সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১২.৭ — ভক্তের মুক্তির আশ্বাস

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ। ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্।।৭।।
তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ। 
ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্।।৭।।

অনুবাদঃ যারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করে, মৎপরায়ণ হয়ে অনন্য ভক্তিযোগের দ্বারা আমার ধ্যান করে উপাসনা করেন, হে পার্থ! আমাতে আবিষ্টচিত্ত সেই সমস্ত ভক্তদের আমি মৃত্যুময় সংসার-সাগর থেকে অচিরেই উদ্ধার করি।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকটি ভক্তিতত্ত্বের এক অত্যন্ত গভীর ও আশ্বাসপূর্ণ বাণী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, যেসব ভক্তের চিত্ত তাঁর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট, তিনি নিজেই তাদের মৃত্যুরূপ সংসারসাগর থেকে অচিরেই উদ্ধার করেন। শ্লোকটির মূল বক্তব্যের মধ্যে যেমন ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য। মানুষ তার চেতনাকে যে বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করে, ধীরে ধীরে তার জীবন সেই বিষয়ের দ্বারাই পরিচালিত হয়। তাই চেতনার কেন্দ্র কোথায় স্থাপিত হবে, সেই প্রশ্নই আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন।

শ্লোকটি শুরু হয়েছে তেষামহং শব্দবন্ধ দিয়ে। তেষাম্ অর্থ তাদের এবং অহম্ অর্থ আমি। এখানে তেষাম্ বলতে সেই ভক্তদের বোঝানো হয়েছে যাদের কথা পূর্ববর্তী শ্লোকে বলা হয়েছে। তারা ভগবানের প্রতি মন স্থাপন করে এবং তাঁকেই পরম আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করে। অহম্ শব্দটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে ভগবান মুক্তির কর্তা হিসেবে নিজেকেই প্রকাশ করছেন। তিনি কোনো দূরবর্তী নীতির কথা বলছেন না, বরং ব্যক্তিগতভাবে ঘোষণা করছেন যে তিনি নিজেই ভক্তের উদ্ধারকারী। এর মধ্যে ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা এবং ঈশ্বরের কৃপাশক্তির প্রকাশ ঘটেছে।

সমুদ্ধর্তা শব্দটি এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে উপরে তুলে আনার ভাব নিহিত রয়েছে। সংস্কৃত সম্ ও উদ্ উপসর্গের সঙ্গে হৃ ধাতুর সম্পর্কের মাধ্যমে শব্দটির গঠন হয়েছে। এর অর্থ এমন একজন যিনি নিমজ্জিত কাউকে উপরে তুলে আনেন, বিপদ থেকে উদ্ধার করেন এবং বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। এই শব্দটির সঙ্গে পরবর্তী মৃত্যুসংসারসাগর শব্দটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভগবান এখানে কেবল রক্ষাকারী নন, তিনি এমন একজন উদ্ধারকারী যিনি সংসারের গভীর সমুদ্রের মধ্যে নিমজ্জিত জীবকে সেই সমুদ্র থেকে তুলে আনেন। ফলে সমুদ্ধর্তা শব্দের মধ্যে একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। জীব যেন উত্তাল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে এবং ভগবান তাকে নিজের শক্তিতে তুলে নিচ্ছেন।

মৃত্যুসংসারসাগর শব্দবন্ধটি শ্লোকটির অন্যতম গভীর দার্শনিক প্রতীক। মৃত্যু শব্দটি এসেছে মরণ বা জীবনের দেহগত অবসানের ধারণা থেকে। কিন্তু গীতার দর্শনে মৃত্যু কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়। এটি জন্ম ও মৃত্যুর পুনরাবর্তনের প্রতীক। সংসার শব্দটি সম্ ও সৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রবাহিত হওয়া, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমন করা এবং অবিরাম চলমান থাকার ধারণা রয়েছে। তাই সংসার কেবল পার্থিব জীবন নয়, বরং জন্ম, মৃত্যু, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, সুখ, দুঃখ এবং পুনর্জন্মের এক অবিরাম প্রবাহ। এর সঙ্গে যখন সাগর শব্দটি যুক্ত হয়, তখন এই সংসারকে একটি অসীম ও গভীর সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই কারণে মৃত্যুসংসারসাগর বলতে বোঝায় এমন এক অস্তিত্বের সমুদ্র, যেখানে জীব জন্ম ও মৃত্যুর ঢেউয়ের মধ্যে বারবার নিমজ্জিত হয়।

সাগরের প্রতীকটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি সমুদ্রের মধ্যে যেমন মানুষের নিজের শক্তিতে তীর খুঁজে পাওয়া কঠিন, তেমনি সংসারের অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা, ভয়, মোহ, আসক্তি ও কর্মফলের মধ্যে জীবও নিজের প্রকৃত গন্তব্য ভুলে যায়। সমুদ্রের ঢেউ যেমন নৌকাকে এক মুহূর্তে একদিকে এবং পরের মুহূর্তে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি মানুষের মনও কখনো সুখের দিকে, কখনো দুঃখের দিকে, কখনো আকাঙ্ক্ষার দিকে এবং কখনো ভয়ের দিকে ছুটে যায়। এই অস্থিরতার মধ্যেই ভগবানের আশ্রয়কে একটি নিরাপদ তীরের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।

ভবামি শব্দটিও অত্যন্ত গভীর। এটি ভূ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। ভগবান বলেন তিনি সমুদ্ধর্তা ভবামি। অর্থাৎ তিনি উদ্ধারকারী হয়ে ওঠেন। এখানে ঈশ্বরের কৃপা একটি সক্রিয় শক্তি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ঈশ্বর কেবল দূর থেকে মুক্তির নির্দেশ দেন না, বরং ভক্তের জীবনে উদ্ধারকারীরূপে উপস্থিত হন। এই বক্তব্য ভক্তিতত্ত্বে ঈশ্বরের করুণার কেন্দ্রীয় গুরুত্বকে প্রকাশ করে।

ন চিরাৎ শব্দবন্ধের অর্থ অচিরেই বা বিলম্ব না করে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ নিবিষ্ট চেতনার ফল হিসেবে আধ্যাত্মিক উত্তরণ কোনো অসীম দূরের সম্ভাবনা নয়। যখন মানুষের চেতনা সত্যিই ঈশ্বরমুখী হয়, তখন তার অন্তর্জগতের পরিবর্তন শুরু হয়। অবশ্য এর অর্থ বাহ্যিক সময়ের নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নয়। এর গভীর অর্থ হলো ঈশ্বরনিষ্ঠ চেতনা মানুষের মুক্তির পথে একটি তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সৃষ্টি করে।

পার্থ শব্দটি অর্জুনের প্রতি ভগবানের স্নেহপূর্ণ সম্বোধন। পার্থ অর্থ পৃথার পুত্র। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম। এই সম্বোধনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা রয়েছে। ভগবান যেন কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অন্তরঙ্গ পথপ্রদর্শক হিসেবে অর্জুনকে আশ্বস্ত করছেন। কঠিন আধ্যাত্মিক সত্যের সঙ্গে এই ব্যক্তিগত সম্বোধন শ্লোকটির আবেগময় শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করেছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি হলো ময্যাবেশিতচেতসাম্। এর মধ্যে ময়ি, আবেশিত এবং চেতসাম্ এই তিনটি ধারণা রয়েছে। ময়ি অর্থ আমার মধ্যে বা আমাতে। আবেশিত অর্থ নিবিষ্ট, স্থাপিত বা সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করানো। চেতস্ অর্থ চিত্ত, মন বা অন্তর্জগতের চেতনাশক্তি। সুতরাং ময্যাবেশিতচেতসাম্ অর্থ যাদের চিত্ত আমার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট। এখানে কেবল ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করা বা বাহ্যিক উপাসনা করার কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে চিত্তের কেন্দ্রকে ঈশ্বরের মধ্যে স্থাপন করার কথা।

এই ধারণাটিই শ্লোকটির প্রকৃত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। মানুষের মন সাধারণত বহির্জগতের অসংখ্য বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। অর্থ, সম্মান, সম্পর্ক, ভোগ, সাফল্য, ব্যর্থতা, ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের চেতনাকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে। ফলে মানুষের অন্তরে স্থিরতা থাকে না। কিন্তু যখন চেতনার কেন্দ্র পরম সত্যের দিকে স্থাপিত হয়, তখন জীবনের সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি স্থায়ী আশ্রয়ের অনুভূতি জন্ম নেয়। এই কারণে ময্যাবেশিতচেতসাম্ কেবল একটি ধর্মীয় শব্দ নয়, এটি চেতনার সম্পূর্ণ পুনর্নির্দেশের ধারণা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক ভক্তি ও মুক্তির সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রকাশ করে। ভক্তিদর্শনে ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং ঈশ্বরের কৃপা মুক্তির প্রধান উপায়। ভক্ত নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে ঈশ্বরকে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং ঈশ্বর সেই ভক্তকে সংসারবন্ধন থেকে উদ্ধার করেন। এখানে জীবের সাধনা এবং ঈশ্বরের কৃপা পরস্পরের পরিপূরক। জীবের পক্ষ থেকে প্রয়োজন চিত্তকে ঈশ্বরের মধ্যে নিবিষ্ট করা এবং ঈশ্বরের পক্ষ থেকে আসে উদ্ধার ও করুণা।

অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে আরও একটি গভীর অর্থে দেখা যায়। সংসারসাগর হলো অবিদ্যা, অহংকার এবং নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রতীক। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখে, তখন সে জন্ম ও মৃত্যুর পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। ঈশ্বরের মধ্যে চিত্ত নিবিষ্ট হওয়ার মাধ্যমে মন বহিরাগত আসক্তি থেকে ধীরে ধীরে প্রত্যাহৃত হয় এবং পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হয়। এই দৃষ্টিতে উদ্ধার মানে কেবল কোনো বাহ্যিক স্থানান্তর নয়, বরং অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে উত্তরণ।

বিশিষ্টাদ্বৈত ও ভক্তিমূলক দর্শনের আলোকে জীব ও ঈশ্বরের সম্পর্ক আরও ব্যক্তিগত ও বাস্তব। জীব ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল এবং ঈশ্বরের কৃপা জীবের মুক্তির জন্য অপরিহার্য। এই দৃষ্টিতে সমুদ্ধর্তা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জীব সংসারের সীমাহীন প্রবাহে নিজ শক্তিতে সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ নয়। সে ঈশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করলে ঈশ্বর তাকে নিজের কৃপায় উত্তরণের পথে নিয়ে যান।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সংসার এখানে সমুদ্র। জীব হলো সেই সমুদ্রে ভাসমান বা নিমজ্জিত যাত্রী। জন্ম ও মৃত্যু হলো সেই সমুদ্রের ঢেউ। আকাঙ্ক্ষা হলো স্রোত। মোহ হলো কুয়াশা। অবিদ্যা হলো অন্ধকার। ঈশ্বর হলেন উদ্ধারকারী এবং ভক্তি হলো সেই আশ্রয় যার মাধ্যমে জীব উদ্ধারকারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই প্রতীকী কাঠামো মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীরভাবে প্রকাশ করে।

আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিক্ষার তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের মন যে বিষয়কে বারবার চিন্তা করে, সেই বিষয় ধীরে ধীরে তার মানসিক জগতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি সর্বদা ভয় নিয়ে চিন্তা করে, তার জীবনে ভয় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি কেবল সম্পদ ও সাফল্যকে জীবনের কেন্দ্র করে, তার আত্মমূল্যবোধও সেই বিষয়গুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু যে ব্যক্তি একটি উচ্চতর সত্য, আদর্শ বা ঈশ্বরকে নিজের চেতনার কেন্দ্র করে, তার জীবন সেই কেন্দ্র দ্বারা সংগঠিত হতে শুরু করে। এই অর্থে ময্যাবেশিতচেতসাম্ মানুষের মনকে বিচ্ছিন্নতা থেকে একাগ্রতা এবং অস্থিরতা থেকে অন্তর্গত স্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি আধ্যাত্মিক মনোবিজ্ঞান।

বাস্তব জীবনের একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। উত্তাল সমুদ্রে একটি ছোট নৌকা যখন দিকহীনভাবে ভাসতে থাকে, তখন প্রতিটি ঢেউ তাকে নিজের ইচ্ছামতো একদিকে নিয়ে যায়। কিন্তু যদি নৌকার একজন দক্ষ মাঝি থাকে এবং নৌকার দিক একটি নির্ভরযোগ্য তীরের দিকে স্থির করা যায়, তখন ঢেউ থাকলেও যাত্রার উদ্দেশ্য হারিয়ে যায় না। মানুষের জীবনও এমন। সুখ ও দুঃখ, লাভ ও ক্ষতি, সম্মান ও অপমান, জন্ম ও মৃত্যু জীবনের সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। এগুলোকে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু চেতনার দিক যদি পরম সত্যের দিকে স্থির থাকে, তাহলে মানুষ ঢেউয়ের মধ্যে থেকেও নিজের গন্তব্য ভুলে যায় না।

এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো মানুষের মুক্তি বাহ্যিক পরিস্থিতির সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। সংসারে থেকে সংসারের দ্বারা পরাজিত না হওয়ার জন্য চেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে সাধারণ জীবনযাপন করেও অন্তরে ঈশ্বরনিষ্ঠ হতে পারে। আবার কেউ বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় আচরণ করেও অন্তরে সম্পূর্ণভাবে বিষয়াসক্ত থাকতে পারে। তাই গীতার এই শিক্ষায় বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে চিত্তের অবস্থাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ময্যাবেশিতচেতসাম্ শব্দটি সেই অন্তর্গত অবস্থাকেই নির্দেশ করে।

শ্লোকটির ভাষাগত সৌন্দর্যও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তেষামহং দিয়ে ভক্তদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সমুদ্ধর্তা শব্দের মাধ্যমে উদ্ধারকারীর ভূমিকা প্রকাশ করা হয়েছে। মৃত্যুসংসারসাগরাৎ শব্দবন্ধে একটি বিশাল অস্তিত্বের সমুদ্রের চিত্র তৈরি হয়েছে। ভবামি ন চিরাৎ শব্দে ঈশ্বরের আশ্বাস এসেছে। পার্থ সম্বোধনে ব্যক্তিগত স্নেহ যুক্ত হয়েছে। আর ময্যাবেশিতচেতসাম্ শব্দে ভক্তের অন্তর্জগতের অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে কয়েকটি শব্দের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক নাটক গড়ে উঠেছে। জীব একদিকে সংসারের সমুদ্রে নিমজ্জিত এবং অন্যদিকে ঈশ্বর তাকে নিজের কৃপায় সেই সমুদ্র থেকে উত্তোলন করছেন।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা তাই কেবল মৃত্যুর পর মুক্তির প্রতিশ্রুতি নয়। এটি বর্তমান জীবনের মধ্যেই চেতনার একটি নতুন কেন্দ্র আবিষ্কারের শিক্ষা। মানুষ যতক্ষণ পরিবর্তনশীল বিষয়কে নিজের চূড়ান্ত আশ্রয় মনে করে, ততক্ষণ তার মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা থাকে। কারণ পরিবর্তনশীল কোনো বিষয় স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে না। কিন্তু যখন মানুষ পরম সত্যকে নিজের চেতনার কেন্দ্র করে, তখন জীবনের পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও একটি গভীর আশ্রয় অনুভব করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি ঈশ্বর, ভক্তি, চেতনা এবং মুক্তির মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। তেষাম্ আমাদের সেই ভক্তদের কথা স্মরণ করায় যারা ঈশ্বরকে আশ্রয় করেছে। অহম্ জানায় যে উদ্ধারকারী স্বয়ং ভগবান। সমুদ্ধর্তা প্রকাশ করে নিমজ্জিত জীবকে উত্তোলনের শক্তি। মৃত্যুসংসারসাগর মানুষের জন্মমৃত্যু ও আসক্তির অনন্ত প্রবাহের প্রতীক। ভবামি প্রকাশ করে ঈশ্বরের সক্রিয় উপস্থিতি। ন চিরাৎ দেয় আশ্বাস যে ঈশ্বরমুখী চেতনার রূপান্তর মুক্তির পথে বিলম্বিত নয়। আর ময্যাবেশিতচেতসাম্ প্রকাশ করে এই সমগ্র শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। চিত্তকে পরম সত্যে নিবিষ্ট করাই হলো আধ্যাত্মিক উত্তরণের মূল সাধনা।

এই কারণে শ্লোকটির গভীরতম বাণী হলো মানুষ যখন নিজের চেতনাকে ক্ষণস্থায়ী জগতের অস্থিরতার মধ্যে হারিয়ে না ফেলে পরম সত্যের মধ্যে স্থাপন করে, তখন সংসারের অসীম স্রোতের মধ্যেও সে একটি চূড়ান্ত আশ্রয় লাভ করে। ভক্তের এই ঈশ্বরনিষ্ঠ চেতনার প্রতিই ভগবানের উত্তর হলো তাঁর করুণা। তাই সংসারসাগর যত গভীরই হোক, চিত্ত যদি পরম আশ্রয়ে নিবিষ্ট হয়, তবে সেই সাগর আর চূড়ান্ত নিয়তি নয়। ঈশ্বরের কৃপাই তখন জীবের উত্তরণের পথ হয়ে ওঠে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি