ভগবদ্গীতা ১৩.৩৫ — জ্ঞানচক্ষুতে ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য ও মুক্তির উপলব্ধি
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা।
ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্।।৩৫।।
অনুবাদঃ যাঁরা এভাবেই জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য জানেন এবং জড়া প্রকৃতির বন্ধন থেকে জীবগণের মুক্ত হওয়ার পন্থা জানেন, তাঁরা পরম গতি লাভ করেন।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকটি মানুষের আত্মপরিচয়, প্রকৃতির স্বরূপ, জ্ঞান এবং মুক্তির এক গভীর সমন্বিত দর্শন তুলে ধরে। শ্লোকটি হলো “ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা। ভূতপ্রকৃতিমোক্ষং চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্।।৩৫।।।” এই শ্লোকের মধ্যে এমন একটি আধ্যাত্মিক সত্য নিহিত আছে যা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর অনুসন্ধানের দ্বার খুলে দেয়। এখানে বলা হয়েছে, যারা জ্ঞানের চক্ষু দিয়ে ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য এবং ভূতসমূহের প্রকৃতি থেকে মুক্তির সত্য উপলব্ধি করতে পারেন, তারাই পরম সত্যে প্রতিষ্ঠিত হন। অর্থাৎ মানুষের মুক্তির মূল রহস্য বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের মধ্যে নয়, বরং নিজের প্রকৃত পরিচয়কে যথার্থভাবে জানার মধ্যে নিহিত।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ক্ষেত্র। সংস্কৃত ক্ষেত্রে শব্দের মূল ভাব হলো এমন একটি স্থান যেখানে কিছু অবস্থান করে, বৃদ্ধি পায় এবং ফল উৎপন্ন করে। সাধারণ অর্থে ক্ষেত্র বলতে জমি বা চাষের স্থান বোঝায়। কৃষক যেমন একটি জমিতে বীজ বপন করেন এবং সেই বীজ থেকে ফল লাভ করেন, তেমনি মানুষের শরীর ও মনও কর্ম, চিন্তা, বাসনা এবং সংস্কারের প্রকাশের ক্ষেত্র। এই কারণেই গীতায় শরীরকে ক্ষেত্র বলা হয়েছে। শরীরের মধ্যে ইন্দ্রিয় কাজ করে, মন চিন্তা করে, বুদ্ধি বিচার করে, অহংকার নিজের পরিচয় নির্মাণ করে এবং কর্মের ফল প্রকাশিত হয়। এই অর্থে ক্ষেত্র শুধু শারীরিক দেহ নয়। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অনুভূতি, বাসনা এবং প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রকাশ মিলিয়ে যে সমগ্র অভিজ্ঞতার জগৎ তৈরি হয় সেটিই ক্ষেত্র।
ক্ষেত্রের বিপরীতে এসেছে ক্ষেত্রজ্ঞ শব্দটি। ক্ষেত্র শব্দের সঙ্গে জ্ঞ শব্দের সংযোগে ক্ষেত্রজ্ঞ গঠিত হয়েছে। জ্ঞ শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। তাই ক্ষেত্রজ্ঞের আক্ষরিক অর্থ হলো যিনি ক্ষেত্রকে জানেন। এই ধারণার মধ্যে গীতার আত্মতত্ত্বের একটি মৌলিক প্রশ্ন নিহিত আছে। আমরা আমাদের শরীরকে দেখি এবং বলি আমার শরীর। আমরা আমাদের মনকে লক্ষ্য করি এবং বলি আমার মন। আমরা আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করি এবং বলি আমার চিন্তা বা আমার অনুভূতি। তাহলে যে শরীরকে দেখা যায়, যে মনকে লক্ষ্য করা যায় এবং যে চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, সেই সবকিছুর জ্ঞাতা কে। গীতার দর্শন এই জ্ঞাতাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ হিসেবে অনুসন্ধান করতে বলে।
ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য বোঝা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেত্র পরিবর্তনশীল, ক্ষেত্রজ্ঞ জ্ঞাতা। শরীর শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। মনও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। আজ যে চিন্তা সত্য বলে মনে হয় কাল তা পরিবর্তিত হতে পারে। আজ যে মানুষ আনন্দিত কাল সে দুঃখিত হতে পারে। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনকে যে সচেতন সত্তা লক্ষ্য করে তার অনুসন্ধান করলে আমরা এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন হই। গীতার শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার জ্ঞাতাকে একই বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা অজ্ঞতার লক্ষণ। ক্ষেত্রকে জানা এবং ক্ষেত্রজ্ঞকে অনুসন্ধান করা আত্মজ্ঞান লাভের অন্যতম প্রধান পথ।
শ্লোকে ব্যবহৃত অন্তরম শব্দটির অর্থ এখানে পার্থক্য বা ভেদ। ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরন্তরম অর্থ হলো ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের মধ্যকার পার্থক্য। এই পার্থক্য বাহ্যিক কোনো বিভাজন নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরতম বিভাজন। মানুষ সাধারণত শরীর, মন, পেশা, সম্পর্ক, সম্পদ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। ফলে জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটলে তার সমগ্র আত্মপরিচয় যেন সংকটে পড়ে। কিন্তু ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য উপলব্ধি হলে মানুষ বুঝতে শুরু করে যে জীবনের পরিবর্তনশীল ঘটনাগুলি তার অভিজ্ঞতার অংশ হলেও সেগুলিই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়।
এই উপলব্ধির জন্য শ্লোকে জ্ঞানচক্ষু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। জ্ঞানচক্ষু অর্থ জ্ঞানের চোখ। এটি কোনো শারীরিক চোখ নয়। সাধারণ চোখ বাহ্যিক রূপ দেখে, কিন্তু জ্ঞানচক্ষু বাস্তবতার অন্তর্নিহিত সত্যকে দেখতে শেখায়। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা শরীরকে দেখি, কিন্তু জ্ঞানচক্ষু শরীরের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি উপলব্ধি করে। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা রাগকে দেখি এবং বলি আমি রাগান্বিত। জ্ঞানচক্ষু বলতে শেখায় যে রাগ একটি মানসিক অবস্থা যা আমার মধ্যে উপস্থিত হয়েছে এবং পরিবর্তিতও হবে। সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ বলে আমি ব্যর্থ। জ্ঞানচক্ষু তাকে বুঝতে শেখায় যে জীবনে একটি ব্যর্থতা ঘটেছে, কিন্তু সেই ব্যর্থতা তার সম্পূর্ণ অস্তিত্বের পরিচয় নয়। এইভাবে জ্ঞানচক্ষু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে।
জ্ঞানচক্ষুর প্রকৃত অর্থ তাই আত্মবিচার এবং বিবেকের জাগরণ। তথ্য জানা এবং জ্ঞান লাভ করা এক বিষয় নয়। কেউ আত্মা সম্পর্কে বহু বই পড়তে পারে এবং আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে অসংখ্য কথা বলতে পারে, কিন্তু তার নিজের জীবন ও আত্মপরিচয়ের মধ্যে যদি সেই জ্ঞানের কোনো পরিবর্তন না আসে তবে সেই জ্ঞান এখনো গভীর উপলব্ধিতে পরিণত হয়নি। জ্ঞানচক্ষু তখনই উন্মুক্ত হয় যখন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে এবং প্রশ্ন করে যে পরিবর্তনশীল শরীর ও মনের অন্তরালে সেই জ্ঞাতা কে।
এরপর আসে ভূতপ্রকৃতিমোক্ষ শব্দটি। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। ভূত বলতে তাই যা অস্তিত্ব লাভ করেছে বা প্রকাশিত হয়েছে তাকে বোঝানো যায়। প্রকৃতি শব্দটি প্র এবং কৃ এর সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃ ধাতুর মূল অর্থ করা, গঠন করা বা সৃষ্টি করা। প্রকৃতি বলতে সেই মূল প্রকৃতিগত শক্তিকে বোঝায় যার মাধ্যমে জগতের বিভিন্ন প্রকাশ ঘটে। গীতার দর্শনে শরীর, মন, ইন্দ্রিয় এবং জগতের পরিবর্তনশীল উপাদান প্রকৃতির অন্তর্গত। প্রকৃতি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং তার মধ্যেই সমস্ত প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে।
মোক্ষ শব্দটি সংস্কৃত মুচ্ ধাতু থেকে সম্পর্কিত। মুচ্ এর অর্থ মুক্ত করা বা বন্ধন থেকে ছেড়ে দেওয়া। তাই মোক্ষের মূল অর্থ হলো বন্ধন থেকে মুক্তি। ভূতপ্রকৃতিমোক্ষ বলতে এই প্রকাশিত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে বন্ধন এবং ভুল আত্মপরিচয় সৃষ্টি হয় তা থেকে মুক্তির সত্যকে বোঝানো যায়। এখানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার কথা বলা হয়নি। বরং প্রকৃতির পরিবর্তনশীল উপাদানকে নিজের চূড়ান্ত আত্মপরিচয় বলে গ্রহণ করার অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মানুষের দুঃখের একটি বড় কারণ হলো সে নিজের পরিচয়কে পরিবর্তনশীল বিষয়ের সঙ্গে এক করে ফেলে। সে বলে আমি শরীর, আমি ধনী, আমি দরিদ্র, আমি সফল, আমি ব্যর্থ, আমি সম্মানিত, আমি অপমানিত। কিন্তু এসব পরিচয় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। শরীর পরিবর্তিত হয়, সম্পদ পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং মানসিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। তবু মানুষ এই পরিবর্তনশীল বিষয়গুলিকে নিজের স্থায়ী পরিচয় মনে করে। গীতার জ্ঞানচক্ষু এই ভুল পরিচয়ের উপর প্রশ্ন তোলে এবং মানুষকে তার গভীরতর সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই শিক্ষা আরও স্পষ্ট হয়। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ দ্রষ্টা। প্রকৃতির মধ্যে বিকাশ ও পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু পুরুষ তার জ্ঞাতা। মানুষের বন্ধনের একটি কারণ হলো পুরুষ ও প্রকৃতির স্বরূপগত পার্থক্য না বোঝা। যখন যথার্থ বিবেক উদিত হয় তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং চৈতন্যস্বরূপ দ্রষ্টা এক জিনিস নয়। এই উপলব্ধিই মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ক্ষেত্রকে শরীর, মন, বুদ্ধি এবং সমস্ত অনাত্ম উপাদানের সমষ্টি হিসেবে দেখা যায়। এগুলি সবই জ্ঞাতব্য। ক্ষেত্রজ্ঞ হলো চৈতন্য, যার উপস্থিতিতে এগুলি জানা যায়। এই অনুসন্ধান মানুষকে ধীরে ধীরে বুঝতে সাহায্য করে যে শরীর পরিবর্তিত হলেও তার জ্ঞাতা আছে, মন পরিবর্তিত হলেও তার জ্ঞাতা আছে এবং চিন্তা পরিবর্তিত হলেও তার জ্ঞাতা আছে। অদ্বৈত দর্শনের গভীর অনুসন্ধানে এই চৈতন্যই আত্মা এবং আত্মার পরম সত্যের সঙ্গে অভেদ উপলব্ধি মুক্তির চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
যোগদর্শনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক দেখা যায়। মন ক্রমাগত নানা চিন্তা, অনুভূতি এবং প্রবৃত্তির দ্বারা পরিবর্তিত হয়। মানুষ যখন নিজের চৈতন্যকে এই পরিবর্তনশীল মানসিক প্রবাহের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে ফেলে তখন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সে নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে তখন দ্রষ্টা এবং মানসিক প্রবাহের মধ্যে একটি পার্থক্য স্পষ্ট হয়। এই সচেতনতা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি বৃদ্ধি করে এবং আত্মপরিচয়ের গভীরে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত শক্তিশালী। ক্ষেত্র মানুষের সমগ্র জীবনকে একটি জমির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। জীবনের জমিতে মানুষ প্রতিদিন চিন্তা ও কর্মের বীজ বপন করে। ভালো চিন্তা ও সৎ কর্ম এক ধরনের ফল দেয় এবং নেতিবাচক প্রবৃত্তি অন্য ধরনের ফল দেয়। এই অর্থে মানুষ নিজের জীবনের কৃষকও বটে এবং নিজের ক্ষেত্রের ফলভোগীও বটে। ক্ষেত্রজ্ঞ সেই গভীর সচেতন সত্তার প্রতীক যে এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে জানতে পারে। জ্ঞানচক্ষু হলো সেই অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক যার মাধ্যমে মানুষ বাহ্যিক পরিবর্তনের আড়ালে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করে। মোক্ষ হলো সেই বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতীক যা ভুল আত্মপরিচয়ের কারণে সৃষ্টি হয়।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ চাকরিতে ব্যর্থ হয়ে মনে করল আমি ব্যর্থ মানুষ। এখানে একটি ঘটনা এবং নিজের অস্তিত্বকে সে এক করে ফেলেছে। কিন্তু যদি সে জ্ঞানচক্ষুর দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখে তাহলে বলতে পারে আমার কর্মজীবনে একটি ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতা আমার জীবনের একটি ঘটনা, কিন্তু আমার সমগ্র অস্তিত্বের পরিচয় নয়। এই সামান্য পরিবর্তন মানুষের মানসিক অবস্থায় গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ তখন সে ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করছে, ঘটনায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে না। ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্যের একটি ব্যবহারিক দিক এখানে বোঝা যায়।
আরেকটি উদাহরণ হতে পারে রাগ। কেউ অপমানিত হয়ে বলল আমি রাগ। কিন্তু একটু সচেতন হলে সে বলতে পারে আমার মধ্যে রাগের অনুভূতি উঠেছে। এখানে আমি এবং রাগের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সেই দূরত্ব উদাসীনতা নয়, বরং সচেতনতা। মানুষ রাগকে অস্বীকার করছে না, কিন্তু রাগকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয়ও বানাচ্ছে না। এই সচেতন পর্যবেক্ষণই জ্ঞানচক্ষুর প্রাথমিক অনুশীলনের সঙ্গে তুলনীয়।
শ্লোকটির শেষ অংশে বলা হয়েছে যে যারা এই সত্যকে জানেন তারা পরমে গমন করেন। যান্তি শব্দের অর্থ গমন করা এবং পরম অর্থ সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত সত্য। এখানে পরমে গমনকে কেবল কোনো স্থান পরিবর্তন হিসেবে বোঝা উচিত নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি চেতনার উত্তরণ। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, ভুল আত্মপরিচয় থেকে সত্য আত্মপরিচয়ে, প্রকৃতির সঙ্গে অন্ধ আসক্তি থেকে স্বাধীনতায় এবং সীমাবদ্ধ পরিচয় থেকে পরম সত্যের উপলব্ধিতে উত্তরণই এখানে পরমে গমন।
এই কারণে শ্লোকটির শেষ শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষ যতক্ষণ নিজের পরিচয়কে কেবল শরীর, মন, কর্ম, সম্পর্ক এবং বাহ্যিক পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে ততক্ষণ তার সুখ ও দুঃখও এসব পরিবর্তনের সঙ্গে ওঠানামা করে। কিন্তু যখন সে ক্ষেত্রকে ক্ষেত্র হিসেবে এবং ক্ষেত্রজ্ঞকে ক্ষেত্রজ্ঞ হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করে তখন তার আত্মপরিচয় গভীরতর হয়। সে বুঝতে শেখে যে জীবনের অভিজ্ঞতাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলিই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। এই উপলব্ধি তাকে অন্তর্দৃষ্টি, সমতা এবং মুক্তির পথে নিয়ে যেতে পারে।
সমগ্র শ্লোকটি তাই মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। আমি যা দেখি আমি কি কেবল তাই, নাকি যে দেখে তার মধ্যে আরও গভীর কোনো সত্য আছে। আমার শরীর পরিবর্তিত হচ্ছে, মন পরিবর্তিত হচ্ছে, চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে, অনুভূতি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জীবনও পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনকে যে সচেতনতা জানছে তাকে অনুসন্ধান করা মানেই ক্ষেত্রজ্ঞের অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের জন্যই প্রয়োজন জ্ঞানচক্ষু। জ্ঞানচক্ষু জাগ্রত হলে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রকাশের সঙ্গে তার পরিচয় থাকলেও তার সত্যস্বরূপকে কেবল সেই পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার এক গভীর সারসংক্ষেপ। ক্ষেত্র আমাদের পরিবর্তনশীল জীবন, ক্ষেত্রজ্ঞ আমাদের জ্ঞাতা সত্তা, অন্তর তাদের প্রকৃত পার্থক্য, জ্ঞানচক্ষু সেই পার্থক্য উপলব্ধির অন্তর্দৃষ্টি, ভূতপ্রকৃতিমোক্ষ হলো প্রকৃতির বন্ধন ও ভুল আত্মপরিচয় থেকে মুক্তি এবং পরম হলো সেই চূড়ান্ত সত্য যার উপলব্ধিতে জীবনের অনুসন্ধান পূর্ণতা লাভ করে। তাই এই শ্লোকের মূল আহ্বান বাহ্যিক জগতকে ত্যাগ করা নয়, বরং তাকে যথার্থভাবে জেনে নিজের প্রকৃত পরিচয়কে আবিষ্কার করা। মানুষ যখন বুঝতে শেখে যে শরীর তার ক্ষেত্র, মন তার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র, প্রকৃতি তার প্রকাশের ক্ষেত্র এবং সে সেই ক্ষেত্রের জ্ঞাতাকে অনুসন্ধান করতে পারে, তখন তার জীবনে এক নতুন মাত্রার সচেতনতা জন্ম নেয়। সেই সচেতনতার পরিণতিই মুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া। এই অর্থে শ্লোকটির গভীরতম বার্তা হলো নিজের মধ্যে সেই জ্ঞানচক্ষু জাগ্রত করা, যা পরিবর্তনের মধ্যে স্থায়ী সত্যকে দেখতে পারে এবং মানুষকে অজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!