ভগবদ্গীতা ১৩.৭ — ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ ও চেতনার পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র
ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ।
এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্।।৭।।
অনুবাদঃ পঞ্চ-মহাভূত, অহঙ্কার, বুদ্ধি, অব্যক্ত, দশ ইন্দ্রিয় ও মন, ইন্দ্রিয়ের পাঁচটি বিষয়, ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত অর্থাৎ পঞ্চ মহাভূতের পরিণামরূপ দেহ, চেতনা ও ধৃতি- এই সমস্ত বিকারযুক্ত ক্ষেত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হল।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের দেহ, মন, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার জগতকে কয়েকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ। এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্। এই শ্লোকে ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা এবং ধৃতি এই সাতটি ধারণাকে ক্ষেত্রের অন্তর্গত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে ক্ষেত্র বলতে কেবল বাহ্যিক শরীরকে বোঝানো হয়নি। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, বিরাগ, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক প্রবণতার যে পরিবর্তনশীল সমষ্টি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জগৎ তৈরি করে, সেই বিস্তৃত ক্ষেত্রকেই এখানে ক্ষেত্র বলা হয়েছে। এই কারণে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় বক্তব্য নয়, মানুষের অস্তিত্ব, মনস্তত্ত্ব এবং আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানের সূচনা করে।
ইচ্ছা শব্দের মূল সংস্কৃত ধারণার সঙ্গে চাওয়া, কামনা করা এবং কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষিত হওয়ার অর্থ যুক্ত। মানুষের জীবনের প্রায় সমস্ত কর্মের পেছনে কোনো না কোনো ইচ্ছা কাজ করে। মানুষ কিছু পেতে চায়, কিছু হতে চায়, কিছু জানতে চায় অথবা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় পৌঁছাতে চায়। ইচ্ছা মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে পরিচালিত করে এবং বর্তমান অবস্থা ও কাঙ্ক্ষিত অবস্থার মধ্যে একটি মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। এই দূরত্ব পূরণ করার আকাঙ্ক্ষাই ইচ্ছার গভীরতম রূপ। তাই ইচ্ছা একদিকে সৃষ্টিশীল শক্তি, অন্যদিকে অতিরিক্ত আসক্তির কারণও হতে পারে। ইচ্ছা যখন বিবেচনা ও কর্তব্যের অধীন থাকে তখন তা উন্নতির প্রেরণা হয়ে ওঠে। কিন্তু ইচ্ছাই যখন মানুষের চেতনার ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তখন মানুষ নিজের শান্তি ও স্বাধীনতা হারাতে পারে।
ইচ্ছার বিপরীতমুখী শক্তি হলো দ্বেষ। দ্বেষ শব্দের সঙ্গে ঘৃণা, বিরাগ, অপছন্দ এবং কোনো কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতা যুক্ত। মানুষ যেমন কোনো কিছুকে নিজের কাছে টেনে নিতে চায়, তেমনি কোনো কিছুকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণ মানুষের মানসিক জীবনের দুটি মৌলিক প্রবাহ। আমি যা চাই তা আমার কাছে আকর্ষণীয় এবং যা চাই না তা আমার কাছে বিরূপ হয়ে ওঠে। ফলে ইচ্ছা ও দ্বেষকে পাশাপাশি রাখলে মানুষের মন কীভাবে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তার একটি মৌলিক চিত্র পাওয়া যায়। ইচ্ছা বলে এটি আমার কাছে আসুক এবং দ্বেষ বলে এটি আমার কাছ থেকে দূরে থাকুক। এই দুই প্রবণতার মধ্যেই মানুষের বহু আনন্দ, অশান্তি, আশা এবং হতাশার জন্ম হয়।
সুখ শব্দটি মানুষের অনুকূল ও আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতার প্রকাশ। সংস্কৃত সুখ শব্দের ঐতিহ্যগত ব্যুৎপত্তিতে সু এবং খ এই দুটি অংশের কথা বলা হয়। সু অর্থ ভালো বা অনুকূল এবং খ অর্থ অবকাশ বা স্থান। ঐতিহ্যগতভাবে সুখকে এমন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যেখানে অভিজ্ঞতার প্রবাহ স্বাভাবিক ও অনুকূল। তবে গীতার দৃষ্টিতে সুখকে কেবল বাহ্যিক আনন্দ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না। সুখ হলো এমন এক মানসিক অভিজ্ঞতা যেখানে কোনো বিষয়কে মন অনুকূল বলে গ্রহণ করে। কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে মানুষ আনন্দ অনুভব করে এবং সেই আনন্দকে সুখ বলে অভিহিত করে। কিন্তু যেহেতু আকাঙ্ক্ষা পরিবর্তনশীল, তাই সুখও পরিবর্তনশীল। যে বস্তু এক সময় সুখের কারণ ছিল, অন্য সময় সেটিই বিরক্তির কারণ হতে পারে।
সুখের বিপরীত হলো দুঃখ। দুঃখ শব্দের সঙ্গে কষ্ট, যন্ত্রণা, বেদনা, অস্বস্তি এবং মানসিক প্রতিকূলতার ধারণা যুক্ত। ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় দুঃখকে এমন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যেখানে অভিজ্ঞতার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত বা প্রতিকূল। মানুষের দুঃখ শুধু শরীরের ব্যথা নয়। প্রিয়জনকে হারানো, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, অপমান, ব্যর্থতা, বিচ্ছেদ, ভয় এবং অনিশ্চয়তাও দুঃখের কারণ হতে পারে। একই ঘটনা একজন মানুষের কাছে আনন্দের এবং অন্য মানুষের কাছে দুঃখের কারণ হতে পারে। এর কারণ সুখ ও দুঃখ কেবল বাহ্যিক ঘটনার ওপর নির্ভর করে না, বরং মানুষের মানসিক মূল্যায়ন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই দৃষ্টিতে সুখ ও দুঃখ উভয়ই ক্ষেত্রের পরিবর্তনশীল অবস্থা।
এরপর আসে সংঘাত শব্দটি। সংঘাত অর্থ সমষ্টি, সংযোগ, সমাহার বা বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলিত গঠন। গীতার এই প্রসঙ্গে সংঘাত বলতে দেহের বিভিন্ন উপাদান এবং দেহের সঙ্গে যুক্ত মানসিক ও ইন্দ্রিয়গত কার্যপ্রক্রিয়ার সমন্বিত সংগঠন বোঝানো হয়। মানুষের শরীর কোনো একক বিচ্ছিন্ন উপাদান নয়। শরীর, ইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক, মন এবং বিভিন্ন কার্যপ্রক্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি জটিল ব্যবস্থা তৈরি করে। এই সম্মিলিত গঠনই মানুষের অভিজ্ঞতার বাহন। তাই সংঘাত শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষকে কেবল একটি শরীর অথবা কেবল একটি মন হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ অস্তিত্ব বোঝা যায় না। মানুষের ব্যক্তিত্ব একটি বহুস্তরীয় সমন্বিত ব্যবস্থা।
চেতনা শব্দটির উৎস সংস্কৃত চিত্ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা, সচেতন হওয়া এবং চিনতে পারা। চেতনা হলো সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ নিজের এবং চারপাশের জগতের অভিজ্ঞতা লাভ করে। আমরা দেখি, শুনি, অনুভব করি, চিন্তা করি, স্মরণ করি এবং নিজের মানসিক অবস্থাকেও লক্ষ্য করতে পারি। এই সমস্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে চেতনার প্রকাশ ঘটে। তবে গীতার দর্শনে চেতনা এবং আত্মাকে সম্পূর্ণ অভিন্ন ধরে নেওয়া উচিত নয়। ত্রয়োদশ অধ্যায়ের বৃহত্তর আলোচনায় ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষেত্র হলো যা জানা যায় এবং ক্ষেত্রজ্ঞ হলো যে ক্ষেত্রকে জানে। এই পার্থক্যটি গীতার আত্মদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ধৃতি শব্দের মূল সংস্কৃত ধৃ ধাতু, যার অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা, বহন করা এবং স্থির রাখা। সেই অর্থে ধৃতি হলো মানুষের ধারণশক্তি, ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সংকল্প ধরে রাখার ক্ষমতা। জীবনে ইচ্ছা মানুষকে একদিকে টানে এবং দ্বেষ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। সুখ মানুষকে আকর্ষণ করে এবং দুঃখ তাকে দুর্বল করতে পারে। এই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার মধ্যে যে শক্তি মানুষকে নিজের কর্তব্য, লক্ষ্য এবং নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করে সেটিই ধৃতি। ধৃতি তাই শুধু ধৈর্য নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত স্থিতিশীলতার শক্তি। একজন মানুষ ব্যর্থতার পরেও চেষ্টা চালিয়ে যায়, বিপদের মধ্যেও কর্তব্য পালন করে এবং আবেগের প্রবল প্রবাহের মধ্যেও নিজের বিবেককে ধরে রাখে, তখন তার মধ্যে ধৃতির প্রকাশ ঘটে।
এই সাতটি শব্দকে পৃথকভাবে দেখলে তাদের অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু একসঙ্গে দেখলে মানুষের সমগ্র মানসিক অভিজ্ঞতার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ইচ্ছা মানুষকে কোনো কিছুর দিকে আকর্ষণ করে এবং দ্বেষ কোনো কিছুর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে সুখ আসে এবং আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হলে দুঃখ দেখা দিতে পারে। এই সমস্ত অভিজ্ঞতা দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন নামক সংঘাতের মধ্যে ঘটে এবং চেতনার মাধ্যমে অনুভূত হয়। এরপর ধৃতি মানুষকে সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে স্থির থাকতে অথবা তার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে। এইভাবে শ্লোকটি মানুষের অভিজ্ঞতাকে একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এখানে ক্ষেত্র শব্দটির তাৎপর্য বিশেষভাবে গভীর। কৃষকের জন্য ক্ষেত্র হলো এমন একটি ভূমি যেখানে বীজ বপন করা হয় এবং যার ফল পরে প্রকাশ পায়। একইভাবে মানুষের দেহ ও মনও এক অর্থে একটি ক্ষেত্র। চিন্তা, কর্ম, অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক প্রবণতার বীজ এখানে বপন হয় এবং তার ফল মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রকাশ পায়। এই ক্ষেত্র পরিবর্তনশীল। শরীর পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, ইচ্ছা পরিবর্তিত হয়, সুখ ও দুঃখ পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের মানসিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। তাই শ্লোকে সবিকার শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সবিকার অর্থ বিকার বা পরিবর্তনসহ। অর্থাৎ ক্ষেত্র স্থির ও অপরিবর্তনীয় নয়। এটি সর্বদা পরিবর্তনের মধ্যে অবস্থান করে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য প্রকাশ পায় যখন ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের পার্থক্য নিয়ে চিন্তা করা হয়। মানুষ সাধারণত নিজের শরীর, মন, অনুভূতি এবং চিন্তার সঙ্গে নিজের পরিচয়কে সম্পূর্ণ এক করে দেখে। আমরা বলি আমি দুঃখী, আমি সুখী, আমি রাগ করেছি, আমি চাই, আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু গভীর আত্মঅনুসন্ধান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় যে যে ব্যক্তি নিজের দুঃখকে লক্ষ্য করতে পারে, সে কি কেবল সেই দুঃখই। যে ব্যক্তি বলতে পারে আমার মনে একটি ইচ্ছা এসেছে, সে কি সেই ইচ্ছার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন। গীতার দর্শন এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই মানুষকে গভীরতর আত্মপরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ এবং অন্যান্য মানসিক অবস্থা পরিবর্তনশীল। কিন্তু যে তাদের পরিবর্তনকে জানতে পারে, সেই জাননেওয়ালার প্রকৃতি অনুসন্ধান করাই ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞান লাভের পথ।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মানসিক জীবনে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ সর্বদা কাজ করে। আমরা যা চাই তা অর্জন করতে চেষ্টা করি এবং যা অপছন্দ করি তা এড়িয়ে চলি। আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে আনন্দ হয় এবং আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হলে কষ্ট জন্মায়। একই প্রক্রিয়া বারবার চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে অভ্যাস ও আসক্তি তৈরি হয়। ফলে মানুষ অনেক সময় নিজের ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হতে হতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারায়। কিন্তু নিজের ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ ও দুঃখকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখা গেলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মানসিক প্রবণতার ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণশক্তির সঙ্গে ধৃতির সমন্বয় ঘটলে আত্মসংযম ও মানসিক স্থিরতা গড়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন ছাত্র প্রথম হতে চায়। তার মধ্যে প্রথম হওয়ার ইচ্ছা জন্মায়। সে অন্য একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপছন্দ করতে পারে এবং সেখানে দ্বেষের জন্ম হয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে তার মধ্যে সুখ আসে এবং ব্যর্থ হলে দুঃখ আসে। তার শরীর, মস্তিষ্ক, ইন্দ্রিয় ও মন মিলিয়ে তৈরি হয় সংঘাত। সে নিজের ফলাফল ও অনুভূতিকে উপলব্ধি করে চেতনার মাধ্যমে। আর ব্যর্থতার পরেও যদি সে অধ্যবসায়ের সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যায় তবে তার মধ্যে ধৃতির প্রকাশ ঘটে। একইভাবে একজন সাধক ধ্যানের সময় নিজের মনে শান্তির ইচ্ছা লক্ষ্য করতে পারেন, অশান্ত চিন্তার প্রতি বিরাগ অনুভব করতে পারেন, শান্তি পেলে সুখ এবং অস্থিরতা এলে দুঃখ অনুভব করতে পারেন। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে শুরু করেন যে এসব অনুভূতি তার মধ্যে উপস্থিত হলেও এগুলোই তার সম্পূর্ণ সত্তা নয়, তখন তার আত্মঅনুসন্ধান আরও গভীর হয়।
আধুনিক জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। অন্যের প্রশংসা সুখ দেয় এবং সমালোচনা দুঃখ সৃষ্টি করে। নিজের পছন্দের বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ এবং অপছন্দের বিষয়ের প্রতি বিরাগ ক্রমাগত মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মানুষ যদি প্রতিটি বাহ্যিক প্রতিক্রিয়াকে নিজের অস্তিত্বের মূল্য হিসেবে গ্রহণ করে তবে তার মানসিক স্থিরতা নষ্ট হতে পারে। কিন্তু যদি সে বুঝতে পারে যে প্রশংসা, নিন্দা, সুখ, দুঃখ, আকর্ষণ এবং বিরাগ সবই পরিবর্তনশীল মানসিক অভিজ্ঞতা, তবে সে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরের স্থিরতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই স্থিরতার জন্যই ধৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের বহির্জগত এবং অন্তর্জগতের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক প্রকাশ করে। ইচ্ছা মানুষের ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার ভাষা, দ্বেষ তার প্রত্যাখ্যানের ভাষা, সুখ তার অনুকূল অভিজ্ঞতার অনুভূতি এবং দুঃখ তার প্রতিকূল অভিজ্ঞতার প্রকাশ। সংঘাত হলো দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের সমন্বিত কাঠামো, চেতনা হলো অভিজ্ঞতার সচেতন প্রকাশ এবং ধৃতি হলো সেই অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজেকে ধারণ করে রাখার শক্তি। কিন্তু এই সবকিছুকে ক্ষেত্রের অন্তর্গত বলা হয়েছে, কারণ এগুলো পরিবর্তনশীল। এখানেই শ্লোকটির সর্বোচ্চ দার্শনিক সৌন্দর্য। মানুষ যখন বুঝতে শুরু করে যে তার ইচ্ছা পরিবর্তিত হয়, দ্বেষ পরিবর্তিত হয়, সুখ ও দুঃখ আসে এবং চলে যায়, শরীর পরিবর্তিত হয় এবং মানসিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়, তখন তার সামনে একটি গভীর প্রশ্ন উপস্থিত হয়। যে এই পরিবর্তনগুলোকে জানছে সে কে। সেই প্রশ্নের অনুসন্ধানই মানুষকে ক্ষেত্রের পরিচয় থেকে ক্ষেত্রজ্ঞের জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের মধ্যে যে ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ ও পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা রয়েছে সেগুলোকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাদের প্রকৃতি বুঝে তাদের সঙ্গে নিজের চূড়ান্ত পরিচয়কে এক করে না ফেলা। যখন মানুষ নিজের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাগুলোকে সচেতনভাবে প্রত্যক্ষ করতে শেখে এবং ধৃতির মাধ্যমে অন্তরের স্থিরতা অর্জন করে, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে গভীরতর জ্ঞানের পথে অগ্রসর হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!