সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৩.১০ — সংসারে অনাসক্তি, সম্পর্কের ঊর্ধ্বে অন্তরের স্বাধীনতা ও সমচিত্ততা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অসত্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু। নিত্যং চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।১০।।
অসত্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু। 
নিত্যং চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।১০।।

অনুবাদঃ অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, সৈর্য, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদিতে আসক্তিশূন্যতা, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান-এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।

ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানীর লক্ষণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষের অন্তর্জগতের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম অবস্থার কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো “অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু। নিত্যং চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।” এই শ্লোকে মানুষের সংসারজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, কর্তব্য, মানসিক স্বাধীনতা এবং সুখ দুঃখের মধ্যে সমত্ব বজায় রাখার এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। বিশেষ করে “অসক্তি” এবং “অনভিষ্বঙ্গ” এই দুটি শব্দ মানুষের পার্থিব সম্পর্কের প্রকৃতি এবং সেই সম্পর্কের মধ্যে থেকেও কীভাবে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করা যায়, তার এক অসাধারণ দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

“অসক্তি” শব্দটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “সক্তি” থেকে। “অ” দ্বারা কোনো কিছুর অনুপস্থিতি বা নাকরণ বোঝানো হয় এবং “সক্তি” শব্দের মধ্যে লেগে থাকা, সংযুক্ত হওয়া, কোনো কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার ভাব রয়েছে। সংস্কৃত “সঞ্জ্” ধাতুর সঙ্গে এই শব্দের ভাবগত সম্পর্ক রয়েছে। সঞ্জ্ ধাতুর মধ্যে সংযুক্ত হওয়া, লেগে থাকা এবং আবদ্ধ হওয়ার ধারণা নিহিত। সেই অর্থে সক্তি হলো কোনো বিষয়ের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হওয়া, যেখানে মন তার দ্বারা আকৃষ্ট ও আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর অসক্তি হলো সেই আবদ্ধতার অনুপস্থিতি। কিন্তু গীতার অসক্তি কোনো নিষ্ঠুরতা, অনুভূতিহীনতা কিংবা সংসারবিমুখতা নয়। এটি এমন এক অন্তর্গত স্বাধীনতা, যেখানে মানুষ তার কর্তব্য পালন করে, ভালোবাসে, সম্পর্ক রক্ষা করে, কিন্তু নিজের অন্তরের শান্তি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর হাতে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে না।

এর পরেই এসেছে “অনভিষ্বঙ্গ” শব্দটি। এই শব্দের মধ্যে “অন” দ্বারা অভাব বা অনুপস্থিতি এবং “অভিষ্বঙ্গ” দ্বারা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়া, আঁকড়ে ধরা কিংবা অতিরিক্ত মমতার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের সঙ্গে নিজের সত্তাকে একাকার করে ফেলার ভাব প্রকাশ পায়। তাই অনভিষ্বঙ্গ কেবল সাধারণ আসক্তির অনুপস্থিতি নয়। এর মধ্যে বিশেষভাবে এমন এক মানসিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও মানুষ তাদের নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য মালিকানা হিসেবে গ্রহণ করে না। সে ভালোবাসে, কিন্তু আঁকড়ে ধরে না। সে যত্ন করে, কিন্তু অধিকারবোধে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। সে সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু সম্পর্কের পরিবর্তন বা বিচ্ছেদকে নিজের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ ধ্বংস হিসেবে গ্রহণ করে না।

এই কারণে “অসক্তি” এবং “অনভিষ্বঙ্গ” পাশাপাশি ব্যবহারের মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। অসক্তি মানুষের সামগ্রিক মানসিক স্বাধীনতার কথা বলে, আর অনভিষ্বঙ্গ বিশেষত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মীয়তাবোধ ও মমতার বন্ধন থেকে মুক্ত থাকার কথা বলে। মানুষের জীবনে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি আবেগ সৃষ্টি করে তার মধ্যে সন্তান, জীবনসঙ্গী এবং গৃহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী অংশে বলেছেন “পুত্রদারগৃহাদিষু”। এখানে পুত্র বলতে সন্তান, দার বলতে স্ত্রী বা জীবনসঙ্গী এবং গৃহ বলতে বাড়ি ও সংসার বোঝানো হয়েছে। “আদি” শব্দের অর্থ ইত্যাদি এবং “ষু” দ্বারা বহুবচনের মধ্যে অবস্থান বোঝানো হয়েছে। ফলে পুত্রদারগৃহাদিষু অর্থ দাঁড়ায় সন্তান, জীবনসঙ্গী, গৃহ এবং এই ধরনের অন্যান্য পারিবারিক বিষয়ের ক্ষেত্রে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বোঝা দরকার। গীতা কখনো পরিবারকে ঘৃণা করতে বা প্রিয়জনকে ত্যাগ করতে বলছে না। বরং গীতা এমন এক ভালোবাসার কথা বলছে যা মানুষকে মুক্ত করে। ভালোবাসা এবং আসক্তি এক জিনিস নয়। ভালোবাসা বলে তুমি ভালো থাকো, আর আসক্তি বলে তুমি আমার ইচ্ছামতো থাকো। ভালোবাসা অপরের কল্যাণ চায়, আর আসক্তি অপরের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ভালোবাসা যত্ন করে, কিন্তু আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ভালোবাসায় আত্মদান থাকতে পারে, কিন্তু আসক্তিতে নিজের সুখ ও পরিচয়কে অন্যের আচরণের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলার প্রবণতা থাকে।

একজন পিতা তার সন্তানকে ভালোবাসবেন, তার শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করবেন এবং তার ভুল হলে সংশোধনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন সন্তান সফল হলেই তিনি সফল এবং সন্তান ব্যর্থ হলেই তার নিজের জীবন ব্যর্থ, তাহলে সন্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মপরিচয় জড়িয়ে গেছে। আবার কোনো মা যদি মনে করেন সন্তান তার নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপন না করলে তার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেখানেও আসক্তির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু যদি তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করেন, সঠিক পথ দেখান এবং একই সঙ্গে উপলব্ধি করেন যে সন্তানেরও নিজস্ব জীবন ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত আছে, তাহলে সেখানে ভালোবাসা আছে কিন্তু অন্ধ অধিকারবোধ নেই। এই অবস্থাই গীতার অনভিষ্বঙ্গ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গীতার এই শিক্ষা মানুষের জীবনের একটি গভীর সত্যের দিকে নির্দেশ করে। আমরা যাকে “আমার” বলে আঁকড়ে ধরি, তার সবকিছুই পরিবর্তনশীল। সন্তান পরিবর্তিত হয়, দাম্পত্য সম্পর্কের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, বাড়ি পুরোনো হয়, সম্পদ আসে এবং চলে যায়, শরীর পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। অথচ মানুষ যখন পরিবর্তনশীল জিনিসের মধ্যে স্থায়ী নিরাপত্তা খুঁজতে থাকে, তখন তার মধ্যে ভয় জন্ম নেয়। যে জিনিসকে সে যত বেশি নিজের বলে মনে করে, সেটিকে হারানোর ভয়ও তত বেশি হয়। ফলে আসক্তি যত গভীর হয়, ভয় তত গভীর হয় এবং ভয়ের সঙ্গে দুঃখও বৃদ্ধি পায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে অসক্তি হলো জীবনের প্রতি অনাগ্রহ নয়, বরং জীবনের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা। মানুষ জানবে যে সম্পর্ক মূল্যবান কিন্তু পরিবর্তনশীল। সম্পদ প্রয়োজনীয় কিন্তু অনিত্য। গৃহ আশ্রয় দিতে পারে কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। সন্তান জীবনের অমূল্য সম্পর্ক কিন্তু তার জীবন সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নয়। এই সত্যকে গ্রহণ করতে পারলে ভালোবাসার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি জন্মায়। তখন মানুষ সম্পর্ককে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখে না, বরং দায়িত্ব ও ভালোবাসার ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করে।

বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শিক্ষার আরও গভীর অর্থ রয়েছে। বেদান্ত মানুষের মৌলিক অজ্ঞতার একটি দিক হিসেবে আত্মার সঙ্গে অনাত্মার মিথ্যা অভিন্নতাকে নির্দেশ করে। মানুষ দেহ, মন, সম্পর্ক, সম্পদ এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে এক করে ফেলে যে এগুলোর কোনো একটি পরিবর্তিত হলেই তার নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন বলে মনে হয়। কিন্তু আত্মা যদি চৈতন্যস্বরূপ হয় এবং দেহ ও সম্পর্ক যদি পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে পরিবর্তনশীল কোনো বিষয়ই আত্মার চূড়ান্ত পরিচয় হতে পারে না। সন্তান আমার সম্পর্ক, স্ত্রী আমার সম্পর্ক, গৃহ আমার আশ্রয়, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই আমার পরম আত্মস্বরূপ নয়। এই উপলব্ধিই অনভিষ্বঙ্গের আধ্যাত্মিক ভিত্তি।

সাংখ্য দর্শনের আলোতেও এই ধারণার গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাংখ্যে পুরুষ হলো চৈতন্য এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জগত। মানুষ যখন পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সঙ্গে নিজের চৈতন্যসত্তাকে এক করে ফেলে, তখন বন্ধন সৃষ্টি হয়। পুত্র, দার, গৃহ এবং পার্থিব সম্পর্ক প্রকৃতির অন্তর্গত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র। এগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু মানুষ যদি নিজেকে তাদের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলে, তাহলে চিত্তে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। সাক্ষীস্বরূপ চৈতন্যের উপলব্ধি যত গভীর হবে, আসক্তির বন্ধন তত শিথিল হবে।

যোগদর্শনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের মন সাধারণত পছন্দের বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং অপছন্দের বিষয়কে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। পছন্দের সঙ্গে রাগ এবং অপছন্দের সঙ্গে দ্বেষ যুক্ত হয়। এই রাগ ও দ্বেষ মনকে ক্রমাগত আলোড়িত করে। গীতার এই শ্লোক তাই অসক্তির সঙ্গে সঙ্গে সমচিত্তত্বের কথাও বলেছে। ইষ্ট উপস্থিত হলে অতিরিক্ত উল্লাসে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা এবং অনিষ্ট উপস্থিত হলে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়া হলো সমচিত্তত্বের অনুশীলন। এর অর্থ অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং অনুভূতির মধ্যেও চিত্তের কেন্দ্রকে স্থির রাখা।

“পুত্রদারগৃহাদিষু” অংশটিকেও প্রতীকীভাবে আরও বিস্তৃত অর্থে দেখা যায়। পুত্র ভবিষ্যৎ ও উত্তরাধিকারের প্রতীক হতে পারে। দার বা জীবনসঙ্গী গভীর আবেগীয় সম্পর্কের প্রতীক। গৃহ নিরাপত্তা, পরিচয় এবং নিজের তৈরি জগতের প্রতীক। এই তিনটির মাধ্যমে মানুষের জীবনের তিনটি গভীর আকর্ষণকে বোঝানো যায়। মানুষ ভবিষ্যৎকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, প্রিয়জনকে নিজের মতো করে রাখতে চায় এবং নিজের নিরাপত্তা ও পরিচয়কে স্থায়ী করতে চায়। কিন্তু জীবন তার নিজস্ব নিয়মে পরিবর্তিত হয়। তাই গীতার শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখো, কিন্তু পরিবর্তনশীল জগতকে নিজের চূড়ান্ত আশ্রয় মনে করো না।

এই ধারণাকে একটি পাখির উপমা দিয়ে বোঝানো যায়। কেউ যদি একটি পাখিকে ভালোবাসে, সে পাখিটির যত্ন নেবে এবং তার স্বাধীনতার কথা ভাববে। কিন্তু যদি সে পাখিটিকে এত শক্ত করে ধরে রাখে যে পাখিটি আর উড়তে না পারে, তখন তার ভালোবাসা আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে মানুষ যখন প্রিয়জনকে ভালোবাসে কিন্তু তার স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্ব জীবনকে সম্মান করে, তখন ভালোবাসা নির্মল থাকে। কিন্তু যখন ভালোবাসার সঙ্গে অতিরিক্ত অধিকারবোধ যুক্ত হয়, তখন সম্পর্ক ধীরে ধীরে বন্ধনে পরিণত হয়।

অসক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি উদাসীনতা নয়। উদাসীন মানুষ অন্যের সুখ দুঃখ নিয়ে ভাবতে চায় না। কিন্তু অসক্ত মানুষ গভীরভাবে যত্ন করতে পারে। সে কর্তব্য পালন করে, সেবা করে, ভালোবাসে এবং প্রয়োজনে আত্মত্যাগও করে। পার্থক্য হলো তার অন্তরের শান্তি অন্যের আচরণ বা ফলাফলের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। সে কাজ করে কারণ কাজটি কর্তব্য, ভালোবাসা বা নৈতিকতার দাবি, কেবল নিজের প্রত্যাশিত ফল পাওয়ার জন্য নয়।

এই কারণেই গীতার অসক্তি কর্মবিমুখতার শিক্ষা নয়। বরং এটি কর্মের মধ্যেই স্বাধীনতার শিক্ষা। একজন গৃহী মানুষ সংসারে থেকেও অসক্ত হতে পারেন এবং একজন বাহ্যিকভাবে সংসারত্যাগী মানুষও অন্তরে গভীর আসক্তির অধিকারী হতে পারেন। আসক্তি বাহ্যিক অবস্থানের বিষয় নয়, চিত্তের অবস্থার বিষয়। মানুষ কোথায় আছে তার চেয়ে তার মন কীভাবে সম্পর্ককে ধারণ করছে সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা তাই হলো সম্পর্ককে অস্বীকার করা নয়, সম্পর্কের প্রকৃতি বোঝা। ভালোবাসো কিন্তু আঁকড়ে ধরো না। কর্তব্য পালন করো কিন্তু নিজের অহংকারকে সেই কর্তব্যের সঙ্গে এক করে ফেলো না। প্রিয়জনের জন্য কাজ করো কিন্তু তাদের জীবনকে নিজের সম্পত্তি মনে করো না। সুখ এলে কৃতজ্ঞ হও কিন্তু সুখের ওপর নিজের অস্তিত্ব নির্ভর করো না। দুঃখ এলে তার বাস্তবতাকে স্বীকার করো কিন্তু দুঃখকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বানিয়ে ফেলো না।

“অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু” তাই কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের সম্পর্কবোধ, মনোবিজ্ঞান, নৈতিকতা এবং আত্মজিজ্ঞাসার এক গভীর সূত্র। মানুষ যত বেশি বলে “এটি আমার”, তত বেশি তার মধ্যে হারানোর ভয় জন্মায়। আর যখন সে উপলব্ধি করতে শেখে যে জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক মূল্যবান হলেও কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী মালিকানা নয়, তখন তার ভালোবাসা আরও নির্মল হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে যে ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য অধিকার করার মধ্যে নয়, বরং কল্যাণ কামনা করার মধ্যে।

সবশেষে বলা যায়, অসক্তি হৃদয়কে শুষ্ক করে না, বরং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে। অনভিষ্বঙ্গ মানুষকে সম্পর্কহীন করে না, বরং সম্পর্কের মধ্যে স্বাধীন করে। পুত্র, দার, গৃহ এবং সমস্ত পার্থিব সম্পর্ক জীবনের অমূল্য অংশ হতে পারে, কিন্তু তারা যেন মানুষের অন্তরের একমাত্র আশ্রয় না হয়ে ওঠে। কারণ যা পরিবর্তনশীল তাকে আঁকড়ে ধরে স্থায়ী শান্তি পাওয়া যায় না। সত্যিকারের শান্তি তখনই আসে যখন মানুষ ভালোবাসার মধ্যে থেকেও নিজের অন্তরের চৈতন্যকে স্বাধীন রাখে। এই অবস্থায় ভালোবাসা থাকে কিন্তু অধিকারবোধ থাকে না, কর্তব্য থাকে কিন্তু দাসত্ব থাকে না, সম্পর্ক থাকে কিন্তু আত্মবিস্মৃতি থাকে না। আর এই অন্তর্গত স্বাধীনতা থেকেই জন্ম নেয় সেই সমচিত্ততা, যার মধ্যে ইষ্ট ও অনিষ্ট উভয়ের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের গভীরতম সত্তার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি