ভগবদ্গীতা ১৩.৩১ — একের মধ্যে বহুর প্রকাশ ও ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধি
যদা ভুতপৃথগভাবমেকস্থমনুপশ্যতি।
তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।৩১।।
অনুবাদঃ যখন বিবেকী পুরুষ জীবগণের পৃথক পৃথক অস্তিত্বকে একই প্রকৃতিতে অবস্থিত এবং একই প্রকৃতি থেকেই তাদের বিস্তার দর্শন করেন, তখন তিনি ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের একত্রিশতম শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্ব, জগতের বৈচিত্র্য এবং পরম সত্যের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো “যদা ভূতপৃথগ্ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি। তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।” এর সরল অর্থ হলো, যখন মানুষ সমস্ত জীবের পৃথক পৃথক সত্তাকে সেই এক পরম সত্যের মধ্যেই অবস্থিত দেখতে পায় এবং সেই এক সত্য থেকেই সমস্ত বৈচিত্র্যের বিস্তার উপলব্ধি করে, তখন সে ব্রহ্মকে লাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে গীতার এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে মানুষের সাধারণ দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এমন এক জ্ঞানদৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে বহুর মধ্যে এক এবং একের মধ্যে বহুর প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “যদা”। যদা অর্থ যখন। শ্লোকের শুরুতেই এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে একটি বিশেষ উপলব্ধির পরেই মানুষের চেতনার মধ্যে একটি গভীর পরিবর্তন ঘটে। মানুষ সাধারণত জগৎকে বিচ্ছিন্ন সত্তার সমষ্টি হিসেবে দেখে। সে ভাবে আমি একজন, তুমি অন্যজন, মানুষ এক ধরনের সত্তা, পশু আরেক ধরনের, প্রকৃতি আবার অন্য কিছু। এই বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টিই মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভিত্তি। কিন্তু গীতা বলছে, যখন এই বাহ্যিক বিচ্ছিন্নতার অন্তরালে থাকা গভীর ঐক্যকে মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটে।
“ভূত” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে। ভূ ধাতুর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা বিদ্যমান হওয়া। তাই ভূত বলতে অস্তিত্বশীল সত্তা, জীব বা সৃষ্ট জগতের বিভিন্ন প্রকাশকে বোঝানো হয়। এখানে ভূত শব্দটি কেবল মানুষকে নির্দেশ করে না। সমস্ত জীব এবং অস্তিত্বশীল প্রকাশ এর অন্তর্ভুক্ত। এই শব্দের মাধ্যমে শ্লোকটি ব্যক্তিমানুষের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র অস্তিত্বের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেছে।
এরপর এসেছে “পৃথক্” শব্দ। পৃথক্ অর্থ আলাদা, স্বতন্ত্র বা অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন। মানুষের সাধারণ দৃষ্টিতে পৃথিবী মূলত পৃথক পৃথক সত্তায় বিভক্ত। আমি এবং তুমি, আপন এবং পর, সুখী এবং দুঃখী, শক্তিশালী এবং দুর্বল, ধনী এবং দরিদ্র, মানুষ এবং প্রাণী এসব পার্থক্য আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো বাহ্যিক পার্থক্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেই পার্থক্যের গভীরে যে ঐক্য রয়েছে তাকে উপলব্ধি করা।
“ভাব” শব্দটি এসেছে ভূ ধাতু থেকে। ভাবের অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব, অবস্থা, সত্তা বা কোনো কিছুর প্রকাশের ধরন। পৃথক্ এবং ভাব একত্রে গঠিত হয় পৃথগ্ভাব। এর অর্থ পৃথকত্বের অবস্থা বা আলাদা সত্তা হিসেবে প্রকাশিত হওয়া। আর ভূতপৃথগ্ভাব বলতে বোঝায় জীবসমূহের পৃথক পৃথক সত্তা বা বহুরূপ অস্তিত্ব। এই শব্দটির মধ্যে মানুষের সাধারণ জগতদৃষ্টির একটি চিত্র রয়েছে। আমরা অসংখ্য জীবকে অসংখ্য পৃথক সত্তা হিসেবে দেখি এবং তাদের মধ্যে মৌলিক বিভাজন অনুভব করি।
কিন্তু শ্লোকের পরবর্তী শব্দ “একস্থম্” সেই দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দেয়। একস্থম্ গঠিত হয়েছে এক এবং স্থ শব্দের সমন্বয়ে। এক অর্থ একক বা অদ্বিতীয়। স্থ শব্দটি স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ থাকা, অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। তাই একস্থ অর্থ একের মধ্যে অবস্থিত বা একটির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এখানে গীতার বক্তব্য হলো, সমস্ত পৃথক পৃথক জীবসত্তাকে এমনভাবে দেখতে হবে যেন তারা একটি গভীরতর ঐক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। বাহ্যিকভাবে তারা বহু, কিন্তু তাদের অস্তিত্বের গভীরে একটি মৌলিক ঐক্য রয়েছে।
এই ধারণাকে বোঝার জন্য সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গ দেখতে একে অপরের থেকে আলাদা। কোনোটি ছোট, কোনোটি বড়, কোনোটি শান্ত, কোনোটি উত্তাল। কিন্তু প্রত্যেক তরঙ্গের মৌলিক সত্তা জল। তরঙ্গের রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জল তার মৌলিক পরিচয় হারায় না। একইভাবে অসংখ্য জীবের দেহ, মন, পরিচয়, ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রা আলাদা হতে পারে, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অস্তিত্বের গভীরে একটি ঐক্য উপলব্ধি করা যায়। এই উপমা শ্লোকটির একস্থ ধারণাকে সহজভাবে বোঝায়।
এরপর এসেছে “অনুপশ্যতি” শব্দটি। এটি অনু উপসর্গ এবং দৃশ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। পশ্যতি অর্থ দেখে। কিন্তু অনুপশ্যতি কেবল চোখ দিয়ে দেখা নয়। এর মধ্যে রয়েছে অনুসরণ করে দেখা, গভীরভাবে দেখা, যথার্থভাবে উপলব্ধি করা এবং অন্তর্দৃষ্টিতে সত্যকে প্রত্যক্ষ করা। তাই এই শ্লোকে দেখা বলতে সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃষ্টি বোঝানো হয় না। এটি জ্ঞানদৃষ্টি। যে দৃষ্টির মাধ্যমে বাহ্যিক রূপের অন্তরালে থাকা সত্য উপলব্ধি করা যায়, সেটিই অনুপশ্যতি।
মানুষ চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখে, কিন্তু সবকিছুর সত্য দেখতে পারে না। যেমন আমরা একটি স্বর্ণের আংটি দেখলে আংটির আকৃতি দেখি, কিন্তু তার স্বর্ণত্বের দিকে আমাদের মন সবসময় যায় না। আবার একটি কাঠের টেবিল দেখলে আমরা তার আকার ও ব্যবহার দেখি, কিন্তু তার পদার্থগত ভিত্তি নিয়ে ভাবি না। তেমনি আমরা মানুষকে তার নাম, পরিচয়, জাতি, অর্থ, পেশা বা সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে দেখি। কিন্তু তার অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নটি খুব কম মানুষই করে। অনুপশ্যতি সেই গভীর অনুসন্ধানের প্রতীক।
শ্লোকের পরবর্তী অংশ হলো “তত এব চ বিস্তারম্”। তত অর্থ তা থেকে এবং এব অর্থ সেই থেকেই বা একমাত্র সেই উৎস থেকেই। বিস্তার অর্থ প্রসারণ, বিস্তার বা বহুরূপ প্রকাশ। এই অংশটি শ্লোকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বক্তব্য প্রকাশ করে। শুধু এই কথা বলা হয়নি যে সব জীব একের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আরও বলা হয়েছে যে এই সমস্ত বৈচিত্র্যের বিস্তারও সেই এক থেকেই। অর্থাৎ মূল এক এবং প্রকাশ বহু। একের মধ্যে বহুর অবস্থান এবং এক থেকেই বহুর প্রকাশ এই দুই ধারণা একত্রে শ্লোকটির পূর্ণ দর্শন গঠন করেছে।
এই ধারণাকে স্বর্ণ এবং অলংকারের উপমা দিয়ে আরও পরিষ্কার করা যায়। একটি আংটি, একটি হার এবং একটি বালা বাহ্যিকভাবে ভিন্ন। তাদের নাম ভিন্ন, আকৃতি ভিন্ন এবং ব্যবহারও ভিন্ন। কিন্তু তাদের স্বর্ণত্ব এক। অলংকারের বহুত্ব স্বর্ণের ঐক্যকে নষ্ট করে না। বরং স্বর্ণই বিভিন্ন রূপ ধারণ করে অলংকার হিসেবে প্রকাশিত হয়। তেমনি এক পরম সত্যের বহুরূপ প্রকাশ হিসেবে জগতকে দেখাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত দৃষ্টি।
“ব্রহ্ম” শব্দটি এই শ্লোকের সর্বোচ্চ দার্শনিক শব্দ। ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বৃহ্ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, বিস্তৃত হওয়া বা মহান হওয়া। সেই অর্থে ব্রহ্ম হলো যা সীমাবদ্ধ নয়, যা সর্বব্যাপী, যা সর্ববিস্তৃত এবং যা সমস্ত অস্তিত্বের গভীরতম সত্য। এখানে ব্রহ্ম বলতে পুরাণের সৃষ্টিকর্তা দেবতা ব্রহ্মাকে বোঝানো হয়নি। এখানে ব্রহ্ম বলতে বোঝানো হয়েছে পরম সত্যকে, যা সমস্ত অস্তিত্বের ভিত্তি এবং যার মধ্যে সমস্ত বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠিত।
শ্লোকের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “সম্পদ্যতে”। এটি সম্ এবং পদ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে পৌঁছানো, লাভ করা, অর্জন করা বা কোনো সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ধারণা রয়েছে। তাই “ব্রহ্ম সম্পদ্যতে” শুধু ব্রহ্মকে কোনো দূরবর্তী বস্তু হিসেবে পাওয়া নয়। এর গভীর অর্থ হলো ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা এবং সেই সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। মানুষ নিজের প্রকৃত অস্তিত্বের সত্যকে উপলব্ধি করলে ব্রহ্মপ্রাপ্তির কথা বলা হয়। এই প্রাপ্তি কোনো ভৌগোলিক যাত্রার ফল নয়, বরং চেতনার গভীর রূপান্তর।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। বাহ্যিক দেহ ও উপাধির কারণে জীবসমূহের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু আত্মার প্রকৃত স্বরূপে সেই বিভাজন নেই। বহু দেহের মধ্যে এক আত্মতত্ত্বের উপলব্ধিই জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই কারণে অদ্বৈত দর্শনে বহুত্বের অভিজ্ঞতার অন্তরালে অদ্বিতীয় ব্রহ্মকে উপলব্ধি করাই মুক্তির জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈত ব্যাখ্যায়ও সমস্ত বৈচিত্র্য একটি পরম সত্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে বিভিন্ন বেদান্তীয় ব্যাখ্যার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও বহুর সঙ্গে একের সম্পর্ক এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে রয়ে যায়।
এই শ্লোকের একটি গভীর মনোবৈজ্ঞানিক অর্থও রয়েছে। মানুষের অহংকারের একটি প্রধান ভিত্তি হলো বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। মানুষ ভাবে আমি অন্যদের থেকে আলাদা, আমার স্বার্থ আলাদা, আমার সুখ আলাদা এবং অন্যের দুঃখ আমার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি থেকেই অনেক সময় অহংকার, ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ভয় এবং প্রতিযোগিতার জন্ম হয়। কিন্তু যদি মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে অন্যের অস্তিত্বও একই বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাহলে তার মধ্যে সহমর্মিতা জন্ম নিতে পারে। তখন অন্যের দুঃখকে সম্পূর্ণ অপরের দুঃখ বলে মনে হয় না। অন্যের আনন্দও তার কাছে সম্পূর্ণ অপরের বিষয় থাকে না।
এই কারণে শ্লোকটি শুধু অধিবিদ্যার আলোচনা নয়। এর একটি গভীর নৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। যে ব্যক্তি সমস্ত জীবের মধ্যে একটি গভীর ঐক্য অনুভব করতে শেখে, তার আচরণে স্বাভাবিকভাবেই সহনশীলতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। সে অন্যকে শুধু বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করতে চায় না। একজন দরিদ্র মানুষ, একজন ধনী মানুষ, একজন শিক্ষিত মানুষ, একজন অশিক্ষিত মানুষ অথবা অন্য কোনো জীবকে দেখার সময় তার মধ্যে একটি সাধারণ অস্তিত্বের উপলব্ধি কাজ করতে পারে। এখান থেকেই সমদৃষ্টি এবং মানবিকতার জন্ম হয়।
শ্লোকটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আরও গভীর। মানুষের সাধারণ চেতনা বলে আমি একটি পৃথক ব্যক্তি এবং জগত আমার থেকে আলাদা। আধ্যাত্মিক জ্ঞান সেই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে প্রশ্ন করে। তখন মানুষ নিজেকে কেবল শরীর, নাম, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান হিসেবে না দেখে নিজের অস্তিত্বের গভীরতর সত্য অনুসন্ধান করতে শুরু করে। সে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে যে বহুর মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে, সেই ঐক্যই অস্তিত্বের গভীর ভিত্তি। এই উপলব্ধি যত গভীর হয়, ততই অহংকার এবং সংকীর্ণ পরিচয়ের প্রভাব কমতে থাকে।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। শুরু হয়েছে “যদা” দিয়ে এবং শেষ হয়েছে “তদা” দিয়ে। অর্থাৎ যখন এবং তখন। এই দুটি শব্দের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রা স্থাপিত হয়েছে। যখন মানুষ জীবের পৃথকত্বের মধ্যে এককে দেখতে পায় এবং সেই এক থেকেই সমস্ত বৈচিত্র্যের বিস্তার উপলব্ধি করে, তখন তার দৃষ্টির পরিবর্তন ঘটে এবং সে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে। ভাষার এই সংক্ষিপ্ত কাঠামোর মধ্যে একটি বিশাল দর্শনকে ধারণ করা হয়েছে।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা তাই বহুত্বকে অস্বীকার করা নয়। পৃথিবীতে বৈচিত্র্য বাস্তব অভিজ্ঞতার অংশ। মানুষ মানুষের থেকে আলাদা, গাছপালা আলাদা, প্রাণী আলাদা এবং প্রত্যেক জীবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের কারণে যেন আমরা অস্তিত্বের গভীর ঐক্যকে ভুলে না যাই। একত্বের উপলব্ধি বহুত্বকে ধ্বংস করে না, বরং বহুত্বকে একটি বৃহত্তর অর্থের মধ্যে স্থাপন করে। যেমন একটি গানের অসংখ্য স্বর একসঙ্গে মিলেই সুর সৃষ্টি করে, তেমনি অস্তিত্বের অসংখ্য রূপ একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে অর্থ লাভ করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, “যদা ভূতপৃথগ্ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি। তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।” শ্লোকটি মানুষের দৃষ্টির রূপান্তরের কথা বলে। সাধারণ দৃষ্টি বহুত্ব দেখে এবং সেখানে বিভাজন অনুভব করে। জ্ঞানদৃষ্টি বহুত্বের মধ্যে একত্ব দেখে। আরও গভীর আধ্যাত্মিক দৃষ্টি উপলব্ধি করে যে সেই এক থেকেই বহুর বিস্তার। “ভূত” আমাদের অস্তিত্বের কথা বলে, “পৃথগ্ভাব” আমাদের বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার কথা বলে, “একস্থ” সেই বিচ্ছিন্নতার অন্তরালে থাকা ঐক্যের কথা বলে, “অনুপশ্যতি” সেই সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা বলে, “বিস্তার” এক থেকে বহুর প্রকাশকে নির্দেশ করে এবং “ব্রহ্ম সম্পদ্যতে” সেই পরম সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চূড়ান্ত উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। তাই এই শ্লোককে শুধু একটি ধর্মীয় বাণী হিসেবে দেখলে এর গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের একটি আধ্যাত্মিক আহ্বান। বাহ্যিকভাবে আমরা বহু, কিন্তু সেই বহুত্বের অন্তরালে যে একক সত্যের সন্ধান রয়েছে, সেই সত্যকে উপলব্ধি করাই এই শ্লোকের হৃদয়। যখন মানুষ অন্যের মধ্যে নিজ অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি অনুভব করতে শেখে, যখন জগতের অসংখ্য রূপের মধ্যে একটি গভীর ঐক্য দেখতে পায় এবং যখন সেই ঐক্য থেকেই সমস্ত বৈচিত্র্যের প্রকাশ উপলব্ধি করে, তখন তার কাছে জীবন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি থাকে না। জীবন হয়ে ওঠে এক পরম সত্যের বহুরূপ প্রকাশ। সেই দৃষ্টিই জ্ঞানদৃষ্টি, সেই উপলব্ধিই আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা এবং সেই উপলব্ধির চূড়ান্ত পরিণতিই ব্রহ্মপ্রাপ্তির দিকে অগ্রসর হওয়া।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!