ভগবদ্গীতা ১৩.৩৪ — সূর্যের ন্যায় ক্ষেত্রজ্ঞের দ্বারা সমগ্র ক্ষেত্রের প্রকাশ
যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নং লোকমিমং রবিঃ।
ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।৩৪।।
অনুবাদঃ হে ভারত! এক সূর্য যেমন সমগ্র জগৎকে প্রকাশ করে, সেই রকম ক্ষেত্রী আত্মাও সমগ্র ক্ষেত্রকে প্রকাশ করে।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকগুলোর মধ্যে চৌত্রিশতম শ্লোকটি ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্বকে একটি অসাধারণ উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো “যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নং লোকমিমং রবিঃ। ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।। ১৩.৩৪।। ” এর সরল অর্থ হলো, হে ভারত, যেমন একমাত্র সূর্য সমগ্র এই জগতকে আলোকিত ও প্রকাশিত করে, তেমনি ক্ষেত্রজ্ঞ সমগ্র ক্ষেত্রকে প্রকাশিত করেন। কিন্তু এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল সূর্যের আলো এবং জগতের দৃশ্যমানতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, চিন্তা, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো প্রকাশয়তি। সংস্কৃত প্রকাশয়তি শব্দটির মূল রয়েছে √কাশ ধাতুর মধ্যে। কাশ ধাতুর অর্থ হলো দীপ্ত হওয়া, জ্বলা, উজ্জ্বল হওয়া এবং প্রকাশিত হওয়া। এর সঙ্গে প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে প্রকাশ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশ বলতে এমন কিছু বোঝায় যা অন্ধকার বা অস্পষ্টতার মধ্য থেকে কোনো বিষয়কে স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করে তোলে। প্রকাশয়তি হলো সেই প্রকাশ ঘটানোর ক্রিয়া। তাই শ্লোকে প্রকাশয়তি শব্দটির অর্থ কেবল আলো দেওয়া নয়। এর গভীরতর অর্থ হলো কোনো কিছুকে জ্ঞানের ক্ষেত্রে উপস্থিত করা, তাকে উপলব্ধিযোগ্য করা এবং তার অস্তিত্বকে সচেতনতার সামনে প্রকাশ করা। এই কারণে শ্লোকটির দার্শনিক অর্থ বোঝার জন্য প্রকাশ শব্দটিকে বাহ্যিক আলো এবং অন্তর্চেতনার জ্ঞানের আলো উভয় অর্থেই দেখতে হয়।
এরপর আসে রবি শব্দটি। রবি সংস্কৃত ভাষায় সূর্যের একটি প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত নাম। এখানে রবি শব্দটি কেবল আকাশে উদিত একটি জ্যোতিষ্ককে নির্দেশ করছে না। ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত সাহিত্যে সূর্য বহু যুগ ধরে আলো, জ্ঞান, প্রাণ, সময় এবং সত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সূর্য নিজে অন্য কোনো আলোর সাহায্যে দৃশ্যমান হয় না। বরং তার আলোতেই অন্য বস্তু আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই বৈশিষ্ট্যই শ্লোকটির গভীর দার্শনিক উপমার ভিত্তি। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে যেমন সূর্যের আলোয় পৃথিবীর অসংখ্য বস্তু প্রকাশিত হয়, তেমনি চেতনার উপস্থিতিতে দেহ, মন, চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা জ্ঞাত হয়ে ওঠে।
একঃ শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। একঃ অর্থ এক বা একমাত্র। শ্রীকৃষ্ণ বলেন এক সূর্য সমগ্র জগতকে প্রকাশ করে। এর দ্বারা বোঝানো হয় যে প্রকাশের উৎস এক হলেও প্রকাশিত বিষয় অসংখ্য হতে পারে। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য বস্তু, অসংখ্য জীব এবং অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, কিন্তু সূর্যের আলো তাদের প্রত্যেককে আলোকিত করতে পারে। এই উপমাকে অন্তর্জগতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেখা যায় যে মানুষের অভিজ্ঞতা অসংখ্য হলেও সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে জানার চেতনা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। দেহের অনুভূতি এক রকম, মনের অবস্থা আরেক রকম, চিন্তা আরেক রকম, স্মৃতি আরেক রকম, কিন্তু এগুলো প্রত্যেকটিই কোনো না কোনো সচেতনতার মধ্যে প্রকাশিত হয়।
কৃৎস্ন শব্দের অর্থ সমগ্র, সম্পূর্ণ বা কোনো অংশ বাদ না রেখে পুরোটা। শ্লোকে এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে কৃৎস্নং লোকম অর্থাৎ সমগ্র জগত এবং পরে বলা হয়েছে কৃৎস্নং ক্ষেত্রং অর্থাৎ সমগ্র ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে সূর্যের আলো কোনো নির্দিষ্ট বস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞানের ক্ষেত্রও দেহের কোনো একটি অংশ বা মনের কোনো একটি অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, স্মৃতি, বাসনা, সুখ, দুঃখ এবং বিভিন্ন মানসিক পরিবর্তন সবই ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।
লোক শব্দটির অর্থ জগৎ বা অভিজ্ঞতার জগৎ। ইমম অর্থ এই। তাই ইমং লোকম অর্থ এই জগৎ। এখানে কোনো দূরবর্তী বা কল্পিত জগতের কথা বলা হচ্ছে না। মানুষ যে জগতকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করে, সূর্যের আলো সেই জগতকে প্রকাশ করে। এই বাহ্যিক জগতের উপমা দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। বাহিরে যেমন সূর্যের আলো ছাড়া দৃশ্যমান জগতের কোনো বস্তু চোখে ধরা পড়ে না, তেমনি অন্তরে চেতনার উপস্থিতি ছাড়া চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার কোনো কিছুই জ্ঞাত হতে পারে না।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শব্দ হলো ক্ষেত্র। সাধারণ ভাষায় ক্ষেত্র বলতে চাষের জমি বা ভূমিকে বোঝায়। কিন্তু ভগবদ্গীতায় ক্ষেত্র একটি গভীর দার্শনিক পরিভাষা। ত্রয়োদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ দেহকে ক্ষেত্র বলে অভিহিত করেছেন। ক্ষেত্রের মধ্যে যেমন বীজ বপন করা হয় এবং সময়ের সঙ্গে তার ফল প্রকাশ পায়, তেমনি মানুষের দেহ ও মন নামক জীবনের ক্ষেত্রে কর্ম, বাসনা, সংস্কার, চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার বীজ ক্রমে বিভিন্ন ফল সৃষ্টি করে। এই কারণে ক্ষেত্রকে কেবল শারীরিক দেহ হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অনুভূতি, ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ এবং পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সমগ্র ব্যবস্থা ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।
এর বিপরীতে রয়েছে ক্ষেত্রী। ক্ষেত্রী শব্দটি ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ হলো ক্ষেত্রের অধিকারী বা ক্ষেত্রের জ্ঞাতা। গীতার দার্শনিক প্রেক্ষাপটে ক্ষেত্রীকে ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ ক্ষেত্রের জ্ঞাতা হিসেবে বোঝা হয়। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেত্র হলো যা জানা যায় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো যে জানে। দেহকে আমরা অনুভব করতে পারি, মনকে লক্ষ্য করতে পারি, চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং সুখ ও দুঃখের পরিবর্তনকে উপলব্ধি করতে পারি। ফলে এগুলো সবই কোনো না কোনো অর্থে ক্ষেত্রের অন্তর্গত। কিন্তু যে সত্তা এগুলোকে জানে, তাকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয়।
এই ধারণাটি দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ একটি বাক্যের মধ্যেও দেখা যায়। আমরা বলি আমার শরীর, আমার মন, আমার চিন্তা বা আমার অনুভূতি। এখানে আমার এবং শরীরের মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। আবার যখন আমরা বলি আমার মন আজ অশান্ত, তখন মনকে লক্ষ্য করার একটি সচেতন ক্ষমতার উপস্থিতি বোঝা যায়। মানুষ যখন বলে আমার মধ্যে রাগ এসেছে, তখন রাগ একটি অনুভূতি হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং সেই অনুভূতিকে লক্ষ্য করার ক্ষমতাও রয়েছে। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্ব এই সাধারণ অভিজ্ঞতাকেই আরও গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানে নিয়ে যায়।
এই কারণে সূর্য ও ক্ষেত্রজ্ঞের উপমাটি অত্যন্ত অর্থবহ। সূর্য পৃথিবীর কোনো বস্তুকে সৃষ্টি না করেও তাকে দৃশ্যমান করে। সূর্য পাহাড় সৃষ্টি করে না, নদী সৃষ্টি করে না, গাছ সৃষ্টি করে না, কিন্তু তার আলোয় এগুলো আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়। একইভাবে চেতনা দেহের প্রতিটি পরিবর্তনকে সৃষ্টি করার প্রশ্নের বাইরে গিয়ে সেই পরিবর্তনগুলোকে জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রকাশ করে। আমরা জানি যে শরীরে ব্যথা হচ্ছে। আমরা জানি যে মনে আনন্দ এসেছে। আমরা জানি যে কোনো চিন্তা আমাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। এই জানার ক্ষমতার উপস্থিতিই শ্লোকটির মূল বিষয়।
এখানে প্রকাশ এবং সৃষ্টি এই দুটি ধারণাকে পৃথক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ প্রকাশয়তি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ প্রকাশ করা বা জ্ঞাত করা। তিনি এখানে সৃষ্টির কথা বলেননি। যেমন সূর্যের আলো কোনো বস্তুকে দৃশ্যমান করে কিন্তু সেই বস্তুটি সূর্য সৃষ্টি করেছে এমন নয়, তেমনি চেতনা কোনো অভিজ্ঞতাকে জানার ক্ষেত্রে তাকে প্রকাশ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চেতনার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রকাশকতা। চেতনা নিজে অভিজ্ঞতার কোনো একটি ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সেই বিষয়গুলোকে জানার ক্ষেত্র তৈরি করে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকটির তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত দর্শনে আত্মাকে স্বপ্রকাশ চৈতন্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, কিন্তু এগুলোর পরিবর্তনকে জানার জন্য একটি সচেতন উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। এই দৃষ্টিতে আত্মা কোনো বাহ্যিক আলো দ্বারা প্রকাশিত বস্তু নয়। বরং আত্মার চৈতন্যেই অন্যান্য অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়। সূর্যের সঙ্গে চেতনার উপমা তাই আত্মার প্রকাশক স্বরূপ বোঝাতে অত্যন্ত শক্তিশালী।
সাংখ্য দর্শনের ক্ষেত্রেও ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের ধারণার সঙ্গে পুরুষ ও প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা করা যায়। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ দ্রষ্টা। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্ব এই পরিবর্তনশীল এবং জ্ঞাতার সম্পর্ককে একটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করে। দেহ ও মন পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তাদের পরিবর্তন সম্পর্কে জ্ঞান লাভের ক্ষমতা মানুষের আত্মঅনুসন্ধানের একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি হয়ে ওঠে।
যোগদর্শনের দিক থেকেও এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের মন কখনো শান্ত হয়, কখনো অশান্ত হয়, কখনো আনন্দিত হয়, কখনো বিষণ্ণ হয় এবং কখনো ভয় বা আকাঙ্ক্ষায় আন্দোলিত হয়। কিন্তু মানুষ তার মনের এই পরিবর্তনগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে। ফলে মন নিজেই পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। এই পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা মানুষকে নিজের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম না হয়ে তাকে দেখতে শেখায়। এই অর্থে গীতার ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণা আত্মপর্যবেক্ষণের একটি গভীর পথ উন্মুক্ত করে।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। সূর্য এখানে জ্ঞান ও চেতনার প্রতীক। অন্ধকার যেমন অজ্ঞতার প্রতীক, তেমনি আলো জ্ঞানের প্রতীক। সূর্য যখন উদিত হয় তখন অন্ধকার সরে যায় এবং বস্তুগুলো তাদের প্রকৃত অবস্থায় দৃশ্যমান হয়। একইভাবে জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে মানুষের নিজের দেহ, মন, প্রবৃত্তি, আসক্তি এবং অভিজ্ঞতার প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্টতা বৃদ্ধি পায়। এই কারণে ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে সূর্য বহু সময় জ্ঞান, সত্য ও আত্মপ্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই ধারণাকে একটি সিনেমা হলের উপমা দিয়ে সহজে বোঝা যায়। একটি সিনেমার পর্দায় কখনো আনন্দের দৃশ্য আসে, কখনো দুঃখের দৃশ্য, কখনো যুদ্ধ, কখনো প্রেম, কখনো মৃত্যু। দৃশ্যগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য প্রকাশের জন্য আলো প্রয়োজন। তেমনি মানুষের মনে অসংখ্য চিন্তা ও অনুভূতি আসে এবং চলে যায়। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো রাগ, কখনো ভয়, কখনো আশা এবং কখনো হতাশা মানুষের অন্তর্জগতে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এগুলোকে জানার জন্য সচেতনতার একটি উপস্থিতি অপরিহার্য। এই উপমায় পরিবর্তনশীল দৃশ্যগুলো ক্ষেত্রের সঙ্গে এবং প্রকাশক আলোর ধারণা ক্ষেত্রজ্ঞের সঙ্গে তুলনীয়।
বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার গভীর প্রয়োগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন অপমানিত হন তখন তার মধ্যে রাগের সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণভাবে তিনি বলতে পারেন আমি রাগান্বিত। কিন্তু আরও সূক্ষ্মভাবে তিনি বলতে পারেন আমার মধ্যে রাগের অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে এবং আমি সেই রাগকে লক্ষ্য করছি। এই সামান্য ভাষাগত পার্থক্যের মধ্যে একটি গভীর আত্মসচেতনতার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম অবস্থায় ব্যক্তি নিজের পরিচয়কে রাগের সঙ্গে এক করে ফেলছেন। দ্বিতীয় অবস্থায় তিনি রাগকে একটি পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন। গীতার ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণা মানুষকে নিজের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞাতার দিকে দৃষ্টি ফেরানোর আহ্বান জানায়।
সুখ ও দুঃখের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। আজ যে ব্যক্তি আনন্দিত, আগামীকাল সে দুঃখিত হতে পারে। আজ যে চিন্তা সত্য বলে মনে হচ্ছে, কিছুদিন পর সেটি পরিবর্তিত হতে পারে। দেহও পরিবর্তিত হয়, মনও পরিবর্তিত হয়, সম্পর্কও পরিবর্তিত হয় এবং জীবনও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষ এই পরিবর্তনগুলোর ধারাকে লক্ষ্য করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের ক্ষমতাই তাকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়। আমি কি আমার শরীর, আমি কি আমার মন, আমি কি আমার চিন্তা, নাকি এগুলো সবই আমার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রের অংশ, এই প্রশ্নটি ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করে।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অনন্য। প্রথমে একটি বাহ্যিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এক সূর্য সমগ্র জগতকে প্রকাশ করছে। তারপর সেই দৃশ্যের সঙ্গে মানুষের অন্তর্জগতের একটি সমান্তরাল সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। বাহিরের জগতের প্রকাশক সূর্য এবং অন্তরের অভিজ্ঞতার প্রকাশক ক্ষেত্রজ্ঞ। এর ফলে একটি সুন্দর বাহ্য ও অন্তর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সূর্য আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীকে প্রকাশ করে এবং চেতনা আমাদের অভিজ্ঞতার জগৎকে জ্ঞাত করে। এই কাব্যিক উপমার মধ্য দিয়ে একটি বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা সহজ ও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।
শ্লোকটির আরেকটি গভীর দিক হলো একত্বের ইঙ্গিত। সূর্য এক হলেও তার আলো অসংখ্য বস্তুকে স্পর্শ করে। তেমনি মানুষের অভিজ্ঞতা অসংখ্য হলেও চেতনার আলো সব অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করে। বেদান্তীয় চিন্তায় এই উপমা আরও বিস্তৃত হয়ে জীবনের বহুত্বের অন্তরালে চৈতন্যের ঐক্য সম্পর্কে ভাবতে সাহায্য করে। বিভিন্ন মানুষের দেহ আলাদা, মন আলাদা, অভিজ্ঞতা আলাদা এবং ব্যক্তিত্ব আলাদা হলেও চেতনা সম্পর্কে অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে।
এই কারণে শ্লোকটির প্রকৃত শিক্ষা বাহ্যিক সূর্যের প্রশংসা নয়। এর লক্ষ্য মানুষের দৃষ্টি বাহ্য জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। আমরা সাধারণত যা দেখি তার দিকেই মনোযোগ দিই। কিন্তু গীতা প্রশ্ন করে, যে দেখছে তাকে কি আমরা কখনো দেখেছি। আমরা দেহকে জানি, মনকে জানি, চিন্তাকে জানি এবং অনুভূতিকে জানি। কিন্তু যে জানছে তার প্রকৃতি কী, এই অনুসন্ধানই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা।
সুতরাং এই শ্লোকের সারকথা হলো, সূর্য যেমন তার আলো দিয়ে সমগ্র জগতকে প্রকাশ করে, তেমনি ক্ষেত্রজ্ঞের চৈতন্য দেহ ও মনের সমগ্র ক্ষেত্রকে জ্ঞাত করে। ক্ষেত্র পরিবর্তনশীল, ক্ষেত্রজ্ঞ সেই পরিবর্তনকে জানার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষেত্রের মধ্যে সুখ ও দুঃখ আসে এবং চলে যায়, চিন্তা আসে এবং চলে যায়, দেহ পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলোর সাক্ষীস্বরূপ চেতনার অনুসন্ধান মানুষকে নিজের অস্তিত্বের গভীরতর সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অতএব “যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নং লোকমিমং রবিঃ। ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।। ” এই শ্লোকটি বাহ্যিক সূর্য এবং অন্তরের চেতনার মধ্যে এক অসাধারণ সেতুবন্ধন রচনা করে। সূর্য জগতের দৃশ্যমানতার আলো এবং ক্ষেত্রজ্ঞ অভিজ্ঞতার জ্ঞানের আলো। ক্ষেত্র হলো যা প্রকাশিত হয় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো সেই প্রকাশকে জানে যে চৈতন্য। এই উপলব্ধি মানুষকে নিজের দেহ, মন ও পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্ধভাবে একাত্ম না হয়ে তাদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়। শেষ পর্যন্ত শ্লোকটি আমাদের একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়। যা কিছু আমি দেখতে পারি, অনুভব করতে পারি এবং জানতে পারি, সেগুলো যদি আমার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হয়, তবে যে সত্তা এই সবকিছুকে জানছে তার প্রকৃতি কী। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ তত্ত্বের প্রকৃত গভীরতা নিহিত রয়েছে এই প্রশ্নের মধ্যেই। সূর্য যেমন অন্ধকার দূর করে জগতকে প্রকাশ করে, তেমনি আত্মজ্ঞান মানুষের অন্তরের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে তার নিজের অস্তিত্বের গভীর সত্যকে প্রকাশ করতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!