সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১২.৪ — আত্মসংযম, সমদৃষ্টি ও সর্বভূতহিত

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়প্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ। তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।৪।।
সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়প্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ। 
তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।৪।।

অনুবাদঃ যাঁরা সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে, সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন হয়ে এবং সর্বভূতের কল্যাণে রত হয়ে আমার অক্ষর, অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বত্রগ, অচিন্ত্য, কুটস্থ, অচল, ধ্রুব ও নির্বিশেষ স্বরূপকে উপাসনা করেন, তাঁরা অবশেষে আমকেই প্রাপ্ত হন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অব্যক্ত ও নিরাকার পরম সত্যের সাধকদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ। এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের আত্মসংযম, সমদৃষ্টি, সর্বজনীন কল্যাণবোধ এবং পরম সত্য লাভের একটি গভীর আধ্যাত্মিক পথ একত্রিত হয়েছে। শ্লোকটি শুধু একটি ধর্মীয় সাধনার নির্দেশ নয়। এর মধ্যে মানুষের চরিত্র গঠন, মানসিক ভারসাম্য, নৈতিক জীবন, মানবপ্রেম এবং আত্মোপলব্ধির একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে।

সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং শব্দটির মধ্যে প্রথমেই পাওয়া যায় আত্মসংযমের শিক্ষা। সন্নিয়ম্য শব্দটি সংস্কৃত যম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। যম্ ধাতুর অর্থ সংযত করা, নিয়ন্ত্রণ করা, নিবৃত্ত করা বা শাসনের মধ্যে রাখা। এর সঙ্গে সম্যক অর্থবোধক ভাব যুক্ত হয়ে এমন এক সংযমের ধারণা তৈরি হয়েছে যা অসম্পূর্ণ বা বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং যথাযথ ও সচেতন নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। ইন্দ্রিয়গ্রাম শব্দে ইন্দ্রিয় এবং গ্রাম এই দুটি ধারণা রয়েছে। ইন্দ্রিয় বলতে মানুষের জ্ঞান ও অনুভূতির উপকরণকে বোঝানো হয় এবং গ্রাম অর্থ সমষ্টি বা গোষ্ঠী। ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাম বলতে ইন্দ্রিয়সমূহের সমষ্টি বোঝায়। সমগ্র সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং পদটির অর্থ দাঁড়ায় ইন্দ্রিয়সমূহকে যথাযথভাবে সংযত করে বা নিয়ন্ত্রণে রেখে।

এই ইন্দ্রিয়সংযমের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। ইন্দ্রিয়সংযম বলতে ইন্দ্রিয়কে ধ্বংস করা বা জগতের সমস্ত আনন্দ থেকে নিজেকে জোর করে বিচ্ছিন্ন করে রাখা বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো ইন্দ্রিয় যেন মানুষের প্রভু না হয়ে মানুষের সচেতন বুদ্ধির অধীন থাকে। চোখ সুন্দর কিছু দেখলে আকৃষ্ট হবে, কান মধুর শব্দ শুনলে আনন্দিত হবে, জিহ্বা সুস্বাদু খাদ্যের প্রতি আকর্ষিত হবে এবং মন নানা অভিজ্ঞতার দিকে ছুটে যাবে। এগুলো মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু কোনো আকাঙ্ক্ষা যখন বিচারবুদ্ধিকে অতিক্রম করে মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন স্বাধীনতা নষ্ট হয়। গীতার ইন্দ্রিয়সংযমের শিক্ষা মানুষকে সেই পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার শিক্ষা।

এরপর আসে সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ। সর্বত্র অর্থ সকল স্থানে বা সকল পরিস্থিতিতে এবং সমবুদ্ধি অর্থ সমান ও ভারসাম্যপূর্ণ বুদ্ধি। সমবুদ্ধি এমন এক মানসিক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে ব্যক্তি নিজের পছন্দ অপছন্দ, লাভ ক্ষতি, সুখ দুঃখ, সম্মান অপমান কিংবা প্রিয় অপ্রিয়ের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হন না। এর অর্থ এই নয় যে জ্ঞানী ব্যক্তি কোনো পার্থক্য বুঝতে পারেন না। বরং তিনি পার্থক্য বুঝেও অন্তরের ন্যায়বোধ ও ভারসাম্য হারান না। তিনি নিজের স্বার্থের কারণে সত্যকে বিকৃত করেন না এবং নিজের অপছন্দের কারণে অন্যের মর্যাদা অস্বীকার করেন না।

মানুষের অধিকাংশ মানসিক অশান্তির পেছনে রয়েছে পক্ষপাত এবং অতিরিক্ত আসক্তি। যে বিষয় আমাদের পছন্দ, তার প্রতি আমরা অন্ধভাবে আকৃষ্ট হই এবং যে বিষয় অপছন্দ, তার প্রতি অকারণে বিরূপ হয়ে উঠি। ফলে আমাদের বিচারবুদ্ধি বাস্তবতার পরিবর্তে আবেগের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সমবুদ্ধি সেই আবেগকে অস্বীকার করে না, কিন্তু আবেগের উপর সচেতনতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সুখ এলে মানুষ যেন অহংকারে অন্ধ না হয় এবং দুঃখ এলে যেন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়ে, এই অন্তরের ভারসাম্যই সমবুদ্ধির অন্যতম লক্ষণ।

শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব। তে অর্থ তাঁরা, প্রাপ্নুবন্তি অর্থ তাঁরা লাভ করেন বা প্রাপ্ত হন এবং মামেব অর্থ আমাকেই। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করছেন যে এমন সাধকেরা তাঁকেই লাভ করেন। এই লাভ কোনো সাধারণ বস্তু লাভের মতো নয়। এটি পরম সত্যের উপলব্ধি। আধ্যাত্মিক অর্থে ঈশ্বরকে লাভ করা মানে ঈশ্বর সম্পর্কে কোনো বাহ্যিক ধারণা অর্জন করা নয়, বরং চেতনার এমন একটি অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বের গভীরতম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন।

শ্লোকটির শেষ অংশ সর্বভূতহিতে রতাঃ এর মধ্যে এই উপলব্ধির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশিত হয়েছে। সর্ব অর্থ সকল, ভূত অর্থ সকল জীব বা সৃষ্ট সত্তা এবং হিত অর্থ কল্যাণ, মঙ্গল বা উপকার। রত শব্দটি রম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে আনন্দের সঙ্গে নিমগ্ন থাকার ভাব রয়েছে। ফলে সর্বভূতহিতে রতাঃ বলতে এমন মানুষকে বোঝায় যিনি সকল জীবের কল্যাণে আনন্দের সঙ্গে নিয়োজিত থাকেন। এখানে শুধু অন্যের উপকার করার কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে কল্যাণের কাজে রত থাকার কথা। অর্থাৎ অন্যের মঙ্গল করা তাঁর জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও সাধনার অংশ হয়ে যায়।

এই বিষয়টি শ্লোকটির সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি। আধ্যাত্মিক সাধনা যদি মানুষকে শুধু নিজের মুক্তির কথা ভাবতে শেখায় এবং অন্যের দুঃখের প্রতি তাকে উদাসীন করে তোলে, তাহলে সেই সাধনা অসম্পূর্ণ। সত্যিকারের আত্মজ্ঞান মানুষের হৃদয়কে সংকুচিত করে না, বরং প্রসারিত করে। নিজের সুখের সঙ্গে অন্যের সুখের সম্পর্ক অনুভব করা, নিজের জীবনের মূল্য উপলব্ধি করার পাশাপাশি অন্য জীবনের মূল্য উপলব্ধি করা এবং নিজের কল্যাণের পাশাপাশি সকলের কল্যাণ কামনা করা হলো চেতনার বিস্তারের লক্ষণ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটির মধ্যে একটি গভীর ধারাবাহিকতা রয়েছে। ইন্দ্রিয়সংযম থেকে অন্তরের স্থিরতা জন্ম নেয়। অন্তরের স্থিরতা থেকে সমবুদ্ধির বিকাশ ঘটে। সমবুদ্ধি থেকে পক্ষপাতহীন দৃষ্টি সৃষ্টি হয়। পক্ষপাতহীন দৃষ্টি মানুষের মধ্যে সর্বজনীন সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে। আর সেই সহমর্মিতা মানুষকে সকল জীবের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে শেখায়। তাই শ্লোকটি একদিকে আত্মসংযমের কথা বললেও অন্যদিকে তার পরিণতি হিসেবে মানবিকতা ও সর্বজনীন কল্যাণবোধকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে দেখলে সকল জীবের অন্তর্নিহিত আত্মতত্ত্ব এক। বাহ্যিকভাবে মানুষ, পশু, পাখি এবং অন্যান্য জীবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু পরম আত্মতত্ত্বের স্তরে বিভেদের সীমা অতিক্রম করে একতার উপলব্ধি করা যায়। এই কারণে সর্বত্র সমবুদ্ধি কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, বরং গভীর আত্মজ্ঞান থেকে উৎসারিত একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

ভক্তির দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও হৃদয়গ্রাহী। ঈশ্বরের প্রতি সত্যিকারের প্রেম যখন হৃদয়ে জন্ম নেয়, তখন ঈশ্বরের সৃষ্ট জীবের প্রতিও ভালোবাসা জন্ম নেয়। ফলে ঈশ্বরভক্তি এবং জীবের প্রতি মঙ্গলভাব পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে না। যে মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসার দাবি করে কিন্তু জীবের প্রতি ঘৃণা, নিষ্ঠুরতা ও অবজ্ঞায় পরিপূর্ণ, তার ভক্তি এখনো অন্তরের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সর্বভূতহিতে রত থাকার শিক্ষা তাই ভক্তির বাস্তব পরীক্ষা হিসেবেও দেখা যায়।

প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয়গ্রামকে মানুষের অন্তরের বিভিন্ন আকর্ষণের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। মানুষের মন একদিকে ভোগের দিকে যায়, অন্যদিকে সম্মানের দিকে ছুটে যায়, কখনো সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কখনো প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায় জ্বলে ওঠে। এই বহুমুখী টান মানুষের চেতনাকে বিচ্ছিন্ন করে। ইন্দ্রিয়সংযম সেই বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে একটি কেন্দ্রের অধীনে আনার প্রতীক। সমবুদ্ধি সেই কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যের প্রতীক এবং সর্বভূতহিত হলো সেই ভারসাম্যপূর্ণ চেতনার বাইরের জগতে প্রকাশ।

মানবজীবনে এই শিক্ষার ব্যবহার অসীম। কর্মক্ষেত্রে একজন মানুষ প্রতিযোগিতা করেও অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করতে পারেন। ব্যবসায় একজন ব্যক্তি লাভ করতে পারেন কিন্তু প্রতারণা বা অন্যের ক্ষতি করে নয়। একজন শিক্ষক নিজের সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর উন্নতিকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। একজন চিকিৎসক রোগীর প্রতি সহমর্মিতা নিয়ে কাজ করতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষ নিজের পরিবারকে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রতিবেশী, সমাজ এবং অন্যান্য জীবের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে পারেন। এই সব ক্ষেত্রেই ইন্দ্রিয়সংযম, সমবুদ্ধি এবং সর্বভূতহিতের শিক্ষা কার্যকর হতে পারে।

ইন্দ্রিয়সংযমকে বোঝার জন্য একজন দক্ষ সারথির উপমা দেওয়া যায়। রথের ঘোড়াগুলোকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলে তারা বিভিন্ন দিকে ছুটে যাবে এবং রথ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু দক্ষ সারথি তাদের শক্তিকে ধ্বংস করেন না। তিনি লাগাম ব্যবহার করে সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। মানুষের ইন্দ্রিয়ও তেমন। ইন্দ্রিয়কে নিস্তেজ করে দেওয়া নয়, বরং সচেতন বুদ্ধির দ্বারা তাদের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই প্রকৃত সংযম।

সমবুদ্ধির ক্ষেত্রেও একটি সুন্দর উপমা হলো স্থির জলের আয়না। জল যখন অস্থির থাকে, তখন তার মধ্যে কোনো প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু জল যখন শান্ত হয়, তখন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। মানুষের মনও তেমন। ক্রোধ, লোভ, ভয়, আসক্তি এবং অহংকারে মন অস্থির থাকলে বাস্তবতাকে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় না। সমবুদ্ধি সেই অন্তরের স্থিরতা সৃষ্টি করে যার মাধ্যমে মানুষ নিজের এবং অন্যের অবস্থাকে অধিক স্বচ্ছভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে শ্লোকটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আবেগীয় পরিপক্বতার একটি গভীর শিক্ষা দেয়। তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ না করে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষের অন্তর্গত শক্তির পরিচয়। প্রশংসা পেলে অতিরিক্ত অহংকারে ভেসে না যাওয়া এবং সমালোচনা পেলে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়া মানসিক ভারসাম্যের লক্ষণ। অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করে তার কল্যাণে এগিয়ে আসা সহমর্মিতার পরিচয়। এই তিনটি গুণ একত্রিত হলে মানুষের চরিত্র গভীর ও পরিণত হয়।

সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গুরুত্ব গভীর। মহৎ সাহিত্য সাধারণত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে। একজন কবির ব্যক্তিগত দুঃখ যখন সমগ্র মানবতার দুঃখের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন ব্যক্তিগত চেতনা সর্বজনীন চেতনার দিকে অগ্রসর হয়। সর্বভূতহিতের ধারণার মধ্যেও একই বিস্তার দেখা যায়। নিজের সীমিত স্বার্থ থেকে বেরিয়ে সকলের কল্যাণের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষের হৃদয়ের পরিধিকে প্রসারিত করে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে আধ্যাত্মিকতা জীবনের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ইন্দ্রিয়সংযম আমাদের নিজের সঙ্গে সম্পর্ককে শুদ্ধ করে। সমবুদ্ধি আমাদের চিন্তা ও বিচারকে শুদ্ধ করে। সর্বভূতহিত আমাদের অন্যের সঙ্গে সম্পর্ককে শুদ্ধ করে। আর এই তিনটির সমন্বয় মানুষের জীবনকে একটি উচ্চতর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করে।

অতএব সন্নিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ শ্লোকটি কেবল ইন্দ্রিয়সংযমের একটি নির্দেশ নয়। এটি মানুষের অন্তর থেকে সর্বজনীনতার দিকে যাত্রার একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। প্রথমে নিজেকে সংযত করতে হবে, তারপর নিজের বিচারকে সমতা ও ভারসাম্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং শেষে সেই পরিশুদ্ধ চেতনাকে সকল জীবের কল্যাণে নিবেদিত করতে হবে। নিজের উপর বিজয়, দৃষ্টির মধ্যে সমতা এবং হৃদয়ের মধ্যে সর্বজনীন মঙ্গলবোধ যখন একত্রিত হয়, তখন মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ সত্তাকে অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা আজও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। সত্যিকার আত্মজ্ঞান মানুষকে পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না। বরং পৃথিবীর সকল জীবের সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও গভীর, নির্মল এবং কল্যাণময় করে তোলে। আর সেই অবস্থাতেই আত্মসংযম সাধনায় পরিণত হয়, সমবুদ্ধি জ্ঞানে পরিণত হয় এবং সর্বভূতহিত ঈশ্বরপ্রেমের জীবন্ত প্রকাশ হয়ে ওঠে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি