখকে বাহ্যিক ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করে ফেলা। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে আমি ভালো, কেউ প্রশংসা করলে আমি মূল্যবান, কেউ অপমান করলে আমি অপমানিত, কোনো সম্পর্ক হারালে আমার জীবন অর্থহীন, কাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেলে আমি ব্যর্থ, এমন চিন্তা মানুষকে ক্রমাগত বাহ্যিক পরিস্থিতির দাস করে রাখে। গীতার শিক্ষা হলো নিজের অন্তরের স্থিতি এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে বাহ্যিক পরিবর্তন আমাদের সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এই অবস্থাকে আধুনিক ভাষায় মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বলা যেতে পারে, কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এর সঙ্গে আত্মজ্ঞান ও ঈশ্বরভক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। হর্ষ প্রতীক প্রাপ্তির, দ্বেষ প্রতীক প্রত্যাখ্যানের, শোক প্রতীক হারানোর এবং আকাঙ্ক্ষা প্রতীক অপ্রাপ্তির। মানুষের জীবন যেন পাওয়া ও না পাওয়ার মধ্যে এক অবিরাম দোলনা। কিছু পেলে আমরা আঁকড়ে ধরতে চাই, কিছু হারালে ফিরে পেতে চাই, কিছু অপছন্দ হলে দূরে সরিয়ে দিতে চাই এবং কিছু এখনও না পেলে তার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। এই দোলাচলের মধ্যেই আমাদের মন তার স্বাধীনতা হারায়। শ্রীকৃষ্ণ সেই দোলাচল থামিয়ে চিত্তকে এমন একটি কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করতে বলেন যা বাহ্যিক লাভ ও ক্ষতির দ্বারা নির্ধারিত নয়।
বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে একজন মানুষের চাকরিতে সাফল্য লাভ। সে যদি পদোন্নতি পেয়ে মনে করে যে এখন সে অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তবে তার আনন্দের সঙ্গে অহংকার যুক্ত হয়েছে। আবার পদোন্নতি না পেয়ে যদি মনে করে যে তার জীবনের কোনো মূল্য নেই, তবে তার আত্মপরিচয় বাহ্যিক ফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সে যদি নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, সাফল্যে কৃতজ্ঞ হয়, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয় এবং নিজের মূল্যকে কেবল বাহ্যিক ফলের সঙ্গে না জুড়ে দেখে, তবে সে গীতার শিক্ষার কাছাকাছি অবস্থান করে। একইভাবে কেউ অন্যায় করলে তার প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু সেই ব্যক্তির প্রতি প্রতিহিংসা পোষণ না করেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রিয়জন হারালে শোক করা যায়, কিন্তু শোকের মধ্যেও জীবনের গভীর সত্যকে স্মরণ করা যায়। কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম করা যায়, কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ না হলে নিজের অস্তিত্বকে ব্যর্থ বলে মনে না করেও জীবনকে এগিয়ে নেওয়া যায়।
এই অবস্থাকে একটি পদ্মফুলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পদ্ম জলের মধ্যে জন্মায় এবং জলের ওপরেই থাকে, কিন্তু তার অস্তিত্ব জলের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় না যে জলই তার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে মানুষকে সংসারের মধ্যেই থাকতে হবে। তাকে সম্পর্ক রাখতে হবে, কাজ করতে হবে, অর্থ উপার্জন করতে হবে, দায়িত্ব পালন করতে হবে, সাফল্য ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু এসবের কোনো একটিকে নিজের প্রকৃত সত্তার সম্পূর্ণ পরিচয় বানানো যাবে না। পৃথিবীর মধ্যে থেকেও পৃথিবীর আসক্তির ঊর্ধ্বে থাকা এই শ্লোকের অনাসক্তির একটি সুন্দর প্রতীক।
সবচেয়ে গভীরভাবে দেখলে এই শ্লোক মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতার কথা বলে। স্বাধীনতা মানে পৃথিবীতে কোনো দুঃখ থাকবে না বা কেউ কখনো আমাদের অপমান করবে না কিংবা আমরা কখনো ব্যর্থ হব না এমন নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও নিজের অন্তরের কেন্দ্রকে হারিয়ে না ফেলা। সুখ এলে কৃতজ্ঞ থাকা, দুঃখ এলে স্থির থাকা, অন্যায় দেখলে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো কিন্তু ঘৃণায় নিজেকে কলুষিত না করা, নিজের কর্তব্য পালন করা কিন্তু ফলের প্রতি দাসত্ব না করা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্ত কর্ম ও অস্তিত্ব ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করা এই হলো এই শ্লোকের সাধনা।
এই কারণে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১২.১৭ কেবল একজন ভক্তের প্রশংসা নয়, বরং মানুষের অন্তর্জগতকে রূপান্তরিত করার একটি পথনির্দেশ। এখানে প্রথমে মানুষের চারটি মানসিক বন্ধনকে দেখানো হয়েছে। হর্ষ, দ্বেষ, শোক এবং আকাঙ্ক্ষা। এরপর বলা হয়েছে শুভ ও অশুভ ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগের কথা। তারপর এসেছে ভক্তির কথা এবং শেষে এসেছে ঈশ্বরের প্রিয় হওয়ার ঘোষণা। অর্থাৎ শ্লোকটি যেন মানুষকে বাহ্যিক নির্ভরতা থেকে অন্তর্গত স্বাধীনতার দিকে, ফলের আসক্তি থেকে কর্তব্যের দিকে, অহংকার থেকে আত্মসমর্পণের দিকে এবং অস্থিরতা থেকে ভক্তির দিকে নিয়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শান্তি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু লাভের মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তরের অবস্থাকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করার মধ্যে যেখানে লাভ মানুষকে অহংকারী করে না, ক্ষতি তাকে ধ্বংস করে না, অপছন্দ তাকে বিদ্বেষী করে না এবং অপ্রাপ্তি তাকে অস্থির করে না। শুভ কাজ করতে হবে, অশুভ থেকে দূরে থাকতে হবে, কিন্তু কোনো ফলের সঙ্গে নিজের আত্মপরিচয়কে বেঁধে রাখা যাবে না। যখন মানুষের হৃদয় এই অনাসক্তির মধ্যেও ঈশ্বরের প্রতি প্রেমে পূর্ণ হয়, তখন তার জীবন কেবল বাহ্যিক সাফল্যের দ্বারা পরিচালিত হয় না। তার কর্ম হয়ে ওঠে কর্তব্য, তার মন হয়ে ওঠে সমত্বশীল, তার হৃদয় হয়ে ওঠে ভক্তিময় এবং তার জীবন হয়ে ওঠে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত। এই অবস্থাতেই শ্রীকৃষ্ণের ঘোষণা সত্য হয়ে ওঠে যে এমন ভক্তই তাঁর প্রিয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!