ভগবদ্গীতা ১৩.৩০ — প্রকৃতির দ্বারা কর্মসম্পাদন ও আত্মার অকর্তৃত্বের উপলব্ধি
প্রকৃতৈ্যব চ কর্মাণি ক্রিয়অমাণানি সর্বশঃ।
যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি।।৩০।।
অনুবাদঃ যিনি দর্শন করেন যে, দেহের দ্বারা কৃত সমস্ত কর্মই প্রকৃতির দ্বারা সম্পাদিত হয় এবং আত্মা হচ্ছে অকর্তা, তিনিই যথাযথভাবে দর্শন করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের এই গভীর শ্লোকটি মানুষের আত্মপরিচয়, কর্ম এবং প্রকৃতির সম্পর্ক সম্পর্কে এক অসাধারণ সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো প্রকৃতিই সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে এবং যে ব্যক্তি আত্মাকে সেই কর্মের প্রকৃত কর্তা বলে মনে না করে অকর্তা হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই সত্যকে যথার্থভাবে দেখতে সক্ষম হন। সংস্কৃত শ্লোকটি হলো “প্রকৃত্যৈব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ। যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি।” এখানে একটি বিষয় প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রচলিত গীতাপাঠ অনুযায়ী এই শ্লোকটি ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ঊনত্রিশতম শ্লোক। এর মধ্যে প্রকৃতি, কর্ম, আত্মা, কর্তা এবং দর্শন এই কয়েকটি শব্দ একত্রিত হয়ে গীতার আত্মতত্ত্ব ও কর্মতত্ত্বের একটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা নির্মাণ করেছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রকৃত্যৈব। প্রকৃতি শব্দটি সংস্কৃত প্র ও কৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃ ধাতুর মূল অর্থ করা, সৃষ্টি করা, সম্পাদন করা বা কোনো কিছু ঘটানো। প্রকৃতি বলতে তাই এমন একটি মূল কার্যশক্তিকে বোঝানো যায় যার মাধ্যমে জগতের প্রকাশ, পরিবর্তন এবং কার্যপ্রবাহ সংঘটিত হয়। প্রকৃত্যা শব্দের অর্থ প্রকৃতির দ্বারা এবং এর সঙ্গে এব শব্দটি যুক্ত হয়ে প্রকৃত্যৈব হয়েছে। এব শব্দের মধ্যে বিশেষ জোর রয়েছে। এর অর্থ এই এবং বা প্রকৃতপক্ষে। ফলে প্রকৃত্যৈব বলতে বোঝায় প্রকৃতির দ্বারাই। এই একটি শব্দের মধ্যেই শ্লোকটি কর্মের প্রকৃত ক্ষেত্রকে নির্দেশ করছে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের মাধ্যমে যে পরিবর্তনশীল কার্যপ্রবাহ প্রকাশিত হয়, তার মূল কার্যকরী ক্ষেত্র হলো প্রকৃতি।
এরপর এসেছে কর্মাণি শব্দটি। কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর আক্ষরিক অর্থ হলো যা করা হয়। বাংলা ভাষায় কর্ম বলতে কাজ, ক্রিয়া, আচরণ, কার্যকলাপ কিংবা কোনো সম্পাদিত কাজ বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে কর্মের অর্থ শুধু বাহ্যিক কোনো কাজ নয়। মানুষের দেহের কার্যকলাপ, ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার, মনের চিন্তা, বুদ্ধির সিদ্ধান্ত, প্রবৃত্তির প্রকাশ এবং প্রকৃতির গুণসমূহের পারস্পরিক ক্রিয়ার বৃহত্তর প্রবাহও কর্মের অন্তর্ভুক্ত। কর্মাণি হলো কর্মের বহুবচন রূপ। অর্থাৎ এখানে একটি বিশেষ কাজ নয় বরং সমস্ত কর্মের কথা বলা হয়েছে।
ক্রিয়মাণানি শব্দটিও এই শ্লোকের ভাবকে আরও গভীর করে। এর মূল ধাতু কৃ, যার অর্থ করা। ক্রিয়মাণ অর্থ করা হচ্ছে বা সম্পাদিত হচ্ছে। ফলে কর্মাণি ক্রিয়মাণানি বলতে বোঝায় কর্মসমূহ সম্পাদিত হচ্ছে। এই গঠনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্লোকটি এখানে এমন কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না যে আত্মা সমস্ত কর্ম নিজে সম্পাদন করছে। বরং বলা হচ্ছে কর্মসমূহ সম্পাদিত হচ্ছে এবং তার আগে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে প্রকৃতির দ্বারাই সেই কর্ম সম্পাদিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে কর্মের কার্যপ্রবাহ এবং আত্মার স্বরূপের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
সর্বশঃ শব্দের অর্থ সর্বপ্রকারে, সর্বদিক থেকে কিংবা সম্পূর্ণভাবে। এর ফলে শ্লোকটির বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দেহের কাজ, ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ, মনের ওঠানামা, চিন্তার সৃষ্টি, আবেগের উদয় এবং প্রকৃতির গুণের প্রকাশ সবই এই বৃহত্তর কর্মপ্রবাহের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ মানুষ যে জগতের মধ্যে কাজ করে, সেই জগতের কার্যকলাপের পেছনে প্রকৃতির একটি অবিরাম গতি রয়েছে।
এরপর শ্লোকে আসে যঃ পশ্যতি। যঃ অর্থ যে এবং পশ্যতি অর্থ দেখে। কিন্তু গীতার ভাষায় এই দেখা কেবল চোখ দিয়ে কোনো দৃশ্য দেখা নয়। এখানে দেখা বলতে বোঝানো হয়েছে সত্যকে উপলব্ধি করা, অস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপকে চিনতে পারা এবং জ্ঞানের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে প্রত্যক্ষ করা। গীতার দর্শনে সত্যদর্শন মানে এমন একটি উপলব্ধি যেখানে মানুষ বাহ্যিক ঘটনার পেছনে থাকা তত্ত্বকে চিনতে পারে। তাই যে ব্যক্তি প্রকৃতির কর্মপ্রবাহকে যথার্থভাবে দেখতে পারেন, তিনি শুধু একজন পর্যবেক্ষক নন, তিনি একজন জ্ঞানদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি।
এইখানেই আসে আত্মানমকর্তারম্ শব্দযুগল। আত্মা শব্দটির অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। আত্মা বলতে নিজস্ব সত্তা, অন্তর্নিহিত চৈতন্য, স্বয়ং বা Self বোঝানো হতে পারে। গীতার এই দার্শনিক প্রসঙ্গে আত্মা বলতে এমন চৈতন্যসত্তাকে বোঝানো হচ্ছে যা দেহ, মন এবং ইন্দ্রিয়ের পরিবর্তনশীল অবস্থার অতিরিক্ত। আর অকর্তারম্ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং কর্তা থেকে। অ অর্থ না এবং কর্তা অর্থ যে করে বা কর্মসম্পাদক। ফলে অকর্তা অর্থ যে প্রকৃত অর্থে কর্তা নয়। এখানে অকর্তা শব্দটির অর্থ এই নয় যে মানুষের কোনো কাজ নেই বা মানুষ কোনো কর্ম করবে না। বরং এর অর্থ হলো আত্মার চূড়ান্ত স্বরূপকে পরিবর্তনশীল কর্মের কর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতায় আমরা বলি আমি হাঁটছি, আমি চিন্তা করছি, আমি রাগ করছি, আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আমি কাজটি করেছি। এই আমি বোধটি দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক। কিন্তু গীতার গভীর বিশ্লেষণ আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় যে এই আমি আসলে কে। দেহ কি আমি, নাকি মন আমি, নাকি চিন্তা আমি, নাকি আবেগ আমি। যদি দেহকে আমি বলা হয়, তবে শৈশবের দেহ এবং বর্তমানের দেহ এক নয়। যদি চিন্তাকে আমি বলা হয়, তবে চিন্তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। যদি আবেগকে আমি বলা হয়, তবে আবেগ কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো রাগ, কখনো শান্তিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাহলে যে সত্তা এই পরিবর্তনগুলোকে প্রত্যক্ষ করছে তার পরিচয় কী। গীতার দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের উত্তর আত্মতত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে প্রকৃতি এবং পুরুষের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং কার্যশীল। পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং সাক্ষী। গীতার এই শ্লোক সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতি দেহ, ইন্দ্রিয়, মন এবং গুণের মাধ্যমে ক্রিয়াশীল থাকে। আত্মা সেই পরিবর্তনশীল ক্রিয়াপ্রবাহের চৈতন্যসাক্ষী। অজ্ঞতার কারণে মানুষ এই দুইকে এক করে ফেলে। ফলে সে বলে আমি কর্তা, আমি ভোগী, আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি সফল এবং আমি ব্যর্থ। কিন্তু জ্ঞানদৃষ্টিতে মানুষ বুঝতে শুরু করে যে প্রকৃতির পরিবর্তনকে আত্মার চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা ভুল।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। আত্মা বা ব্রহ্ম স্বরূপতঃ অক্রিয়, অসঙ্গ এবং পরিবর্তনাতীত। দেহ ও মনের সমস্ত কার্যকলাপ আত্মার ওপর আরোপিত হয়। যেমন আকাশের মধ্যে ধোঁয়া দেখা গেলেও ধোঁয়া আকাশকে প্রকৃতপক্ষে কলুষিত করতে পারে না, তেমনি দেহ ও মনের কর্ম আত্মার স্বরূপকে প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তিত করে না। মানুষ যখন দেহ ও মনের সঙ্গে আত্মপরিচয়কে সম্পূর্ণ এক করে ফেলে তখন কর্তার অহংকার সৃষ্টি হয়। আর যখন সে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে তখন সেই অহংকার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়।
তবে অকর্তৃত্বের শিক্ষা কখনোই কর্মবিমুখতার শিক্ষা নয়। গীতার সামগ্রিক দর্শনে মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলা হয়নি। বরং কর্তব্য পালন করতে বলা হয়েছে। পার্থক্য হলো কর্ম করার সময় নিজের মধ্যে এই অহংকার না রাখা যে আমিই সবকিছুর একমাত্র কর্তা। মানুষ কর্ম করবে, কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অহংকারের সঙ্গে এক করে দেখবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই কর্মযোগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কর্মের মধ্যেই থাকা, কর্তব্য পালন করা এবং একই সঙ্গে কর্মের অহংকার থেকে মুক্ত হওয়া গীতার কর্মদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
এই শ্লোককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি গাড়ি যখন চলছে তখন তার ইঞ্জিন কাজ করছে, চাকা ঘুরছে, জ্বালানি পুড়ছে এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক অংশ পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করছে। গাড়ির মধ্যে বসে থাকা একজন যাত্রী এই সমস্ত কার্যপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করছে। যদি সে বলে আমি ইঞ্জিন, আমি চাকা, আমি জ্বালানি পোড়াচ্ছি, তাহলে তার বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তেমনি মানুষের দেহ ও মনও প্রকৃতির একটি জটিল কার্যপ্রবাহের মধ্যে কাজ করছে। আত্মা সেই কর্মপ্রবাহের সাক্ষীস্বরূপ। এই উপমা আত্মা ও প্রকৃতির পার্থক্যকে সহজভাবে বোঝাতে সাহায্য করে।
আরেকটি উপমা হলো সিনেমার পর্দা। পর্দার ওপর কখনো যুদ্ধ দেখা যায়, কখনো প্রেম, কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো আগুন এবং কখনো বৃষ্টি। দৃশ্যগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়, কিন্তু পর্দা নিজে সেই পরিবর্তনগুলোর দ্বারা পরিবর্তিত হয় না। এই উপমায় প্রকৃতিকে পরিবর্তনশীল দৃশ্যের সঙ্গে এবং আত্মাকে সাক্ষীস্বরূপ পর্দার সঙ্গে তুলনা করা যায়। অবশ্য কোনো উপমাই আত্মতত্ত্বের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু এটি বুঝতে সাহায্য করে যে পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষীকে একই জিনিস মনে করা উচিত নয়।
এই শ্লোকের একটি অসাধারণ ভাষাতাত্ত্বিক সৌন্দর্য হলো এখানে করা এবং দেখার ধারণা পাশাপাশি এসেছে। কৃ ধাতু থেকে কর্ম এবং ক্রিয়মাণ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে দৃশ্ ধাতু থেকে পশ্যতি এসেছে। একদিকে রয়েছে কর্ম, অন্যদিকে রয়েছে দর্শন। একদিকে রয়েছে প্রকৃতির ক্রিয়া, অন্যদিকে রয়েছে আত্মার সাক্ষীস্বরূপ উপলব্ধি। যেন শ্লোকটি সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলছে প্রকৃতি করে এবং জ্ঞানী দেখে। এই করা এবং দেখার পার্থক্যই শ্লোকটির দার্শনিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর। কেউ যখন ব্যর্থ হয় তখন সে বলে আমি ব্যর্থ। কেউ অপমানিত হলে বলে আমি অপমানিত। কেউ রাগ করলে বলে আমি রাগ। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় দেহে বিভিন্ন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, মনে বিভিন্ন চিন্তা উঠছে, স্মৃতি সক্রিয় হচ্ছে এবং আবেগের পরিবর্তন ঘটছে। যে ব্যক্তি এই পরিবর্তনগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে একটি আবেগ আমার মধ্যে উদয় হয়েছে আর আমি নিজেই সেই আবেগ নই। একটি চিন্তা আমার মনে এসেছে আর আমি সেই চিন্তা নই। এই সাক্ষীভাব মানুষের মানসিক স্বাধীনতার একটি গভীর পথ খুলে দিতে পারে।
তবে এই শিক্ষা নৈতিক দায়িত্ব অস্বীকার করার কোনো অনুমতি দেয় না। কেউ যদি বলে আমি কর্তা নই তাই আমি যা ইচ্ছা করতে পারি, তাহলে সে শ্লোকটির গভীর অর্থকে ভুল বুঝছে। ব্যবহারিক জীবনে মানুষকে ধর্ম, কর্তব্য, নৈতিকতা এবং সৎ কর্মের পথে চলতে হয়। অকর্তৃত্বের উপলব্ধি হলো আত্মার পরমার্থিক স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান। এটি দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অহংকার থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা।
শ্লোকটির আধ্যাত্মিক প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। প্রকৃতিকে যদি একটি অবিরাম নৃত্য হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, বাসনা এবং গুণসমূহ সেই নৃত্যের বিভিন্ন প্রকাশ। আত্মা সেই নৃত্যের সাক্ষী। অজ্ঞ মানুষ নৃত্যের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে এবং বলে আমি নৃত্য করছি। জ্ঞানী ব্যক্তি নৃত্যকে নৃত্য হিসেবে এবং নিজের প্রকৃত সত্তাকে সাক্ষী হিসেবে উপলব্ধি করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই কারণে শ্লোকে পশ্যতি শব্দটির পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। শুরুতে বলা হয়েছে যঃ পশ্যতি এবং শেষে বলা হয়েছে স পশ্যতি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি দেখে, সেই সত্যিই দেখে। এখানে দেখা মানে কেবল কোনো দর্শনীয় বস্তু দেখা নয়। এটি অস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপকে দেখা। কেউ শাস্ত্র পড়ে জানতে পারে যে আত্মা অকর্তা। কিন্তু শাস্ত্রজ্ঞান এবং প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এক নয়। যখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে দেহ ও মনের পরিবর্তনশীল কর্মই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়, তখন সেই জ্ঞান জীবনের অভিজ্ঞতাকে পরিবর্তন করতে শুরু করে।
এই শ্লোক আমাদের শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি কে। আমি কি কেবল আমার দেহ, আমার চিন্তা, আমার আবেগ, আমার পেশা, আমার সামাজিক পরিচয় এবং আমার জীবনের ঘটনাগুলোর সমষ্টি। নাকি এর অন্তরালে এমন একটি চৈতন্যসত্তা আছে যা এই সব পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে। গীতার এই শ্লোক সেই অন্তর্দৃষ্টির দিকে নিয়ে যায় যেখানে মানুষ নিজের কর্মকে অস্বীকার করে না, কিন্তু কর্মের সঙ্গে নিজের চূড়ান্ত আত্মপরিচয়কে আর এক করে দেখে না।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের ভাষাগত, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা একটি কেন্দ্রীয় সত্যের দিকে নির্দেশ করে। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে ক্রিয়াশীল। দেহ কাজ করে, ইন্দ্রিয় কাজ করে, মন চিন্তা করে, বুদ্ধি বিচার করে এবং প্রকৃতির গুণসমূহ পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করে। কিন্তু আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে এই পরিবর্তনশীল কর্মপ্রবাহের সঙ্গে অভিন্ন করে দেখা উচিত নয়। মানুষ যখন নিজেকে কেবল কর্মের কর্তা হিসেবে দেখে তখন অহংকার, আসক্তি, সাফল্যের গর্ব এবং ব্যর্থতার দুঃখ তাকে আবদ্ধ করে। আর যখন সে উপলব্ধি করতে শেখে যে প্রকৃতির কর্মপ্রবাহ তার নিজস্ব ক্ষেত্রে চলছে এবং আত্মা সেই কর্মপ্রবাহের গভীর সাক্ষীস্বরূপ, তখন তার মধ্যে এক নতুন স্বাধীনতার জন্ম হয়। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো প্রকৃতি কর্ম করে, আত্মা সেই কর্মকে প্রত্যক্ষ করে এবং আত্মাকে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল কর্মের কর্তা বলে মনে করাই অজ্ঞতার মূল। যে ব্যক্তি এই পার্থক্যকে সত্যভাবে উপলব্ধি করতে পারে, গীতার ভাষায় সেই ব্যক্তিই সত্যকে যথার্থভাবে দেখতে শুরু করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!