ভগবদ্গীতা ১৩.১৫ — ইন্দ্রিয়াতীত পরমসত্তা, আসক্তিহীন ধারক ও গুণাতীত চৈতন্য
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
আসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।১৫।।
অনুবাদঃ সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক, তবুও তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত। যদিও তিনি সকলের পালক, তবুও তিনি সম্পূর্ণ অনাসক্ত। তিনি প্রকৃতির গুণের অতীত, তবুও তিনি সমস্ত গুণের ঈশ্বর।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার এমন এক গভীর স্বরূপ প্রকাশ করেছেন, যা সাধারণ বুদ্ধির কাছে প্রথমে আপাতবিরোধী বলে মনে হতে পারে। তিনি বলেছেন যে পরম সত্য সকল ইন্দ্রিয়ের গুণ বা কার্যকে প্রকাশ করেন, অথচ তিনি নিজে সকল ইন্দ্রিয় থেকে বর্জিত। তিনি আসক্তিহীন, অথচ সমগ্র জগতের ধারক। তিনি প্রকৃতির গুণত্রয়ের অতীত, অথচ গুণসমূহের ভোক্তা বা অভিজ্ঞাতা হিসেবে প্রতীয়মান। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভারতীয় দর্শনের এক বিশাল তত্ত্ব নিহিত রয়েছে। এখানে মূলত মানুষের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির অন্তরালে যে চৈতন্যসত্তা সমস্ত অভিজ্ঞতাকে আলোকিত করে, সেই চৈতন্যের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসম্ শব্দটির মধ্যে সর্ব অর্থ সকল, ইন্দ্রিয় অর্থ জ্ঞান ও কর্মের উপকরণ, গুণ অর্থ ইন্দ্রিয়ের ধর্ম বা কার্যক্ষমতা এবং আভাস অর্থ প্রকাশ বা উদ্ভাসন। আভাস শব্দটির মূল সংস্কৃত ভাস্ ধাতুর মধ্যে, যার অর্থ আলো দেওয়া, দীপ্ত হওয়া বা প্রকাশিত হওয়া। তাই সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসম্ বলতে বোঝায় এমন এক চৈতন্য, যার উপস্থিতিতে সকল ইন্দ্রিয়ের কার্য প্রকাশিত হয়। চোখ দেখে, কান শোনে, জিহ্বা স্বাদ গ্রহণ করে, ত্বক স্পর্শ অনুভব করে এবং নাক গন্ধ গ্রহণ করে। কিন্তু এই সমস্ত অনুভূতির শেষ সত্যটি কোথায় প্রকাশিত হয়। চোখ কোনো বস্তু দেখলেও সেই দেখাকে যে সত্তা জানে, কান কোনো শব্দ শুনলেও সেই শোনাকে যে সত্তা উপলব্ধি করে, মন কোনো চিন্তা করলেও সেই চিন্তাকে যে সত্তা প্রত্যক্ষ করে, সেই সত্তাই চৈতন্য। এই অর্থে চৈতন্য ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপের প্রকাশক।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্। সর্ব অর্থ সকল, ইন্দ্রিয় অর্থ অনুভব ও কর্মের উপকরণ এবং বিবর্জিত অর্থ বর্জিত বা মুক্ত। অর্থাৎ যিনি সকল ইন্দ্রিয়ের কার্যকে প্রকাশ করেন, তিনি নিজে কোনো ইন্দ্রিয় নন। এই ধারণাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। যেমন বিদ্যুতের উপস্থিতিতে বাতি জ্বলে, পাখা ঘোরে এবং নানা যন্ত্র কাজ করে, কিন্তু বিদ্যুৎ নিজে বাতি, পাখা বা কোনো যন্ত্র নয়, তেমনি চৈতন্যের উপস্থিতিতে চোখ দেখে, কান শোনে এবং মন চিন্তা করে, কিন্তু চৈতন্য নিজে চোখ, কান বা মন নয়। চৈতন্য ইন্দ্রিয়কে ব্যবহার করে না, বরং ইন্দ্রিয়ের সমস্ত কার্য তার উপস্থিতিতে অর্থ ও প্রকাশ লাভ করে।
এই বক্তব্য মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমরা সাধারণত বলি আমি দেখি, আমি শুনি, আমি ভাবি, আমি সুখী এবং আমি দুঃখী। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দেহের পরিবর্তন আমরা জানতে পারি, মনের পরিবর্তন আমরা অনুভব করতে পারি এবং চিন্তার পরিবর্তনও আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। তাহলে যে সত্তা দেহ, মন ও চিন্তার পরিবর্তনকে জানতে পারে, সে কি নিজেই সেই পরিবর্তনগুলোর সমষ্টি। গীতার দৃষ্টিতে এর উত্তর হলো না। পরিবর্তনশীল দেহ ও মনের অন্তরালে এমন একটি সাক্ষী চৈতন্য রয়েছে, যার উপস্থিতিতে সমস্ত পরিবর্তন প্রকাশিত হয়।
আসক্তম্ শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। আসক্ত শব্দটি সংস্কৃত সঞ্জ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মূল ভাব হলো কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকা, যুক্ত হওয়া বা আবদ্ধ হওয়া। পরমাত্মাকে এখানে আসক্ত বলা হয়েছে, যার গভীর তাৎপর্য অনাসক্ত বা কোনো কিছুর দ্বারা আবদ্ধ নন। তিনি জগতের মধ্যে প্রকাশিত হলেও জগতের কোনো বস্তু তাঁকে আবদ্ধ করে না। মানুষের ক্ষেত্রে আসক্তি সৃষ্টি হয় যখন কোনো বস্তু, সম্পর্ক, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলা হয়। তখন বস্তুটি হারালে নিজের অস্তিত্বও যেন বিপন্ন বলে মনে হয়। কিন্তু আত্মস্বরূপের উপলব্ধি মানুষকে শেখায় যে জগতের মধ্যে থেকে জগতের প্রতি কর্তব্য পালন করা যায়, অথচ অন্তরে তার দ্বারা আবদ্ধ না হয়েও থাকা সম্ভব।
এর পরেই এসেছে সর্বভৃত্ শব্দটি। সর্ব অর্থ সকল এবং ভৃত্ শব্দটি সংস্কৃত ভৃ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ধারণ করা, বহন করা, পালন করা বা রক্ষা করা। সুতরাং সর্বভৃত্ অর্থ যিনি সকলকে ধারণ করেন বা সকলের আধার। এই ধারণাটি ভারতীয় দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সমস্ত জীব কোনো না কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল। শরীর খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, খাদ্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রকৃতি মহাজাগতিক নিয়মের মধ্যে অবস্থিত। কিন্তু সমগ্র নির্ভরশীল অস্তিত্বের পেছনে এমন এক চূড়ান্ত আধারের ধারণা ভারতীয় দর্শনে পাওয়া যায়, যার ওপর সবকিছু নির্ভর করে অথচ তিনি নিজে অন্য কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন। সেই অর্থেই পরমাত্মা সর্বভৃত্।
নির্গুণম্ শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গভীর শব্দ। নির্গুণ গঠিত হয়েছে নিঃ এবং গুণ থেকে। গুণ এখানে প্রধানত প্রকৃতির তিন গুণ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃকে নির্দেশ করে। সত্ত্ব জ্ঞান, স্বচ্ছতা ও সাম্য প্রকাশ করে। রজঃ কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত। তমঃ জড়তা, অজ্ঞানতা ও অবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরমাত্মাকে নির্গুণ বলা মানে এই নয় যে তাঁর কোনো উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই। বরং এর গভীর অর্থ হলো তিনি প্রকৃতির গুণত্রয়ের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। তিনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃএর পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। অদ্বৈত বেদান্তে এই নির্গুণতা বিশেষভাবে ব্রহ্মের উপাধিহীন স্বরূপকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে ভক্তিমূলক ও বিশিষ্টাদ্বৈত ব্যাখ্যায় নির্গুণ শব্দকে প্রকৃতির গুণ ও দোষ থেকে মুক্ত পরমসত্তা হিসেবে বোঝানো হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো নির্গুণম্ বলার পরেই এসেছে গুণভোক্তৃ। ভোক্তৃ শব্দটি সংস্কৃত ভুজ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ ভোগকারী, অভিজ্ঞাতা বা কোনো কিছুর অভিজ্ঞতা গ্রহণকারী। এখানে প্রশ্ন জাগে, যিনি গুণের অতীত, তিনি আবার গুণের ভোক্তা কীভাবে। এই আপাতবিরোধের মধ্যেই গীতার গভীর দর্শন নিহিত। প্রকৃতির গুণসমূহ পরিবর্তিত হয় এবং মন সেই পরিবর্তনকে সুখ, দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আনন্দ ও বিষাদেরূপে অনুভব করে। কিন্তু এই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে যে চৈতন্য প্রকাশ করে, তাকে গুণের ভোক্তা বলা হয়। গভীর দৃষ্টিতে চৈতন্য নিজে গুণের দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, বরং গুণের সমস্ত অভিজ্ঞতা তার উপস্থিতিতে প্রকাশিত হয়। তাই তিনি গুণাতীত হয়েও গুণের অভিজ্ঞতার সাক্ষী।
এই সত্যকে বোঝার জন্য আকাশের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। আকাশের মধ্যে মেঘ আসে, বৃষ্টি হয়, ঝড় হয় এবং রংধনু দেখা যায়। কিন্তু মেঘের আগমন বা ঝড়ের সৃষ্টি আকাশের স্বরূপকে পরিবর্তন করে না। তেমনি মানুষের মনে আনন্দ আসে, দুঃখ আসে, রাগ আসে, ভয় আসে এবং আকাঙ্ক্ষা জাগে। কিন্তু এই সমস্ত মানসিক পরিবর্তনের সাক্ষী যে চৈতন্য, তার মৌলিক স্বরূপ এই পরিবর্তনগুলোর দ্বারা আবদ্ধ নয়। আবার আয়নার উপমাও এখানে প্রযোজ্য। আয়নায় হাসি দেখা যায়, কান্না দেখা যায়, সৌন্দর্য দেখা যায় এবং বিকৃতিও দেখা যায়, কিন্তু আয়না নিজে হাসে না বা কাঁদে না। একইভাবে চৈতন্যের মধ্যে জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হলেও চৈতন্য নিজে সেই অভিজ্ঞতার কোনো সীমিত রূপে আবদ্ধ নয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে আরও গভীর হয়। অদ্বৈত মতে আত্মা বা ব্রহ্ম চৈতন্যস্বরূপ এবং দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি পরিবর্তনশীল উপাধি। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ বা মন বলে মনে করে তখন সে সুখ, দুঃখ, লাভ, ক্ষতি, সম্মান ও অপমানের সঙ্গে গভীরভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে দেহ পরিবর্তিত হচ্ছে, মন পরিবর্তিত হচ্ছে, চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই সমস্ত পরিবর্তনের একজন সাক্ষী রয়েছে, তখন তার আত্মপরিচয়ের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। সে বুঝতে শেখে যে পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার অন্তরালে একটি অপরিবর্তনীয় সচেতন উপস্থিতি রয়েছে।
সাংখ্যদর্শনের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাংখ্যে পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ বিদ্যমান। পুরুষ নিজে পরিবর্তিত না হলেও প্রকৃতির কার্যকলাপ তার উপস্থিতিতে প্রকাশিত হয়। গীতার ভাষায় তাই পরম চৈতন্যকে গুণাতীত বলা যায়, অথচ জীবনের অভিজ্ঞতার স্তরে তাকে গুণের ভোক্তা হিসেবে দেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের বন্ধনের প্রকৃতি বোঝাতেও সাহায্য করে। যখন চৈতন্যের সঙ্গে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল অবস্থাকে অভিন্ন মনে করা হয় তখন বন্ধন সৃষ্টি হয়, আর যখন সাক্ষীস্বরূপ চৈতন্যকে উপলব্ধি করা হয় তখন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও গভীর। মানুষ যখন বলে আমি রাগান্বিত, তখন সে নিজের অস্তিত্বকে রাগের সঙ্গে এক করে ফেলছে। কিন্তু যদি সে বলতে শেখে আমার মধ্যে রাগের অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে, তখন সে রাগকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। একইভাবে আমি দুঃখী বলার পরিবর্তে আমার মনে দুঃখের অনুভূতি এসেছে বলা হলে মানুষ নিজের সঙ্গে নিজের মানসিক অবস্থার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি করতে পারে। এই সাক্ষীভাব আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসংযমের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গীতার শিক্ষা হলো অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়, বরং অনুভূতির প্রকৃতি জেনে তার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ না হওয়া।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। এখানে পরম সত্যকে সরাসরি কোনো সীমিত সংজ্ঞায় আবদ্ধ না করে বিপরীতধর্মী শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক অথচ ইন্দ্রিয়হীন। তিনি অনাসক্ত অথচ সকলের ধারক। তিনি নির্গুণ অথচ গুণের অভিজ্ঞাতা। এই বৈপরীত্য আসলে ভাষার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার একটি কৌশল। সীমিত ভাষায় অসীম সত্যকে প্রকাশ করতে গেলে কখনো কখনো বলা হয় তিনি এক অর্থে এমন এবং অন্য অর্থে তেমন। এর মাধ্যমে পাঠকের চিন্তাকে সাধারণ দ্বৈততার সীমা অতিক্রম করতে আহ্বান জানানো হয়।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ যদি উপলব্ধি করতে পারে যে তার দেহ তার একটি প্রকাশ, কিন্তু তার সমগ্র সত্তা কেবল দেহ নয়, তার মন তার অভিজ্ঞতার একটি ক্ষেত্র, কিন্তু তার চূড়ান্ত পরিচয় কেবল মনের পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলো নয়, তাহলে জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে। সুখ এলে সে অতিরিক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে না এবং দুঃখ এলে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দুঃখের সঙ্গে এক করে ফেলবে না। কর্ম করবে, সম্পর্ক পালন করবে, দায়িত্ব গ্রহণ করবে, কিন্তু অন্তরে অনাসক্তির একটি গভীর বোধ তৈরি করতে পারবে।
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্ এই অংশ আমাদের শেখায় যে চৈতন্য সকল ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করে অথচ নিজে কোনো ইন্দ্রিয় নয়। আসক্তং সর্বভৃচ্চৈব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরমসত্তা কোনো কিছুর দ্বারা আবদ্ধ না থেকেও সমগ্র অস্তিত্বের আধার। নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ আমাদের সামনে তুলে ধরে এমন এক গভীর সত্য যেখানে চৈতন্য প্রকৃতির গুণত্রয়ের অতীত হয়েও সেই গুণসমূহের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে আলোকিত করে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক পরিচয় থেকে অন্তর্গত পরিচয়ের দিকে যাত্রার একটি দার্শনিক আহ্বান। আমরা সাধারণত দেহকে আমি বলি, মনকে আমি বলি এবং আমাদের অনুভূতি ও চিন্তাকেও আমি বলে গ্রহণ করি। কিন্তু গীতা আমাদের আরও গভীরে যেতে শেখায়। যে সত্তা চোখের দেখা, কানের শোনা, মনের চিন্তা এবং হৃদয়ের অনুভূতিকে জানে, সেই সাক্ষী চৈতন্যের অনুসন্ধানই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা। পরম সত্য কোনো একটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নয়, কারণ তিনি ইন্দ্রিয়েরও প্রকাশক। তিনি কোনো সীমিত গুণের অধীন নন, কারণ তিনি গুণাতীত। তবুও তাঁর উপস্থিতিতেই সমগ্র জগতের অভিজ্ঞতা সম্ভব। এই কারণেই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষ যেন নিজের পরিবর্তনশীল পরিচয়ের অন্তরালে অবস্থিত সেই অপরিবর্তনীয় চৈতন্যকে চিনতে শেখে। সকল অভিজ্ঞতার আলো, সকল অস্তিত্বের আধার এবং সকল পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হিসেবে সেই চৈতন্যের উপলব্ধিই এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক হৃদয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!