সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৩.১২ — অধ্যাত্মজ্ঞান, আত্মতত্ত্বের অনুসন্ধান ও পরম জ্ঞেয়ের উপলব্ধি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্।এতজজ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোহন্যথা।।১২।।
অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্।
এতজজ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোহন্যথা।।১২।।

অনুবাদঃ অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, সৈর্য, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদিতে আসক্তিশূন্যতা, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান-এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছেন। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা, শাস্ত্র পাঠ করা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক পাণ্ডিত্য অর্জন করা বোঝানো হয়নি। প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেই সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে অনুসন্ধানী থাকা। অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং শব্দের মধ্যে এই গভীর ভাবটি প্রকাশ পেয়েছে। অধ্যাত্ম অর্থ আত্মাকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান এবং জ্ঞান অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। তাই অধ্যাত্মজ্ঞান বলতে নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে জ্ঞানকে বোঝায় এবং নিত্যত্ব বলতে সেই জ্ঞানে সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকার অবস্থাকে বোঝায়। মানুষ সাধারণত নিজের শরীর, মন, চিন্তা, স্মৃতি, পেশা, সম্পদ, সম্পর্ক ও সামাজিক পরিচয়ের মাধ্যমে নিজেকে চিনতে শেখে। কিন্তু এসবই পরিবর্তনশীল। শৈশবের শরীর বদলে যায়, চিন্তা বদলে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, সম্পদ আসে ও চলে যায়, সামাজিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হয়। অথচ এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষ নিজের মধ্যে একটি অবিচ্ছিন্ন আমি বোধ অনুভব করে। অধ্যাত্মজ্ঞান সেই গভীর সত্তার অনুসন্ধান করতে শেখায়।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্। তত্ত্ব শব্দের অর্থ হলো যা প্রকৃতপক্ষে তাই বা কোনো কিছুর যথার্থ স্বরূপ। দর্শন শব্দের অর্থ শুধু চোখ দিয়ে দেখা নয়, বরং সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা। তাই তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শন বলতে তত্ত্বজ্ঞানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করার দৃষ্টিকে বোঝায়। কোনো সত্য সম্পর্কে পড়া আর সেই সত্যকে নিজের জীবনে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। কেউ যদি জানে যে সবকিছু পরিবর্তনশীল, কিন্তু সামান্য ক্ষতি হলেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, তবে সেই জ্ঞান এখনও তার জীবনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রকৃত জ্ঞান তখনই জীবন্ত হয় যখন তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও মানসিক অবস্থাকে পরিবর্তন করে। সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গের আকার যেমন আলাদা হলেও তাদের প্রকৃতি জল, তেমনি মানুষের বাহ্যিক পরিচয় যতই ভিন্ন হোক না কেন, নিজের গভীরতম অস্তিত্বের সত্য অনুসন্ধানই অধ্যাত্মদৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য।

শ্রীকৃষ্ণ এরপর বলেন এতজ্জ্ঞানমিতি প্রোক্তম্ অর্থাৎ এই অবস্থাকেই জ্ঞান বলা হয়েছে। এখানে জ্ঞান শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃত জ্ঞান শব্দটি জানা বা উপলব্ধি করার অর্থ বহন করে। কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে এই জানা কেবল তথ্যগত জানা নয়। এটি এমন এক উপলব্ধি যা মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকে পরিবর্তন করে। একজন ব্যক্তি যখন বুঝতে শুরু করে যে সে কেবল তার শরীর নয়, কেবল তার চিন্তা নয় এবং কেবল তার সামাজিক পরিচয়ও নয়, তখন তার মধ্যে আত্মঅনুসন্ধানের সূচনা হয়। সে বাহ্যিক সাফল্য ও ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের অস্তিত্বের গভীর অর্থ অনুসন্ধান করতে শেখে। এই অনুসন্ধানই অধ্যাত্মজ্ঞানকে জীবনের একটি স্থায়ী সাধনায় পরিণত করে।

শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে অজ্ঞানং যদতঃ অন্যথা। অর্থাৎ এই জ্ঞানের বিপরীত যা কিছু সেটিই অজ্ঞান। এখানে অজ্ঞান বলতে শুধু কোনো বিষয় না জানাকে বোঝানো হয়নি। অজ্ঞান হলো বাস্তবতাকে ভুলভাবে দেখা এবং পরিবর্তনশীল বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করা। মানুষ যখন সম্পদকে নিজের পরিচয় মনে করে, সম্মান হারালে নিজেকে মূল্যহীন মনে করে, শরীরের পরিবর্তনকে নিজের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করে অথবা সুখ ও দুঃখকে নিজের প্রকৃত স্বরূপের সঙ্গে এক করে ফেলে, তখন সে নিজের গভীর সত্যকে ভুলে যায়। এই ভুল পরিচয়ই গীতার দৃষ্টিতে অজ্ঞানতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য এখানেই যে এটি মানুষকে নিজের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়। আমরা সাধারণত বাইরের জগতকে জানার জন্য অসংখ্য চেষ্টা করি। বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করি। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন করে না, তার বাহ্যিক জ্ঞান যত বিস্তৃতই হোক, তার আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একটি গভীর শূন্যতা থেকে যেতে পারে। তাই গীতার এই শিক্ষা মানুষের জ্ঞানকে বাহির থেকে অন্তরের দিকে নিয়ে যায়। প্রথমে প্রশ্ন আসে জগত কী, তারপর প্রশ্ন আসে আমি কে, এবং শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ওঠে এই জগত ও আমার অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত সত্য কী।

অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্বং এবং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্ এই দুটি ধারণাকে একত্রে দেখলে বোঝা যায় যে প্রকৃত জ্ঞান কোনো একদিনের অর্জন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক অন্তর্জাগরণ। প্রতিদিন নিজের চিন্তা ও আচরণকে পর্যবেক্ষণ করা, নিজের আসক্তি ও অহংকারকে বোঝা, পরিবর্তনশীলতার সত্যকে গ্রহণ করা এবং নিজের অস্তিত্বের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধান করা এই জ্ঞানকে জীবন্ত রাখে। তাই আত্মজ্ঞান কেবল ধ্যান বা শাস্ত্র পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের সুখ দুঃখ, লাভ ক্ষতি, সম্মান অপমান এবং সাফল্য ব্যর্থতার প্রতিটি পরিস্থিতিই আত্মজ্ঞানকে পরীক্ষা ও গভীর করার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের সামনে জ্ঞানের একটি অত্যন্ত গভীর আদর্শ স্থাপন করে। প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের প্রকৃত সত্তাকে জানার আকাঙ্ক্ষা, সেই জ্ঞানে স্থির থাকার সাধনা এবং সমস্ত পরিবর্তনশীলতার অন্তরালে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করার দৃষ্টি। এর বিপরীতে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে বাহ্যিক ও পরিবর্তনশীল বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য মনে করাই অজ্ঞান। তাই এই শ্লোকের সারমর্ম হলো নিজের দিকে ফিরে তাকাও, নিজের প্রকৃত সত্তাকে অনুসন্ধান করো, সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করো এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করো। কারণ প্রকৃত জ্ঞান মানুষের মাথায় জমে থাকা তথ্য নয়, বরং এমন এক অন্তর্দৃষ্টি যা মানুষকে নিজের পরিচয়, জীবন ও জগতকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি