ভগবদ্গীতা ১৩.২৯ — সর্বত্র সমভাবে ঈশ্বরদর্শন, আত্মহিংসা থেকে মুক্তি ও পরম গতি
সমং পশ্যন্ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্।
ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্।।২৯।।
অনুবাদঃ যিনি সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত পরমাত্মাকে দর্শন করেন, তিনি কখনও মনের দ্বারা নিজেকে অধঃপতিত করেন না। এভাবেই তিনি পরম গতি লাভ করেন।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ঊনত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপান্তরের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো “সমং পশ্যন্ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্। ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্।” এর সহজ অর্থ হলো, যে ব্যক্তি সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত ঈশ্বরকে দেখতে পারে, সে নিজের দ্বারা নিজেকে ধ্বংস করে না এবং সেই কারণে পরম গতি লাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের আত্মপরিচয়, ঈশ্বরচেতনা, সমদৃষ্টি, অহিংসা, নৈতিকতা এবং মুক্তির এক গভীর দর্শন একত্রিত হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “সমম্”। সংস্কৃত “সম” শব্দের অর্থ সমান, সমভাবে, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পক্ষপাতহীন। এখানে সমভাবে দেখার অর্থ বাহ্যিক জগতের সমস্ত মানুষ ও জীবকে একই রকম বলে মনে করা নয়। প্রত্যেক মানুষের দেহ, মন, চরিত্র, কর্ম, জ্ঞান এবং সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এই সমস্ত বাহ্যিক বৈচিত্র্যের গভীরে যে চৈতন্যসত্তা বিদ্যমান, তাকে সমভাবে উপলব্ধি করাই এখানে সমদৃষ্টি। অর্থাৎ জ্ঞানীর দৃষ্টি বাহ্যিক পার্থক্যকে অস্বীকার করে না, কিন্তু সেই পার্থক্যকে অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণও করে না।
এরপর এসেছে “পশ্যন্” শব্দটি। এর মূল সংস্কৃত ধাতু হলো দৃশ্, যার অর্থ দেখা। পশ্যন্ অর্থ যিনি দেখছেন বা উপলব্ধি করছেন। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক ভাষায় দেখা শুধু চোখ দিয়ে কোনো বস্তু প্রত্যক্ষ করা নয়। মানুষ চোখ দিয়ে রূপ দেখে, বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে এবং জ্ঞান দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করে। এখানে পশ্যন্ শব্দটি এমন এক অন্তর্দৃষ্টির কথা বলে যার মাধ্যমে মানুষ বাহ্যিক রূপের অন্তরালে অবস্থিত সত্যকে দেখতে শেখে। তাই সমং পশ্যন্ বলতে কেবল সকলের প্রতি সমান আচরণ নয়, বরং সকল সত্তার অন্তরে একই পরম সত্যের উপস্থিতি উপলব্ধি করাকে বোঝানো হয়েছে।
“সর্বত্র” শব্দটি এই উপলব্ধির ব্যাপ্তিকে প্রকাশ করে। সর্বত্র অর্থ সব জায়গায়, সকল স্থানে এবং সকল অস্তিত্বের মধ্যে। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান, ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ঈশ্বর যদি সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত হন, তাহলে তাঁকে কেবল কোনো মন্দিরে, উপাসনাস্থলে বা বিশেষ আচার অনুষ্ঠানে খুঁজলে তাঁর সর্বব্যাপী স্বরূপ সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না। গীতার এই শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিকে বাইরের সীমা অতিক্রম করে জীবনের সর্বস্তরে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
“সমবস্থিতম্” শব্দটি এই শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গভীর শব্দ। এটি সম এবং অবস্থিত ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। এর মূলের সঙ্গে সংস্কৃত স্থা ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। সমবস্থিতম্ অর্থ সমভাবে প্রতিষ্ঠিত বা সমভাবে অবস্থিত। যখন এটি ঈশ্বরম্ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন অর্থ দাঁড়ায় সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত ঈশ্বর। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের বাহ্যিক রূপ ভিন্ন হলেও পরম চৈতন্যের ভিত্তি এক। কারও জ্ঞান বেশি হতে পারে, কারও জ্ঞান কম হতে পারে। কারও সামাজিক মর্যাদা উঁচু হতে পারে, কারও নিচু হতে পারে। কিন্তু ঈশ্বরের অন্তর্নিহিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে এই বাহ্যিক পার্থক্য কোনো চূড়ান্ত বিভাজন সৃষ্টি করে না।
“ঈশ্বরম্” শব্দটি এসেছে ঈশ্বর শব্দ থেকে। ঈশ শব্দের মধ্যে অধিকার, নিয়ন্ত্রণ এবং শাসনের ভাব রয়েছে। ঈশ্বর অর্থ পরম অধীশ্বর, নিয়ন্তা এবং সর্বশক্তিমান সত্তা। তবে এই শ্লোকে ঈশ্বরকে কেবল কোনো দূরবর্তী দেবতা হিসেবে বোঝালে শ্লোকটির গভীরতা ধরা পড়ে না। এখানে ঈশ্বর এমন এক পরম সত্তা যিনি সর্বত্র বিদ্যমান এবং সমস্ত জীবের অন্তরে অবস্থান করেন। তিনি অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি। তাই সর্বত্র ঈশ্বরকে দেখা মানে সমস্ত জীবের মধ্যে সেই পরম চৈতন্যের উপস্থিতিকে উপলব্ধি করা।
শ্লোকটির দ্বিতীয় অংশে এসেছে “ন হিনস্তি”। হিনস্তি শব্দটি সংস্কৃত হन् ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ আঘাত করা, হত্যা করা বা ধ্বংস করা। এর সঙ্গে হিংসা শব্দটিরও সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ অর্থে হিনস্তি মানে ক্ষতি করা বা ধ্বংস করা। কিন্তু এখানে এর অর্থ কেবল শারীরিক হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, হিংসা, ঘৃণা এবং বিভেদের মাধ্যমে নিজের আত্মিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ন হিনস্তি আত্মনা আত্মানম্ অর্থ হলো নিজের দ্বারা নিজেকে ধ্বংস না করা।
“আত্মনা আত্মানম্” এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শব্দবন্ধগুলোর একটি। আত্মনা অর্থ নিজের দ্বারা এবং আত্মানম্ অর্থ নিজেকে। ফলে আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় নিজের দ্বারা নিজেকে। সংস্কৃত আত্মন্ শব্দের অর্থ প্রসঙ্গভেদে শরীর, মন, ব্যক্তি, নিজের সত্তা, জীবাত্মা অথবা চৈতন্য হতে পারে। গীতার আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে আত্মা মানুষের প্রকৃত চৈতন্যস্বরূপের দিকে ইঙ্গিত করে। তাই নিজের দ্বারা নিজেকে ধ্বংস করার অর্থ হলো নিজের অজ্ঞতা ও বিভেদের মাধ্যমে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে আচ্ছন্ন করে ফেলা।
মানুষ যখন অন্যকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং পর বলে মনে করে, তখন তার মধ্যে অহংকার, ঘৃণা, ঈর্ষা এবং হিংসার জন্ম হতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি সকলের মধ্যে একই পরম চৈতন্যকে দেখতে শেখে, তার পক্ষে অন্যের প্রতি অকারণ বিদ্বেষ পোষণ করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ সে উপলব্ধি করে যে বাহ্যিক দেহ ও পরিচয়ের পার্থক্যের মধ্যেও একটি গভীর অস্তিত্বগত ঐক্য রয়েছে। এই অর্থে অন্যকে আঘাত করা শেষ পর্যন্ত নিজের চেতনাকেই আঘাত করা। এই উপলব্ধিই শ্লোকটির নৈতিক শক্তি।
“ততঃ” শব্দের অর্থ অতএব, সেই কারণে বা সেই উপলব্ধির ফলে। এই শব্দটি শ্লোকের পূর্ববর্তী জ্ঞান এবং পরবর্তী ফলের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। মানুষ যখন সর্বত্র ঈশ্বরকে দেখতে শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। তার মধ্যে সমতা, সহমর্মিতা এবং অহিংসা জন্ম নেয়। সে নিজের অহংকার ও হিংসার দ্বারা নিজের আত্মিক বিকাশকে নষ্ট করে না। এর ফলেই সে পরম গতির দিকে অগ্রসর হয়।
“যাতি” শব্দটি সংস্কৃত যা ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ যাওয়া বা অগ্রসর হওয়া। এখানে এটি কোনো স্থান পরিবর্তনের কথা বলছে না। এটি চেতনার অগ্রগতির প্রতীক। মানুষ অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, বিভেদ থেকে ঐক্যের দিকে, অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে এবং বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে অগ্রসর হয়। তাই যাতি শব্দটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে।
শ্লোকের শেষ শব্দবন্ধ হলো “পরাং গতিম্”। পরাং অর্থ সর্বোচ্চ বা পরম এবং গতি অর্থ গন্তব্য, অগ্রগতি বা চূড়ান্ত অবস্থান। পরম গতি বলতে সাধারণ কোনো ভৌগোলিক স্থান বোঝানো হয় না। এটি আত্মিক মুক্তি, পরম সত্যের উপলব্ধি এবং ঈশ্বরচেতনার সর্বোচ্চ অবস্থাকে বোঝায়। বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে এর ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন হলেও মূল ভাব হলো মানুষের সীমাবদ্ধ অহংচেতনা অতিক্রম করে পরম সত্যের উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত দর্শন আত্মা এবং ব্রহ্মের মৌলিক ঐক্যের কথা বলে। বাহ্যিক জগতে অসংখ্য জীব ও বস্তুর বৈচিত্র্য থাকলেও চূড়ান্ত সত্যের স্তরে চৈতন্য এক। তাই অন্যের মধ্যে নিজেরই পরম সত্তার প্রতিফলন উপলব্ধি করা সমদর্শনের একটি উচ্চতর রূপ। এই উপলব্ধি থেকে হিংসা ও বিভেদের অবসান ঘটে এবং আত্মজ্ঞান মুক্তির পথে নিয়ে যায়।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে জীব এবং ঈশ্বর সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়, কিন্তু ঈশ্বর সকল জীবের অন্তর্যামী এবং জীব ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিতে সর্বত্র ঈশ্বরকে দেখা মানে প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বরের অন্তর্যামী উপস্থিতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উপলব্ধি করা। ফলে অন্য জীবকে অবজ্ঞা করা বা অন্যায়ভাবে আঘাত করা ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতির প্রতি অসম্মান হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তবু ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান এবং সমস্ত জীব তাঁর অধীন। তাই এই শ্লোকের সমদৃষ্টি এখানে ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সকল জীবের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দেয়। দর্শনের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষকে কেবল বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করলে অস্তিত্বের গভীরতর সত্য আড়াল হয়ে যায়।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক অর্থও রয়েছে। মানুষের মনে যখন আমি এবং অন্যের বিভাজন অত্যন্ত তীব্র হয়, তখন তুলনা, ঈর্ষা, অহংকার এবং সংঘাত বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে যখন মানুষের মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি জাগে, তখন সহমর্মিতা, করুণা, সহযোগিতা এবং মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়। এই অর্থে সর্বত্র ঈশ্বরকে দেখা মানুষের চেতনাকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে বিস্তৃততার দিকে নিয়ে যায়।
এই শিক্ষাকে বোঝার জন্য সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গের আকার, উচ্চতা এবং স্থায়িত্ব আলাদা। কোনো তরঙ্গ বড়, কোনোটি ছোট। কোনোটি দ্রুত ভেঙে যায়, কোনোটি কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়। কিন্তু তাদের মৌলিক উপাদান এক। তারা সবাই জল। একইভাবে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব ভিন্ন হলেও গীতার দৃষ্টিতে তাদের অন্তর্নিহিত চৈতন্যের ভিত্তিতে গভীর ঐক্য রয়েছে। যে ব্যক্তি কেবল তরঙ্গ দেখে সে পার্থক্য দেখে। যে ব্যক্তি জলের সত্য উপলব্ধি করে সে ঐক্য দেখতে পায়।
আরেকটি সহজ উপমা হলো বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র। একটি ঘরে ফ্যান, বাতি, কম্পিউটার এবং অন্য কোনো যন্ত্র থাকতে পারে। প্রতিটি যন্ত্রের রূপ ও কাজ আলাদা। কিন্তু তাদের কার্যক্ষমতার পেছনে যে বিদ্যুৎশক্তি কাজ করে তার প্রকৃতি একই। তেমনি মানুষের শরীর, মন, চরিত্র ও কর্ম আলাদা হলেও গীতার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে অন্তর্নিহিত চৈতন্যের উৎসকে এক পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা মানুষের আচরণে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। কেউ যদি সত্যিই বুঝতে পারে যে প্রত্যেক জীবনের মধ্যে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে সে অন্যকে সহজে অপমান করতে পারবে না। সে অন্যের সাফল্যে অকারণ ঈর্ষা পোষণ করবে না। সে দুর্বল মানুষকে অবজ্ঞা করবে না। নিজের ক্ষমতা ও প্রতিভাকে অহংকারের কারণ না করে বৃহত্তর জীবনের একটি অংশ হিসেবে দেখতে শিখবে। অন্যের দুঃখকে সম্পূর্ণ অপরের দুঃখ মনে না করে তার প্রতি সহমর্মী হবে।
সামাজিক ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষের জাতি, ধর্ম, ভাষা, সম্পদ, পেশা, শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেক মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদাকে সম্মান করার একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি এখানে পাওয়া যায়। যদি মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করে যে সকল জীবের মধ্যে পরম সত্তার উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে শোষণ, ঘৃণা, নিষ্ঠুরতা এবং অবমাননার বিরুদ্ধে তার বিবেক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত মানুষের দৃষ্টির পরিবর্তন। অজ্ঞতার চোখ বলে আমি এবং তুমি আলাদা। অহংকারের চোখ বলে আমি শ্রেষ্ঠ এবং অন্যরা নিম্ন। কিন্তু জ্ঞানের চোখ বলে বাহ্যিকভাবে আমরা ভিন্ন হলেও অস্তিত্বের গভীরতম স্তরে আমাদের মধ্যে একটি ঐক্য রয়েছে। তাই “পশ্যন্” শব্দটি শুধু দেখার কথা বলে না। এটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কথা বলে। যে দৃষ্টি মানুষকে বিভাজিত করে তা অজ্ঞতার দৃষ্টি এবং যে দৃষ্টি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করে তা জ্ঞানের দৃষ্টি।
এই কারণে “ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানম্” বাক্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু অন্যকে হত্যা না করার শিক্ষা নয়। এটি আরও গভীরভাবে বলে যে মানুষ যেন নিজের অজ্ঞতা, অহংকার ও হিংসার মাধ্যমে নিজের আত্মিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস না করে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে যায় এবং কেবল দেহ, সম্পদ, পরিচয় ও অহংকারকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বলে মনে করে, তখন সে নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে আচ্ছন্ন করে। আত্মজ্ঞান সেই আত্মবিস্মৃতির বিপরীত।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক পথ উন্মুক্ত করে। প্রথমে প্রয়োজন সমদৃষ্টি। তারপর প্রয়োজন সর্বত্র ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি। সেই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় অহিংসা ও সহমর্মিতা। এর ফলে মানুষ নিজের দ্বারা নিজের আত্মিক ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। ধীরে ধীরে তার চেতনা পরিশুদ্ধ হয় এবং সে পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান। এটি শেখায় যে পৃথিবীর বৈচিত্র্যকে অস্বীকার না করেও তার গভীরে ঐক্যকে উপলব্ধি করা যায়। মানুষ যখন অন্যের মধ্যে ঈশ্বরীয় উপস্থিতিকে দেখতে শেখে, তখন তার নিজের মধ্যেও ঈশ্বরচেতনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন অন্যকে আঘাত করা নিজের অস্তিত্বের গভীর সত্যের বিরোধিতা বলে মনে হয়। আর সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় আত্মশুদ্ধি, করুণা, অহিংসা এবং মুক্তির পথ।
এই শ্লোকের সারকথা হলো মানুষের চোখকে শুধু বাহ্যিক রূপের দর্শন থেকে অন্তর্নিহিত সত্যের দর্শনে উন্নীত করা। যে ব্যক্তি সর্বত্র সমভাবে অবস্থিত ঈশ্বরকে দেখতে পারে, সে আর মানুষকে কেবল বন্ধু ও শত্রু, আপন ও পর, উচ্চ ও নিম্নের সংকীর্ণ পরিচয়ে বিচার করে না। সে বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্যকে অনুভব করে। সেই ঐক্যবোধ তার হৃদয় থেকে হিংসা ও ঘৃণাকে দূর করে এবং তাকে নিজের আত্মিক সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তাই সমদৃষ্টি থেকে ঈশ্বরদৃষ্টি, ঈশ্বরদৃষ্টি থেকে অহিংসা, অহিংসা থেকে আত্মশুদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধি থেকে পরম গতি লাভের যে পথ এই শ্লোকে দেখানো হয়েছে, তা মানবজীবনের জন্য এক গভীর ও চিরন্তন আধ্যাত্মিক শিক্ষা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!