সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৩.৩ — সকল ক্ষেত্রে ক্ষেত্রজ্ঞরূপে শ্রীকৃষ্ণ ও প্রকৃত জ্ঞানের স্বরূপ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজজ্ঞানং মতং মম।।…
ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজজ্ঞানং মতং মম।।৩।।

অনুবাদঃ হে ভারত! আমাকেই সমস্ত ক্ষত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানবে এবং ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ সম্বন্ধে যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানই আমার অভিমত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকটি আত্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব এবং ঈশ্বরতত্ত্বের এক গভীর সমন্বিত প্রকাশ। শ্লোকটি হলো “ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত। ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্জ্ঞানং মতং মম।” এর সহজ অর্থ হলো, হে ভারত, সকল ক্ষেত্রে আমাকেও ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানবে। ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের প্রকৃত জ্ঞানকেই আমি জ্ঞান বলে মনে করি। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এমন একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যার কেন্দ্রবিন্দু হলো আমি কে। মানুষ সাধারণত নিজের শরীর, মন, চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে দেখে। কিন্তু গীতা এখানে আরও গভীর অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়। যে দেহকে আমি আমার দেহ বলি, যে মনকে আমি আমার মন বলি, যে চিন্তাকে আমি আমার চিন্তা বলে অনুভব করি, সেই আমি আসলে কে, এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের পথেই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণা উন্মোচিত হয়।

ক্ষেত্র শব্দটি সংস্কৃত ক্ষেত্র শব্দ থেকে এসেছে। এর সাধারণ অর্থ জমি, ভূমি, স্থান বা কার্যক্ষেত্র। কৃষকের কাছে ক্ষেত্র হলো সেই জমি যেখানে বীজ বপন করা হয় এবং যার মধ্যে কর্মের ফল উৎপন্ন হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে ক্ষেত্র শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত। মানুষের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অনুভূতি, চিন্তা, স্মৃতি এবং পরিবর্তনশীল মানসিক ও শারীরিক অভিজ্ঞতার সমগ্র পরিসরকে ক্ষেত্র বলা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষেত্র হলো সেই প্রকাশমান ক্ষেত্র যেখানে জীবনের অভিজ্ঞতা সংঘটিত হয়। শরীর জন্ম নেয়, বৃদ্ধি পায়, পরিবর্তিত হয় এবং একদিন বিলীন হয়। মনও এক মুহূর্তে আনন্দিত হয়, অন্য মুহূর্তে দুঃখিত হয়। চিন্তা আসে এবং চলে যায়। আবেগেরও পরিবর্তন ঘটে। এই সমস্ত পরিবর্তনশীল উপাদানের সমষ্টিগত ক্ষেত্রই গীতার ভাষায় ক্ষেত্র।

ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দটি গঠিত হয়েছে ক্ষেত্র এবং জ্ঞ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে। জ্ঞ অংশটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার মূল অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। এই একই ধাতুর সঙ্গে জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, বিজ্ঞান এবং প্রজ্ঞা প্রভৃতি শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। তাই ক্ষেত্রজ্ঞের আক্ষরিক অর্থ হলো ক্ষেত্রকে যে জানে। আরও গভীর অর্থে ক্ষেত্রজ্ঞ হলো সেই জ্ঞাতা যার কাছে ক্ষেত্রটি প্রকাশিত হয়। আমরা শরীরকে অনুভব করতে পারি, মনের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারি, চিন্তার আগমন ও প্রস্থান উপলব্ধি করতে পারি এবং আবেগের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এই অর্থে শরীর, মন, চিন্তা এবং আবেগ আমাদের কাছে জ্ঞাত বিষয়। আর যে এগুলোকে জানে ও প্রত্যক্ষ করে তার দিকেই ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দটি নির্দেশ করে।

এখানে গীতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য প্রকাশিত হয়। যা জানা যায় এবং যে জানে এই দুটি এক নয়। শরীরকে আমি জানতে পারি, তাই শরীর আমার কাছে জ্ঞাত। চিন্তাকে আমি লক্ষ্য করতে পারি, তাই চিন্তাও আমার কাছে জ্ঞাত। রাগ, দুঃখ, আনন্দ বা ভয়কে আমি অনুভব করতে পারি এবং কখনও কখনও সেগুলোকে পর্যবেক্ষণও করতে পারি। তাহলে প্রশ্ন আসে, যে এগুলোকে জানছে সে কে। গীতার আত্মতত্ত্ব এই জিজ্ঞাসাকেই গভীরতর করে তোলে। মানুষের সত্য পরিচয় কি কেবল তার শরীর, নাকি শরীরের পরিবর্তনের মধ্যেও এমন কোনো চৈতন্য রয়েছে যা এই পরিবর্তনকে জানে, এই প্রশ্নের মধ্যেই ক্ষেত্রজ্ঞের তাৎপর্য নিহিত।

শ্লোকে কৃষ্ণ বলেছেন ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি। এখানে চ অর্থ এবং বোঝায় এবং অপি অর্থও বা এমনকি বোঝায়। মাং অর্থ আমাকে এবং বিদ্ধি অর্থ জানো বা উপলব্ধি করো। ফলে বাক্যটির গভীর অর্থ দাঁড়ায়, আমাকেও ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানো। কিন্তু এর পরেই কৃষ্ণ বলেছেন সর্বক্ষেত্রেষু অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রে। এই অংশটি শ্লোকটির দর্শনকে ব্যক্তিগত আত্মচেতনার সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন চেতনার দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণ কেবল ব্যক্তির মধ্যে ক্ষেত্রজ্ঞের অস্তিত্বের কথা বলছেন না। তিনি ঘোষণা করছেন যে সকল ক্ষেত্রের মধ্যে তাঁকেও ক্ষেত্রজ্ঞ হিসেবে জানতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তির দেহ ও মনের অন্তর্নিহিত জ্ঞাতা এবং সর্বজীবের অন্তর্নিহিত পরম চৈতন্যের সম্পর্ক এখানে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

এই কারণে ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের সম্পর্ক বোঝা গীতার জ্ঞানতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষেত্র হলো যা পরিবর্তিত হয় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো যে সেই পরিবর্তনকে জানে। শরীর শৈশব থেকে যৌবন এবং বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হয়। তবুও মানুষ নিজের অতীতকে স্মরণ করে বলে আমি ছোট ছিলাম, আমি বড় হয়েছি, আমার শরীর পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তনশীল শরীরের সঙ্গে নিজের পরিচয় অনুভব করলেও মানুষ একই সঙ্গে নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কেও সচেতন। এই আত্মসচেতনতার মধ্যেই গীতা মানুষকে আরও গভীর অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যায়। আমি যদি আমার শরীরকে জানতে পারি, তাহলে আমি কি কেবল শরীর। আমি যদি আমার চিন্তাকে লক্ষ্য করতে পারি, তাহলে আমি কি কেবল চিন্তা। আমি যদি আমার আবেগকে অনুভব করতে পারি, তাহলে আমি কি কেবল আবেগ। এই প্রশ্নগুলোর গভীরে প্রবেশ করলেই ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণা অর্থবহ হয়ে ওঠে।

শ্লোকের পরবর্তী অংশ হলো ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং। এর অর্থ ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞান। কৃষ্ণ এখানে শুধু ক্ষেত্রের জ্ঞান বা শুধু ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞানের কথা বলেননি। তিনি দুটির সম্পর্কের জ্ঞানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ মানুষ যদি শুধু দেহকে জানে, তবে সে নিজের অস্তিত্বের বাহ্যিক দিককে জানে। আবার যদি শুধু আত্মার কথা কল্পনা করে কিন্তু দেহ, মন, কর্ম এবং জীবনের প্রকৃতিকে না বোঝে, তাহলেও জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। প্রকৃত জ্ঞান হলো পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র এবং তার জ্ঞাতার প্রকৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্ককে উপলব্ধি করা।

এই কারণেই কৃষ্ণ বলেছেন যত্তজ্জ্ঞানং মতং মম। অর্থাৎ এই জ্ঞানকেই আমি প্রকৃত জ্ঞান বলে মনে করি। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল তথ্য সংগ্রহ বা শাস্ত্র পড়ার বিদ্যা বোঝানো হয়নি। মানুষ পৃথিবী সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য জানতে পারে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করতে পারে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে। গীতার দৃষ্টিতে বাহ্যিক জ্ঞানের মূল্য থাকলেও আত্মস্বরূপের জ্ঞান মানুষের জ্ঞানকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। নিজের শরীর, মন, ইন্দ্রিয়, চিন্তা ও আবেগকে জানার পাশাপাশি যে চৈতন্যের মাধ্যমে এগুলো জানা সম্ভব সেই চৈতন্যকে অনুসন্ধান করাই জ্ঞানের গভীরতর রূপ।

অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। অদ্বৈত মতে ব্যক্তিগত আত্মার প্রকৃত স্বরূপ এবং পরম ব্রহ্মের মধ্যে চূড়ান্ত সত্যে কোনো ভেদ নেই। বহু দেহের কারণে বহু চৈতন্যের প্রকাশ দেখা গেলেও পরম সত্যের স্তরে চৈতন্য এক। যেমন বহু পাত্রের মধ্যে থাকা জলে একটি সূর্যের বহু প্রতিবিম্ব দেখা যেতে পারে, তেমনি বহু জীবের মধ্যে চৈতন্যের বহু প্রকাশ দেখা গেলেও মূল চৈতন্য এক। এই ব্যাখ্যার আলোকে কৃষ্ণের সকল ক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার বক্তব্য সর্বব্যাপী চৈতন্যের দিকে নির্দেশ করে।

বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে আবার জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকলেও তাদের সম্পূর্ণ অভিন্নতা স্বীকার করা হয় না। জীব বাস্তব এবং ঈশ্বরের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। এই দৃষ্টিতে জীব নিজ ক্ষেত্রের জ্ঞাতা হলেও ঈশ্বর সকল ক্ষেত্রের সর্বোচ্চ জ্ঞাতা। দ্বৈত দর্শন আরও স্পষ্টভাবে জীব এবং ঈশ্বরের পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয়। সেখানে জীব ক্ষেত্রজ্ঞ হলেও পরমেশ্বর সকল ক্ষেত্রের সর্বজ্ঞ ক্ষেত্রজ্ঞ। ফলে বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে এই শ্লোক মানুষের আত্মপরিচয়কে সাধারণ দেহগত পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায় এবং ঈশ্বর ও চৈতন্যের গভীরতর সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়।

ক্ষেত্র শব্দটির মধ্যে একটি সুন্দর প্রতীকী অর্থও নিহিত রয়েছে। কৃষকের ক্ষেত্র যেমন বীজ গ্রহণ করে এবং পরে সেই বীজের ফল প্রকাশ করে, মানুষের জীবনও তেমনই কর্ম ও চিন্তার ক্ষেত্র। মানুষের চিন্তা তার অভ্যাসকে প্রভাবিত করে, অভ্যাস তার চরিত্রকে গঠন করে এবং চরিত্র তার জীবনের গতিপথকে প্রভাবিত করে। এই অর্থে মানুষের দেহ ও মন একটি ক্ষেত্রের মতো যেখানে কর্ম, চিন্তা এবং সংস্কারের বীজ ক্রমাগত বপন করা হয়। তাই নিজের ক্ষেত্রকে পরিচর্যা করা মানে নিজের শরীর, মন, চিন্তা, আচরণ এবং চরিত্রকে সচেতনভাবে পরিচালনা করা।

ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণাটি আত্মপর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যখন বলে আমি রাগ অনুভব করছি, তখন সে নিজের রাগকে লক্ষ্য করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করছে। সে যদি উপলব্ধি করতে পারে যে রাগ একটি মানসিক অবস্থা এবং এই অবস্থাকে সে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে, তাহলে তার মধ্যে আত্মসচেতনতার একটি নতুন স্তর তৈরি হয়। একইভাবে দুঃখ, ভয়, আনন্দ, আকাঙ্ক্ষা বা হতাশাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়। গীতার দৃষ্টিতে এই পর্যবেক্ষণশীল চেতনার দিকে মনোযোগ দেওয়া আত্মজ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

এই ধারণাকে বোঝানোর জন্য একটি সিনেমা হলের উপমা দেওয়া যেতে পারে। একটি পর্দায় কখনও আনন্দের দৃশ্য, কখনও দুঃখের দৃশ্য, কখনও যুদ্ধ, কখনও প্রেম এবং কখনও বিচ্ছেদের দৃশ্য দেখা যায়। দৃশ্যগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি সেই দৃশ্যগুলো দেখছে তার কাছে প্রত্যেকটি দৃশ্য কেবল একটি অভিজ্ঞতা। মানবজীবনের ক্ষেত্রও তেমন। শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য, আনন্দ, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং সম্পর্কের পরিবর্তন জীবনের পর্দায় ক্রমাগত প্রকাশিত হয়। গীতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় যে এই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার মধ্যে যে চৈতন্য সবকিছুকে জানছে তার প্রকৃতি কী।

এই উপলব্ধি মানুষের জীবনে একটি গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনতে পারে। যদি মানুষ নিজেকে কেবল শরীর ও মনের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখে, তবে সাময়িক পরিবর্তনগুলোই তার সমগ্র পরিচয় হয়ে ওঠে। সাফল্যে সে নিজেকে বড় মনে করে এবং ব্যর্থতায় নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করে। প্রশংসায় আনন্দিত হয় এবং নিন্দায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য উপলব্ধি করতে শুরু করলে মানুষ বুঝতে পারে যে জীবনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সত্য নয়। তখন আত্মপর্যবেক্ষণ, সংযম এবং সমত্ববোধের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এই শ্লোকের সর্বোচ্চ তাৎপর্য তাই আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে। আমরা প্রতিদিন বলি আমার শরীর, আমার মন, আমার চিন্তা, আমার অনুভূতি এবং আমার স্মৃতি। কিন্তু এই আমার কথাটিই এক গভীর অনুসন্ধানের দরজা খুলে দেয়। যদি শরীর আমার হয়, তাহলে আমি কি শুধু শরীর। যদি মন আমার হয়, তাহলে আমি কি শুধু মন। যদি চিন্তা আমার হয়, তাহলে আমি কি কেবল চিন্তার সমষ্টি। এই প্রশ্নের সরল উত্তর না দিয়ে গীতা মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতার গভীরে প্রবেশ করতে আহ্বান জানায়। সেই অনুসন্ধানে ক্ষেত্র হলো জ্ঞাত বিষয় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো জ্ঞাতা।

অতএব ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দটি কেবল একটি সংস্কৃত যৌগিক শব্দ নয়। এর মধ্যে ভারতীয় দর্শনের আত্মতত্ত্বের একটি বিশাল জগৎ নিহিত রয়েছে। ভাষাগতভাবে এর অর্থ ক্ষেত্রকে যে জানে। দার্শনিকভাবে এটি জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের পার্থক্যকে নির্দেশ করে। আধ্যাত্মিকভাবে এটি আত্মস্বরূপ অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়। প্রতীকীভাবে ক্ষেত্র মানুষের দেহ ও জীবনকে এবং ক্ষেত্রজ্ঞ সেই জীবনের অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে নির্দেশ করে। আর কৃষ্ণ যখন বলেন সকল ক্ষেত্রে আমাকেও ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানো, তখন ব্যক্তিগত আত্মজিজ্ঞাসা এক সর্বজনীন সত্যের অনুসন্ধানে পরিণত হয়।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের সারকথা হলো মানুষ যেন কেবল নিজের পরিবর্তনশীল শরীর, মন ও অভিজ্ঞতার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না থাকে। সে যেন জানতে শেখে কোনটি ক্ষেত্র এবং কে সেই ক্ষেত্রের জ্ঞাতা। ক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ক্ষেত্রজ্ঞের অনুসন্ধান মানুষকে পরিবর্তনের অন্তরালে থাকা চৈতন্যের দিকে নিয়ে যায়। আর যখন এই ব্যক্তিগত অনুসন্ধান সকল জীবের অন্তর্নিহিত চৈতন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন জ্ঞান কেবল তথ্যের বিষয় থাকে না, তা আত্মোপলব্ধির পথে পরিণত হয়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেন যে ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের প্রকৃত জ্ঞানই তাঁর মতে প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞান মানুষকে নিজের পরিচয়ের গভীরে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে সেই চিরন্তন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, আমি আসলে কে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 22, 2026 August 22, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি