ভগবদ্গীতা ১৩.২৭ — ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগে জীবসৃষ্টির প্রকাশ
যাবৎ সংজায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তদ্ধিদ্ধি ভরতর্ষভ।।২৭।।
অনুবাদঃ হে ভারতশ্রেষ্ঠ! স্থাবর ও জঙ্গম যা কিছু অস্তিত্ব আছে, তা সবই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলে জানবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের সাতাশতম শ্লোকটি জীবজগতের উৎপত্তি এবং চৈতন্যের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, হে ভরতশ্রেষ্ঠ, স্থাবর ও জঙ্গম যা কিছু সত্তা এই জগতে জন্মগ্রহণ করে বা প্রকাশিত হয়, তা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকেই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানো। শ্লোকটি আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্যে দেহ, মন, প্রকৃতি, চৈতন্য, আত্মপরিচয় এবং জীবনের মৌলিক রহস্য সম্পর্কে ভারতীয় দর্শনের এক গভীর অনুসন্ধান নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ যাবৎ। সংস্কৃত যাবৎ শব্দের অর্থ যত, যা কিছু বা যতদূর পর্যন্ত। এখানে এই শব্দটি ব্যাপ্তির ধারণা প্রকাশ করে। কৃষ্ণ কোনো নির্দিষ্ট জীবের কথা বলছেন না। তিনি এমন একটি সর্বব্যাপী সত্যের কথা বলছেন যা সমস্ত প্রকাশিত জীবসত্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ক্ষুদ্রতম জীব থেকে বৃহত্তম জীব, দৃশ্যমান জীব থেকে অদৃশ্য জীব এবং স্থির প্রকৃতির সত্তা থেকে গতিশীল সত্তা পর্যন্ত সবকিছুকে এই বক্তব্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শ্লোকটির সূচনাতেই একটি সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর এসেছে সঞ্জায়তে। এই শব্দটি জন্ম নেওয়া, উৎপন্ন হওয়া এবং প্রকাশিত হওয়ার ধারণা বহন করে। এখানে জন্ম বলতে কেবল জৈবিক জন্ম বোঝানো হয় না। কোনো সম্ভাবনা যখন প্রকাশিত রূপ লাভ করে তখনও তাকে এক অর্থে সঞ্জায়তে বলা যায়। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা যখন নির্দিষ্ট দেহ ও জীবরূপে প্রকাশ পায় তখন সেই প্রকাশকেও এই শব্দের মাধ্যমে বোঝা যায়। তাই এই শব্দটি জীবনের কেবল জন্মের ঘটনা নয় বরং অস্তিত্বের প্রকাশের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
কিঞ্চিৎ শব্দের অর্থ কোনো কিছু বা সামান্যতম কোনো সত্তাও। এই শব্দের ব্যবহার শ্লোকটিকে আরও সর্বজনীন করে তুলেছে। কৃষ্ণ যেন বলতে চাইছেন, এমন কোনো প্রকাশিত সত্তা নেই যা এই মৌলিক সত্যের বাইরে। যে কোনো অস্তিত্বশীল জীবকে বুঝতে হলে তার দেহগত প্রকাশ এবং তার মধ্যে বিদ্যমান চৈতন্যের সম্পর্ককে বুঝতে হবে। এই দৃষ্টিতে কিঞ্চিৎ শব্দটি ক্ষুদ্রতম অস্তিত্বকেও দার্শনিক অনুসন্ধানের আওতায় নিয়ে আসে।
এরপর এসেছে সত্ত্বম্। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সত্ত্বম্ শব্দটি দেখে একে সরাসরি গীতার সত্ত্বগুণ বলে মনে করা উচিত নয়। এই শ্লোকে সত্ত্বম্ মূলত অস্তিত্বশীল সত্তা বা জীবকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ যা আছে, যার অস্তিত্ব আছে এবং যা কোনো নির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তাই এখানে সত্ত্বম্ শব্দের মাধ্যমে অস্তিত্বের ধারণাটি সামনে আসে। এই অস্তিত্ব কেবল জড় পদার্থের অস্তিত্ব নয়, বরং জীবনের প্রকাশিত রূপকেও বোঝায়।
স্থাবর শব্দের সঙ্গে স্থির থাকার ধারণা যুক্ত। যা নিজের অবস্থান থেকে চলাফেরা করে না তাকে স্থাবর বলা হয়। বৃক্ষ, লতা এবং উদ্ভিদজগতকে এর সাধারণ উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। অন্যদিকে জঙ্গম শব্দটি গতিশীলতার ধারণা বহন করে। যে চলে, যে স্থান পরিবর্তন করে, যে গতিশীল, তাকে জঙ্গম বলা হয়। মানুষ, পশু, পাখি এবং অন্যান্য চলমান জীব এর উদাহরণ। স্থাবর এবং জঙ্গম এই দুটি শব্দ একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে সমগ্র জীবজগতের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করেছে। স্থির এবং গতিশীলের এই যুগল ধারণার মাধ্যমে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে জীবনের কোনো একটি বিশেষ রূপ নয়, বরং সমস্ত জীবন্ত প্রকাশই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
এরপর শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা আসে ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞ। ক্ষেত্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ ক্ষেত্র বা জমি। কিন্তু গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ক্ষেত্র একটি বিশেষ দার্শনিক অর্থ লাভ করেছে। ক্ষেত্র বলতে কেবল স্থূল শরীর বোঝায় না। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহংকার, ইন্দ্রিয়বিষয়, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ এবং বিভিন্ন মানসিক পরিবর্তনকে নিয়ে যে অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র গঠিত হয় সেটিই ক্ষেত্র। অর্থাৎ মানুষ যে দেহ ও মানসিক জগতের মধ্যে জীবনযাপন করে সেটি পরিবর্তনশীল প্রকৃতির একটি ক্ষেত্র।
ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দটি গঠিত হয়েছে ক্ষেত্র এবং জ্ঞানের ধারণা থেকে। ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থ ক্ষেত্রের জ্ঞাতা বা ক্ষেত্রকে যে জানে। এই শব্দের মধ্যে একটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে। ক্ষেত্র হলো যা জানা যায় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো যে জানে। শরীরকে আমরা অনুভব করতে পারি। মনের পরিবর্তনকে আমরা লক্ষ্য করতে পারি। চিন্তার আগমন ও প্রস্থান আমরা উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু যে এই শরীর, মন এবং চিন্তার পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকে তাকে ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণার মাধ্যমে বোঝানো হয়।
মানুষ সাধারণত বলে আমার শরীর, আমার মন, আমার চিন্তা এবং আমার অনুভূতি। এখানে আমার শব্দটি একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন সৃষ্টি করে। যদি শরীর আমার হয় তবে আমি কি কেবল শরীর। যদি মন আমার হয় তবে আমি কি কেবল মন। যদি চিন্তা আমার হয় তবে আমি কি কেবল চিন্তা। এই প্রশ্ন থেকেই ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য স্পষ্ট হতে শুরু করে। যা আমার বলে অনুভূত হচ্ছে তা যদি ক্ষেত্র হয় তবে যে আমার বলে তাকে জানছে তার পরিচয় কী। গীতার আত্মজিজ্ঞাসা মূলত এই প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সংযোগ। সংযোগ অর্থ যুক্ত হওয়া, সম্পর্ক স্থাপন বা একত্রিত হওয়া। এখানে ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ কোনো সাধারণ শারীরিক সংযোগ নয়। এটি একটি গভীর অস্তিত্বগত এবং অভিজ্ঞতাগত সম্পর্ক। পরিবর্তনশীল দেহ ও মন যখন চৈতন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় তখন একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতার জগৎ প্রকাশিত হয়। তখন আমরা দেখি, শুনি, অনুভব করি, চিন্তা করি এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হই। এই সম্পর্কের কারণেই নিছক বস্তুগত কাঠামো একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতার রূপ লাভ করে।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ শব্দটি তাই সমগ্র শ্লোকের কেন্দ্রবিন্দু। এর অর্থ ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকে। এখানে ক্ষেত্র প্রকৃতির পরিবর্তনশীল দিক এবং ক্ষেত্রজ্ঞ চৈতন্যের জ্ঞাতৃস্বরূপ দিককে নির্দেশ করে। এই দুইয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে জীবনের প্রকাশ ঘটে। কৃষ্ণ তাই অর্জুনকে কেবল বাহ্যিক সৃষ্টিকে দেখতে বলছেন না। তিনি তাকে সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সম্পর্কটিকে উপলব্ধি করতে বলছেন।
তদ্বিদ্ধি শব্দের অর্থ তা জানো বা সেই সত্যকে উপলব্ধি করো। এখানে জানা বলতে কেবল কোনো তথ্য মুখস্থ করা বোঝায় না। গীতার জ্ঞান ধারণাটি আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে বলছেন যে এই সত্যকে এমনভাবে উপলব্ধি করতে হবে যাতে জগতকে দেখার দৃষ্টিই পরিবর্তিত হয়। কেবল দেহকে দেখলে জগতের একটি অংশ দেখা হয়। দেহের মধ্যে চৈতন্যের উপস্থিতি এবং চৈতন্যের সঙ্গে দেহের সম্পর্ককে উপলব্ধি করলে জীবনের গভীরতর অর্থ উন্মোচিত হয়।
শ্লোকের শেষে ভরতর্ষভ সম্বোধনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভরতর্ষভ অর্থ ভরতবংশের শ্রেষ্ঠ বা বৃষভতুল্য উৎকৃষ্ট ব্যক্তি। কৃষ্ণ অর্জুনকে এই নামে সম্বোধন করে যেন তাকে গভীর সত্য উপলব্ধির জন্য আহ্বান করছেন। এখানে সম্বোধনের মধ্যে শুধু প্রশংসা নেই, বরং আত্মজ্ঞান লাভের উপযুক্ত মানসিক শক্তি অর্জনের আহ্বানও রয়েছে।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি বস্তু এবং চৈতন্যের সম্পর্ক নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয় এবং অনুভূতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলিকে যে জানে তার প্রকৃতি কী। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্ব এই প্রশ্নের একটি আধ্যাত্মিক উত্তর অনুসন্ধান করে। ক্ষেত্র হলো পরিবর্তনশীল এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো সেই পরিবর্তনের জ্ঞাতা। ফলে মানুষকে নিজের পরিচয় কেবল পরিবর্তনশীল শরীর ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চৈতন্যের দিক থেকেও নিজেকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ক্ষেত্রকে দেহ, মন এবং প্রকৃতির উপাধি হিসেবে দেখা যায় এবং ক্ষেত্রজ্ঞকে আত্মস্বরূপ চৈতন্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিতে চূড়ান্ত সত্য হলো আত্মা এবং ব্রহ্মের ঐক্য। শরীর ও মন পরিবর্তিত হলেও আত্মস্বরূপ চৈতন্য পরিবর্তনের সাক্ষী। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ও প্রকৃতি বাস্তব এবং তারা পরমেশ্বরের ওপর নির্ভরশীল। দ্বৈত দর্শনে জীব, জড় এবং ঈশ্বরের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য বজায় থাকে। ফলে একই শ্লোক বিভিন্ন বেদান্তীয় দর্শনে ভিন্ন ব্যাখ্যা পেলেও ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য তার মূল আলোচনার অংশ হয়ে থাকে।
সাংখ্য দর্শনের সঙ্গেও এই শ্লোকের ভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সাংখ্যে পুরুষকে চৈতন্য এবং প্রকৃতিকে পরিবর্তনশীল জগতের মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণার সঙ্গে এর একটি ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে গীতা সাংখ্যের ধারণাগুলোকে নিজের বৃহত্তর আধ্যাত্মিক ও ঈশ্বরতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে নতুন অর্থে ব্যবহার করেছে।
শ্লোকটির একটি গভীর প্রতীকী অর্থ ক্ষেত্র এবং কৃষকের উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি কৃষিক্ষেত্রে মাটি, বীজ, গাছ, আগাছা এবং ফসলের নানা পরিবর্তন ঘটে। ক্ষেত্রটি নিজে নিজের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন নয়। কৃষক ক্ষেত্রকে দেখে, চাষ করে এবং তার পরিবর্তন সম্পর্কে জানে। তেমনি শরীর ও মন জীবনের ক্ষেত্রের মতো। এর মধ্যে নানা পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন যে সত্তা তাকে ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণার মাধ্যমে বোঝানো যায়।
আরেকটি উপমা হলো সিনেমার পর্দা। পর্দায় যুদ্ধ, প্রেম, আনন্দ, দুঃখ, জন্ম এবং মৃত্যু নানা দৃশ্যের মতো প্রকাশিত হয়। কিন্তু পর্দা নিজে সেই ঘটনাগুলোর কর্তা নয়। এই উপমার মাধ্যমে পরিবর্তনশীল প্রকাশ এবং তার পেছনের সচেতন দর্শকের ধারণা কিছুটা বোঝা যায়। যদিও এই উপমা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সম্পূর্ণ দার্শনিক অর্থকে ধারণ করে না, তবু এটি ধারণাটিকে সহজে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
মানবজীবনের দুঃখের সঙ্গেও এই শ্লোকের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন নিজের পরিবর্তনশীল অবস্থাকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে তখন সাময়িক ব্যর্থতা তার কাছে সম্পূর্ণ অস্তিত্বের ব্যর্থতা হয়ে ওঠে। সে বলে আমি ব্যর্থ। কিন্তু আত্মপর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে বলা যায় আমার একটি কাজে ব্যর্থতা এসেছে। একইভাবে আমি দুঃখী বলার পরিবর্তে আমার মনে দুঃখের অনুভূতি এসেছে বলা যায়। এই সামান্য ভাষাগত পার্থক্যের মধ্যেও একটি গভীর আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এতে মানুষ নিজের অনুভূতি ও চিন্তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম না হয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে শেখে।
এই শ্লোক তাই কেবল সৃষ্টি কীভাবে হয় তার একটি তত্ত্ব নয়। এটি মানুষকে নিজের পরিচয় নিয়ে ভাবতে শেখায়। শরীর পরিবর্তিত হয়, শৈশব থেকে যৌবন আসে, যৌবন থেকে বার্ধক্য আসে। মনও পরিবর্তিত হয়। আজ যে চিন্তা সত্য বলে মনে হয় কাল তা বদলে যেতে পারে। আবেগ আসে এবং চলে যায়। কিন্তু মানুষ এই পরিবর্তনগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের ক্ষমতাই তাকে নিজের অস্তিত্বের গভীরতর স্তর অনুসন্ধানের সুযোগ দেয়।
স্থাবর ও জঙ্গমের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ যেন সমগ্র জীবজগতকে একটি বৃহৎ ঐক্যের মধ্যে দেখছেন। বাহ্যিকভাবে জীবের মধ্যে অসংখ্য পার্থক্য আছে। কেউ স্থির, কেউ গতিশীল। কেউ ক্ষুদ্র, কেউ বিশাল। কেউ মানুষের মতো উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন, কেউ সরল জীবরূপে প্রকাশিত। কিন্তু জীবনের গভীরে প্রকৃতি এবং চৈতন্যের সম্পর্কের প্রশ্নটি সকলের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতার অনুভূতিও জাগাতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, যাবৎ সঞ্জায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্ এই শ্লোকের প্রথম অংশ আমাদের সমগ্র প্রকাশিত জীবজগতের দিকে তাকাতে শেখায় এবং ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ অংশ আমাদের সেই প্রকাশের গভীরে যেতে শেখায়। বাহ্যিক জগতের দিকে তাকালে আমরা দেহ, প্রকৃতি এবং জীবনের পরিবর্তন দেখতে পাই। অন্তর্দৃষ্টিতে তাকালে আমরা জানতে চাই কে এই পরিবর্তনকে জানছে। এই দুই দৃষ্টির মিলনেই শ্লোকটির প্রকৃত গভীরতা প্রকাশ পায়।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো জীবনের প্রকাশ কেবল বস্তুগত কাঠামোর বিষয় নয়। জীবনের মধ্যে দেহ আছে, প্রকৃতি আছে, পরিবর্তন আছে এবং সেই পরিবর্তনকে জানার এক রহস্যময় চৈতন্যও আছে। ক্ষেত্র আমাদের অভিজ্ঞতার পরিবর্তনশীল জগতকে নির্দেশ করে এবং ক্ষেত্রজ্ঞ নির্দেশ করে সেই জগতের জ্ঞাতাকে। তাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই জীবনের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়। তাই এই শ্লোক শেষ পর্যন্ত মানুষকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমি কে। আমি কি কেবল এই দেহ, এই মন, এই চিন্তা এবং এই অনুভূতিগুলোর সমষ্টি, নাকি এগুলোর পরিবর্তনকে যে সচেতনভাবে উপলব্ধি করে তার মধ্যে আমার প্রকৃত পরিচয় নিহিত। এই আত্মজিজ্ঞাসাই শ্লোকটির সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং এই কারণেই ভগবদ্গীতার এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকটি মানবজীবন, চৈতন্য এবং আত্মপরিচয়ের এক অসীম গভীর অনুসন্ধানের দ্বার খুলে দেয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!