সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১২.১৯ — নিন্দা-প্রশংসার ঊর্ধ্বে স্থির ও অনাসক্ত ভক্ত

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ। অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ।।১৯।।
তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ। 
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ।।১৯।।

অনুবাদঃ যিনি শত্রু ও মিত্রের প্রতি সমবুদ্ধি, যিনি সম্মানে ও অপরমানে, শীতে ও গরমে, সুখে ও দুঃখে এবং নিন্দা ও স্তুতিতে সম-ভাবাপন্ন, যিনি কুসঙ্গ-বর্জিত, সংযতবাক্, যৎকিঞ্চিৎ লাভে সন্তষ্ট, গৃহাসক্তিশূন্য এবং যিনি স্থিরবুদ্ধি ও আমার প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, সেই রকম ব্যক্তি আমার অত্যন্ত প্রিয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের ঊনবিংশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক ভক্তের চরিত্র তুলে ধরেছেন, যিনি বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা সহজে বিচলিত হন না এবং যাঁর অন্তর ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এই শ্লোকটি কেবল একজন ধর্মপরায়ণ মানুষের পরিচয় দেয় না, বরং মানুষের অন্তর্জীবনের পরিপূর্ণতার একটি গভীর আদর্শ প্রকাশ করে। এখানে নিন্দা ও প্রশংসার প্রতি সমভাব, বাকসংযম, সন্তুষ্টি, অনাসক্তি, স্থিরবুদ্ধি এবং ভক্তিকে একত্র করে এমন এক মানবচরিত্রের কথা বলা হয়েছে, যার অন্তরের শান্তি বাহ্যিক পৃথিবীর পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল নয়। শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় এমন মানুষই তাঁর প্রিয়।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো তুল্যনিন্দাস্তুতিঃ। সংস্কৃত তুল্য শব্দের অর্থ সমান বা সমতুল্য। নিন্দা শব্দের অর্থ দোষারোপ, অবজ্ঞা বা সমালোচনা এবং স্তুতি শব্দের অর্থ প্রশংসা, গুণকীর্তন বা সম্মান। তাই তুল্যনিন্দাস্তুতিঃ বলতে বোঝায় নিন্দা ও প্রশংসাকে সমভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা। এখানে সমতা বলতে নিন্দা ও প্রশংসার মূল্য একই বলে মনে করা বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো নিন্দা শুনে অহংকারে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নিজের অন্তরের শান্তি হারিয়ে না ফেলা এবং প্রশংসা শুনে অহংকারে ফুলে না ওঠা। সাধারণ মানুষ নিজের মূল্য অন্যের কথার মাধ্যমে নির্ধারণ করে। কেউ প্রশংসা করলে সে নিজেকে মূল্যবান মনে করে এবং কেউ নিন্দা করলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। গীতার শিক্ষা হলো নিজের আত্মমূল্যকে মানুষের প্রশংসা বা নিন্দার উপর নির্ভরশীল করা উচিত নয়। নিন্দার মধ্যে যদি সত্য থাকে তবে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রশংসার মধ্যে যদি সত্য থাকে তবে তা অহংকারে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। এই অবস্থাই প্রকৃত সমতা।

এরপর এসেছে মৌনী শব্দটি। মৌনী শব্দের সাধারণ অর্থ মৌনপরায়ণ বা নীরব ব্যক্তি। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক অর্থে মৌনতা কেবল মুখ বন্ধ রাখার নাম নয়। প্রকৃত মৌনতা হলো বাক্যের উপর সংযম এবং অন্তরের অস্থিরতা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়া। মানুষ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কথা বলে নিজের অস্থিরতা প্রকাশ করে। কখনো ক্রোধের কারণে কঠোর কথা বলে, কখনো অহংকারের কারণে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে এবং কখনো অন্যকে আঘাত করার জন্য বাক্য ব্যবহার করে। গীতার মৌনী ব্যক্তি এই প্রবণতার ঊর্ধ্বে ওঠেন। তিনি জানেন কখন কথা বলতে হবে, কী কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকা অধিক কল্যাণকর। তাই মৌনতা এখানে নিস্তব্ধতার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। এটি হলো বাকশক্তির উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অন্তরের পরিমিতি।

সন্তুষ্টঃ শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। এই শব্দটি সংস্কৃত সম্ এবং তুষ্ ধাতুর ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ তৃপ্ত, পরিতৃপ্ত বা সন্তুষ্ট। কিন্তু সন্তুষ্টি মানে জীবনের উন্নতির চেষ্টা বন্ধ করে দেওয়া নয়। একজন মানুষ নিজের কর্তব্যে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন এবং একই সঙ্গে বর্তমান জীবনের জন্য অন্তরে কৃতজ্ঞ ও শান্ত থাকতে পারেন। অসন্তুষ্ট মানুষ মনে করেন ভবিষ্যতে আরও কিছু অর্জন করলেই তিনি সুখী হবেন। ফলে তাঁর সুখ সবসময় ভবিষ্যতের হাতে বন্দী থাকে। কিন্তু সন্তুষ্ট মানুষ বুঝতে পারেন যে প্রচেষ্টা তাঁর কর্তব্য, ফল সম্পূর্ণ তাঁর নিয়ন্ত্রণে নয়। তাই তিনি যা কিছু ন্যায়সঙ্গতভাবে লাভ করেন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা খুঁজে পান এবং যা এখনও লাভ করেননি তার জন্য নিজের অন্তরের শান্তিকে বিসর্জন দেন না। এই কারণে সন্তুষ্টি গীতার দৃষ্টিতে নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং আকাঙ্ক্ষার উপর আত্মনিয়ন্ত্রণ।

যেন কেনচিত্ শব্দগুচ্ছের অর্থ যা কিছু দ্বারা বা যা কিছু প্রাপ্ত হয় তার দ্বারা। এর সঙ্গে সন্তুষ্ট শব্দটি যুক্ত হয়ে একটি গভীর শিক্ষা তৈরি করেছে। মানুষ সাধারণত নিজের পছন্দমতো সবকিছু না পেলে অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু গীতার ভক্ত জানেন যে জীবন সবসময় নিজের ইচ্ছামতো চলে না। কখনো প্রাচুর্য আসে, কখনো সীমাবদ্ধতা আসে, কখনো সম্মান আসে এবং কখনো অবহেলা আসে। এই পরিবর্তনের মধ্যেও যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের শান্তি বজায় রাখতে পারেন তিনি ধীরে ধীরে বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনেন। তবে এর অর্থ অন্যায়, অশুভ বা অধর্মকে নির্বিচারে মেনে নেওয়া নয়। এর অর্থ হলো ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রাপ্ত জীবনের পরিস্থিতির প্রতি অকারণ অভিযোগ ও অতৃপ্তির দাস না হওয়া।

এরপর এসেছে অনিকেতঃ। শব্দটি অ এবং নিকেত এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। নিকেত অর্থ বাসস্থান বা আশ্রয় এবং অ অর্থ অভাব বা অনুপস্থিতির ভাব প্রকাশ করে। আক্ষরিক অর্থে অনিকেত এমন একজনকে বোঝায় যার নির্দিষ্ট আবাস নেই। কিন্তু গীতার গভীর অর্থে অনিকেত হওয়া মানে কেবল গৃহহীন হওয়া নয়। এটি বাহ্যিক আশ্রয়ের প্রতি অনাসক্তির প্রতীক। একজন মানুষ বাড়িতে থাকতে পারেন, পরিবার নিয়ে থাকতে পারেন, সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন এবং সামাজিক জীবন যাপন করতে পারেন, তবুও তিনি অনিকেত হতে পারেন যদি এসবকিছুকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বা নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি মনে না করেন। অনিকেত ভাবের অর্থ হলো পৃথিবীতে থাকা কিন্তু পৃথিবীর বস্তুগত আশ্রয়ের মধ্যে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে বন্দী না করা। বাড়ি থাকবে কিন্তু বাড়ি যেন হৃদয়ের কারাগার না হয়। সম্পদ থাকবে কিন্তু সম্পদ যেন আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি না হয়। সম্পর্ক থাকবে কিন্তু সম্পর্ক যেন আসক্তির শৃঙ্খলে পরিণত না হয়।

স্থিরমতিঃ শব্দটি গঠিত হয়েছে স্থির এবং মতি এই দুই অংশের সমন্বয়ে। স্থির অর্থ অচঞ্চল, দৃঢ় ও অবিচল এবং মতি অর্থ বুদ্ধি, চিন্তা বা সিদ্ধান্তশক্তি। তাই স্থিরমতি সেই ব্যক্তি যার বুদ্ধি পরিস্থিতির পরিবর্তনে সহজে বিচলিত হয় না। আজ কেউ প্রশংসা করল বলে তিনি এক ধরনের সিদ্ধান্ত নেন এবং কাল কেউ নিন্দা করল বলে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত নেন এমন ব্যক্তি স্থিরমতি নন। স্থিরমতি ব্যক্তি সত্য, ন্যায়, কর্তব্য ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মন আবেগ অনুভব করে কিন্তু আবেগ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না। তিনি দুঃখ পান কিন্তু দুঃখে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না। তিনি আনন্দিত হন কিন্তু আনন্দে নিজের বিবেক হারান না। এই স্থিরতা মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

শ্লোকটির শেষের দিকে এসেছে ভক্তিমান্ শব্দটি। ভক্তি শব্দের সঙ্গে মতুপ্ প্রত্যয়ের যোগে ভক্তিমান্ গঠিত হয়েছে। এর অর্থ যার মধ্যে ভক্তি রয়েছে। কিন্তু এখানে ভক্তি কেবল ধর্মীয় আচরণ বা আবেগের নাম নয়। ভক্তি হলো ঈশ্বরের প্রতি গভীর প্রেম, আস্থা, শ্রদ্ধা এবং আত্মনিবেদনের অবস্থা। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অনেক ধর্মীয় কাজ করতে পারেন কিন্তু তাঁর অন্তরে যদি অহংকার, বিদ্বেষ, লোভ ও প্রতিহিংসা প্রবল থাকে তাহলে সেই ভক্তি এখনও পরিপূর্ণ হয়নি। গীতার ভক্তির আদর্শ মানুষের চরিত্রকে রূপান্তরিত করে। প্রকৃত ভক্তি মানুষের অহংকারকে নম্রতায়, অস্থিরতাকে স্থিরতায়, আকাঙ্ক্ষাকে সন্তুষ্টিতে এবং আসক্তিকে অনাসক্তিতে রূপান্তরিত করে।

এই শ্লোকের মধ্যে একটি অত্যন্ত সুন্দর অন্তর্গত ক্রম লক্ষ করা যায়। প্রথমে বলা হয়েছে তুল্যনিন্দাস্তুতিঃ, অর্থাৎ মানুষ অন্যের প্রশংসা ও নিন্দার দাস নয়। তারপর বলা হয়েছে মৌনী, অর্থাৎ সে নিজের বাক্যের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। এরপর বলা হয়েছে সন্তুষ্টঃ, অর্থাৎ সে অসীম আকাঙ্ক্ষার দাস নয়। তারপর অনিকেতঃ, অর্থাৎ সে বাহ্যিক আশ্রয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়। এরপর স্থিরমতিঃ, অর্থাৎ তার বুদ্ধি স্থির। সবশেষে ভক্তিমান্, অর্থাৎ তার অন্তর ঈশ্বরের প্রতি প্রেমে প্রতিষ্ঠিত। এই ক্রমটি মানুষের অন্তর্জীবনের একটি সম্পূর্ণ রূপান্তরের পথকে প্রকাশ করে। সামাজিক মূল্যায়নের দাসত্ব থেকে বাকসংযমের দিকে, বাকসংযম থেকে সন্তুষ্টির দিকে, সন্তুষ্টি থেকে অনাসক্তির দিকে, অনাসক্তি থেকে স্থিরবুদ্ধির দিকে এবং স্থিরবুদ্ধি থেকে গভীর ভক্তির দিকে মানুষ এগিয়ে যায়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি মানুষের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষ কি কেবল অন্যের চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি। নাকি তার অস্তিত্বের আরও গভীর কোনো সত্য রয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে নিন্দা ও প্রশংসা উভয়ই পরিবর্তনশীল জগতের ঘটনা। আজ যে প্রশংসা করছে কাল সে নিন্দা করতে পারে। আজ যে নিন্দা করছে কাল সে প্রশংসা করতে পারে। কিন্তু চৈতন্যস্বরূপ আত্মা এই পরিবর্তনের সাক্ষী। তাই তুল্যনিন্দাস্তুতি মানুষের প্রকৃত আত্মপরিচয়কে বাহ্যিক মতামত থেকে পৃথক করার শিক্ষা দেয়। সাংখ্য ও যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও মন নানা বৃত্তির দ্বারা আন্দোলিত হয়। প্রশংসা একটি বৃত্তি সৃষ্টি করে এবং নিন্দা আরেকটি বৃত্তি সৃষ্টি করে। স্থিরমতি ব্যক্তি এই বৃত্তিগুলোর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না। ভক্তিদর্শনের দৃষ্টিতে এই স্থিরতার চূড়ান্ত ভিত্তি হলো ঈশ্বরের প্রতি প্রেমময় আত্মসমর্পণ।

প্রতীকী দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নিন্দা ও স্তুতি মানুষের সামাজিক আয়নার প্রতীক। মানুষ অন্যের চোখে নিজের একটি পরিচয় দেখতে চায়। কিন্তু গীতা শেখায় যে নিজের প্রকৃত পরিচয় যেন সেই আয়নার উপর নির্ভর না করে। মৌনতা অন্তরের পরিশুদ্ধতার প্রতীক। সন্তুষ্টি অন্তরের পূর্ণতার প্রতীক। অনিকেত ভাব বাহ্যিক আশ্রয়ের প্রতি অনাসক্তির প্রতীক। স্থিরমতি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের প্রতীক। আর ভক্তি হলো সেই কেন্দ্রের সঙ্গে ঈশ্বরীয় সম্পর্কের প্রতীক। এইভাবে শ্লোকটি মানুষের বাহ্যিক জীবন থেকে অন্তর্জীবনের দিকে একটি যাত্রার প্রতিচিত্র হয়ে ওঠে।

বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ অত্যন্ত গভীর। একজন শিক্ষক যদি ছাত্রদের প্রশংসায় নিজেকে অসাধারণ মনে করেন এবং সমালোচনায় নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ ভাবেন তবে তাঁর আত্মমূল্য অন্যের হাতে চলে যায়। কিন্তু তিনি যদি প্রশংসার মধ্যে সত্যটুকু গ্রহণ করেন এবং নিন্দার মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন খুঁজে নেন, অথচ নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হন, তাহলে তিনি তুল্যনিন্দাস্তুতির আদর্শের দিকে এগিয়ে যান। একইভাবে একজন ধনী মানুষ যদি সম্পদ হারানোর ভয়ে সারাক্ষণ অস্থির থাকেন তবে সম্পদ তাঁর আশ্রয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে যিনি সম্পদ ব্যবহার করেন কিন্তু সম্পদকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করেন না তিনি অনিকেত ভাবের কাছাকাছি অবস্থান করেন। একজন প্রকৃত স্থিরমতি ব্যক্তি জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়কেই গ্রহণ করেন এবং উভয় অবস্থার মধ্যেই নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে ধরে রাখেন।

এই ভক্তকে একটি গভীর সমুদ্রের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। সমুদ্রের উপরিভাগে ঢেউ ওঠে, ঝড় হয়, বাতাস প্রবল হয় এবং জল অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু গভীরতার দিকে গেলে সেই অস্থিরতা অনেকটাই প্রশমিত হয়। মানুষের জীবনও তেমন। বাহ্যিক জীবনে প্রশংসা, নিন্দা, লাভ, ক্ষতি, সুখ, দুঃখ, সম্মান ও অপমানের ঢেউ উঠতেই পারে। কিন্তু যে মানুষের অন্তর ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত, তার চেতনার গভীর কেন্দ্র সহজে ভেঙে পড়ে না। এই গভীর কেন্দ্রই স্থিরমতির প্রকৃত শক্তি।

এই কারণে তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্মে প্রিয়ো নরঃ শ্লোকটি কেবল একজন সাধকের প্রশংসা নয়। এটি মানুষের অন্তরকে মুক্ত করার একটি গভীর শিক্ষা। এখানে স্বাধীনতা বলতে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়নি। বরং মানুষের মতামতের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, অপ্রয়োজনীয় বাক্যের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, বস্তুগত আশ্রয়ের অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়া এবং অস্থির চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। আর এই মুক্তির চূড়ান্ত আশ্রয় হলো ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি।

শ্লোকটির শেষ বাক্য মে প্রিয়ো নরঃ অর্থাৎ সেই মানুষ আমার প্রিয়। এই বাক্যটির মধ্যেই সমগ্র শিক্ষার একটি আবেগময় পরিণতি রয়েছে। ঈশ্বরের কাছে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা বা সাফল্যই মুখ্য নয়। মুখ্য হলো অন্তরের গুণ। যে মানুষ নিন্দায় ভেঙে পড়ে না, প্রশংসায় অহংকারী হয় না, বাক্যে সংযত, প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট, বাহ্যিক আশ্রয়ে অনাসক্ত, বুদ্ধিতে স্থির এবং হৃদয়ে ভক্তিসম্পন্ন, সেই মানুষই ঈশ্বরের কাছে প্রিয়। এখানে ভক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন গুণ নয়। বরং ভক্তিই অন্য সব গুণকে একটি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের সামনে এক অসাধারণ অন্তর্জাগরণের আদর্শ স্থাপন করে। তুল্যনিন্দাস্তুতি আমাদের শেখায় অন্যের মতামতের ঊর্ধ্বে অন্তরের ভারসাম্য অর্জন করতে। মৌনী শেখায় বাক্যের সংযম। সন্তুষ্টি শেখায় প্রাপ্তির মধ্যে তৃপ্তি ও কৃতজ্ঞতা। অনিকেত ভাব শেখায় বাহ্যিক আশ্রয়ের প্রতি অনাসক্তি। স্থিরমতি শেখায় জীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও সত্য ও কর্তব্যে অবিচল থাকতে। আর ভক্তিমান শব্দটি এই সমস্ত গুণকে ঈশ্বরের প্রতি প্রেমময় আত্মসমর্পণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো যে মানুষ যখন প্রশংসা ও নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে, আকাঙ্ক্ষার অস্থিরতা অতিক্রম করে, বাহ্যিক আশ্রয়ের প্রতি আসক্তি কমিয়ে নিজের বুদ্ধিকে স্থির করে এবং ঈশ্বরের প্রতি গভীর প্রেমে নিজেকে নিবেদন করে, তখন তার মধ্যে এমন এক অন্তর্নিহিত স্বাধীনতা জন্ম নেয় যা বাহ্যিক পরিবর্তন সহজে কেড়ে নিতে পারে না। সেই স্বাধীনতার মধ্যেই শান্তি, সেই শান্তির মধ্যেই স্থিরতা, সেই স্থিরতার মধ্যেই জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানের গভীরতম হৃদয়ে রয়েছে ভক্তি। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এমন ভক্তই তাঁর প্রিয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি