ভগবদ্গীতা ১৩.১৩ — জ্ঞেয় পরম তত্ত্ব, অনাদি ব্রহ্ম ও অমৃতত্বের উপলব্ধি
জ্ঞেয়ং যত্তৎপ্রবক্ষ্যামি যজজ্ঞাত্বামৃতমশ্নুতে।
অনাদি মৎপরং ব্রহ্ম ন সত্তন্নাসদুচ্যতে।।১৩।।
অনুবাদঃ আমি এখন জ্ঞাতব্য বিষয় সম্বন্ধে বলব, যা জেনে অমৃতত্ব লাভ হয়। সেই জ্ঞেয় বস্তু অনাদি এবং আমার আশ্রিত। তাকে বলা হয় ব্রহ্ম এবং তা কার্য ও কারণের অতীত।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষের চূড়ান্ত জ্ঞানের বিষয় বা জ্ঞেয় তত্ত্বের দিকে নিয়ে যান। তিনি বলেন, যে তত্ত্বকে জানা উচিত এবং যা জেনে মানুষ অমৃতত্ব লাভ করে, সেই পরম সত্যের কথা তিনি এখন প্রকাশ করবেন। শ্লোকটির কেন্দ্রে রয়েছে জ্ঞেয়ং, জ্ঞাত্বা, অমৃতম্, অনাদি, ব্রহ্ম, সৎ এবং অসৎ এই কয়েকটি গভীর শব্দ। প্রতিটি শব্দ একদিকে যেমন সংস্কৃত ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ ও ধাতুগত ইতিহাস বহন করে, অন্যদিকে তেমনি ভারতীয় দর্শনের এক বিশাল চিন্তাজগতের দ্বার খুলে দেয়।
জ্ঞেয় শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন। জ্ঞা ধাতুর অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা জ্ঞান লাভ করা। জ্ঞেয় বলতে বোঝায় যা জানা উচিত, যা জ্ঞানের বিষয় এবং যা সত্যভাবে উপলব্ধি করার যোগ্য। সাধারণ কোনো তথ্য জানাকে এখানে জ্ঞেয় বলা হচ্ছে না। মানুষ পৃথিবী, প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞান সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য জানতে পারে, কিন্তু সেই সমস্ত জ্ঞান তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় না। গীতার জ্ঞেয় সেই তত্ত্ব, যার জ্ঞান মানুষের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। অর্থাৎ এখানে জ্ঞেয় হলো পরম সত্য, আত্মতত্ত্ব এবং ব্রহ্মতত্ত্বের উপলব্ধির বিষয়।
যৎ এবং তৎ শব্দ দুটি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যৎ অর্থ যা এবং তৎ অর্থ সেই। সংস্কৃত ভাষায় যৎ এবং তৎ এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে নির্দেশ করা হয়। কৃষ্ণ যেন বলছেন, যে পরম তত্ত্বকে জানা উচিত, সেটিই এখন তিনি ব্যাখ্যা করবেন। এই নির্দেশের মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত রয়েছে। পরম সত্যকে কোনো দৃশ্যমান বস্তুর মতো সামনে রেখে দেখানো যায় না। তাকে ভাষার মাধ্যমে নির্দেশ করতে হয়। তাই যৎ এবং তৎ এখানে শুধু ব্যাকরণগত সর্বনাম নয়, বরং মানুষের মনকে দৃশ্যমান জগতের বাইরে অদৃশ্য সত্যের দিকে পরিচালিত করার নির্দেশক।
প্রবক্ষ্যামি শব্দটি প্র এবং বচ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বচ ধাতুর অর্থ বলা বা প্রকাশ করা। প্র উপসর্গের মাধ্যমে বিশেষভাবে বা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার ভাব আসে। প্রবক্ষ্যামি অর্থ আমি বলব, আমি প্রকাশ করব বা আমি ব্যাখ্যা করব। কিন্তু এখানে একটি গভীর রহস্য রয়েছে। কৃষ্ণ এমন একটি তত্ত্ব প্রকাশ করতে যাচ্ছেন যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভাষায় সম্পূর্ণরূপে ধারণ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ভাষা এখানে সত্যকে বন্দী করার জন্য নয়, সত্যের দিকে নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এই কারণেই শ্লোকের শেষাংশে বলা হয়েছে যে ব্রহ্মকে সৎও বলা যায় না এবং অসৎও বলা যায় না।
যজ্জ্ঞাত্বা শব্দটির মধ্যে জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে জ্ঞাত্বা রূপ রয়েছে। এর অর্থ যা জেনে বা যার সত্য উপলব্ধি করে। এখানে জ্ঞান কেবল শ্রবণ বা তথ্য সংগ্রহের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে সত্যিকারের জ্ঞান এমন একটি উপলব্ধি, যা মানুষের নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণাকে দূর করে। কেউ যদি ব্রহ্ম সম্পর্কে অনেক বই পড়ে এবং অসংখ্য শাস্ত্রীয় বক্তব্য মুখস্থ করে, তবুও তার জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না যতক্ষণ না সেই সত্য তার নিজের অস্তিত্বের মধ্যে উপলব্ধ হয়। তাই জ্ঞাত্বা শব্দটি তথ্যগত জ্ঞান থেকে আত্মানুভূতির দিকে নিয়ে যায়।
অমৃতম্ শব্দটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। অমৃত শব্দের মধ্যে অ এবং মৃত এই দুটি ভাব রয়েছে। মৃত মানে মৃত্যুর অধীন বা বিনষ্ট হওয়া। অমৃত অর্থ মৃত্যুহীন, মৃত্যুকে অতিক্রমকারী বা অবিনাশী। ভারতীয় সংস্কৃতিতে অমৃতকে অনেক সময় দেবতাদের অমরত্বদায়ী পানীয় হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, কিন্তু গীতার এই শ্লোকে অমৃতের অর্থ আরও গভীর। এখানে অমৃত মানে এমন এক উপলব্ধি, যার দ্বারা মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপকে নশ্বর দেহ, পরিবর্তনশীল মন এবং সাময়িক পরিচয়ের সীমার মধ্যে আবদ্ধ মনে করে না। অমৃতত্ব হলো মৃত্যুর বাস্তবতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং মৃত্যুর মধ্যেও যে অবিনাশী আত্মতত্ত্বের উপলব্ধি সম্ভব তা জানা।
অশ্নুতে শব্দের অর্থ লাভ করে, প্রাপ্ত হয় বা অনুভব করে। তাই অমৃতমশ্নুতে অর্থ দাঁড়ায় অমৃত লাভ করে বা অমৃতত্ব উপলব্ধি করে। এখানে শুধু কোনো ভবিষ্যৎ পুরস্কারের কথা বলা হচ্ছে না। জ্ঞানের ফল বর্তমান জীবনেই মানুষের চেতনার রূপান্তর ঘটাতে পারে। যখন মানুষ নিজেকে কেবল দেহ, নাম, পরিচয়, সম্পদ, সাফল্য এবং ব্যর্থতার সমষ্টি হিসেবে দেখতে থাকে, তখন তার মধ্যে ভয়, আসক্তি এবং মৃত্যুচিন্তা প্রবল হয়। কিন্তু যখন সে নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে এবং নশ্বরতার অন্তরালে অবিনাশী সত্যের অনুসন্ধান করে, তখন তার চেতনার মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতা জন্ম নেয়। এই স্বাধীনতাই অমৃতত্বের আধ্যাত্মিক অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অনাদি শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং আদি এই দুটি উপাদানের মাধ্যমে। আদি অর্থ শুরু বা প্রথম এবং অনাদি অর্থ যার কোনো শুরু নেই। ব্রহ্মকে অনাদি বলা হচ্ছে কারণ ব্রহ্ম কোনো সৃষ্ট বস্তু নয় যে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে তার অস্তিত্ব শুরু হয়েছে। যা সৃষ্টি হয় তার একটি সূচনা থাকে এবং যা পরিবর্তিত হয় তার একটি অবসানও থাকে। কিন্তু পরম সত্যকে যদি সৃষ্ট জগতের একটি বস্তু হিসেবে ধরা হয়, তাহলে তাকে আর পরম বলা যায় না। তাই অনাদি শব্দটি ব্রহ্মের কালাতীত প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। ব্রহ্ম কোনো সময়ের মধ্যে আবির্ভূত কোনো সীমিত সত্তা নয়। বরং সময় ও পরিবর্তনের ধারণারও গভীরে যে পরম বাস্তবতা, অনাদি শব্দ সেই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
মৎপরম শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মৎ অর্থ আমার বা আমাকে এবং পরম অর্থ সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত বা শ্রেষ্ঠ। এই শব্দকে এমনভাবে বোঝা যায় যে পরম সত্যের চূড়ান্ত আশ্রয় ভগবান এবং যার সর্বোচ্চ লক্ষ্য পরমেশ্বর। গীতার ভক্তিমূলক ব্যাখ্যায় এটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে ব্রহ্মকে ঈশ্বরের পরম স্বরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়। আবার বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে এই শব্দের ব্যাখ্যায় সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। অদ্বৈত দর্শন ব্রহ্মকে অদ্বিতীয় পরম সত্য হিসেবে উপলব্ধি করে, বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন পরম ব্যক্তিগত ঈশ্বরের সঙ্গে জীব ও জগতের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলে এবং দ্বৈত দর্শন ঈশ্বর, জীব ও জগতের বাস্তব পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয়। ফলে মৎপরম শব্দটি গীতার বহুমাত্রিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বৃহ্ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, বিস্তৃত হওয়া বা বৃহৎ হওয়া। এই ধাতুগত ভাব থেকে ব্রহ্মের মধ্যে সীমাহীনতা, ব্যাপকতা এবং সর্বব্যাপিতার ধারণা প্রকাশ পায়। উপনিষদীয় দর্শনে ব্রহ্ম কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তু নয়। ব্রহ্ম হলো সেই পরম বাস্তবতা যার ওপর সমস্ত অস্তিত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। দৃশ্যমান জগতের অসংখ্য নাম ও রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সেই পরিবর্তনের অন্তরালে যে পরম সত্যকে অনুসন্ধান করা হয়, তাকে ব্রহ্ম বলা হয়। তাই ব্রহ্মকে কোনো নির্দিষ্ট আকার, স্থান বা সময়ের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর অংশ হলো ন সত্তন্নাসদুচ্যতে। এখানে সৎ শব্দটি অস্তিত্ব বা যা আছে সেই অর্থ বহন করে। সৎ শব্দটি সংস্কৃত অস্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়া। অসৎ শব্দের মধ্যে অ নিষেধসূচক উপাদান যুক্ত হয়ে এমন কিছুকে বোঝায় যা নেই বা অস্তিত্বহীন। কৃষ্ণ বলছেন ব্রহ্মকে সৎও বলা যায় না এবং অসৎও বলা যায় না। এর অর্থ এই নয় যে ব্রহ্ম অস্তিত্বহীন। বরং এর অর্থ হলো ব্রহ্মকে আমাদের সাধারণ আছে এবং নেই এই দ্বৈত ধারণার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ করা যায় না।
মানুষ সাধারণত বাস্তবতাকে দুই ভাগে বিচার করে। কোনো কিছু আছে অথবা নেই। কোনো বস্তু দৃশ্যমান হলে আমরা তাকে বাস্তব বলে মনে করি এবং যা দেখা যায় না তাকে অনেক সময় অবাস্তব বলে ধরে নিই। কিন্তু পরম সত্যের ক্ষেত্রে এই বিচার যথেষ্ট নয়। ব্রহ্ম কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়, আবার শূন্য বা অস্তিত্বহীনও নয়। তাই তাকে সাধারণ সৎ ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না এবং অসৎ বলেও অস্বীকার করা যায় না। এই বক্তব্য ভারতীয় দর্শনের সেই গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায় যেখানে পরম সত্যকে ধারণাগত সীমার বাইরে অনুসন্ধান করা হয়।
এই ভাবটি উপনিষদের নেতি নেতি ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নেতি নেতি অর্থ এ নয়, এও নয়। এর উদ্দেশ্য কোনো সত্যকে অস্বীকার করা নয়। বরং মানুষ যাতে কোনো সীমিত ধারণাকেই পরম সত্য মনে না করে, সেই সতর্কতা সৃষ্টি করা। যখন আমরা বলি ব্রহ্ম আছে, তখন আমাদের মনে কোনো বস্তু বা সত্তার ধারণা তৈরি হতে পারে। আবার যখন বলি ব্রহ্ম নেই, তখন আমরা তাকে শূন্যতা বা অনস্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলতে পারি। তাই গীতা আমাদের প্রচলিত ধারণার সীমা অতিক্রম করে সত্যকে অনুসন্ধান করতে শেখায়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য বিশেষভাবে গভীর। অদ্বৈত দর্শনে ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় পরম সত্য। জগতের নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল হলেও ব্রহ্ম চূড়ান্ত বাস্তবতা। তাই সৎ এবং অসৎ এই দ্বৈত ধারণার মধ্যে ব্রহ্মকে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ করা যায় না। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ব্রহ্ম পরম ব্যক্তিগত ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জীব ও জগত তাঁর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। দ্বৈত দর্শনে আবার ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য বাস্তব এবং ঈশ্বরই সর্বোচ্চ পরম সত্য। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও সব ধারাই স্বীকার করে যে মানুষের সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান পরম সত্যকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও গভীর। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয় তৈরি করে শরীর, নাম, পেশা, পরিবার, সম্পদ, স্মৃতি, সাফল্য এবং ব্যর্থতার মাধ্যমে। কিন্তু এগুলোর সবই পরিবর্তনশীল। শৈশবের শরীর আর বর্তমান শরীর এক নয়। পুরনো চিন্তা বদলে গেছে। জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়েছে। তবুও মানুষের মধ্যে আমি আছি এই অনুভূতি কোনো না কোনোভাবে অব্যাহত থাকে। গীতার আত্মতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সেই গভীর প্রশ্নটি সামনে আনে যে পরিবর্তনশীল সবকিছুকে যে সচেতনতা লক্ষ্য করছে, সেই সচেতনতার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্ন থেকেই আত্মজ্ঞান ও ব্রহ্মজিজ্ঞাসার পথ উন্মুক্ত হয়।
একটি সিনেমার পর্দার কথা ভাবা যায়। পর্দার ওপর কখনো যুদ্ধ দেখা যাচ্ছে, কখনো প্রেম, কখনো আগুন, কখনো বৃষ্টি, কখনো জন্ম এবং কখনো মৃত্যু। দৃশ্যগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে কিন্তু পর্দা নিজে সেই দৃশ্যগুলোর কোনো একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উপমার মাধ্যমে বোঝা যায় যে দৃশ্যমান জগতের পরিবর্তনের অন্তরালে কোনো স্থায়ী ভিত্তির ধারণা কীভাবে কল্পনা করা যায়। অবশ্যই পর্দা ব্রহ্মের পূর্ণ সংজ্ঞা নয়, কিন্তু ব্রহ্মকে কোনো একক দৃশ্য বা বস্তুর সঙ্গে এক করে না দেখার বিষয়টি বোঝাতে এই উপমা সহায়ক।
সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমাও এখানে প্রাসঙ্গিক। একটি তরঙ্গের জন্ম হয়, তার আকৃতি পরিবর্তিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা সমুদ্রের মধ্যে বিলীন হয়। তরঙ্গের দৃষ্টিতে জন্ম ও মৃত্যু আছে, কিন্তু সমুদ্রের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে জল তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও অনেকটা তরঙ্গের মতো। দেহের জন্ম হয়, পরিবর্তন হয় এবং একদিন মৃত্যু ঘটে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে অনুসন্ধান তাকে সেই গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায় যা কেবল পরিবর্তনশীল দেহ ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো জ্ঞেয় এবং জ্ঞাত্বা শব্দের সম্পর্ক। শুরুতে বলা হচ্ছে যে একটি তত্ত্ব জ্ঞেয়, অর্থাৎ যা জানা উচিত। পরে বলা হচ্ছে যজ্জ্ঞাত্বা, অর্থাৎ যা জেনে অমৃতত্ব লাভ করা যায়। ফলে জ্ঞানের বিষয় এবং জ্ঞানের ফল একই আধ্যাত্মিক ধারার মধ্যে যুক্ত হয়েছে। এখানে জ্ঞান কোনো বাহ্যিক তথ্যের সঞ্চয় নয়। জ্ঞান তখনই সত্যিকার অর্থে জ্ঞান হয়ে ওঠে যখন তা মানুষের অস্তিত্বকে পরিবর্তন করে এবং তাকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
এই কারণেই অমৃতত্বকে কেবল মৃত্যুর পর কোনো চিরস্থায়ী অবস্থার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। অমৃতত্ব হলো নিজের পরিচয়কে নশ্বরতার সীমা থেকে মুক্ত করে দেখা। মানুষ যখন নিজেকে শুধু দেহ হিসেবে দেখে তখন মৃত্যু তার কাছে সর্বশেষ ভয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আত্মতত্ত্বের অনুসন্ধানে সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে দেহ পরিবর্তনশীল হলেও চেতনা এবং আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অনুসন্ধান আরও গভীর কোনো সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই উপলব্ধি মৃত্যুকে অস্বীকার করে না, বরং মৃত্যুকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে।
পুরো শ্লোকটি তাই একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার মতো। প্রথমে আছে জ্ঞেয়, অর্থাৎ যে সত্যকে জানা উচিত। তারপর আছে প্রবক্ষ্যামি, অর্থাৎ সেই সত্যের দিকে নির্দেশ করার জন্য শিক্ষার সূচনা। এরপর আছে জ্ঞাত্বা, অর্থাৎ সেই সত্যকে উপলব্ধি করা। তার ফল অমৃতত্ব। তারপর অনাদি এবং ব্রহ্ম শব্দের মাধ্যমে সেই সত্যের কালাতীত ও সর্বব্যাপী প্রকৃতি প্রকাশিত হয়েছে। সবশেষে ন সৎ নাসৎ বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পরম সত্যকে সাধারণ ধারণার সীমায় সম্পূর্ণভাবে বন্দী করা সম্ভব নয়।
এই শ্লোকের সারকথা হলো মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ জ্ঞান বাহ্যিক জগতের অসংখ্য বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ নয়। মানুষের গভীরতম জ্ঞান হলো নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত ভিত্তিকে অনুসন্ধান করা। যে তত্ত্বকে জানা উচিত তা হলো ব্রহ্ম, যে জ্ঞান লাভ করলে অমৃতত্বের উপলব্ধি হয় তা হলো আত্মস্বরূপের জ্ঞান, এবং যে সত্যকে উপলব্ধি করা হয় তা অনাদি ও পরম। তাকে সাধারণ অর্থে সৎ বলা যায় না, কারণ সে কোনো সীমিত অস্তিত্বশীল বস্তু নয়। তাকে অসৎও বলা যায় না, কারণ সে অস্তিত্বহীন নয়। বরং সে এমন এক পরম সত্য যার সামনে আমাদের প্রচলিত ভাষা ও ধারণার সীমা প্রকাশ পায়।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের জিজ্ঞাসাকে বাহ্যিক জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে এবং তথ্য থেকে উপলব্ধির দিকে পরিচালিত করে। জ্ঞেয় আমাদের বলে কী জানতে হবে, জ্ঞাত্বা বলে কীভাবে সেই জ্ঞান জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে, অমৃতম্ বলে সেই উপলব্ধির ফল কী এবং অনাদি ব্রহ্ম বলে সেই সত্যের কালাতীত প্রকৃতি কী। আর ন সত্তন্নাসদুচ্যতে আমাদের শেখায় যে পরম সত্যকে কোনো সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে বন্দী করা যায় না। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং মানুষের চিরন্তন আত্মঅনুসন্ধানের এক গভীর দার্শনিক আহ্বান। মানুষ যখন বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে এবং জানতে চায় আমি আসলে কে, তখনই এই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ তার জীবনের মধ্যে উন্মোচিত হতে শুরু করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!