ভগবদ্গীতা ১৩.১৯ — ক্ষেত্র, জ্ঞান ও জ্ঞেয় তত্ত্বের উপলব্ধি এবং মদ্ভাব লাভ
ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ।
মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে।।১৯।।
অনুবাদঃ এভাবেই ক্ষেত্র, জ্ঞান ও জ্ঞেয়-এই তিনটি তত্ত্ব সংক্ষেপে বলা হল। আমার ভক্তই কেবল এই সমস্ত বিদিত হয়ে আমার ভাব লাভ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ঊনবিংশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় সম্পর্কে পূর্বে আলোচিত তত্ত্বের সারসংক্ষেপ করে মানবজীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ। মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে।। অর্থাৎ এইভাবে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় সংক্ষেপে বলা হয়েছে। আমার ভক্ত এই তত্ত্বকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করে আমার ভাব লাভের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। শ্লোকটি আপাতদৃষ্টিতে সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্যে মানুষের অস্তিত্ব, জ্ঞান, আত্মপরিচয়, ঈশ্বরচেতনা এবং মুক্তির একটি সম্পূর্ণ দার্শনিক পথনির্দেশ নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ক্ষেত্র। সংস্কৃত ক্ষেত্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো জমি বা চাষের ভূমি। কৃষক যেমন একটি জমিতে বীজ বপন করে এবং সেই জমির মধ্যেই বীজের বিকাশ ও ফসলের প্রকাশ ঘটে, তেমনি মানুষের দেহ ও মনও কর্ম, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, বাসনা এবং চিন্তার প্রকাশের ক্ষেত্র। গীতার দৃষ্টিতে দেহ শুধু একটি জড় শরীর নয়। এর সঙ্গে মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়, অহংকার, সুখ, দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা এবং নানা মানসিক পরিবর্তন যুক্ত হয়ে যে অভিজ্ঞতার জগৎ সৃষ্টি করে, তাকেই ক্ষেত্র বলা যায়। মানুষের জীবনে যা কিছু পরিবর্তিত হয়, যা অনুভূত হয় এবং যা পর্যবেক্ষণ করা যায়, তার একটি বড় অংশ এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। ক্ষেত্র শব্দটির মধ্যে তাই একটি গভীর প্রতীকও রয়েছে। মানুষের জীবন যেন একটি জমি এবং তার চিন্তা, কর্ম ও বাসনা হলো সেই জমিতে বপন করা বীজ। যে বীজ বপন করা হয়, কোনো না কোনোভাবে তারই ফল জীবনে প্রকাশ পায়।
এরপর এসেছে জ্ঞান শব্দটি। জ্ঞান শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু হলো জ্ঞা, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা চিনতে পারা। এই ধাতু থেকেই জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, বিজ্ঞান এবং প্রজ্ঞার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু গীতার জ্ঞান কেবল বই পড়ে তথ্য সংগ্রহ করার নাম নয়। জ্ঞান হলো এমন এক অন্তর্দৃষ্টি যার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রকৃতি, জগতের প্রকৃতি এবং পরম সত্য সম্পর্কে যথার্থ ধারণা লাভ করে। মানুষ যদি অসংখ্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু নিজের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তবে সেই জ্ঞান তাকে জীবনের চূড়ান্ত সত্যের কাছে নিয়ে যেতে পারে না। তাই গীতার জ্ঞান মূলত আত্মপরিচয় ও সত্য উপলব্ধির দিকে পরিচালিত জ্ঞান।
এই প্রসঙ্গে জ্ঞেয় শব্দটির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। জ্ঞেয় শব্দটি জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন এবং এর অর্থ হলো যা জানা উচিত বা যা জ্ঞাতব্য। মানুষ যখন কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়, তখন সেই বিষয়টি তার কাছে জ্ঞেয় হয়ে ওঠে। কিন্তু গীতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞেয় কেবল কোনো সাধারণ বস্তু বা তথ্য নয়। এখানে জ্ঞেয় হলো সেই পরম সত্য, যাকে উপলব্ধি করলে মানুষের জ্ঞানের পরিপূর্ণতা ঘটে। অর্থাৎ জ্ঞান হলো সত্যকে জানার পথ এবং জ্ঞেয় হলো সেই চূড়ান্ত সত্য, যাকে জানা বা উপলব্ধি করা মানুষের জীবনের গভীরতম উদ্দেশ্যগুলোর একটি।
ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয়কে একত্রে দেখলে মানুষের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একটি সুন্দর কাঠামো প্রকাশ পায়। ক্ষেত্র হলো যেখানে অভিজ্ঞতা ঘটে, জ্ঞান হলো যার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি বোঝা যায় এবং জ্ঞেয় হলো সেই পরম সত্য যার উপলব্ধির দিকে জ্ঞান মানুষকে নিয়ে যায়। এই তিনটি ধারণা মানুষকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। আমি যে শরীরটিকে আমার শরীর বলি, সেটিই কি সম্পূর্ণ আমি। আমি যে মনকে আমার মন বলি, সেই মন কি আমার প্রকৃত পরিচয়। আমার চিন্তা, অনুভূতি ও স্মৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে চেতনা এই পরিবর্তনগুলোকে প্রত্যক্ষ করে, তার প্রকৃতি কী। গীতার ক্ষেত্র তত্ত্ব এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়েই আত্মঅনুসন্ধানের দরজা খুলে দেয়।
শ্লোকে উক্তম্ এবং সমাসতঃ শব্দ দুটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। উক্তম্ অর্থ বলা হয়েছে এবং সমাসতঃ অর্থ সংক্ষেপে বা সাররূপে। অর্থাৎ কৃষ্ণ এখানে বোঝাচ্ছেন যে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনার সারকথা তিনি তুলে ধরেছেন। এটি শুধু একটি বক্তব্যের সমাপ্তি নয়, বরং পূর্ববর্তী শিক্ষার একটি দার্শনিক সংহতি। বহু চিন্তা ও বিশ্লেষণের শেষে যে সারসত্যে এসে পৌঁছানো যায়, এই শ্লোক সেই সারসত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এরপর শ্লোকে আসে মদ্ভক্ত শব্দটি। মদ্ভক্ত অর্থ আমার ভক্ত। ভক্ত শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু হলো ভজ্। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশগ্রহণ করা, সেবা করা এবং আরাধনা করার অর্থ রয়েছে। সেই দিক থেকে ভক্ত কেবল এমন একজন মানুষ নন যিনি কোনো ধর্মীয় আচার পালন করেন। প্রকৃত ভক্ত হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজের অস্তিত্বকে পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেন এবং প্রেম, বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও ঈশ্বরচেতনার মাধ্যমে নিজের জীবনকে পরিচালিত করেন। এই কারণে শ্লোকে জ্ঞানের সঙ্গে ভক্তিকে যুক্ত করা হয়েছে। কৃষ্ণের বক্তব্য হলো প্রকৃত জ্ঞান যখন হৃদয়ের ভক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা কেবল বুদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা মানুষের চরিত্র ও চেতনার রূপান্তর ঘটায়।
এখানে এতৎ এবং বিজ্ঞায় শব্দ দুটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতৎ অর্থ এই বিষয় বা এই তত্ত্ব। বিজ্ঞায় শব্দটি জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে বি উপসর্গ যুক্ত হয়ে গঠিত এবং এর মধ্যে বিশেষভাবে জানা, যথার্থভাবে উপলব্ধি করা বা তত্ত্বরূপে জানা অর্থ নিহিত রয়েছে। এই শব্দটি শ্লোকের গভীরতাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। কারণ কৃষ্ণ কেবল এই তত্ত্ব সম্পর্কে তথ্য জানার কথা বলছেন না। তিনি বলছেন এই তত্ত্বকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে হবে। কোনো বই পড়ে জানা যেতে পারে যে আগুন গরম। কিন্তু আগুনের তাপ নিজের মধ্যে অনুভব করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তেমনি আত্মা, ক্ষেত্র, জ্ঞান ও পরম সত্য সম্পর্কে তথ্য জানা এক বিষয় এবং সেই সত্যকে নিজের অস্তিত্বে উপলব্ধি করা আরেক বিষয়। বিজ্ঞায় শব্দটি এই গভীর অন্তর্দৃষ্টির দিকেই নির্দেশ করে।
শ্লোকের শেষ অংশ মদ্ভাবায়োপপদ্যতে আরও গভীর একটি আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। মদ্ভাব শব্দটি মৎ এবং ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। ভাব শব্দটি ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে হওয়া, অস্তিত্ব, স্বভাব, চেতনার অবস্থা এবং অন্তর্নিহিত রূপের ধারণা রয়েছে। মদ্ভাব অর্থ আমার ভাব, আমার স্বরূপ বা আমার চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থা। বিভিন্ন ভারতীয় দর্শন এই শব্দটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এটি পরম ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ভক্তিমার্গে এটি ঈশ্বরের ভাব, ঈশ্বরের সান্নিধ্য এবং ঈশ্বরমুখী চেতনার পূর্ণতা বোঝাতে পারে। সাধারণ আধ্যাত্মিক অর্থে মদ্ভাব বলতে এমন এক চেতনার অবস্থাকে বোঝানো যায় যেখানে মানুষের জীবন আর কেবল অহংকার ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রকে ঘিরে থাকে না, বরং পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ হয়ে ওঠে।
উপপদ্যতে শব্দটির মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য আছে। এর অর্থ শুধু কোনো কিছু পাওয়া নয়, বরং কোনো অবস্থার উপযুক্ত হয়ে ওঠা বা সেই অবস্থায় পৌঁছানোর যোগ্যতা অর্জন করা। অর্থাৎ কৃষ্ণ বলছেন না যে একজন ভক্ত কেবল কোনো বাহ্যিক পুরস্কার লাভ করবে। বরং যথার্থ জ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে তার চেতনা এমনভাবে পরিবর্তিত হবে যে সে ঈশ্বরীয় ভাব উপলব্ধির উপযুক্ত হয়ে উঠবে। এটি আধ্যাত্মিক বিকাশের একটি অত্যন্ত সুন্দর ধারণা। মানুষকে জোর করে কোনো উচ্চতর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় না। তাকে নিজের চেতনা, চরিত্র, জ্ঞান ও হৃদয়কে সেই অবস্থার উপযোগী করে তুলতে হয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য বুঝতে হলে জ্ঞান ও ভক্তির সম্পর্ক উপলব্ধি করা জরুরি। শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান কখনো কখনো মানুষের অহংকার বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার অনুভূতিনির্ভর ভক্তি যদি বিবেক ও সত্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। গীতার পথ এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করে। জ্ঞান মানুষকে সত্য দেখতে শেখায় এবং ভক্তি তাকে সেই সত্যের প্রতি হৃদয় উন্মুক্ত করতে শেখায়। জ্ঞান মানুষের বুদ্ধিকে পরিশুদ্ধ করে এবং ভক্তি তার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে। যখন বুদ্ধি ও হৃদয় একই সত্যের দিকে অগ্রসর হয়, তখন মানুষের মধ্যে একটি গভীর অন্তর্গত রূপান্তর শুরু হয়।
ক্ষেত্রের প্রতীকী অর্থও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দেহ ও মনকে যদি একটি ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়, তবে মানুষের চিন্তা ও কর্ম সেই ক্ষেত্রের বীজ। ক্রোধ, লোভ, অহংকার, হিংসা ও আসক্তির বীজ বপন করলে জীবনে অশান্তির ফল জন্মায়। আবার করুণা, সত্য, সংযম, জ্ঞান, ভক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বীজ বপন করলে জীবনে শান্তি ও অন্তর্গত শক্তির বিকাশ ঘটে। এই দৃষ্টিতে গীতার ক্ষেত্র তত্ত্ব কেবল আধ্যাত্মিক দর্শন নয়, এটি জীবন পরিচালনার একটি গভীর নীতিও।
একজন মানুষ যখন অপমানিত হয়, তখন তার মনে রাগ জন্মাতে পারে। শরীরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, মনে নানা চিন্তা আসে এবং অহংকার তাকে প্রতিশোধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু যদি সে নিজের অভিজ্ঞতাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তখন সে বুঝতে পারে যে রাগ তার মধ্যে একটি পরিবর্তনশীল অবস্থা। সে নিজেকে রাগের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে না দেখে রাগকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। এই সামান্য দূরত্বই আত্মসচেতনতার সূচনা। গীতার ক্ষেত্র ও জ্ঞানের ধারণা মানুষকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যেতে চায় যেখানে সে নিজের দেহ, মন ও মানসিক পরিবর্তনকে চিনতে পারে এবং নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করতে পারে।
এই কারণে শ্লোকটির মধ্যে একটি মৌলিক আত্মজিজ্ঞাসাও নিহিত আছে। আমি কে। আমি কি শুধু শরীর। আমি কি আমার চিন্তা। আমি কি আমার অনুভূতি। আমি কি আমার স্মৃতি। যদি শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, তবে যে সত্তা এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে তার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করাই আত্মজ্ঞান অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান পথ। ক্ষেত্রকে জানা মানে নিজের অভিজ্ঞতার জগতকে জানা এবং ক্ষেত্রের প্রকৃতি উপলব্ধি করা মানে নিজের পরিচয় সম্পর্কে আরও গভীর সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই উপলব্ধির চূড়ান্ত পর্যায় হলো আত্মা ও ব্রহ্মের অভিন্ন সত্য উপলব্ধি করা। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি ও পুরুষের পার্থক্য উপলব্ধি করা মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। ভক্তিমার্গের দৃষ্টিতে মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গে তার চিরন্তন সম্পর্ক উপলব্ধি করে এবং প্রেম ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ঈশ্বরমুখী হয়ে ওঠে। দর্শনের ভাষা আলাদা হলেও সব ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। মানুষ নিজের সীমিত অহংকেন্দ্রিক পরিচয়কে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো জানা এবং উপলব্ধি করার মধ্যে পার্থক্য। কেউ বলতে পারে আত্মা অবিনশ্বর, ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান এবং দেহ পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই কথাগুলো মুখস্থ করা আর সত্যিই সেই উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক নয়। জ্ঞান যখন জীবনের আচরণ পরিবর্তন করে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং মানুষের মধ্যে অহংকার, ভয়, আসক্তি ও অজ্ঞতার প্রভাব কমিয়ে দেয়, তখন সেই জ্ঞান জীবন্ত জ্ঞানে পরিণত হয়। আর যখন সেই জ্ঞান প্রেম, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা ভক্তির মাধ্যমে গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে রূপ নেয়।
অতএব এই শ্লোকের সারকথা হলো মানুষের বাহ্যিক জীবনকে একটি ক্ষেত্র হিসেবে চিনতে হবে, সেই ক্ষেত্রের প্রকৃতি বোঝার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে পরম জ্ঞেয় সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে। কিন্তু শুধু বুদ্ধির জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সেই জ্ঞানকে হৃদয়ের ভক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তখন জ্ঞান তথ্য থেকে উপলব্ধিতে পরিণত হবে, উপলব্ধি চেতনার রূপান্তর ঘটাবে এবং মানুষ ধীরে ধীরে ঈশ্বরীয় ভাব লাভের উপযুক্ত হয়ে উঠবে। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্যে ক্ষেত্র, জ্ঞান, জ্ঞেয়, ভক্তি, বিজ্ঞান এবং মদ্ভাব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মঅনুসন্ধানের পথ উন্মুক্ত করে। ক্ষেত্র আমাদের শেখায় কোথায় জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। জ্ঞান শেখায় সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি কীভাবে বুঝতে হয়। জ্ঞেয় নির্দেশ করে কোন পরম সত্যের দিকে আমাদের অনুসন্ধান পরিচালিত হওয়া উচিত। বিজ্ঞায় শেখায় শুধু জানা নয়, সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে। মদ্ভক্ত শেখায় জ্ঞানকে হৃদয়ের ভক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আর মদ্ভাব মানুষের চেতনার সেই উচ্চতর অবস্থার প্রতীক যেখানে সে নিজের সীমিত অহংকেন্দ্রিক পরিচয় অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়, জ্ঞান, চেতনা এবং আধ্যাত্মিক বিকাশের এক গভীর দর্শন। এর অন্তর্নিহিত আহ্বান হলো নিজের জীবনক্ষেত্রকে সচেতনভাবে পরিচর্যা করা, জ্ঞানের আলোয় নিজেকে দেখা, পরম সত্যকে অনুসন্ধান করা এবং ভক্তির মাধ্যমে সেই সত্যকে হৃদয়ের গভীরে উপলব্ধি করা। এই উপলব্ধিই মানুষকে ধীরে ধীরে তার সীমাবদ্ধ সত্তা থেকে বৃহত্তর চেতনার দিকে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মদ্ভাব লাভের উপযুক্ত করে তোলে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!