ভগবদ্গীতা ১২.৫ — অব্যক্ত সাধনার কঠিন পথ
ক্লেশোহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্।
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে।।৫।।
অনুবাদঃ যাদের মন ভগবানের অব্যক্ত নির্বিশেষ রূপের প্রতি আসক্ত, তাদের ক্লেশ অধিকতর। কারণ, অব্যক্তের উপাসনার ফলে দেহধারী জীবদের কেবল দুঃখই লাভ হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক সাধনার প্রকৃতি এবং পরম সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে মানবমনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো “ক্লেশোহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্। অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে।।৫।। ” এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এমন সাধকদের কথা বলেছেন যাদের চিত্ত অব্যক্ত পরমতত্ত্বে নিবদ্ধ। তিনি বলেন, তাদের সাধনায় ক্লেশ অধিকতর, কারণ দেহধারী মানুষের পক্ষে অব্যক্ত তত্ত্বের উপলব্ধির পথ অত্যন্ত কঠিন। এখানে অব্যক্ত বলতে এমন পরম সত্যকে বোঝানো হয়েছে যা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায় না, যার নির্দিষ্ট কোনো রূপ বা আকার নেই এবং যা সাধারণ মানসিক ধারণার সীমাকেও অতিক্রম করে। তাই এই শ্লোককে কেবল নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা কঠিন এই সরল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ করলে এর প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এর মধ্যে মানুষের মন, দেহ, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, চেতনা এবং পরম সত্যের সম্পর্ক সম্পর্কে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক মনোবিজ্ঞান নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ক্লেশ। সংস্কৃত ক্লেশ শব্দটি ক্লিশ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে কষ্ট, পীড়া, দুর্ভোগ ও সাধনাগত সংগ্রামের অর্থ নিহিত রয়েছে। এখানে ক্লেশ বলতে শুধু শারীরিক যন্ত্রণা বোঝানো হয়নি। মনকে একাগ্র করা, ইন্দ্রিয়কে সংযত করা, অহংকার অতিক্রম করা, ব্যক্তিগত পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং কোনো দৃশ্যমান অবলম্বন ছাড়াই চিত্তকে পরম সত্যে স্থির করার যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, তার সবই ক্লেশের অন্তর্ভুক্ত। অধিকতর শব্দটি এই ক্লেশের তুলনামূলক মাত্রা প্রকাশ করে। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ অব্যক্ত সাধনাকে অসম্ভব বলেননি এবং এটিকে আধ্যাত্মিকভাবে নিকৃষ্টও বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন যে দেহধারী মানুষের জন্য এই পথ তুলনামূলকভাবে অধিক কষ্টসাধ্য।
অব্যক্ত শব্দটি এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শব্দগুলোর একটি। অব্যক্ত শব্দটি অ এবং ব্যক্ত এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ব্যক্ত অর্থ প্রকাশিত, দৃশ্যমান, নির্দিষ্ট বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং অ উপসর্গ সেই প্রকাশিত অবস্থার নিষেধ প্রকাশ করে। ফলে অব্যক্ত অর্থ যা প্রকাশিত নয়, যা কোনো নির্দিষ্ট রূপে ধরা যায় না এবং যা সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার অতীত। আধ্যাত্মিক অর্থে অব্যক্ত বলতে এমন পরমতত্ত্বকে বোঝানো যায় যা নাম, রূপ, আকার ও ইন্দ্রিয়ের সীমার অতীত। মানুষ সাধারণত কোনো কিছুকে বুঝতে হলে তার একটি রূপ, নাম, গুণ বা সম্পর্কের আশ্রয় নেয়। কিন্তু অব্যক্ত সাধনায় সেইসব বাহ্যিক অবলম্বনকে অতিক্রম করে এমন একটি সত্যে মন স্থাপন করতে হয় যা কোনো দৃশ্যমান রূপে ধরা দেয় না। এখানেই এই সাধনার কঠিনতা।
অব্যক্তাসক্তচেতসাম্ শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। এর অর্থ হলো যাদের চিত্ত অব্যক্তে নিবদ্ধ বা আসক্ত। এখানে শুধু অব্যক্ত তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান থাকা বোঝানো হয়নি। কোনো ব্যক্তি বই পড়ে নিরাকার ব্রহ্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন, কিন্তু তার চিত্তকে সেই অব্যক্ত সত্যে স্থির করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বুদ্ধি কোনো ধারণাকে বুঝতে পারে, কিন্তু চিত্তকে সেই সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে গভীর অন্তরশুদ্ধি, একাগ্রতা এবং আসক্তির অতিক্রম প্রয়োজন। মানুষের মন সাধারণত কোনো না কোনো বিষয়, রূপ, স্মৃতি, সম্পর্ক বা অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়। তাই সম্পূর্ণ অবলম্বনহীন পরমতত্ত্বে চিত্তকে স্থির করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন।
গতি শব্দটিও এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্কৃত গতি শব্দটি গম ধাতু থেকে এসেছে এবং এর মৌলিক অর্থ হলো যাওয়া বা গমন করা। কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে গতি শুধু চলার অর্থ প্রকাশ করে না। এটি পথ, অভিগমন, প্রাপ্তির অবস্থা এবং চূড়ান্ত পরিণতিকেও বোঝাতে পারে। এই কারণে অব্যক্তা গতির অর্থ কেবল অব্যক্তের দিকে যাওয়ার রাস্তা নয়। এটি অব্যক্ত পরমতত্ত্ব উপলব্ধির সমগ্র সাধনাপথ এবং সেই সাধনার চূড়ান্ত পরিণতির দিকেও ইঙ্গিত করে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে এই গতি দেহধারী মানুষের পক্ষে দুঃখসাধ্য। অর্থাৎ পথটি অমূল্য হলেও তা সহজ নয়।
দেহবদ্ভিঃ শব্দটি শ্লোকটির অন্তর্নিহিত মানবতত্ত্বকে বিশেষভাবে স্পষ্ট করে। দেহবৎ অর্থ দেহযুক্ত বা দেহধারী এবং দেহবদ্ভিঃ অর্থ দেহধারীদের দ্বারা বা দেহধারী মানুষের পক্ষে। মানুষ দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, স্মৃতি, আবেগ এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তার অভিজ্ঞতার অধিকাংশই এই সীমিত কাঠামোর মধ্য দিয়ে ঘটে। ফলে যে সত্য দেহ ও ইন্দ্রিয়ের সীমার অতীত, সেখানে সরাসরি মনকে স্থাপন করা কঠিন। এই কারণে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের সীমাবদ্ধতাকে নিন্দা করেননি। বরং তিনি মানুষের প্রকৃতিকে বাস্তবভাবে গ্রহণ করেছেন। মানুষ যে রূপ ও সম্পর্কের মাধ্যমে সহজে আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভ করে, সেই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে তিনি স্বীকার করেছেন।
এই শ্লোকের মধ্যে ব্যক্ত ও অব্যক্তের একটি গভীর সম্পর্কও প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্ত হলো যা রূপ, নাম ও গুণের মাধ্যমে প্রকাশিত। অব্যক্ত হলো যা সেই প্রকাশের অতীত। মানুষ সাধারণত ব্যক্তের মধ্য দিয়ে অব্যক্তকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে। যেমন একজন মানুষ ভালোবাসাকে সরাসরি হাতে ধরতে পারে না, কিন্তু প্রিয় মানুষের মুখ, আচরণ, কণ্ঠ বা স্মৃতির মাধ্যমে ভালোবাসাকে অনুভব করে। একইভাবে একজন ভক্ত ঈশ্বরের নাম, রূপ, মন্ত্র, পূজা, প্রার্থনা ও প্রেমের মাধ্যমে এমন এক পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হতে পারেন যা শেষ পর্যন্ত নাম ও রূপেরও অতীত। এই কারণে ব্যক্ত ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি অনেক মানুষের জন্য অব্যক্ত ব্রহ্মের ধ্যানের তুলনায় সহজতর অবলম্বন হয়ে ওঠে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। পরম ব্রহ্ম কোনো সীমিত রূপে আবদ্ধ নয়। ব্রহ্ম নিরাকার, অনন্ত এবং অদ্বৈত। কিন্তু যতক্ষণ মানুষ নিজেকে দেহ ও মন হিসেবে অনুভব করে, ততক্ষণ সেই নিরাকার ব্রহ্মে চিত্ত স্থির করা কঠিন। মানুষের দেহাত্মবোধ যত প্রবল, অব্যক্ত ব্রহ্মচিন্তার পথ তত কঠিন। তাই এখানে সাধনার প্রকৃত বাধা অব্যক্ত সত্যের মধ্যে নয়, বরং সাধকের নিজের চেতনার সীমাবদ্ধতার মধ্যে। সত্য কঠিন নয়, সত্যের দিকে তাকানোর জন্য যে চেতনার রূপান্তর প্রয়োজন সেটিই কঠিন।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষের হৃদয় সম্পর্কের মাধ্যমে গভীরভাবে স্পর্শিত হয়। একজন ভক্ত যখন ঈশ্বরকে প্রিয়তম, পিতা, মাতা, বন্ধু বা আশ্রয় হিসেবে অনুভব করেন, তখন তার মন একটি জীবন্ত সম্পর্কের মধ্যে ঈশ্বরকে ধারণ করতে পারে। এই সম্পর্ক চিত্তকে একাগ্র করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিপরীতে অব্যক্ত তত্ত্বে কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অবলম্বন করা যায় না। ফলে সাধককে নিজের মনকে আরও সূক্ষ্ম ও অন্তর্মুখী করে তুলতে হয়। এই কারণেই ভক্তির পথ অনেক মানুষের কাছে অধিক স্বাভাবিক ও সহজগম্য বলে প্রতীয়মান হয়।
এই বক্তব্যকে কখনোই অব্যক্ত সাধনার অস্বীকৃতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। গীতার বক্তব্য হলো না যে অব্যক্ত সত্য ভুল এবং ব্যক্ত ঈশ্বরই একমাত্র সত্য। বরং এখানে মানুষের সাধনক্ষমতা ও মানসিক প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে। অব্যক্ত সাধনা সম্ভব, কিন্তু দেহধারী মানুষের জন্য তা অধিক ক্লেশসাধ্য। অর্থাৎ পথের মূল্য ও পথের কঠিনতা এক বিষয় নয়। কোনো পথ কঠিন হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই পথ ভুল। বরং কখনো কঠিন পথই গভীরতম অন্তর্দৃষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে গীতা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক গঠন বিবেচনা করে এমন সাধনাপথের গুরুত্ব দেখায় যেখানে মন সহজে ঈশ্বরের প্রতি নিবদ্ধ হতে পারে।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও অসাধারণ। মানুষের মন বিমূর্ত সত্যকে বোঝার জন্য প্রায়ই দৃশ্যমান প্রতীক ব্যবহার করে। সৌন্দর্য একটি বিমূর্ত ধারণা, কিন্তু একটি সুন্দর মুখ, একটি ফুল বা একটি সুরের মাধ্যমে সৌন্দর্যকে অনুভব করা যায়। ভালোবাসা একটি বিমূর্ত অনুভূতি, কিন্তু প্রিয় মানুষের আচরণ ও উপস্থিতির মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একইভাবে ঈশ্বরতত্ত্বও মানুষের কাছে নাম, রূপ, মন্ত্র, প্রার্থনা ও সম্পর্কের মাধ্যমে সহজে অনুভবযোগ্য হতে পারে। অব্যক্ত সাধনায় এই অবলম্বনগুলোকেও অতিক্রম করতে হয়। ফলে মনকে এমন এক স্তরে স্থির করতে হয় যেখানে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক প্রতিমূর্তি তাকে ধরে রাখে না।
এই কারণে অব্যক্ত সাধনা আসলে ধারণার সীমা অতিক্রম করার সাধনা। আমরা যখন বলি নিরাকার, তখনও আমাদের মন নিরাকার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে। যখন বলি অসীম, তখনও অসীমকে নিয়ে একটি মানসিক ছবি তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃত অব্যক্ত সেই মানসিক ছবিরও অতীত। তাই অব্যক্ত সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য কোনো নতুন কল্পনা তৈরি করা নয়। বরং সমস্ত সীমিত কল্পনা, পরিচয় ও ধারণার পেছনে যে চৈতন্য অবস্থান করছে তাকে উপলব্ধি করা। এই দৃষ্টিতে অব্যক্ত সাধনা বাহ্যিক জগত থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের চেতনার গভীরে প্রবেশ করা।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এখানে দেহ সীমাবদ্ধতার প্রতীক, চিত্ত অনুসন্ধানী চেতনার প্রতীক, ক্লেশ আত্মরূপান্তরের সংগ্রামের প্রতীক এবং অব্যক্ত সীমাহীন পরম সত্যের প্রতীক। মানুষ সীমিত দেহ ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে বাস করেও অসীম সত্যের সন্ধান করে। এই সীমিত থেকে অসীমের দিকে যাত্রাই আধ্যাত্মিক সাধনা। মানুষ প্রথমে রূপের মধ্যে ঈশ্বরকে খোঁজে, পরে রূপের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখে এবং শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে যে পরম সত্য কোনো একটি রূপের মধ্যে আবদ্ধ নয়।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান মানুষ ক্রমাগত ছবি, শব্দ, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগ, বিজ্ঞাপন এবং নানা ধরনের ইন্দ্রিয়উদ্দীপনার মধ্যে বসবাস করে। ফলে মন ক্রমাগত বাহ্যিক কোনো না কোনো বস্তুর দিকে আকৃষ্ট থাকে। কয়েক মিনিট নীরবে বসে নিজের মনকে কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনা ছাড়াই স্থির রাখা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা দেখায় যে অব্যক্তের দিকে মন ফেরানো কেন কঠিন। মানুষের মন সবসময় কিছু দেখতে, শুনতে, ভাবতে বা আঁকড়ে ধরতে চায়। তাই আধ্যাত্মিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মন কীভাবে বাহ্যিক বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয় তা প্রত্যক্ষ করা এবং ধীরে ধীরে সেই আসক্তির প্রকৃতি অতিক্রম করা।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। যদি কাউকে বলা হয় একটি নির্দিষ্ট ফুলের দিকে তাকিয়ে মন স্থির করতে, তবে কাজটি তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু যদি বলা হয় কোনো ফুল, রং, আকার, শব্দ বা কল্পচিত্র ব্যবহার না করে শুধু সৌন্দর্যের স্বরূপের ওপর মন স্থির করতে, তবে কাজটি অনেক কঠিন হয়ে যাবে। প্রথম ক্ষেত্রে মনের একটি দৃশ্যমান অবলম্বন আছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মনকে বিমূর্ত সত্যের দিকে স্থির করতে হচ্ছে। অব্যক্ত সাধনার কঠিনতাও অনেকটা এই রকম।
সাহিত্যের দৃষ্টিতেও ব্যক্ত ও অব্যক্তের সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি শব্দ ব্যবহার করে এমন অনুভূতি প্রকাশ করতে চান যা আসলে শব্দের অতীত। একটি কবিতা ব্যক্ত শব্দের মাধ্যমে অব্যক্ত অনুভূতিকে প্রকাশ করে। একটি সুর শ্রুতির মাধ্যমে এমন আবেগ জাগিয়ে তুলতে পারে যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একইভাবে আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যক্ত রূপ কখনো অব্যক্ত সত্যের দিকে যাওয়ার দরজা হয়ে ওঠে। তাই ব্যক্ত এবং অব্যক্তকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুই বাস্তবতা হিসেবে না দেখে তাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক দেখতে হয়।
এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত মানবতত্ত্ব হলো মানুষ সীমিত হয়েও অসীমের সন্ধানী। সে দেহের মধ্যে বাস করে কিন্তু দেহের সীমা অতিক্রমকারী সত্যের সন্ধান করে। সে নাম ও রূপের মধ্যে বাস করে কিন্তু নাম ও রূপের অতীত সত্যকে জানতে চায়। সে সম্পর্কের মাধ্যমে ভালোবাসে কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন এক প্রেমের সন্ধান করে যা কোনো ব্যক্তিগত সীমায় আবদ্ধ নয়। এই কারণে আধ্যাত্মিক জীবন আসলে মানুষের স্বাভাবিক সীমাকে অস্বীকার করা নয়। বরং সেই সীমাকে বুঝে ধীরে ধীরে তার গভীরে প্রবেশ করে সীমাহীনতার উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া।
শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা তাই অত্যন্ত বাস্তব ও মানবিক। তিনি সাধককে এমন কোনো আধ্যাত্মিক আদর্শের সামনে দাঁড় করাননি যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। তিনি দেখিয়েছেন যে অব্যক্ত পরমতত্ত্বের উপলব্ধি উচ্চতর ও গভীর সাধনা হলেও তা দেহধারী মানুষের জন্য স্বাভাবিকভাবে কঠিন। তাই মানুষের জন্য ভক্তি, স্মরণ, আত্মসমর্পণ, কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন এবং চিত্তকে ধীরে ধীরে একাগ্র করার পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পথের মাধ্যমে মন প্রথমে একটি পবিত্র অবলম্বনে স্থির হয় এবং ক্রমে সেই অবলম্বনের অন্তর্নিহিত পরম সত্য উপলব্ধি করতে শেখে।
সবশেষে বলা যায়, “ক্লেশোহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্। অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে” শ্লোকটি শুধু একটি আধ্যাত্মিক সাধনাপদ্ধতির কঠিনতার কথা বলে না। এটি মানুষের অস্তিত্বের গভীর সত্য প্রকাশ করে। মানুষ সীমিত দেহের অধিকারী হলেও তার চেতনা অসীমের সন্ধান করে। ব্যক্ত রূপের মাধ্যমে সে অব্যক্ত সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। চিত্ত যখন বাহ্যিক আসক্তি অতিক্রম করে নিজের গভীরে প্রবেশ করে, তখন ধীরে ধীরে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত, ব্যক্ত ও অব্যক্ত, জগত ও পরম সত্যের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক উপলব্ধি হতে থাকে। এই শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা তাই হলো পরম সত্যের পথ বন্ধ নয়, কিন্তু সেই পথে অগ্রসর হতে হলে মানুষের চিত্তকে তার স্বাভাবিক আসক্তি, দেহাত্মবোধ এবং সীমিত ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। আর ভক্তি, প্রেম, আত্মসমর্পণ ও একাগ্র সাধনা সেই কঠিন যাত্রাকে মানুষের জন্য অধিক স্বাভাবিক, জীবন্ত ও অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!