ভগবদ্গীতা ১৩.১১ — অনন্য ভক্তি, নির্জন সাধনা ও জনসংসর্গ থেকে অনাসক্তি
ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী।
বিবিক্তদেশসেবিত্বমরাতির্জনসংসদি।।১১।।
অনুবাদঃ অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, সৈর্য, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদিতে আসক্তিশূন্যতা, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান-এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের একটি অত্যন্ত গভীর ও অন্তর্মুখী রূপের পরিচয় দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো “ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী। বিবিক্তদেশসেবিত্বমরতির্জনসংসদি।” এই শ্লোকে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ মানুষের অন্তর্জীবন, ঈশ্বরচেতনা, ভক্তি, আত্মসংযম এবং সামাজিক আসক্তি সম্পর্কে একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা বোঝানো হয়নি। বরং এমন একটি পরিশুদ্ধ জীবনদৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ নিজের চেতনার প্রকৃত কেন্দ্রকে উপলব্ধি করতে পারে। ঈশ্বরের প্রতি অবিচল ভক্তি, অন্তর্মুখী সাধনার উপযোগী পরিবেশ গ্রহণ এবং জনসমাজের প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে মুক্ত থাকা এই জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো “ময়ি”। সংস্কৃত “মদ্” সর্বনাম থেকে “ময়ি” শব্দের উৎপত্তি এবং এর সাধারণ অর্থ হলো আমার মধ্যে, আমার প্রতি অথবা আমাকে আশ্রয় করে। কিন্তু গীতার দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থ কেবল ব্যক্তিগত কৃষ্ণের প্রতি মানসিক আকর্ষণ নয়। এখানে “ময়ি” পরমেশ্বরকে জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয় ও পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করার দিকে নির্দেশ করে। মানুষের জীবন সাধারণত অসংখ্য কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরতে থাকে। কখনো অর্থ জীবনের কেন্দ্র হয়, কখনো সম্মান, কখনো সম্পর্ক, কখনো ক্ষমতা, কখনো সামাজিক পরিচয় এবং কখনো মানুষের প্রশংসা। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো মানুষের চেতনার একটি চূড়ান্ত কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন এবং সেই কেন্দ্র যখন পরম সত্যে স্থাপিত হয় তখন জীবনের বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে কমে আসে।
এরপর এসেছে “অনন্যযোগেন” শব্দটি। “অনন্য” শব্দটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “অন্য” থেকে। অর্থাৎ অন্য নয়, দ্বিতীয় কোনো আশ্রয় নেই, একনিষ্ঠ বা অবিভক্ত। “যোগ” শব্দটি সংস্কৃত “যুজ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে সংযোগ, একীকরণ ও একাগ্রতার ভাব রয়েছে। তাই “অনন্যযোগ” বলতে এমন এক চেতনার অবস্থা বোঝায় যেখানে মানুষের মন ও হৃদয় পরম সত্যের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে। “অনন্যযোগেন” বলতে বোঝানো হয়েছে অনন্যযোগের দ্বারা বা অনন্যযোগের মাধ্যমে। এর মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা রয়েছে। ঈশ্বর যেন জীবনের বহু আকাঙ্ক্ষার একটি অংশ না হয়ে জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয় হয়ে ওঠেন। মানুষ যদি ঈশ্বরকে চায় কেবল নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য, বিপদ থেকে মুক্তির জন্য অথবা কোনো পার্থিব লাভের আশায়, তবে সেখানে ঈশ্বরের প্রতি সম্পর্ক থাকলেও তা এখনও সম্পূর্ণ অনন্যতার পর্যায়ে পৌঁছায় না। অনন্যযোগ তখনই গভীর হয় যখন ঈশ্বর নিজেই হয়ে ওঠেন চূড়ান্ত লক্ষ্য।
এরপর এসেছে “ভক্তি” শব্দটি। ভক্তি শব্দটির মূল সংস্কৃত “ভজ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, গ্রহণ করা, সেবা করা, উপাসনা করা এবং নিজেকে নিবেদন করার ভাব রয়েছে। তাই ভক্তি কেবল আবেগের নাম নয়। ভক্তি হলো ঈশ্বরের সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক যেখানে শ্রদ্ধা, প্রেম, আত্মসমর্পণ, স্মরণ, সেবা এবং ঈশ্বরনিষ্ঠা একত্রিত হয়। একজন মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে পারেন কিন্তু তাঁর মধ্যে ভক্তি নাও থাকতে পারে। আবার কেউ গভীর ভক্তির মাধ্যমে এমন এক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন যেখানে ঈশ্বর তাঁর জীবনের সমস্ত কর্ম, চিন্তা ও মূল্যবোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। এই কারণে গীতার ভক্তি কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়। এটি চেতনার একটি বিশেষ অভিমুখ।
কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ শুধু “ভক্তি” শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি বলেছেন “ভক্তিরব্যভিচারিণী”। “অব্যভিচারিণী” শব্দটি গঠিত হয়েছে নিষেধসূচক “অ” এবং “ব্যভিচারিণী” শব্দের মাধ্যমে। ব্যভিচারের মধ্যে নির্দিষ্ট পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া বা অন্যদিকে চলে যাওয়ার ভাব রয়েছে। তাই অব্যভিচারিণী অর্থ হলো যা বিচ্যুত হয় না, যা অবিচল, একনিষ্ঠ এবং স্থির। এর দ্বারা এমন ভক্তিকে বোঝানো হয়েছে যা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না। সুখে ঈশ্বরকে স্মরণ করা এবং দুঃখে তাঁকে ভুলে যাওয়া অবিচল ভক্তির লক্ষণ নয়। লাভ হলে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং ক্ষতি হলে ঈশ্বরের প্রতি অভিমান করা ভক্তির পরিপূর্ণ রূপ নয়। প্রকৃত ভক্তি হলো এমন এক সম্পর্ক যা লাভ ও ক্ষতি, সুখ ও দুঃখ, সম্মান ও অপমান, সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যেও অন্তরের গভীরে স্থির থাকে।
এই অব্যভিচারিণী ভক্তির একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো ঈশ্বরকে কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য পূরণের যন্ত্র হিসেবে না দেখা। মানুষ অনেক সময় প্রার্থনা করে কারণ সে কিছু পেতে চায়। তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে তার ভক্তি প্রবল হয় এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে তার বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু অনন্য ও অব্যভিচারিণী ভক্তিতে ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য ঈশ্বরকে চাওয়া হয়। এখানে ঈশ্বর কোনো মাধ্যম নন। তিনিই চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং আশ্রয়। এই অবস্থায় ভক্তির গভীরতা মানুষের বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা নির্ধারিত হয় না।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো “বিবিক্তদেশসেবিত্বম্”। এটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “বিবিক্ত” অর্থ পৃথক, নির্জন বা জনসমাগম থেকে দূরে থাকা। “দেশ” অর্থ স্থান বা পরিবেশ এবং “সেবিত্ব” শব্দের মধ্যে গ্রহণ করা, অবলম্বন করা বা অভ্যাস করার ভাব রয়েছে। তাই “বিবিক্তদেশসেবিত্বম্” অর্থ হলো এমন নির্জন বা শান্ত পরিবেশকে গ্রহণ করার প্রবণতা যেখানে আত্মচিন্তা, সাধনা ও অন্তর্মুখী মনন সহজ হয়। এখানে নির্জনতা বলতে কেবল এমন কোনো স্থান বোঝানো হয় না যেখানে কোনো মানুষ নেই। প্রকৃত বিবিক্ত দেশ হলো এমন পরিবেশ যেখানে বাহ্যিক কোলাহল কম এবং নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকানোর সুযোগ বেশি।
মানুষের মন স্বভাবতই বাহিরের জগতের দ্বারা প্রভাবিত হয়। দৃশ্য, শব্দ, মানুষের প্রশংসা, নিন্দা, প্রতিযোগিতা, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক তুলনা মনের মধ্যে ক্রমাগত ঢেউ সৃষ্টি করে। এই কারণে আত্মজিজ্ঞাসার জন্য কখনো কখনো বাহ্যিক কোলাহল থেকে সরে আসা প্রয়োজন। বিবিক্তদেশ সেই নীরবতার প্রতীক যেখানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য নিজের সঙ্গে দেখা করতে পারে। তবে এই নির্জনতা মানুষকে সমাজবিমুখ করার জন্য নয়। এর উদ্দেশ্য হলো অন্তর্জগতকে শক্তিশালী করা যাতে মানুষ আবার সমাজের মধ্যে ফিরে গিয়েও নিজের অন্তরের কেন্দ্র হারিয়ে না ফেলে।
এরপর এসেছে “অরতি” শব্দটি। “রতি” শব্দের মধ্যে আনন্দ, আকর্ষণ, অনুরাগ ও আসক্তির ভাব রয়েছে। এর আগে নিষেধসূচক “অ” যুক্ত হয়ে “অরতি” হয়েছে। অর্থাৎ অনুরাগহীনতা বা অতিরিক্ত আকর্ষণের অভাব। কিন্তু এখানে অরতি বলতে মানুষকে ঘৃণা করা বোঝানো হয়নি। শ্রীকৃষ্ণ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ শেখাচ্ছেন না। বরং তিনি এমন এক মানসিক স্বাধীনতার কথা বলছেন যেখানে মানুষ জনসমাজের উপস্থিতি, প্রশংসা এবং অনুমোদনের ওপর নিজের আত্মমূল্য নির্ভরশীল করে তোলে না।
এই অর্থটি আরও স্পষ্ট হয় “জনসংসদি” শব্দের মাধ্যমে। “জন” অর্থ মানুষ এবং “সংসদ” অর্থ মানুষের সমাবেশ বা একত্রে বসার স্থান। “জনসংসদি” অর্থ জনসমাজে বা মানুষের সমাগমে। “অরতির্জনসংসদি” অর্থ জনসমাজের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ না থাকা। এখানে মানুষকে ভালোবাসার বিরোধিতা নেই। একজন জ্ঞানী মানুষ সমাজের মধ্যে বাস করতে পারেন, মানুষের সেবা করতে পারেন, পরিবার পালন করতে পারেন, রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারেন। কিন্তু তিনি জনমতের দাস হবেন না। মানুষের প্রশংসায় তাঁর অহংকার ফুলে উঠবে না এবং নিন্দায় তাঁর অস্তিত্ব ভেঙে পড়বে না। তাঁর অন্তরের মূল্যবোধ বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করবে না।
এই শিক্ষা বর্তমান যুগে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের পৃথিবীতে জনসংসদ শুধু কোনো সভা বা বাজার নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এক ধরনের বিশাল জনসমাজে পরিণত হয়েছে। একজন মানুষ একটি ছবি বা মতামত প্রকাশ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। প্রশংসা পেলে আনন্দ, সমালোচনা পেলে হতাশা, বেশি প্রতিক্রিয়া পেলে আত্মতৃপ্তি এবং কম প্রতিক্রিয়া পেলে আত্মসন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় মানুষ নিজের অন্তরের সত্যের পরিবর্তে জনতার প্রতিক্রিয়াকে নিজের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে। গীতার “অরতির্জনসংসদি” শিক্ষা এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। এর অর্থ প্রযুক্তি বা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের অন্তরের মূল্যকে মানুষের প্রশংসা ও নিন্দার হাতে তুলে না দেওয়া।
এই শ্লোকের মধ্যে ভক্তি, নির্জনতা এবং জনসমাজ থেকে অনাসক্তি একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রথমে বলা হয়েছে “ময়ি” অর্থাৎ চেতনার কেন্দ্র ঈশ্বরে স্থাপন করা। তারপর বলা হয়েছে “অনন্যযোগেন” অর্থাৎ সেই কেন্দ্রের প্রতি একনিষ্ঠ থাকা। এরপর এসেছে “ভক্তিরব্যভিচারিণী” অর্থাৎ সেই সম্পর্ক যেন বিচ্যুত না হয়। তারপর বলা হয়েছে “বিবিক্তদেশসেবিত্বম্” অর্থাৎ অন্তর্জগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য নীরব ও অনুকূল পরিবেশ গ্রহণ করা। শেষে বলা হয়েছে “অরতির্জনসংসদি” অর্থাৎ জনসমাজের অন্ধ আকর্ষণ ও জনমতের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা। এই ধারাটি আসলে মানুষের চেতনাকে বাহির থেকে ভিতরের দিকে নিয়ে যায়।
দার্শনিকভাবে দেখলে এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের পরিচয় সম্পর্কে একটি গভীর প্রশ্ন রয়েছে। মানুষ কি কেবল তার সামাজিক পরিচয়। সে কি কেবল তার পেশা, পরিবার, সম্পদ, খ্যাতি অথবা অন্যের দেওয়া পরিচয়। যদি মানুষের আত্মপরিচয় সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই পরিচয় সবসময় অস্থির থাকবে। কারণ বাহ্যিক সবকিছুই পরিবর্তনশীল। সম্পদ পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তিত হয়, মানুষের মতামত পরিবর্তিত হয় এবং শরীরও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু গীতা মানুষকে এমন এক সত্যের সন্ধান করতে বলছে যা এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যে অপরিবর্তনীয় আশ্রয় দিতে পারে। সেই অনুসন্ধানের পথেই অনন্য ভক্তি ও অন্তর্মুখীতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শিক্ষা চেতনাকে বহিরঙ্গের নাম ও রূপের বিচিত্রতা থেকে সরিয়ে পরম সত্যের দিকে স্থাপন করার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভক্তির দৃষ্টিতে এটি ঈশ্বরকে একমাত্র পরম আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষা। যোগদর্শনের দৃষ্টিতে এটি চিত্তের বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে একাগ্রতার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ। মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এটি অন্যের অনুমোদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের গভীর মূল্যবোধের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার শিক্ষা। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে বিবিক্ত স্থান হয়ে ওঠে আত্মঅনুসন্ধানের প্রতীক এবং জনসমাজ হয়ে ওঠে বাহ্যিক কোলাহল, সামাজিক অভিনয় ও জনমতের প্রতীক।
এই শ্লোককে একটি শান্ত পুকুরের উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। যখন পুকুরের পানিতে ক্রমাগত ঢেউ থাকে তখন তার গভীরে কী আছে তা দেখা যায় না। মানুষের মনও তেমনি কামনা, ভয়, অহংকার, প্রতিযোগিতা, প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক তুলনার ঢেউয়ে অস্থির থাকে। বিবিক্ততার মাধ্যমে বাহ্যিক উদ্দীপনা কিছুটা কমে আসে। জনসমাজের প্রতি অন্ধ আকর্ষণ কমলে নতুন ঢেউ সৃষ্টি হওয়ার প্রবণতাও কমে। অনন্যযোগ মনকে একদিকে স্থির করে এবং অব্যভিচারিণী ভক্তি সেই স্থিরতাকে ঈশ্বরমুখী করে। তখন মানুষের অন্তর্গত গভীরতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
তবে এই শ্লোককে ভুলভাবে বোঝা উচিত নয়। বিবিক্তদেশসেবিত্বম্ মানে সমাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া নয় এবং অরতির্জনসংসদি মানে মানুষকে ঘৃণা করা নয়। বরং এর গভীর শিক্ষা হলো বাইরে সমাজের মধ্যে থেকেও ভিতরে স্বাধীন থাকা। একজন মানুষ মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, মানুষের সেবা করতে পারেন, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে নিজের অন্তরের কেন্দ্রকে ঈশ্বরের মধ্যে স্থাপন করতে পারেন। প্রকৃত অনাসক্তি হলো সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, সম্পর্কের মধ্যে থেকেও নিজের চেতনার স্বাধীনতা রক্ষা করা।
এই কারণে এই শ্লোকের শিক্ষা শুধু সন্ন্যাসী বা সাধকের জন্য নয়। সাধারণ মানুষের জীবনেও এর গভীর প্রয়োগ রয়েছে। প্রতিদিন কিছু সময় নীরব থাকা, নিজের চিন্তা ও উদ্দেশ্য পরীক্ষা করা, মানুষের প্রশংসার ওপর নিজের মূল্য নির্ভর না করা, সমালোচনায় অস্থির না হওয়া, নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করা এবং ঈশ্বরের প্রতি স্থির বিশ্বাস ও ভক্তি গড়ে তোলা এই শিক্ষার বাস্তব রূপ হতে পারে। আধুনিক ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষ যদি কিছু সময় নিজের অন্তরের সঙ্গে কথা বলতে শেখে তবে তার জীবন অনেক বেশি সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, “ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী। বিবিক্তদেশসেবিত্বমরতির্জনসংসদি” শ্লোকটি মানুষের বাহ্যিক জীবনকে নয়, তার চেতনার কেন্দ্রকে পরিবর্তন করার শিক্ষা দেয়। “ময়ি” মানুষকে পরম সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। “অনন্যযোগেন” তাকে একনিষ্ঠ করে। “ভক্তি” তাকে প্রেম ও আত্মসমর্পণের সঙ্গে যুক্ত করে। “অব্যভিচারিণী” তাকে পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির থাকতে শেখায়। “বিবিক্তদেশসেবিত্বম্” তাকে অন্তরের নীরবতার মূল্য উপলব্ধি করায়। আর “অরতির্জনসংসদি” তাকে জনমত, প্রশংসা ও সামাজিক অনুমোদনের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে শেখায়। এই সমস্ত শিক্ষা একত্রে একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে। প্রকৃত জ্ঞান শুধু জানার মধ্যে নয়, বরং নিজের চেতনাকে এমনভাবে রূপান্তরিত করার মধ্যে যার ফলে মানুষ বাহ্যিক কোলাহলের মাঝেও অন্তরের সত্যকে ধরে রাখতে পারে। যে ভক্তি ঈশ্বরকে জীবনের কেন্দ্র করে, যে নির্জনতা মানুষকে নিজের গভীরে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং যে অনাসক্তি তাকে জনমতের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে, সেই তিনের মিলনেই গীতার বর্ণিত জ্ঞানের এক গভীর ও জীবন্ত রূপ প্রকাশিত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!