ভগবদ্গীতা ১২.১৮ — শত্রু-মিত্র ও সুখ-দুঃখে সমভাবের শিক্ষা
সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ।।১৮।।
অনুবাদঃ যিনি শত্রু ও মিত্রের প্রতি সমবুদ্ধি, যিনি সম্মানে ও অপরমানে, শীতে ও গরমে, সুখে ও দুঃখে এবং নিন্দা ও স্তুতিতে সম-ভাবাপন্ন, যিনি কুসঙ্গ-বর্জিত, সংযতবাক্, যৎকিঞ্চিৎ লাভে সন্তষ্ট, গৃহাসক্তিশূন্য এবং যিনি স্থিরবুদ্ধি ও আমার প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, সেই রকম ব্যক্তি আমার অত্যন্ত প্রিয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভক্তের যে মহৎ গুণের কথা বলেছেন, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো সমভাব। শ্লোকটি হলো সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ। শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ। এই শ্লোকে সমঃ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ অর্থে সমঃ বলতে সমান, সমদর্শী, সমভাবাপন্ন বা পক্ষপাতহীন বোঝায়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে শব্দটির অর্থ কেবল বাহ্যিক সমান আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সমঃ এমন এক অন্তর্গত অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষ শত্রু ও মিত্র, সম্মান ও অপমান, শীত ও উষ্ণতা, সুখ ও দুঃখের মতো জীবনের বিপরীত অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজের অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
সংস্কৃত সমঃ শব্দটির মূল রূপ হলো সম। এটি একটি প্রাচীন সংস্কৃত বিশেষণ যার অর্থ সমান, একই, সমতুল্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমভাবাপন্ন। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী সমঃ হলো সম শব্দের পুংলিঙ্গ একবচন প্রথমা বিভক্তির রূপ। এখানে বিসর্গ শব্দটির অর্থের পৃথক কোনো অংশ নয়, বরং সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে গঠিত রূপের অংশ। প্রাচীন ভারতীয় ভাষাচিন্তায় সম শব্দের সঙ্গে একতা, সাম্য, সমতা এবং ভারসাম্যের ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই শব্দের মধ্যেই এমন একটি ভাব নিহিত রয়েছে যেখানে ভিন্নতার অস্তিত্ব স্বীকার করেও তার দ্বারা অন্তরের পক্ষপাত ও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে দেওয়া হয় না।
গীতার এই শ্লোকে সমঃ শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝার জন্য প্রথমে শত্রু ও মিত্রের প্রসঙ্গটি বুঝতে হয়। মানুষের জীবনে মিত্র এমন ব্যক্তি যার কাছ থেকে আমরা ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সম্মান লাভ করি। অন্যদিকে শত্রু এমন ব্যক্তি যে আমাদের বিরোধিতা করে বা আমাদের ক্ষতি করতে চায়। সাধারণ মানুষের মন মিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং শত্রুর প্রতি বিরূপ হয়। ফলে ভালোবাসা ও ঘৃণা, আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, প্রশংসা ও বিরোধিতার মধ্যে মন ক্রমাগত দোলায়িত হতে থাকে। কিন্তু গীতার সমঃ এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষের আচরণের বিচার করা হলেও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা অন্ধ পক্ষপাত অন্তরের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। একজন সমদর্শী মানুষ অন্যায়কে অন্যায় বলবেন এবং ন্যায়কে ন্যায় বলবেন, কিন্তু অন্যায়কারীর প্রতি ব্যক্তিগত ঘৃণা তার বিচারবোধকে অন্ধ করে দেবে না।
এই কারণে শত্রু ও মিত্রের প্রতি সমতা মানে শত্রুকে মিত্রের মতো ব্যবহার করা নয়। বরং এর অর্থ হলো উভয়ের মধ্যেই একই আত্মিক মর্যাদা উপলব্ধি করা এবং ব্যক্তিগত আবেগের দ্বারা ন্যায়বোধকে বিকৃত না হতে দেওয়া। কোনো ব্যক্তি আমাদের প্রতি বিরূপ হলেও তার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত না হয়। আবার কোনো ব্যক্তি আমাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করলেও তার প্রতি অন্ধ পক্ষপাত যেন সৃষ্টি না হয়। এই অবস্থাই গীতার সমদৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
এরপর শ্লোকে এসেছে মান ও অপমানের কথা। মানুষ সাধারণত অন্যের প্রশংসা ও সম্মানের মাধ্যমে নিজের মূল্য অনুভব করতে চায়। আবার অপমান বা নিন্দা তার অহংবোধকে আহত করে। ফলে মান পেলে আনন্দ এবং অপমান পেলে দুঃখ, ক্রোধ বা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সমঃ ব্যক্তি সম্মান পেলে অহংকারে আত্মবিস্মৃত হন না এবং অপমান পেলে নিজের অন্তর্গত মর্যাদা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন না। কারণ তিনি উপলব্ধি করেন যে মানুষের দেওয়া সম্মান বা অপমান তার প্রকৃত আত্মসত্তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। অন্যের প্রশংসা যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি অন্যের নিন্দাও ক্ষণস্থায়ী। যে আত্মপরিচয় অন্যের মুখের কথার উপর নির্ভর করে না, সেই আত্মপরিচয়ের মধ্যেই প্রকৃত স্থিরতার সূচনা ঘটে।
শ্লোকের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ। এখানে শীত ও উষ্ণতা এবং সুখ ও দুঃখের মধ্যেও সমভাব বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। শীত ও উষ্ণতা শরীরের অনুভূতির বিপরীত অভিজ্ঞতা। কখনো পরিবেশ অনুকূল হয় এবং কখনো প্রতিকূল হয়। একইভাবে সুখ ও দুঃখ মানুষের মনের দুই বিপরীত অভিজ্ঞতা। সুখ এলে মানুষ তাকে আঁকড়ে ধরতে চায় এবং দুঃখ এলে তা থেকে পালাতে চায়। এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের মধ্যেই মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। গীতার সমভাবের শিক্ষা মানুষকে সুখ অস্বীকার করতে বা দুঃখ অনুভব না করতে বলে না। বরং শিক্ষা দেয় যে সুখ ও দুঃখ উভয়ই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা এবং কোনো একটি অভিজ্ঞতাকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
এই দৃষ্টিতে সমঃ হলো অনুভূতিহীনতা নয়, বরং অনুভূতির উপর আত্মসচেতনতার প্রতিষ্ঠা। একজন সমভাবাপন্ন ব্যক্তি আনন্দ অনুভব করবেন, দুঃখও অনুভব করবেন, কিন্তু আনন্দ তাকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করবে না এবং দুঃখও তাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে পারবে না। তিনি আবেগকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু আবেগের দাসও হন না। তাঁর মধ্যে অনুভূতি আছে, কিন্তু অনুভূতিই তাঁর চূড়ান্ত নিয়ন্তা নয়। এখানেই গীতার সমত্বের শিক্ষা আধুনিক জীবনের জন্যও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
শ্লোকটির শেষ অংশ সঙ্গবিবর্জিতঃ এই সমত্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রকাশ করে। সঙ্গ অর্থ আসক্তি বা কোনো কিছুর সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ হওয়া যার কারণে তার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের শান্তিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। মানুষ যখন কোনো ব্যক্তি, বস্তু, সম্মান, সম্পর্ক বা অভিজ্ঞতাকে নিজের সুখের অপরিহার্য শর্ত মনে করে, তখন সেটি হারানোর ভয় তাকে গ্রাস করে। কিন্তু অনাসক্তি মানুষকে শেখায় যে ভালোবাসা থাকতে পারে, কর্তব্য থাকতে পারে, সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের শান্তিকে কোনো পরিবর্তনশীল বিষয়ের হাতে সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া উচিত নয়। তাই সমত্ব ও অনাসক্তি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দার্শনিক দৃষ্টিতে সমঃ শব্দটি ভারতীয় চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সমত্বের সঙ্গে যুক্ত। সাংখ্য দর্শনের আলোকে শীত, উষ্ণতা, সুখ, দুঃখ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রকাশ। কিন্তু চৈতন্যস্বরূপ পুরুষ এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষকারী। মানুষ যখন নিজেকে কেবল পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম করে দেখে, তখন সে প্রত্যেক পরিবর্তনের সঙ্গে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে নিজের গভীরতর চৈতন্যসত্তার দিকে ফিরে যায়, তখন বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও এক ধরনের অন্তর্গত স্থিরতা অনুভব করতে পারে। এই অর্থে সমঃ হলো পরিবর্তনশীলতার মাঝেও চৈতন্যের স্থির কেন্দ্র আবিষ্কারের একটি আধ্যাত্মিক সংকেত।
বেদান্তের দৃষ্টিতে সমদৃষ্টি আরও গভীর অর্থ বহন করে। শত্রু ও মিত্রের বাহ্যিক পরিচয় পৃথক হলেও প্রত্যেক জীবের অন্তরে একই আত্মতত্ত্ব বিরাজমান। তাই সমদর্শন কেবল সামাজিক ন্যায়বোধের বিষয় নয়, বরং আত্মদর্শনেরও ফল। যখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে জীবের বাহ্যিক পরিচয় পরিবর্তনশীল কিন্তু অন্তর্গত আত্মসত্তা এক, তখন ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের সীমা অতিক্রম করে তার মধ্যে বৃহত্তর সমদৃষ্টি জন্ম নিতে পারে।
ভক্তির দৃষ্টিতেও সমঃ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভক্ত নিজের অহংকেন্দ্রিক পরিচয়ের পরিবর্তে ঈশ্বরকে জীবনের কেন্দ্র করে তোলেন। ফলে সম্মান বা অপমান, লাভ বা ক্ষতি, সুখ বা দুঃখ তার চূড়ান্ত আশ্রয় হয়ে থাকে না। তার আশ্রয় থাকে ঈশ্বরের মধ্যে। এই কারণে বাহ্যিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও অন্তরের কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বিচলিত হয় না। ভক্তির ক্ষেত্রে সমত্ব তাই শুষ্ক নির্লিপ্ততা নয়। এটি ঈশ্বরের প্রতি গভীর আশ্রয়বোধ থেকে জন্ম নেওয়া অন্তরের স্থিরতা।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে সমঃ ধারণাটিকে আবেগীয় ভারসাম্য ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। যে ব্যক্তি প্রশংসা পেলেই নিজেকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন এবং সামান্য সমালোচনায় নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করেন, তার আত্মমূল্যায়ন বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সমভাবাপন্ন ব্যক্তি নিজের মূল্যকে অন্যের প্রশংসা বা নিন্দার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করেন না। তিনি সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন, প্রশংসা গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু কোনো একটি প্রতিক্রিয়াকেই নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিচার হিসেবে গ্রহণ করেন না। ফলে তার মধ্যে আত্মসংযম ও মানসিক স্থিতি বৃদ্ধি পায়।
সমঃ শব্দটির একটি সুন্দর প্রতীকী অর্থও রয়েছে। জীবনকে যদি একটি দোলনার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে একদিকে রয়েছে সুখ এবং অন্যদিকে দুঃখ। একদিকে সম্মান এবং অন্যদিকে অপমান। একদিকে মিত্র এবং অন্যদিকে শত্রু। সাধারণ মন এই দোলনার সঙ্গে ক্রমাগত ওঠানামা করে। কিন্তু সমভাব হলো সেই অন্তর্গত কেন্দ্র যেখানে দোলনার দুই দিকের আন্দোলনের মধ্যেও ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে। আবার সমভাবকে একটি গভীর হ্রদের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। হ্রদের উপরিভাগে বাতাসের কারণে ঢেউ উঠতে পারে, বৃষ্টি পড়তে পারে, পাতা ভেসে যেতে পারে, কিন্তু গভীর স্তর তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। মানুষের মনও যদি কেবল বাহ্যিক ঘটনার পৃষ্ঠে অবস্থান করে, তবে সামান্য ঘটনাতেই প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হবে। কিন্তু মন যখন গভীর আত্মসচেতনতার দিকে অগ্রসর হয়, তখন বাহ্যিক ঢেউ থাকলেও অন্তরের গভীরতা শান্ত থাকতে পারে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য প্রয়োগ রয়েছে। একজন শিক্ষক যদি কোনো ছাত্রের কাছ থেকে প্রশংসা পান এবং অন্য কোনো ছাত্রের কাছ থেকে সমালোচনা পান, তাহলে তাঁর কর্তব্য যেন প্রশংসা ও অপমানের দ্বারা পরিবর্তিত না হয়। একজন কর্মজীবী মানুষ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পেলে অহংকারে অন্ধ না হয়ে এবং ব্যর্থ হলে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে না ফেলে নিজের কর্তব্যে স্থির থাকতে পারেন। একজন ব্যক্তি বন্ধুর ভালোবাসায় কৃতজ্ঞ হতে পারেন এবং শত্রুর বিরোধিতার মধ্যেও নিজের নৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারেন। এসব ক্ষেত্রেই সমঃ ধারণাটি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সমঃ শব্দের গভীরে তাই কেবল সমান হওয়ার ধারণা নেই। এর মধ্যে রয়েছে সমতা, সাম্য, ভারসাম্য, সমদৃষ্টি, আত্মসংযম, অনাসক্তি এবং অন্তর্গত স্বাধীনতার একটি সমন্বিত দর্শন। এটি এমন একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতির কথা বলে যেখানে মানুষ বাহ্যিক জগতের দ্বন্দ্বকে অস্বীকার না করেও তার দ্বারা নিজের অন্তরের শান্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে দেয় না।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় স্বাধীনতাগুলোর একটি হলো নিজের অন্তরের অবস্থার উপর নিজের সচেতন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। অন্য কেউ আমাকে সম্মান করতে পারে অথবা অপমান করতে পারে। কেউ আমাকে ভালোবাসতে পারে অথবা ঘৃণা করতে পারে। জীবনে সুখ আসতে পারে অথবা দুঃখ আসতে পারে। শরীর শীত অনুভব করতে পারে অথবা উষ্ণতা অনুভব করতে পারে। কিন্তু এসব পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার মধ্যেও যদি অন্তরে এমন একটি কেন্দ্র আবিষ্কার করা যায় যা সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক পরিবর্তনের হাতে বন্দী নয়, তখনই সমত্বের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি হয়।
এই কারণে গীতার সমঃ কোনো নিষ্প্রাণ নির্লিপ্ততার শিক্ষা নয়। এটি অনুভূতিকে হত্যা করার শিক্ষা নয়। এটি মানুষকে ভালোবাসাহীন বা কর্তব্যহীন হতে বলে না। বরং এটি শেখায় যে ভালোবাসার মধ্যেও আসক্তির দাস হওয়া যাবে না, কর্তব্যের মধ্যেও অহংকারে আবদ্ধ হওয়া যাবে না, সাফল্যের মধ্যেও আত্মবিস্মৃত হওয়া যাবে না এবং ব্যর্থতার মধ্যেও নিজের গভীরতর সত্তাকে অস্বীকার করা যাবে না।
সবশেষে বলা যায়, সমঃ শব্দটি গীতার এক অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রতীক। ভাষাগতভাবে এটি সমান ও সমভাবাপন্ন হওয়ার ধারণা প্রকাশ করে। নৈতিকভাবে এটি পক্ষপাতহীনতা ও ন্যায়বোধের শিক্ষা দেয়। মানসিকভাবে এটি আবেগীয় ভারসাম্য ও স্থিতির প্রতীক। দার্শনিকভাবে এটি দ্বন্দ্বের মধ্যেও চৈতন্যের স্থিরতা উপলব্ধির পথ নির্দেশ করে। আধ্যাত্মিকভাবে এটি আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিকে আহ্বান জানায়। শত্রু ও মিত্র, মান ও অপমান, শীত ও উষ্ণতা, সুখ ও দুঃখের মধ্যেও যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের সত্যকে হারিয়ে ফেলেন না এবং আসক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত থেকে সমভাব বজায় রাখতে পারেন, গীতার ভাষায় তিনিই প্রকৃত অর্থে সমঃ। এই সমত্বই মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতার এক উজ্জ্বল লক্ষণ এবং জীবনের সমস্ত দ্বন্দ্বের মধ্যেও শান্তি আবিষ্কারের একটি গভীর পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!