ভগবদ্গীতা ১৩.৪ — ক্ষেত্রের স্বরূপ, বিকার, উৎপত্তি ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রভাব
তৎ ক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্ চ যুদ্ধিকারি যতশ্চ যৎ।
স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।।৪।।
অনুবাদঃ সেই ক্ষেত্র কি, তার কি প্রকার, তার বিকার কি, তা কার থেকে উৎপন্ন হয়েছে, সেই ক্ষেত্রজ্ঞের স্বরূপ কি এবং তার প্রভাব কি, সেই সব সংক্ষেপে আমার কাছে শ্রবণ কর।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকটি মানুষের আত্মপরিচয়, দেহ, মন, প্রকৃতি এবং চৈতন্য সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানের সূচনা করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে বলছেন যে ক্ষেত্র কী, তার প্রকৃতি কেমন, তার কী কী পরিবর্তন ঘটে, কোন কারণ থেকে কী উৎপন্ন হয়, সেই ক্ষেত্রজ্ঞ কে এবং তাঁর প্রভাব বা শক্তি কী, তা তিনি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন। শ্লোকটি হলো “তৎক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্ চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ। স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।” এই শ্লোকের মধ্যে বাহ্যিক দেহ থেকে অন্তর্গত চৈতন্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি সম্পূর্ণ জ্ঞানযাত্রা নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ক্ষেত্র। সংস্কৃত ক্ষেত্রে শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো জমি, ভূমি বা চাষের স্থান। যে জমিতে বীজ বপন করা হয়, পরিচর্যা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার ফল পাওয়া যায়, সেটিই ক্ষেত্র। শ্রীকৃষ্ণ দেহকে ক্ষেত্র বলে অভিহিত করেছেন কারণ দেহ কেবল একটি জৈবিক কাঠামো নয়, এটি মানুষের কর্ম, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং জীবনের প্রকাশের ক্ষেত্র। মানুষের সমস্ত কর্ম এই দেহের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ জগতকে অনুভব করে, মনের মাধ্যমে চিন্তা করে, বুদ্ধির মাধ্যমে বিচার করে এবং কর্মের মাধ্যমে নিজের জীবনের ফল সৃষ্টি করে। সেই অর্থে দেহ একটি জীবন্ত ক্ষেত্র, যেখানে কর্মের বীজ বপন হয় এবং অভিজ্ঞতার ফল জন্ম নেয়।
ক্ষেত্র শব্দটির এই কৃষিভিত্তিক প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গভীর। একটি জমিতে যে বীজ বপন করা হয়, তার ওপর ভবিষ্যতের ফসল নির্ভর করে। মানুষের জীবনেও একইভাবে চিন্তা, ইচ্ছা, কর্ম ও অভ্যাস ভবিষ্যৎ অভিজ্ঞতার রূপ তৈরি করে। মনে যদি ক্রোধ, লোভ ও হিংসার বীজ বারবার বপন করা হয়, তবে তার ফল হিসেবে অশান্তি ও দুঃখ জন্ম নিতে পারে। আবার জ্ঞান, সংযম, সত্য, করুণা ও প্রেমের বীজ বপন করলে জীবনে ভিন্ন ধরনের ফল প্রকাশিত হয়। তাই ক্ষেত্র কেবল দেহ নয়, মানুষের সমগ্র অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হিসেবেও বোঝা যায়।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন যাদৃক্ অর্থাৎ ক্ষেত্রটি কেমন। এখানে শুধু ক্ষেত্রের নাম জানা যথেষ্ট নয়। তার প্রকৃতি বুঝতে হবে। একটি বস্তু কী এবং সেটি কেমন, এই দুটি প্রশ্ন এক নয়। ক্ষেত্রের প্রকৃতি বোঝার অর্থ হলো তার গঠন, কার্যপ্রণালী এবং পরিবর্তনশীলতার স্বরূপ উপলব্ধি করা। দেহ জন্মগ্রহণ করে, বৃদ্ধি পায়, পরিবর্তিত হয়, বার্ধক্যের দিকে যায় এবং একসময় বিলীন হয়। মনও একইভাবে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। কখনও আনন্দ, কখনও দুঃখ, কখনও আশা, কখনও হতাশা, কখনও আকাঙ্ক্ষা এবং কখনও বিরাগ মানুষের মানসিক ক্ষেত্রে উদ্ভূত হয়। এই পরিবর্তনশীলতার কারণেই ক্ষেত্রকে স্থায়ী আত্মসত্তা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো যদ্বিকারি। বিকার শব্দটি সংস্কৃত বিকার থেকে এসেছে। এর মধ্যে পরিবর্তন, রূপান্তর বা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমনের ধারণা রয়েছে। বিকার মানেই শুধু খারাপ কিছু নয়। যে কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তরকে বিকার বলা যায়। শিশুর শরীর যখন ধীরে ধীরে কিশোরের শরীরে এবং পরে প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে পরিবর্তিত হয়, তখন সেখানে বিকার ঘটছে। মানুষের চিন্তাধারা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, দেহ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক পরিচয় পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ ক্ষেত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো পরিবর্তনশীলতা।
এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যে একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসা নিহিত আছে। শৈশবের শরীর আর বর্তমানের শরীর এক নয়। বহু বছর আগে যে চিন্তা ছিল, আজ তা নেই। পুরোনো অনুভূতি পরিবর্তিত হয়েছে, স্মৃতি বদলেছে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তবু মানুষ বলে যে সে একই ব্যক্তি। তাহলে যে দেহ পরিবর্তিত হয়েছে, যে মন পরিবর্তিত হয়েছে এবং যে চিন্তা পরিবর্তিত হয়েছে, সেই পরিবর্তনকে যে জানছে সে কে। এখানেই ক্ষেত্রের পাশাপাশি ক্ষেত্রজ্ঞের প্রশ্ন উঠে আসে।
শ্লোকে যতশ্চ যৎ অংশের মাধ্যমে কারণ ও কার্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করা হয়েছে। যতঃ অর্থ হলো যেখান থেকে, যে উৎস থেকে অথবা যে কারণ থেকে। যৎ অর্থ হলো যা বা যে ফল। অর্থাৎ কৃষ্ণ শুধু ক্ষেত্রের বাহ্যিক পরিচয় দিতে চান না, তিনি জানতে বলছেন কোন কারণ থেকে কী উৎপন্ন হয়। এই প্রশ্ন ভারতীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন। জগতের কোনো ঘটনা কারণহীন নয়। মানুষের আচরণ, চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। এই কারণ ও কার্য সম্পর্ককে বুঝতে পারলে মানুষ নিজের জীবন ও আচরণের গভীরতর কাঠামো উপলব্ধি করতে পারে।
এরপর শ্লোকটি আরও গভীর স্তরে প্রবেশ করে। বলা হয় স চ যো অর্থাৎ সেই ক্ষেত্রজ্ঞ কে। এখানে আলোচনার কেন্দ্র দেহ থেকে জ্ঞাতার দিকে চলে যায়। ক্ষেত্র হলো যা জানা যায়, আর ক্ষেত্রজ্ঞ হলো যিনি জানেন। শরীরকে আমরা জানতে পারি, মনের পরিবর্তনকে লক্ষ্য করতে পারি, চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু যে সত্তা এসবকে জানে, তার প্রকৃতি কী, এই প্রশ্নই গীতার আত্মতত্ত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। ক্ষেত্র পরিবর্তনশীল, কিন্তু ক্ষেত্রজ্ঞ হলো সেই জ্ঞাতা যিনি পরিবর্তনকে উপলব্ধি করেন। শরীরের পরিবর্তন আমরা জানি। মনের পরিবর্তনও জানি। চিন্তার পরিবর্তনও লক্ষ্য করি। সুতরাং প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনগুলোর জ্ঞাতা কি নিজেও সেই একইভাবে পরিবর্তনশীল। এই অনুসন্ধান মানুষকে বাহ্যিক পরিচয় থেকে অন্তর্গত আত্মপরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।
শ্লোকের যৎপ্রভাবশ্চ শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রভাব শব্দের অর্থ শুধু সাধারণ অর্থে প্রভাব বিস্তার নয়। এর মধ্যে শক্তি, ক্ষমতা, কার্যক্ষমতা, প্রকাশশক্তি এবং স্বাভাবিক সামর্থ্যের ধারণা রয়েছে। তাই যৎপ্রভাবশ্চ বলতে ক্ষেত্রজ্ঞের প্রকৃত শক্তি বা প্রভাব কী, সেই প্রশ্নকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ শুধু ক্ষেত্রজ্ঞ কে তা জানতে বলছেন না, সেই জ্ঞাতার প্রকৃতি ও শক্তির প্রকাশ কী তাও উপলব্ধি করতে বলছেন।
শেষে বলা হয়েছে তৎ সমাসেন মে শৃণু। এখানে সমাসেন অর্থ হলো সংক্ষেপে বা সাররূপে। সমাস শব্দের মধ্যেই বহু বিষয়কে একত্র করে সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করার ধারণা রয়েছে। কৃষ্ণ বলছেন যে এই বিস্তৃত বিষয় তিনি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন। আর মে শৃণু অর্থ হলো আমার কাছ থেকে শোনো। এখানে শৃণু শব্দটি সংস্কৃত শৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ শোনা। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রবণের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভারতীয় দর্শনে শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনকে জ্ঞান উপলব্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়। প্রথমে সত্যকে শুনতে হয়, তারপর তা নিয়ে চিন্তা করতে হয় এবং শেষে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক সাংখ্য ও বেদান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণার মধ্যেও পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং জ্ঞাতা চৈতন্যের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য প্রকাশ পায়। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই অনুসন্ধান আরও গভীর হয়ে আত্মার প্রকৃতি এবং চৈতন্যের স্বরূপের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ যখন উপলব্ধি করতে শুরু করে যে দেহ তার জানা বিষয়, মনও জানা বিষয় এবং চিন্তাও জানা বিষয়, তখন সে প্রশ্ন করতে বাধ্য হয় যে এই সমস্ত জানা বিষয়ের জ্ঞাতা কে।
ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। ব্যক্তিগত জীবসত্তা ক্ষেত্রজ্ঞ হিসেবে দেহ ও অভিজ্ঞতাকে জানে। কিন্তু গীতার পরবর্তী আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেকেও সমস্ত ক্ষেত্রের পরম জ্ঞাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর ফলে জীব, ক্ষেত্র এবং ঈশ্বরের সম্পর্ক নিয়ে একটি গভীর তত্ত্ব সামনে আসে। মানুষ নিজের ব্যক্তিগত চৈতন্যকে উপলব্ধি করতে করতে সর্বব্যাপী চৈতন্যের প্রশ্নের দিকে অগ্রসর হয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ প্রায়ই বলে আমি রাগান্বিত, আমি দুঃখিত অথবা আমি ভীত। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায় আমার মধ্যে রাগের অনুভূতি উঠেছে, আমার মধ্যে দুঃখের অনুভূতি এসেছে অথবা আমি ভয়ের অনুভূতিকে লক্ষ্য করছি। এই ভাষাগত পার্থক্যের মধ্যেই একটি গভীর আত্মপর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। অনুভূতি ও অনুভূতির জ্ঞাতাকে এক করে না দেখলে মানুষ নিজের মানসিক অবস্থার প্রতি আরও সচেতন হতে পারে। গীতার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ ধারণা এই আত্মপর্যবেক্ষণকে আরও গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে রূপ দেয়।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। কয়েকটি শব্দের মধ্যে কৃষ্ণ একের পর এক মৌলিক প্রশ্ন সাজিয়েছেন। ক্ষেত্র কী, ক্ষেত্রটি কেমন, তার কী পরিবর্তন ঘটে, তার কারণ কী, ক্ষেত্রজ্ঞ কে এবং তাঁর শক্তি কী। প্রশ্নগুলো যেন বাহ্যিক জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। প্রথমে জানা হয় যা দেখা যায়, তারপর তার পরিবর্তনের প্রকৃতি অনুসন্ধান করা হয়, এরপর কারণ অনুসন্ধান করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই জ্ঞাতার সন্ধান করা হয় যিনি সবকিছুকে জানেন। ফলে শ্লোকটি নিজেই একটি আত্মজ্ঞানমুখী যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন কৃষকের একটি জমি আছে। জমিতে বীজ বপন করা হয়, গাছ জন্মায়, ফল হয় এবং সময়ের সঙ্গে জমির চেহারা পরিবর্তিত হয়। কিন্তু জমি আর কৃষক এক নয়। কৃষক জমিকে জানেন এবং তার ওপর কাজ করেন। একইভাবে মানুষের দেহ ও মন একটি ক্ষেত্রের মতো, যেখানে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয় এবং অনুভূতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে সত্তা এই পরিবর্তনগুলোকে জানতে পারে, তাকে নিয়ে প্রশ্ন করাই ক্ষেত্রজ্ঞের অনুসন্ধান।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের পরিচয় নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করতে শেখানো। আমরা সাধারণত নিজেদের শরীর, নাম, পরিচয়, পেশা, সম্পর্ক, চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম করে দেখি। কিন্তু গীতা আমাদের আরও গভীরে যেতে বলে। যা কিছু পরিবর্তিত হচ্ছে তা ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। আর যে পরিবর্তনকে আমরা জানছি, সেই জ্ঞাতার প্রকৃতি অনুসন্ধান করাই আত্মজ্ঞান। এই অনুসন্ধান মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
সুতরাং তৎক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্ চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ শ্লোকটি কেবল দেহ সম্পর্কে কোনো সাধারণ বক্তব্য নয়। এটি মানুষকে একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মজিজ্ঞাসার পথে আহ্বান জানায়। ক্ষেত্র হলো পরিবর্তনশীল দেহ, মন ও প্রকৃতির প্রকাশক্ষেত্র। বিকার হলো সেই ক্ষেত্রের অবিরাম পরিবর্তন। যতঃ এবং যৎ আমাদের কারণ ও কার্য অনুসন্ধান করতে শেখায়। আর স চ যো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় জ্ঞাতার প্রশ্নের দিকে। যৎপ্রভাবশ্চ সেই জ্ঞাতার শক্তি ও প্রকাশের অনুসন্ধানকে সামনে আনে। শেষে সমাসেন মে শৃণু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই বিশাল তত্ত্বকে প্রথমে শ্রবণ করতে হবে, তারপর চিন্তা করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে উপলব্ধি করতে হবে।
এই শ্লোকের সারমর্ম তাই এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসায় এসে মিলিত হয়। যা কিছু আমরা দেখতে পারি, অনুভব করতে পারি এবং জানতে পারি তা যদি ক্ষেত্র হয়, তবে যে সত্তা সেই সমস্ত কিছুকে জানে সে কে। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের সাক্ষীস্বরূপ যে জ্ঞাতাকে আমরা অনুসন্ধান করি, তার প্রকৃতি উপলব্ধি করাই গীতার আত্মজ্ঞানমুখী শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই কারণে শ্লোকটি বাহ্যিক জগতের পরিচয় থেকে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি যা জানি তা কী, এবং যে আমি জানি সেই আমি কে। এই প্রশ্নের গভীর অনুসন্ধানই ক্ষেত্র থেকে ক্ষেত্রজ্ঞের দিকে, পরিবর্তন থেকে চৈতন্যের দিকে এবং বাহ্যিক পরিচয় থেকে আত্মস্বরূপের দিকে মানুষের প্রকৃত যাত্রা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!