ভগবদ্গীতা ১২.২ — অনন্য ভক্তির শ্রেষ্ঠতা
শ্রীভগবানুবাচ
ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুুক্তা উপাসতে।
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।২।।
অনুবাদঃ শ্রীভগবান বললেন-যাঁরা তাঁদের মনকে আমার সবিশেষ রূপে নিবিষ্ট করনে এবং অপ্রাকৃত শ্রদ্ধা সহকারে নিরন্তর আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকটি ভক্তিযোগের একটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন সাধকের কথা বলেছেন যিনি নিজের মনকে সম্পূর্ণভাবে তাঁর মধ্যে নিবিষ্ট করে সর্বদা তাঁর সঙ্গে যুক্ত থেকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর উপাসনা করেন। শ্লোকটির সংস্কৃত পাঠ হলো ময়্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ। এর সহজ অর্থ হলো যারা আমার মধ্যে মনকে সম্পূর্ণভাবে স্থাপন করে আমাকে সর্বদা উপাসনা করে এবং পরম শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ হয়ে আমার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত থাকে, আমার মতে তারাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠভাবে যোগযুক্ত। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যেই ভক্তি, একাগ্রতা, আত্মসমর্পণ এবং ঈশ্বরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
ময়্যাবেশ্য শব্দটির মধ্যে শ্লোকটির মূল সাধনপদ্ধতি নিহিত আছে। ময়ি অর্থ আমার মধ্যে এবং আবেশ্য অর্থ প্রবেশ করিয়ে, নিবিষ্ট করে বা স্থাপন করে। আবেশ্য শব্দটি সংস্কৃত বিশ্ ধাতুর সঙ্গে আ উপসর্গের সংযোগে গঠিত এবং এর মধ্যে কোনো কিছুর মধ্যে প্রবেশ করা বা সম্পূর্ণভাবে স্থাপন করার ভাব রয়েছে। তাই ময়্যাবেশ্য মনো বলতে কেবল ঈশ্বরকে মাঝে মাঝে স্মরণ করার কথা বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো নিজের মনকে ঈশ্বরচেতনার মধ্যে এমনভাবে স্থাপন করা যাতে চিন্তা, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের উদ্দেশ্য ক্রমশ ঈশ্বরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। মানুষ সাধারণত নিজের মনকে অসংখ্য বিষয়ের মধ্যে ছড়িয়ে রাখে। কখনো সম্পদের চিন্তা, কখনো সম্মানের চিন্তা, কখনো সম্পর্কের চিন্তা, কখনো ভবিষ্যতের উদ্বেগ এবং কখনো অতীতের স্মৃতি তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো এই বিচ্ছিন্ন মনকে একটি পরম কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সেই কেন্দ্র হলো ঈশ্বর।
মনো শব্দটি মনঃ থেকে এসেছে এবং এর মূল সম্পর্ক সংস্কৃত মন্ ধাতুর সঙ্গে, যার অর্থ চিন্তা করা, ভাবা বা মনন করা। ভারতীয় দর্শনে মন কেবল চিন্তার একটি যন্ত্র নয়, এটি মানুষের অন্তর্জগতের এমন একটি শক্তি যার মাধ্যমে মানুষ সংকল্প, বিকল্প, আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি এবং স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। মানুষ যেদিকে নিজের মনকে বারবার স্থাপন করে, তার জীবনও ধীরে ধীরে সেই দিকের রূপ ধারণ করে। এই কারণে ময়্যাবেশ্য মনো বাক্যটি মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। মন যেখানে নিবিষ্ট হয়, জীবন সেখানেই প্রবাহিত হয়। যদি মন কেবল ইন্দ্রিয়সুখের মধ্যে নিবিষ্ট থাকে, তবে জীবন ভোগের দিকে যায়। যদি মন ভয় ও দুশ্চিন্তায় নিবিষ্ট থাকে, তবে জীবন অস্থির হয়ে ওঠে। আর যদি মন পরম সত্য, ঈশ্বর, প্রেম, সত্য এবং কল্যাণের মধ্যে নিবিষ্ট হয়, তবে মানুষের অন্তর্জগতও ধীরে ধীরে সেই গুণে রূপান্তরিত হতে থাকে।
এরপর এসেছে মাং শব্দটি, যা মাম্ শব্দের সন্ধিজাত রূপ এবং এর অর্থ আমাকে। এখানে উপাসনার বিষয় কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। শ্রীকৃষ্ণ নিজেকেই উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে নির্দেশ করেছেন। এর ফলে ভক্তির মধ্যে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ঈশ্বর কেবল দূরবর্তী কোনো দার্শনিক সত্য নন। তিনি ভক্তের কাছে আশ্রয়, প্রিয়, উপাস্য এবং জীবনের সর্বোচ্চ কেন্দ্র। এই সম্পর্কের মধ্যেই ভক্তিযোগের বিশেষ সৌন্দর্য নিহিত। জ্ঞান যেখানে সত্যকে উপলব্ধি করতে চায়, ভক্তি সেখানে সেই সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। ফলে ঈশ্বরের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক কেবল চিন্তার বিষয় থাকে না, তা হৃদয়ের গভীর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
নিত্যযুক্তা শব্দটি এই সাধনার ধারাবাহিকতার কথা বলে। নিত্য অর্থ সর্বদা, চিরস্থায়ী বা অবিরত এবং যুক্ত শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত হওয়া বা যোগ স্থাপন করা। সেই অর্থে নিত্যযুক্তা হলো যারা সর্বদা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত। এখানে নিত্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিকতা কোনো বিশেষ সময়ের অনুভূতি নয়। কেবল পূজার সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করা এবং জীবনের অন্যান্য সময় তাঁকে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া এই শ্লোকের নিত্যযুক্ত ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিত্যযুক্ত সাধক জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতির মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করেন। আনন্দের সময় তিনি ঈশ্বরকে স্মরণ করেন, দুঃখের সময়ও তাঁকে স্মরণ করেন, সাফল্যের সময় তাঁকে স্মরণ করেন এবং ব্যর্থতার সময়ও তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করেন। এইভাবে ঈশ্বরস্মরণ জীবনের বিচ্ছিন্ন একটি কাজ না হয়ে জীবনের অন্তর্নিহিত চেতনা হয়ে ওঠে।
উপাসতে শব্দটির মধ্যেও একটি অসাধারণ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। উপাসনা শব্দটি উপ এবং আস্ এই দুই অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। উপ অর্থ নিকট এবং আস্ অর্থ বসা বা অবস্থান করা। সেই অর্থে উপাসনার প্রাথমিক ভাব হলো নিকটে অবস্থান করা। পরবর্তীকালে এর অর্থ হয়েছে পূজা করা, আরাধনা করা, ধ্যান করা এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করা। এই ব্যুৎপত্তি আমাদের বোঝায় যে প্রকৃত উপাসনা কেবল বাহ্যিক আচার নয়। উপাসনার গভীর অর্থ হলো ঈশ্বরের নিকটে থাকা। কেউ মন্দিরে গিয়ে পূজা করেও অন্তরে ঈশ্বর থেকে দূরে থাকতে পারে। আবার কেউ বাহ্যিকভাবে কোনো বিশেষ আচার পালন না করেও নিজের কর্ম, চিন্তা ও হৃদয়কে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত করে প্রকৃত উপাসনার অবস্থায় থাকতে পারে। তাই উপাসনার প্রকৃত মূল্য বাহ্যিক রূপের চেয়ে অন্তরের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এরপর এসেছে শ্রদ্ধয়া শব্দটি। শ্রদ্ধা আধ্যাত্মিক জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। শ্রদ্ধা সাধারণ অন্ধ বিশ্বাস নয়। শ্রদ্ধা হলো এমন গভীর অন্তর্গত আস্থা যা মানুষকে সত্যের অনুসন্ধানে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সাধনার পথে স্থির থাকতে সাহায্য করে। মানুষ যখন কোনো উচ্চতর সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তখন সে সেই সত্যকে নিজের জীবনে গ্রহণ করার চেষ্টা করে। এখানে শ্রদ্ধয়া শব্দটি তৃতীয়া একবচন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং অর্থ হলো শ্রদ্ধার সঙ্গে বা গভীর আস্থার সঙ্গে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ শ্রদ্ধার কথা বলেননি। তিনি বলেছেন পরয়া শ্রদ্ধয়া। পরয়া অর্থ পরম, শ্রেষ্ঠ বা সর্বোচ্চ। অর্থাৎ এমন শ্রদ্ধা যা সাময়িক আবেগ নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম অংশ থেকে উদ্ভূত।
শ্রদ্ধা এবং মনকে একত্রে দেখলে শ্লোকটির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক প্রকাশিত হয়। মানুষের মন কোনো বিষয়কে দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করতে পারে তখনই, যখন হৃদয় সেই বিষয়কে সত্য বলে গ্রহণ করে। কেবল বুদ্ধি দিয়ে ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তা করা এক বিষয় এবং হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদন করা আরেক বিষয়। শ্রদ্ধা সেই ব্যবধানকে পূরণ করে। শ্রদ্ধা মানুষের চিন্তাকে হৃদয়ের সঙ্গে এবং হৃদয়কে সাধনার সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে ভক্তি কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে না এবং জ্ঞানও কেবল বুদ্ধিগত ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকে না। উভয়ই জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
উপেতাঃ শব্দটি বোঝায় কোনো গুণে পরিপূর্ণ হওয়া বা কোনো বিশেষ অবস্থার দ্বারা সমন্বিত হওয়া। শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাঃ অর্থ হলো যারা পরম শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ। এখানে বোঝানো হচ্ছে যে প্রকৃত ভক্তির মধ্যে গভীর আস্থা থাকা আবশ্যক। যার মনে ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, তার উপাসনা সহজেই যান্ত্রিক আচারে পরিণত হতে পারে। কিন্তু শ্রদ্ধা যখন অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন উপাসনা প্রাণ পায়। তখন ঈশ্বরস্মরণ কেবল কর্তব্য থাকে না, তা ভালোবাসায় পরিণত হয়।
শ্লোকের শেষ অংশ তে মে যুক্ততমা মতাঃ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তে অর্থ তারা, মে অর্থ আমার মতে এবং যুক্ততমা অর্থ সর্বাপেক্ষা অধিক যোগযুক্ত বা সর্বোত্তমভাবে সংযুক্ত। যুক্ত শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ সংযোগ বা যোগ। এর সঙ্গে তম প্রত্যয় যুক্ত হয়ে সর্বোচ্চ মাত্রার অর্থ প্রকাশ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ তাই বলছেন যে যারা মনকে তাঁর মধ্যে নিবিষ্ট করে, সর্বদা তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর উপাসনা করে, তাঁর মতে তারাই যুক্ততম। এখানে যোগ বলতে কেবল শরীরচর্চা বা আসন বোঝানো হয় না। এখানে যোগ হলো চেতনার সঙ্গে পরম সত্যের সংযোগ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে ঈশ্বরের প্রতি একাগ্র ভক্তি মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করে এবং একাগ্র করে। সেই একাগ্রতা পরবর্তীকালে আত্মস্বরূপের অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত জীব ও ব্রহ্মের অভিন্ন সত্য উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে জীব ঈশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত হলেও ঈশ্বরের সঙ্গে তার একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক বজায় থাকে এবং ভক্তি ও আত্মসমর্পণ মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর এবং জীবের মধ্যে চিরন্তন পার্থক্য রয়েছে এবং তাই ঈশ্বরের প্রতি অনন্য ভক্তি জীবের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এই বিভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যার মধ্যেও একটি মৌলিক ঐক্য রয়েছে। সেই ঐক্য হলো মানুষের মনকে উচ্চতর সত্যের দিকে নিবিষ্ট করা এবং নিজের সীমাবদ্ধ অহংকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করে পরম সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা।
প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত গভীর। এখানে মন মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক, আবেশ্য সেই অন্তর্জগতকে একটি কেন্দ্রে স্থাপন করার প্রতীক এবং ময়ি পরম সত্যের প্রতীক। নিত্যযুক্তা মানুষের আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতার প্রতীক এবং শ্রদ্ধা হলো সেই অন্তর্গত শক্তির প্রতীক যা মানুষকে অদৃশ্য সত্যের প্রতি আত্মনিবেদনে সক্ষম করে। যুক্ততমা হলো সেই চূড়ান্ত অবস্থার প্রতীক যেখানে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং কর্ম একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছড়িয়ে থাকা সূর্যের আলো যেমন একটি উত্তল লেন্সের মাধ্যমে একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হলে তীব্র শক্তি অর্জন করে, তেমনি মানুষের বিচ্ছিন্ন মন যখন ঈশ্বরচেতনার মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তার অন্তর্নিহিত শক্তিও অধিকতর সুসংহত হয়।
বাস্তব জীবনের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার গুরুত্ব অসীম। একজন মানুষ যদি সারাক্ষণ অর্থ, সম্মান, প্রতিযোগিতা এবং নিজের ইচ্ছাপূরণের চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, তবে তার সমগ্র জীবন ধীরে ধীরে সেই আকাঙ্ক্ষাগুলোর চারপাশে আবর্তিত হয়। আবার একজন মানুষ যদি সত্য, প্রেম, করুণা, ন্যায়, ঈশ্বর এবং আত্মিক কল্যাণকে নিজের জীবনের কেন্দ্র করে তোলে, তাহলে তার সিদ্ধান্ত ও আচরণের মধ্যেও সেই মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই কারণে মানুষের জীবন পরিবর্তনের জন্য বাহ্যিক পরিস্থিতি সবসময় প্রথমে পরিবর্তন করতে হয় না। অনেক সময় পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো মনের কেন্দ্র পরিবর্তন করা।
এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরভক্তি কোনো পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়। বরং এটি জীবনের প্রতিটি কর্মকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করার পথ। একজন সত্যিকারের ভক্ত সংসার, কর্ম, সম্পর্ক এবং দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন না। বরং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। তিনি নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে শেখেন, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করতে শেখেন এবং নিজের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করতে শেখেন। তখন জীবন নিজেই উপাসনার একটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, ময়্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ শ্লোকটি মানুষের মনের প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। মানুষ তার মনকে যেখানে স্থাপন করে, তার জীবনও ধীরে ধীরে সেই রূপ ধারণ করে। তাই মনকে পরম সত্যের মধ্যে নিবিষ্ট করা, ঈশ্বরের সঙ্গে নিত্য সম্পর্ক স্থাপন করা, উপাসনাকে জীবনের অন্তর্গত অংশে পরিণত করা এবং পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই সাধনায় অবিচল থাকা হলো এই শিক্ষার মূল কথা। ময়্যাবেশ্য আমাদের শেখায় মনকে কোথায় স্থাপন করতে হবে। নিত্যযুক্তা শেখায় সেই সংযোগকে কীভাবে অবিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। উপাসতে শেখায় ঈশ্বরের সান্নিধ্যকে জীবনের সাধনা করতে। শ্রদ্ধয়া পরয়া শেখায় হৃদয়ের গভীরতম আস্থা নিয়ে সেই পথে চলতে। আর যুক্ততমা মতাঃ ঘোষণা করে যে এমন সাধকই ঈশ্বরের সঙ্গে সর্বোচ্চভাবে যুক্ত। এই অর্থে শ্লোকটি কেবল ভক্তির প্রশংসা নয়, এটি মানুষের সমগ্র চেতনাকে এক পরম কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করার একটি গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!