ভগবদ্গীতা ১৩.১৬ — সকলের অন্তরে ও বাইরে বিরাজমান পরম তত্ত্ব
বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ।
সূক্ষ্মাত্বত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।।১৬।।
অনুবাদঃ সেই পরমতত্ত্ব সমস্ত ভূতের অন্তরে ও বাইরে বর্তমান। তাঁর থেকেই সমস্ত চরাচর; অত্যন্ত সূক্ষ্মতা হেতু তিনি অবিজ্ঞেয়। যুদিও তিনি বহু দূরে অবস্থিত, কিন্তু তবুও তিনি সকলের অত্যন্ত নিকটে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের একটি অত্যন্ত গভীর শ্লোকে পরম তত্ত্বের এমন এক স্বরূপ প্রকাশ করা হয়েছে, যা সাধারণ চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে যায়। শ্লোকটি হলো “বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ। সূক্ষ্মাত্বত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।” এর সহজ অর্থ হলো সেই পরম তত্ত্ব সমস্ত জীবের বাইরে এবং ভিতরে অবস্থান করেন। তিনি অচল অথচ চলমান, অত্যন্ত সূক্ষ্ম বলে সাধারণভাবে তাঁকে জানা যায় না এবং তিনি একই সঙ্গে অত্যন্ত দূরে ও অত্যন্ত নিকটে অবস্থান করেন। এই শ্লোকের সৌন্দর্য কেবল তার ভাষায় নয়, বরং তার মধ্যে নিহিত গভীর দার্শনিক সত্যে। এখানে পরম সত্যকে বোঝানোর জন্য এমন কিছু শব্দ পাশাপাশি রাখা হয়েছে, যেগুলো সাধারণ দৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী। কিন্তু এই আপাত বিরোধের মধ্য দিয়েই গীতা বোঝাতে চায় যে পরম সত্য কোনো সীমাবদ্ধ বস্তু নয় এবং তাঁকে স্থান, কাল, গতি কিংবা সাধারণ জ্ঞানের কাঠামো দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো বহিঃ। সংস্কৃত বহিঃ শব্দের অর্থ বাইরে বা বহির্ভাগে। এর বিপরীতে রয়েছে অন্তঃ, যার অর্থ ভিতর বা অন্তর্ভাগ। গীতার বক্তব্য হলো পরম তত্ত্ব কেবল পৃথিবীর বাইরে কোনো দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করেন না, আবার কেবল মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি সমস্ত জীবের বাইরে এবং ভিতরে। এখানে বাইরে ও ভিতর কেবল স্থানগত অর্থ বহন করে না। বাইরে বলতে সমগ্র বিশ্বজগতকে অতিক্রমকারী পরম বাস্তবতাকে বোঝানো হয়েছে এবং ভিতর বলতে প্রতিটি জীবের অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে নিজের থেকে আলাদা কোনো সত্তা হিসেবে কল্পনা করে বাইরে খুঁজতে থাকে। কিন্তু এই শ্লোক সেই ধারণাকে গভীরতর করে জানায় যে যাঁকে বাইরে অনুসন্ধান করা হচ্ছে, তাঁর উপস্থিতিই আবার জীবনের অন্তরতম স্তরে বিদ্যমান।
এখানে ভূতানাম শব্দটিরও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা বিদ্যমান হওয়া। সেই অর্থে ভূত বলতে অস্তিত্বশীল সত্তা বা সৃষ্টি বোঝায়। ভূতানাম অর্থ সমস্ত সৃষ্ট সত্তার। অর্থাৎ এই শ্লোক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কোনো বিশেষ জীবের কথা বলছে না। এটি সমস্ত জীব ও সমস্ত অস্তিত্বের সঙ্গে পরম তত্ত্বের সম্পর্কের কথা বলছে। মানুষের মধ্যে যেমন সেই চৈতন্যের প্রকাশ রয়েছে, তেমনি সমস্ত জীবজগত ও সৃষ্টির মধ্যেও তার উপস্থিতি রয়েছে। ফলে পরম সত্যকে কোনো একটি জাতি, ব্যক্তি, দেহ বা স্থানের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না।
এরপর এসেছে অচরম এবং চরম শব্দ দুটি। অচরম অর্থ যা চলে না বা অচল। এটি অ এবং চর শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। চর শব্দের উৎস সংস্কৃত চর ধাতু, যার অর্থ চলা, গমন করা বা বিচরণ করা। অচর তাই যা গতিহীন বা স্থির। অন্যদিকে চর বা চরম অর্থ চলমান বা গতিশীল। এখানে গীতা আবার একটি বিস্ময়কর সত্য প্রকাশ করছে। পরম তত্ত্ব অচল অথচ চলমান। সাধারণ বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণা হলো কোনো কিছু হয় স্থির, নয়তো চলমান। কিন্তু পরম তত্ত্বকে এই দুইয়ের একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। পরম সত্য নিজে পরিবর্তনশীল নয়, কিন্তু তাঁর আশ্রয়েই পরিবর্তনশীল জগতের সমস্ত গতি ও ক্রিয়া সংঘটিত হয়। প্রকৃতির মধ্যে জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় ও বিলয়ের যে অবিরাম প্রবাহ দেখা যায়, তার অন্তরালে যে অপরিবর্তনীয় ভিত্তি রয়েছে, শ্লোকের অচল অথচ চলমান কথাটি সেই গভীর সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য সূর্যের একটি উপমা দেওয়া যায়। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর জীবনে অসংখ্য পরিবর্তন ঘটে। গাছপালা বৃদ্ধি পায়, মানুষ কাজ করে, প্রাণী চলাফেরা করে, নদী প্রবাহিত হয় এবং পৃথিবীতে জীবনধারা অব্যাহত থাকে। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে সূর্যকে প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে চলমান কোনো ব্যক্তিসত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয় না। একইভাবে পরম চৈতন্যকে পরিবর্তনশীল জগতের প্রতিটি ক্রিয়ার মতো পরিবর্তনশীল ভাবা যায় না। তিনি অপরিবর্তনীয় ভিত্তি, অথচ তাঁর উপস্থিতির মধ্যে পরিবর্তনশীল জগতের প্রকাশ ঘটে।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে সূক্ষ্মাত্ তদবিজ্ঞেয়ম্। সূক্ষ্ম শব্দের অর্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, যা স্থূল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সহজে ধরা যায় না। অবিজ্ঞেয় অর্থ সাধারণভাবে জ্ঞাত বা উপলব্ধ করা কঠিন। এর অর্থ এই নয় যে পরম তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে জানার অযোগ্য বা তাঁর কোনো উপলব্ধিই সম্ভব নয়। বরং এখানে বলা হয়েছে যে তাঁকে সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো বস্তু হিসেবে জানা যায় না। চোখ দিয়ে আমরা অনেক কিছু দেখতে পারি, কান দিয়ে অনেক কিছু শুনতে পারি এবং বুদ্ধির সাহায্যে নানা বিষয় বিচার করতে পারি। কিন্তু যে চেতনার সাহায্যে চোখ দেখে, কান শোনে এবং বুদ্ধি চিন্তা করে, সেই চেতনাকে একইভাবে বাইরের কোনো বস্তু হিসেবে দেখা যায় না। এই কারণেই পরম তত্ত্বকে জানতে হলে বাহ্যিক বিষয়জ্ঞান অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির দিকে যেতে হয়।
এই ভাবনাটি ভারতীয় দর্শনের একটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। আমরা পৃথিবীর অসংখ্য বিষয়কে জ্ঞাতব্য বস্তু হিসেবে গ্রহণ করি। কিন্তু যে চেতনা সমস্ত বিষয়কে জানে, সেই চেতনাকে কি অন্য একটি বস্তুর মতো জানা সম্ভব। গীতার এই শ্লোক সেই প্রশ্নের গভীরতার দিকে নিয়ে যায়। আত্মা বা পরম চৈতন্যকে কোনো সীমাবদ্ধ বিষয় হিসেবে ধরতে গেলে তার প্রকৃত স্বরূপ অধরা থেকে যায়। কারণ জ্ঞাতব্য বস্তু ও জ্ঞাতার মধ্যে যে পার্থক্য সাধারণ অভিজ্ঞতায় থাকে, পরম চৈতন্যের ক্ষেত্রে সেই বিভাজনকে সাধারণ পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যায় না।
শ্লোকটির শেষ অংশ হলো দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ। অর্থাৎ সেই তত্ত্ব দূরে এবং নিকটেও। দূরস্থ শব্দের অর্থ দূরে অবস্থানকারী এবং অন্তিকে অর্থ নিকটে বা সন্নিকটে। এই দুই শব্দের মধ্যেও একটি গভীর রহস্য রয়েছে। অজ্ঞ মানুষের কাছে পরম সত্য অত্যন্ত দূরের বলে মনে হয়। সে মনে করে সত্যকে পাওয়ার জন্য বহু দূরে যেতে হবে, বহু কিছু অর্জন করতে হবে অথবা কোনো বিশেষ স্থানে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু গীতা বলছে যে সেই সত্যই মানুষের অন্তরতম অস্তিত্বের সঙ্গে নিকটতমভাবে যুক্ত। মানুষ নিজের প্রকৃত চৈতন্যকে না জানার কারণে সত্যকে দূরে অনুভব করে। তাই সত্য দূরে নয়, মানুষের অজ্ঞতাই তাকে দূরে বলে মনে করায়।
এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি মানুষের আত্মঅনুসন্ধানের একটি গভীর আহ্বান। আমরা সাধারণত জীবনের অর্থ খুঁজি বাইরের জগতে। সম্পদ, সম্মান, সম্পর্ক, সাফল্য ও বাহ্যিক পরিচয়ের মধ্যে আমরা নিজের পূর্ণতা খুঁজে বেড়াই। কিন্তু এই সবকিছু পরিবর্তনশীল। আজ যা আছে কাল তা নাও থাকতে পারে। শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, আবেগ পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং সামাজিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনকে যে চেতনা প্রত্যক্ষ করছে, তার প্রকৃতি কী, এই প্রশ্নটি মানুষ খুব কমই করে। সেই প্রশ্নের দিকে মন ফেরানোই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও গভীর। ব্রহ্মকে কোনো সীমাবদ্ধ বস্তু হিসেবে ধরা যায় না। তিনি জগতের বাইরে এবং জগতের মধ্যেও উপস্থিত। ঘটের ভিতরের আকাশ এবং ঘটের বাইরের আকাশের মতো জীবের সীমাবদ্ধ দেহ ও মনের কারণে আমরা ভিতর ও বাইরের বিভাজন অনুভব করি। কিন্তু আকাশ নিজে কোনো ঘটের দ্বারা সত্যিকার অর্থে বিভক্ত হয় না। একইভাবে চৈতন্যকে ব্যক্তিগত দেহের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ কোনো পৃথক বস্তু হিসেবে ভাবলে তার অসীম প্রকৃতি আড়াল হয়ে যায়। অদ্বৈত দৃষ্টিতে আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্কের উপলব্ধিই এই শ্লোকের গভীরতম অর্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে পরম সত্তা সমস্ত জীবের অন্তর্যামী এবং একই সঙ্গে তাঁদের অতিক্রমকারী। তিনি জীবের মধ্যে উপস্থিত থাকলেও জীবের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতেও ঈশ্বর জীবের অন্তরে বিরাজমান নিয়ন্তা এবং একই সঙ্গে জীবের থেকে স্বতন্ত্র ও অতীত। দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে পরম সত্তাকে কেবল বাহ্যিক কোনো বস্তু হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যায় না এবং তাঁর সঙ্গে জীবের গভীর অন্তর্গত সম্পর্ক রয়েছে।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বহিঃ প্রতীক হয়ে ওঠে অসীম বিশ্বজগতের, অন্তঃ প্রতীক হয়ে ওঠে অন্তর্জগতের। অচল প্রতীক হয়ে ওঠে শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় সত্যের এবং চলমান প্রতীক হয়ে ওঠে পরিবর্তনশীল জীবন ও প্রকৃতির। সূক্ষ্ম প্রতীক হয়ে ওঠে ইন্দ্রিয়ের সীমার বাইরে থাকা বাস্তবতার। দূর প্রতীক হয়ে ওঠে অজ্ঞতার এবং নিকট প্রতীক হয়ে ওঠে আত্মস্বরূপের। অর্থাৎ একটি মাত্র শ্লোকের মধ্যে মানুষের বাহ্যিক জীবন, অন্তর্জীবন, প্রকৃতি, চৈতন্য, জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সমগ্র পরিসরকে একত্র করা হয়েছে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। মানুষ সাধারণত নিজেকে তার শরীর, নাম, পেশা, সামাজিক পরিচয়, স্মৃতি ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে এক করে দেখে। কিন্তু যখন সে নিজের চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে, আবেগ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অনুভূতি পরিবর্তিত হচ্ছে, অথচ এগুলোকে প্রত্যক্ষ করার একটি সচেতন উপস্থিতি রয়েছে। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় এই উপস্থিতিকে সাক্ষী চেতনার ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এই সাক্ষীস্বরূপ চেতনার অনুসন্ধান মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের গভীরতর অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই শ্লোকের ভাষাশৈলীতেও অসাধারণ সৌন্দর্য রয়েছে। বহিঃ ও অন্তঃ, অচর ও চর, দূর ও অন্তিক এই বিপরীতার্থক শব্দগুলোর পাশাপাশি ব্যবহার এক ধরনের বিরোধাভাস সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই বিরোধাভাসই শ্লোকটির শক্তি। কারণ সাধারণ ভাষায় যে সত্যকে সরাসরি বলা কঠিন, কখনও কখনও বিপরীত ধারণাগুলোকে পাশাপাশি রেখে তার গভীরতা প্রকাশ করা যায়। এখানে ভাষা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট ধারণা গ্রহণ করতে বাধ্য করে না, বরং তাকে নিজের চিন্তার সীমা নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়।
বাস্তব জীবনের একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি ঘরের ভিতরে যেমন বাতাস রয়েছে, তেমনি ঘরের বাইরেও বাতাস রয়েছে। ঘরের দেয়াল বাতাসকে আমাদের দৃষ্টিতে ভিতর ও বাইরের অংশে ভাগ করে দেয়, কিন্তু বাতাসের প্রকৃত অস্তিত্ব সেই সীমার দ্বারা চূড়ান্তভাবে বিভক্ত হয় না। একইভাবে দেহ ও ব্যক্তিসত্তা আমাদের চেতনার মধ্যে ভিতর ও বাইরের একটি ধারণা তৈরি করে। কিন্তু পরম চৈতন্যকে কেবল একটি ব্যক্তিগত সত্তার মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। আরেকটি উপমা হলো সমুদ্র ও তরঙ্গ। তরঙ্গ চলমান এবং পরিবর্তনশীল, কিন্তু তরঙ্গের সমস্ত গতি জলের ওপর নির্ভরশীল। জলের দৃষ্টিতে তরঙ্গের অসংখ্য পরিবর্তন ঘটলেও জলের মৌলিক প্রকৃতি সেই পরিবর্তনের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয় না। এই উপমা অচল ও চলমানের রহস্য কিছুটা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
মানবজীবনের জন্য এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সত্যকে কেবল বাইরে অনুসন্ধান না করা। বাহ্যিক জগতের অনুসন্ধান যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি নিজের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানও অপরিহার্য। মানুষ যদি কেবল অর্জনের পেছনে ছুটে চলে, তাহলে তার জীবনে বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও অন্তর্গত প্রশ্নের উত্তর নাও মিলতে পারে। নিজের চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, ভয় এবং চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে মানুষ বুঝতে পারে যে তার জীবনের গভীরে এমন একটি স্তর রয়েছে যা বাহ্যিক পরিবর্তনের তুলনায় অনেক বেশি মৌলিক।
এই কারণে “দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ” বাক্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ যাকে দূরে খুঁজছে, সেই সত্যই তার কাছে। কিন্তু কাছে থাকা মানেই উপলব্ধ হওয়া নয়। চোখের সামনে থাকা কোনো বিষয়ও অজ্ঞতার কারণে অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারে। সূর্য আকাশে উদিত হলেও চোখ বন্ধ করলে তাকে দেখা যায় না। একইভাবে পরম সত্য সর্বব্যাপী হলেও অজ্ঞতা, অহংকার, আসক্তি ও বাহ্যিকতার মোহ মানুষের উপলব্ধিকে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। তাই আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো নতুন সত্য সৃষ্টি করা নয়, বরং যে সত্য ইতিমধ্যেই উপস্থিত তাকে উপলব্ধি করার অন্তরায়গুলো দূর করা।
সবশেষে বলা যায়, “বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ। সূক্ষ্মাত্বত্তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।” শ্লোকটি পরম সত্যের এমন এক মহিমান্বিত রূপ তুলে ধরে যা স্থান ও কালের সীমা অতিক্রম করে, স্থিরতা ও গতিশীলতার দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে এবং জ্ঞাত ও অজ্ঞাতের সাধারণ সীমারেখাকেও অতিক্রম করে। তিনি সমস্ত সৃষ্টির বাইরে, আবার সমস্ত সৃষ্টির অন্তরে। তিনি নিজে অচল, অথচ তাঁর আশ্রয়ে জগতের সমস্ত গতি প্রকাশিত হয়। তিনি এত সূক্ষ্ম যে সাধারণ ইন্দ্রিয় তাঁকে ধরতে পারে না, অথচ তিনি মানুষের নিজের অস্তিত্বের চেয়েও নিকট। অজ্ঞতার কারণে তিনি দূর বলে মনে হন, আর আত্মজ্ঞান জাগ্রত হলে সেই দূরত্ব বিলীন হতে থাকে। এই শ্লোক তাই কেবল ঈশ্বরের অবস্থান সম্পর্কে একটি বক্তব্য নয়, এটি মানুষের নিজের অস্তিত্বকে নতুনভাবে দেখার আহ্বান। এর গভীরতম শিক্ষা হলো যে পরম সত্যকে কেবল দূরবর্তী কোনো বাস্তবতা হিসেবে অনুসন্ধান না করে নিজের চেতনার গভীরে অনুসন্ধান করতে হবে। বাহিরের অসীম বিশ্ব এবং অন্তরের নীরব চেতনা যখন একই পরম সত্যের দুই প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধ হয়, তখনই এই শ্লোকের প্রকৃত তাৎপর্য হৃদয়ে উদ্ভাসিত হতে শুরু করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!