ভগবদ্গীতা ১৩.২৫ — ধ্যান, সাংখ্যজ্ঞান ও কর্মযোগের মাধ্যমে আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি
ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা।
অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চাপরে।।২৫।।
অনুবাদঃ কেউ কেউ পরমাত্মাকে অন্তরে ধ্যানের দ্বারা দর্শন করেন, কেউ সাংখ্য-যোগের দ্বারা দর্শন করেন এবং অন্যেরা কর্মযোগের দ্বারা দর্শন করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির বিভিন্ন পথের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো “ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা। অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চাপরে।। ” এর মূল বক্তব্য হলো মানুষ তার প্রকৃত আত্মস্বরূপকে একমাত্র একটি নির্দিষ্ট পথেই উপলব্ধি করতে বাধ্য নয়। মানুষের স্বভাব, মানসিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তি ও কর্মপ্রবণতা অনুযায়ী আত্মসত্য উপলব্ধির পথ ভিন্ন হতে পারে। কেউ ধ্যানের মাধ্যমে নিজের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে আত্মাকে উপলব্ধি করেন, কেউ তত্ত্ববিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে আত্মা ও অনাত্মার পার্থক্য বুঝতে চেষ্টা করেন এবং কেউ নিজের দৈনন্দিন কর্মকে নিঃস্বার্থ সাধনায় পরিণত করে আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হন। কিন্তু পথের বৈচিত্র্যের অন্তরালে লক্ষ্যটি একই। সেই লক্ষ্য হলো নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করা।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ধ্যানেন। ধ্যান শব্দটি সংস্কৃত ধ্যান শব্দ থেকে এসেছে এবং এর সঙ্গে গভীর চিন্তা, মনোনিবেশ ও একাগ্রতার ধারণা যুক্ত। ধ্যানের প্রকৃত অর্থ কেবল চোখ বন্ধ করে বসে থাকা নয়। মানুষের মন সাধারণত বহির্জগতের অসংখ্য বিষয়ের দিকে ছুটে চলে। কখনো ইচ্ছা, কখনো ভয়, কখনো স্মৃতি, কখনো আকাঙ্ক্ষা এবং কখনো ভবিষ্যতের কল্পনা তাকে অস্থির করে রাখে। ধ্যান সেই অস্থির প্রবাহকে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী করে। মন যখন বাহ্যিক বিষয়ের আকর্ষণ থেকে কিছুটা মুক্ত হয়ে নিজের চেতনার দিকে ফিরে আসে, তখন মানুষ নিজের অন্তর্জগতকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করে। এই কারণে গীতার ধ্যান কোনো নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশের একটি সচেতন সাধনা।
এরপর এসেছে আত্মনি শব্দটি। আত্মনি শব্দের মূল আত্মন এবং এর অর্থ আত্মায়, নিজের মধ্যে অথবা নিজের অন্তঃসত্তায়। এখানে আত্মা বলতে কেবল দেহের ভিতরে অবস্থানকারী কোনো অদৃশ্য সত্তাকে বোঝানো হয় না। ভারতীয় দর্শনের গভীর পরিসরে আত্মা হলো সেই চৈতন্যস্বরূপ যা দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে। দেহ শৈশব থেকে যৌবন এবং বার্ধক্যের দিকে পরিবর্তিত হয়। মন এক মুহূর্তে আনন্দিত হয় এবং অন্য মুহূর্তে দুঃখিত হয়। চিন্তা আসে এবং চলে যায়। অনুভূতি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলোর প্রত্যক্ষকারী চেতনার প্রশ্নটি থেকে যায়। গীতার আত্মতত্ত্ব সেই প্রত্যক্ষকারী সত্তার দিকে মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়।
শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো পশ্যন্তি। সাধারণভাবে এর অর্থ তারা দেখে। কিন্তু এখানে দেখা বলতে চোখ দিয়ে কোনো বস্তু দেখা বোঝানো হয় না। আত্মাকে চোখ দিয়ে কোনো বাহ্যিক বস্তুর মতো দেখা যায় না। এখানে দেখা মানে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা। মানুষ কোনো বিষয় সম্পর্কে শুনতে পারে, পড়তে পারে এবং বুদ্ধি দিয়ে তার ধারণা তৈরি করতে পারে। কিন্তু আত্মসত্য উপলব্ধি তার চেয়ে গভীর একটি অভিজ্ঞতা। যেমন কেউ মধুর স্বাদ সম্পর্কে অনেক কথা শুনতে পারে, কিন্তু নিজে মধু না খেলে তার স্বাদকে প্রত্যক্ষভাবে জানা যায় না। তেমনি আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং আত্মস্বরূপকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। পশ্যন্তি শব্দটি তাই আত্মসাক্ষাৎকারের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর পদগুলোর একটি হলো আত্মানমাত্মনা। অর্থাৎ আত্মাকে আত্মার দ্বারা। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি রহস্যময় বাক্য বলে মনে হতে পারে। আত্মাকে আবার আত্মার দ্বারা কীভাবে দেখা সম্ভব। কিন্তু এখানেই গীতার আত্মদর্শনের গভীরতা নিহিত। সাধারণ কোনো বস্তুকে জানার ক্ষেত্রে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় পৃথক থাকে। আমি একটি গাছ দেখি। এখানে আমি দ্রষ্টা এবং গাছ দৃশ্য। কিন্তু আত্মা কোনো বাহ্যিক দৃশ্যবস্তু নয়। আত্মাই চূড়ান্ত দ্রষ্টা এবং চৈতন্যের ভিত্তি। যে চৈতন্যের সাহায্যে মানুষ সমস্ত কিছু জানতে পারে, সেই চৈতন্যকে আর কোনো বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দিয়ে বস্তুর মতো জানা সম্ভব নয়। আত্মস্বরূপ কোনো দ্বিতীয় সত্তার দ্বারা প্রকাশিত হয় না। বরং চেতনা যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপের দিকে জাগ্রত হয়, তখন আত্মা নিজের মধ্যেই নিজেকে প্রকাশ করে।
এই কারণে শ্লোকের আত্মনি, আত্মানম্ এবং আত্মনা শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একই আত্মন শব্দ ভিন্ন ব্যাকরণগত রূপে এসে যেন একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক বৃত্ত তৈরি করেছে। আত্মার মধ্যে আত্মাকে আত্মার দ্বারা উপলব্ধি করা। এর মধ্যে একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে যে আত্মসন্ধানের যাত্রা আসলে বাইরে থেকে ভিতরে এবং অবশেষে নিজের চৈতন্যের মধ্যেই ফিরে আসার যাত্রা। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয় খুঁজে পায় দেহ, নাম, পরিবার, পেশা, সামাজিক অবস্থান, সম্পদ, সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে। কিন্তু গীতা তাকে প্রশ্ন করতে শেখায় যে এসব পরিবর্তনশীল পরিচয়ের অন্তরালে সেই অপরিবর্তনীয় পরিচয়টি কী, যাকে সত্যিকার অর্থে আমি বলা যায়।
শ্লোকে এরপর এসেছে সাংখ্যেন যোগেন। সাংখ্য শব্দের সঙ্গে তত্ত্বের বিশ্লেষণ ও বিচারবুদ্ধির ধারণা গভীরভাবে যুক্ত। সাংখ্যের দৃষ্টিতে মানুষকে বুঝতে হলে পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং চৈতন্যস্বরূপ পুরুষের পার্থক্য উপলব্ধি করতে হয়। দেহ পরিবর্তিত হচ্ছে, ইন্দ্রিয় পরিবর্তিত হচ্ছে, মন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং চিন্তাধারাও পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু যে চেতনা এই পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে তার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্নের অনুসন্ধান মানুষকে তত্ত্ববিচারের দিকে নিয়ে যায়। সাংখ্যের শক্তি এখানেই যে এটি মানুষকে অন্ধভাবে কোনো পরিচয় গ্রহণ করতে বলে না। বরং বিচারের মাধ্যমে দেখতে শেখায় কোনটি পরিবর্তনশীল এবং কোনটি চিরস্থায়ী।
এরপর এসেছে কর্মযোগেন। কর্মযোগ শব্দটি কর্ম এবং যোগের সমন্বয়ে গঠিত। যোগ শব্দের মূলের মধ্যে যুক্ত হওয়া এবং সংহতির ধারণা রয়েছে। কর্মযোগের অর্থ তাই কেবল কাজ করা নয়। বরং কর্মকে এমনভাবে সম্পাদন করা যাতে কর্ম মানুষের বন্ধনের কারণ না হয়ে আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ কর্ম করে কোনো ফল পাওয়ার প্রত্যাশায়। কর্মযোগী কর্ম করেন কর্তব্যবোধে এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে। তার কাছে কর্ম কেবল জীবিকা বা সাফল্য অর্জনের উপায় নয়। কর্ম তার চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করার এবং অহংকারকে অতিক্রম করার একটি সাধনা।
এই কারণে গীতার কর্মযোগ জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয় না। বরং জীবনের মধ্যেই আধ্যাত্মিকতার সন্ধান করতে শেখায়। একজন শিক্ষক যখন নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, একজন কৃষক যখন সততার সঙ্গে জমি চাষ করেন, একজন চিকিৎসক যখন মানুষের সেবাকে নিজের কর্তব্য মনে করেন অথবা একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন এবং নিজের কর্মের ফলকে অহংকারের সম্পত্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরেন না, তখন তার দৈনন্দিন জীবনও কর্মযোগের সাধনায় পরিণত হতে পারে। এই দৃষ্টিতে কর্মজীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবন একে অপরের বিপরীত নয়।
শ্লোকটির একটি গভীর দার্শনিক শিক্ষা হলো সত্য উপলব্ধির পথ বহু হতে পারে। মানুষের প্রকৃতি এক নয়। কারও মন শান্ত ও অন্তর্মুখী, তাই তার জন্য ধ্যান সহজ হতে পারে। কেউ যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধিৎসু, তাই তত্ত্ববিচার তার জন্য স্বাভাবিক পথ হতে পারে। আবার কেউ কর্মপ্রবণ এবং সক্রিয়, তাই কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের চেতনাকে পরিশুদ্ধ করা তার জন্য অধিক উপযোগী হতে পারে। কৃষ্ণ মানুষের এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন যে বিভিন্ন মানসিক প্রবণতাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে ব্যবহার করা যায়।
এই শ্লোককে একটি পর্বতের উপমা দিয়ে বোঝানো যায়। একটি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য একাধিক পথ থাকতে পারে। কোনো পথ অরণ্যের মধ্য দিয়ে যায়, কোনো পথ পাথুরে ঢাল বেয়ে উঠে এবং কোনো পথ দীর্ঘ সমতল অতিক্রম করে শৃঙ্গে পৌঁছায়। পথের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একই। তেমনি ধ্যান, সাংখ্য এবং কর্মযোগের বাহ্যিক পদ্ধতি ভিন্ন হলেও তাদের গভীর উদ্দেশ্য হলো মানুষের সীমাবদ্ধ অহংকেন্দ্রিক পরিচয় অতিক্রম করে নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করা। অবশ্য এই উপমা বিভিন্ন দর্শনের সূক্ষ্ম পার্থক্যকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে না, কিন্তু শ্লোকটির বহুমুখী সাধনপথের ধারণাটি সহজে বোঝাতে সাহায্য করে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে নিজের পরিচয়কে সম্পূর্ণ এক করে ফেলে। সে বলে আমি দুঃখী, আমি রাগী, আমি ব্যর্থ অথবা আমি সফল। কিন্তু গভীর আত্মপর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে চিন্তা পরিবর্তিত হয়, আবেগ পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়। যদি সবকিছু পরিবর্তিত হয় তাহলে এই পরিবর্তনকে যে চেতনা প্রত্যক্ষ করছে তার প্রকৃতি কী। ধ্যান মানুষের মধ্যে এই সাক্ষীসুলভ সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে পারে। যদিও গীতার আত্মতত্ত্বকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের কোনো একটি ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখা ঠিক নয়, তবু আত্মপর্যবেক্ষণ ও সাক্ষীচেতনার ধারণার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। আত্মনি, আত্মানম্ এবং আত্মনা এই তিনটি শব্দের পুনরাবৃত্তি ভাষার মধ্যেই এক ধরনের দার্শনিক ছন্দ সৃষ্টি করেছে। মনে হয় যেন বাক্যটি বাইরে থেকে ভিতরে এবং ভিতর থেকে আরও গভীরে প্রবেশ করছে। আত্মার মধ্যে আত্মাকে আত্মার দ্বারা দেখা। এটি কেবল একটি ব্যাকরণগত নির্মাণ নয়। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আত্মঅনুসন্ধানের সম্পূর্ণ প্রতীকী যাত্রা। মানুষ প্রথমে পৃথিবীকে দেখে, তারপর নিজের মনকে দেখে এবং শেষ পর্যন্ত সেই দেখার ক্ষমতার উৎসকে অনুসন্ধান করতে শুরু করে।
প্রতীকী অর্থে ধ্যান হলো অন্তরের দরজা খুলে দেওয়া, সাংখ্য হলো জ্ঞানের আলো দিয়ে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য করা এবং কর্মযোগ হলো জীবনের প্রতিটি কাজকে আত্মশুদ্ধির পথে ব্যবহার করা। ধ্যান মানুষের চঞ্চলতাকে শান্ত করে, জ্ঞান মানুষের বিভ্রান্তিকে দূর করে এবং কর্মযোগ মানুষের স্বার্থপরতাকে পরিশুদ্ধ করে। তিনটির গভীরে রয়েছে একই সাধনা, নিজের সীমাবদ্ধ অহংকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
এই শ্লোকের মানবিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষ সারাজীবন নিজেকে বিভিন্ন পরিচয়ের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করে। সে বলে আমি একজন পিতা, আমি একজন সন্তান, আমি একজন শিক্ষক, আমি একজন ব্যবসায়ী, আমি ধনী, আমি দরিদ্র, আমি সফল অথবা আমি ব্যর্থ। কিন্তু এগুলো জীবনের পরিবর্তনশীল ভূমিকা। গীতা মানুষকে আরও গভীর প্রশ্ন করতে শেখায়। এই সমস্ত পরিচয় পরিবর্তিত হওয়ার পরেও যে সত্তা নিজের জীবনের পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে সে কে। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই আত্মসন্ধানের সূচনা।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে আত্মজ্ঞান কোনো বাহ্যিক বস্তু অর্জনের নাম নয়। আত্মা এমন কোনো বস্তু নয় যা দূরদেশে গিয়ে খুঁজে আনতে হবে। বরং মানুষের নিজের চেতনার গভীরতম স্তরে যে সত্য সর্বদা উপস্থিত, তাকে অজ্ঞতা ও আসক্তির আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে উপলব্ধি করাই আত্মসাক্ষাৎ। কেউ ধ্যানের মাধ্যমে সেই সত্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে, কেউ জ্ঞান ও তত্ত্ববিচারের মাধ্যমে এবং কেউ কর্মকে নিঃস্বার্থ সাধনায় রূপান্তরিত করে। পথ আলাদা হতে পারে, মানুষের স্বভাব আলাদা হতে পারে এবং সাধনার পদ্ধতিও আলাদা হতে পারে, কিন্তু আত্মসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু একই। নিজের প্রকৃত সত্তাকে জানা।
এই কারণেই “ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা। অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চাপরে।। ” শ্লোকটি শুধু একটি আধ্যাত্মিক সাধনপদ্ধতির বিবরণ নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনার একটি গভীর ঘোষণা। সত্যের দিকে যাওয়ার জন্য প্রত্যেক মানুষের পথ একই হতে হবে না। যার মন ধ্যানমুখী সে ধ্যানের মাধ্যমে এগোতে পারে, যার বুদ্ধি অনুসন্ধিৎসু সে জ্ঞানের মাধ্যমে এগোতে পারে এবং যে কর্মের মধ্যে নিজের জীবনকে খুঁজে পায় সে কর্মযোগের মাধ্যমে এগোতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক পথের শেষ প্রশ্নটি একই থাকে। আমি কে। আমি কি কেবল এই দেহ, এই মন, এই পরিচয় ও এই পরিবর্তনশীল জীবনের সমষ্টি, নাকি আমার অস্তিত্বের গভীরে এমন কোনো চৈতন্যসত্তা রয়েছে যা এই সমস্ত পরিবর্তনের সাক্ষী। গীতার এই শ্লোক সেই গভীর প্রশ্নের দ্বার খুলে দেয় এবং মানুষকে নিজের মধ্যেই নিজের সত্যকে প্রত্যক্ষ করার পথে আহ্বান জানায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!