ভগবদ্গীতা ১৩.৩৩ — আকাশের ন্যায় আত্মার সর্বব্যাপী ও অলিপ্ত স্বরূপ
যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে।
সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে।।৩৩।।
অনুবাদঃ আকাশ যেমন সর্বগত হয়েও সূক্ষ্মতা হেতু অন্য বস্তুতে লিপ্ত হয় না, তেমনই ব্রহ্ম দর্শন-সম্পন্ন জীবাত্মা দেহে অবস্থিত হয়েও দেহধর্মে লিপ্ত হন না।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের তেত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ আত্মার এক অত্যন্ত গভীর স্বরূপকে আকাশের উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে”। এর সহজ অর্থ হলো, সর্বব্যাপী আকাশ যেমন তার সূক্ষ্মতার কারণে কোনো কিছুর দ্বারা লিপ্ত বা কলুষিত হয় না, তেমনি আত্মাও দেহের সর্বত্র অবস্থান করেও দেহের কোনো ধর্ম দ্বারা লিপ্ত হয় না। এই শ্লোকের মধ্যে দেহ ও আত্মার সম্পর্ক, চৈতন্যের প্রকৃতি, মানুষের প্রকৃত পরিচয় এবং আসক্তির প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সর্বগতং। সর্ব শব্দের অর্থ সমস্ত বা সব এবং গত শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু গম যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। সেই অর্থে সর্বগত বলতে বোঝায় যে সর্বত্র গমন করেছে অথবা সর্বত্র অবস্থান করছে। এখানে সর্বগতং শব্দটি আকাশের বিশেষণ। অর্থাৎ আকাশ সর্বব্যাপী এবং তার বিস্তার কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পর এসেছে সৌক্ষ্ম্যাৎ শব্দটি। সৌক্ষ্ম্য শব্দের অর্থ সূক্ষ্মতা এবং সৌক্ষ্ম্যাৎ অর্থ সূক্ষ্মতার কারণে। আকাশের সূক্ষ্ম প্রকৃতির কারণে কোনো দৃশ্যমান বস্তু তাকে এমনভাবে আবৃত করতে পারে না যে তার নিজস্ব প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। এরপর এসেছে আকাশং অর্থাৎ আকাশ। এখানে আকাশ কেবল আমাদের চোখে দেখা নীল আকাশ নয়। ভারতীয় দর্শনে আকাশ একটি গভীর তাত্ত্বিক ধারণা এবং এই শ্লোকে তা আত্মার অলিপ্ত স্বরূপ বোঝানোর একটি শক্তিশালী উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
শ্লোকটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদগুলোর একটি হলো নোপলিপ্যতে। এটি ন এবং উপলিপ্যতে এই দুই অংশের সন্ধিজাত রূপ। উপলিপ্যতে শব্দটি উপ এবং লিপ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। লিপ ধাতুর অর্থ হলো লেপন করা, মাখানো, লেগে যাওয়া অথবা কলুষিত হওয়া। ন উপসর্গের মাধ্যমে তার অর্থ হয়ে যায় লিপ্ত হয় না বা কলুষিত হয় না। তবে এখানে লিপ্ত হওয়ার অর্থ কেবল কোনো বস্তুতে ময়লা লাগা নয়। দার্শনিক অর্থে লিপ্ত হওয়া মানে কোনো কিছুর ধর্ম নিজের প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে একীভূত করে নেওয়া। এই সূক্ষ্ম অর্থটি উপলব্ধি করলেই শ্লোকটির গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মানুষ সাধারণত দেহ এবং আত্মাকে এক বলে মনে করে। আমরা বলি আমি অসুস্থ, আমি দুঃখী, আমি ব্যর্থ, আমি সুখী, আমি অপমানিত। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, দেহের অবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে, মনের অবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে, চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে, অনুভূতি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। শৈশবের দেহ আর যৌবনের দেহ এক নয়। যৌবনের দেহও বার্ধক্যের দেহের মতো নয়। আজ যে চিন্তা সত্য বলে মনে হচ্ছে, বহু বছর পরে সেই চিন্তা পরিবর্তিত হতে পারে। আজ যে মানুষ আনন্দিত, আগামীকাল সে দুঃখী হতে পারে। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনকে যে চৈতন্য জানছে, সেই জানার ক্ষমতার প্রকৃতি কী। গীতার আত্মতত্ত্ব এই প্রশ্নের মধ্যেই আত্মার স্বরূপ অনুসন্ধানের পথ দেখায়।
শ্লোকে এরপর বলা হয়েছে সর্বত্রাবস্থিতো দেহে। সর্বত্র শব্দের অর্থ সব জায়গায় এবং অবস্থিত শব্দটি অব ও স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থা ধাতুর অর্থ দাঁড়ানো বা অবস্থান করা। সর্বত্রাবস্থিতো দেহে অর্থ হলো দেহের সর্বত্র অবস্থানকারী। এখানে আত্মাকে দেহের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। আত্মা কেবল হৃদয়ে আছে, কেবল মস্তিষ্কে আছে অথবা কেবল শরীরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আছে এমন ধারণা এই শ্লোকের উদ্দেশ্য নয়। বরং আত্মাকে দেহব্যাপী চৈতন্যসত্তা হিসেবে উপলব্ধি করার একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর আসে তথা আত্মা নোপলিপ্যতে। তথা অর্থ তেমনই বা সেইরূপ। অর্থাৎ আকাশ যেমন লিপ্ত হয় না, তেমনি আত্মাও লিপ্ত হয় না। এই তেমনি শব্দটি পুরো শ্লোকের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। প্রথম অংশে আকাশের উদাহরণ এবং দ্বিতীয় অংশে আত্মার তত্ত্ব। আকাশের মধ্যে মেঘ আসে, বৃষ্টি হয়, ঝড় হয়, ধোঁয়া দেখা যায় এবং পাখি উড়ে যায়। কিন্তু আকাশ নিজে মেঘ হয়ে যায় না, ধোঁয়া হয়ে যায় না এবং ঝড় হয়ে যায় না। এই দৃশ্যমান সত্যের মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ একটি অদৃশ্য সত্য বোঝাচ্ছেন। দেহের মধ্যে জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, রোগ, বার্ধক্য এবং মৃত্যু ঘটে। মনে আনন্দ, দুঃখ, রাগ, ভয়, আশা ও হতাশা আসে। কিন্তু আত্মার প্রকৃত স্বরূপ এসব পরিবর্তনের দ্বারা পরিবর্তিত হয় না।
এই কারণে এই শ্লোকের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো উপস্থিতি এবং আসক্তি এক বিষয় নয়। কোনো কিছুর মধ্যে থাকা মানেই সেই জিনিসের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়। আকাশ মেঘকে ধারণ করে, কিন্তু মেঘ আকাশের প্রকৃত স্বরূপ হয়ে যায় না। তেমনি আত্মা দেহের মধ্যে অবস্থান করে, কিন্তু দেহের পরিবর্তন আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে পরিবর্তন করে না। এই ধারণাটি মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের অধিকাংশ দুঃখের একটি কারণ হলো নিজের সাময়িক অবস্থা এবং প্রকৃত পরিচয়কে এক করে ফেলা। মানুষ মনে করে আমার অর্থ নেই তাই আমি অসহায়, আমার শরীর অসুস্থ তাই আমি দুর্বল, আমি ব্যর্থ হয়েছি তাই আমি ব্যর্থ মানুষ। গীতার আত্মতত্ত্ব এই আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রশ্ন তোলে।
আত্মা শব্দটিও ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর শব্দ। সংস্কৃত আত্মন শব্দটি বৈদিক যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গে এর অর্থ নিজের সত্তা, অন্তর্সত্তা, প্রাণ, চৈতন্য অথবা নিজস্ব অস্তিত্বের কেন্দ্র হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। উপনিষদ এবং বেদান্তে আত্মা ক্রমে এমন এক গভীর দার্শনিক ধারণায় পরিণত হয়েছে যা দেহ ও মনের পরিবর্তনশীলতার অতীত চৈতন্যস্বরূপকে নির্দেশ করে। এই শ্লোকে আত্মা বলতে সেই চৈতন্যসত্তাকেই বোঝানো হয়েছে যা দেহের সমস্ত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেও নিজে দেহের পরিবর্তনশীল ধর্ম দ্বারা প্রকৃতভাবে লিপ্ত হয় না।
এই ধারণাকে বোঝার জন্য আকাশের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। আকাশের মধ্যে কালো মেঘ জমলে আমরা বলি আকাশ কালো হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কালো হলো মেঘ, আকাশ নয়। কিছুক্ষণ পরে মেঘ সরে গেলে আকাশ আবার পরিষ্কার দেখা যায়। একইভাবে মানুষের মনে দুঃখের মেঘ জমতে পারে, রাগের মেঘ জমতে পারে, ভয়ের মেঘ জমতে পারে এবং হতাশার মেঘ জমতে পারে। কিন্তু যে চৈতন্য এই দুঃখ, রাগ, ভয় এবং হতাশাকে জানতে পারে, তাকে কি সেই দুঃখ, রাগ বা ভয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখা যায়। গীতার উত্তর হলো আত্মার প্রকৃত স্বরূপ এর চেয়ে গভীর।
এই বক্তব্যের মধ্যে সাক্ষী চৈতন্যের ধারণাও নিহিত রয়েছে। আমরা যখন বলি আমার মনে একটি চিন্তা এসেছে, তখন অজান্তেই আমরা স্বীকার করি যে চিন্তাটি এবং চিন্তাকে জানার ক্ষমতা একই জিনিস নয়। যখন বলি আমার মনে দুঃখ হয়েছে, তখন বোঝা যায় যে দুঃখ একটি মানসিক অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার জ্ঞানও আমাদের মধ্যে রয়েছে। এই জানার ক্ষমতাকে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় সাক্ষীস্বরূপ চৈতন্য বলা হয়। আত্মাকে এই সাক্ষী হিসেবে উপলব্ধি করা মানে জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে অস্বীকার করা নয়। বরং তাদের প্রকৃতি বুঝে তাদের সঙ্গে নিজের চূড়ান্ত পরিচয়কে গুলিয়ে না ফেলা।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাংখ্যে পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি প্রকৃতির অন্তর্গত। প্রকৃতির মধ্যে পরিবর্তন ঘটে কিন্তু পুরুষ সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। এই দৃষ্টিতে আত্মার অলিপ্ততা বোঝা যায়। দেহের জন্ম ও মৃত্যু আছে, মনের ওঠানামা আছে, বুদ্ধির পরিবর্তন আছে, কিন্তু চৈতন্যস্বরূপ পুরুষকে এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন করে দেখা যায় না।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোচনায় এই শ্লোকটির তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত মতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ চৈতন্য এবং সেই আত্মা মূলত অসঙ্গ ও অলিপ্ত। দেহ এবং মন পরিবর্তনশীল উপাধি হিসেবে কাজ করে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে দেহ ও মনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্নতা অনুভব করে তখন বন্ধনের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়। আর যখন সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে দেহ পরিবর্তনশীল হলেও তার সাক্ষীস্বরূপ চৈতন্য তার প্রকৃত পরিচয়, তখন আত্মজ্ঞান বা মুক্তির দিকে তার যাত্রা শুরু হয়।
তবে এই শ্লোককে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করলে এর প্রকৃত শক্তি উপলব্ধি করা যায় না। এর একটি গভীর ব্যবহারিক দিক রয়েছে। জীবনে যখন অপমান আসে, তখন মানুষ মনে করতে পারে আমি অপমানিত। যখন ব্যর্থতা আসে তখন মনে হতে পারে আমি ব্যর্থ। যখন দুঃখ আসে তখন মনে হতে পারে আমি দুঃখ। কিন্তু যদি মানুষ একটু থেমে নিজেকে প্রশ্ন করে যে এই অনুভূতিকে কে জানছে, তাহলে সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সামান্য দূরত্ব তৈরি করতে পারে। এই দূরত্ব উদাসীনতা নয়। বরং সচেতনতা। দুঃখকে অস্বীকার না করে দুঃখকে দেখা, রাগকে দমন না করে রাগকে জানা এবং ভয়কে অস্বীকার না করে ভয়ের উপস্থিতিকে প্রত্যক্ষ করা আত্মসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।
এই শ্লোকে আকাশ একটি প্রতীক হিসেবেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। আকাশ অসীমতার প্রতীক, স্বাধীনতার প্রতীক এবং ধারণক্ষমতার প্রতীক। তার মধ্যে সবকিছু স্থান পায় কিন্তু কোনো একটি বস্তু তাকে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। একইভাবে আত্মাকে এখানে এমন এক অন্তর্সত্তার প্রতীক হিসেবে দেখা যায় যা দেহ, মন এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজের গভীরতম প্রকৃতিতে স্বাধীন ও অলিপ্ত। এই প্রতীকী অর্থ মানুষের আত্মপরিচয়কে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে গভীরতর অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়।
আকাশের সঙ্গে আত্মার তুলনা অবশ্য সম্পূর্ণ অভিন্নতার কথা বলে না। আকাশ একটি জড় উপাদান এবং আত্মা চৈতন্যস্বরূপ। উপমার উদ্দেশ্য হলো আকাশের সর্বব্যাপী ও অলিপ্ত প্রকৃতির মাধ্যমে আত্মার অসঙ্গতা বোঝানো। যেমন পদ্ম জলে জন্মেও জলের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে ভিজে যায় না, তেমনি আত্মা দেহের মধ্যে থেকেও দেহের পরিবর্তনশীল ধর্মে প্রকৃতভাবে লিপ্ত হয় না। এই ধরনের উপমা ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাহিত্যে বিমূর্ত সত্যকে সহজে উপলব্ধি করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
এই শ্লোকের সঙ্গে কর্মের প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। মানুষের জীবন কর্মময়। মানুষ কাজ করে এবং সেই কাজের ফল ভোগ করে। কিন্তু আত্মার গভীরতম স্বরূপকে দেহ ও মনের কর্মের সঙ্গে এক করে দেখা হলে মানুষ নিজের পরিচয়কে কেবল কর্মের ফলের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। গীতার শিক্ষা মানুষকে কর্ম থেকে পালাতে বলে না। বরং কর্মের মধ্যেই থেকে নিজের গভীরতর স্বরূপকে উপলব্ধি করার শিক্ষা দেয়। দেহ কাজ করবে, মন চিন্তা করবে, বুদ্ধি বিচার করবে এবং জীবনের নানা পরিস্থিতি আসবে। কিন্তু আত্মাকে যদি সাক্ষী চৈতন্য হিসেবে উপলব্ধি করা যায় তাহলে মানুষ কর্মের মধ্যেও অন্তর্গত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে পারে।
এই শ্লোকের ভাষাগত সৌন্দর্যও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমে আকাশের কথা বলা হয়েছে এবং পরে আত্মার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে একটি দৃশ্যমান ও পরিচিত বিষয়ের সাহায্যে পাঠকের মনকে প্রস্তুত করা হয়েছে। তারপর সেই পরিচিত বিষয়ের মাধ্যমে একটি অদৃশ্য ও গভীর সত্য প্রকাশ করা হয়েছে। আকাশের মধ্যে মেঘ দেখা যায় কিন্তু আকাশ নিজে মেঘ নয়। একইভাবে আত্মার মধ্যে দেহ ও মনের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয় কিন্তু আত্মা সেই অভিজ্ঞতাগুলোর সমষ্টি নয়। এইভাবে শ্লোকটি দৃশ্যমান প্রকৃতি থেকে অদৃশ্য চৈতন্যের দিকে পাঠককে নিয়ে যায়।
মানুষের জীবনে এই উপলব্ধির মূল্য অপরিসীম। আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলি। কেউ নিজের পেশাকে নিজের পরিচয় মনে করে, কেউ সম্পদকে, কেউ সামাজিক সম্মানকে, কেউ নিজের দেহকে এবং কেউ নিজের মানসিক অবস্থাকে। কিন্তু এসব পরিচয় পরিবর্তনশীল। জীবনের একটি পর্যায়ে যা আছে অন্য পর্যায়ে তা থাকে না। এই পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের গভীরতম সত্তাকে অনুসন্ধান করার যে আহ্বান গীতা দেয়, এই শ্লোক তারই একটি শক্তিশালী প্রকাশ।
অতএব “সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে” কেবল একটি শ্লোক নয়, এটি আত্মপরিচয়ের একটি গভীর দর্শন। এর মধ্যে ভাষার সৌন্দর্য, ব্যাকরণের সূক্ষ্মতা, আধ্যাত্মিক প্রতীক, দার্শনিক বিশ্লেষণ এবং মানবজীবনের ব্যবহারিক শিক্ষা একত্রিত হয়েছে। সর্বগত শব্দ আমাদের আত্মার সর্বব্যাপী উপস্থিতির কথা স্মরণ করায়। সৌক্ষ্ম্য আমাদের আত্মার ইন্দ্রিয়াতীত প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। আকাশ আমাদের অসীমতা ও অলিপ্ততার প্রতীক দেয়। আর নোপলিপ্যতে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দেহ ও মনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা আত্মার চূড়ান্ত পরিচয় নয়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের পরিচয় নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হবে। দেহের মধ্যে বাস করেও নিজেকে শুধু দেহ বলে মনে করা যাবে না। মনের মধ্যে চিন্তা থাকলেও নিজেকে শুধু চিন্তার সমষ্টি মনে করা যাবে না। জীবনে দুঃখ থাকলেও নিজেকে কেবল দুঃখ বলে ভাবা যাবে না। আকাশ যেমন মেঘকে ধারণ করেও মেঘ হয়ে যায় না, তেমনি আত্মাও দেহ ও মনের সমস্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও তাদের দ্বারা নিজের চূড়ান্ত স্বরূপ হারায় না। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে অনাসক্তি সৃষ্টি করে, কিন্তু তা জীবনের প্রতি উদাসীনতা নয়। বরং এটি এমন এক সচেতনতা যেখানে মানুষ জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করেও তার পরিবর্তনশীল অবস্থার দ্বারা নিজের চূড়ান্ত পরিচয়কে নির্ধারিত হতে দেয় না। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক আত্মজ্ঞান, অন্তর্গত স্বাধীনতা এবং চৈতন্যের অলিপ্ত স্বরূপ উপলব্ধির পথে এক অনন্য দার্শনিক আলোকবর্তিকা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!