ভগবদ্গীতা ১৩.৮ — অমানিত্ব, অহিংসা, ক্ষমা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে জ্ঞানের সাধনা
অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্।
আচার্যোপাসনং শৌচং স্থৈর্যমাত্মবিনিগ্রহঃ।।৮।।
অনুবাদঃ অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, সৈর্য, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদিতে আসক্তিশূন্যতা, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান-এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের যে লক্ষণগুলি বর্ণনা করেছেন, তার সূচনায় রয়েছে অমানিত্বম্, অদম্ভিত্বম্, অহিংসা, ক্ষান্তি, আর্জবম্, আচার্যোপাসনম্, শৌচম্, স্থৈর্যম্ এবং আত্মবিনিগ্রহ। এই শব্দগুলি বাহ্যিক নৈতিকতার কয়েকটি বিচ্ছিন্ন নিয়ম নয়। এগুলি মানুষের অন্তর্জীবনকে পরিশুদ্ধ করার এক গভীর আধ্যাত্মিক পথের বিভিন্ন ধাপ। মানুষ যখন নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার থেকে সরে আসে, আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা ত্যাগ করে, অন্যকে আঘাত না করার মানসিকতা অর্জন করে, আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমাশীল হয়, অন্তর ও বাহিরে সরলতা প্রতিষ্ঠা করে, জ্ঞানীর কাছে বিনয়ের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করে, নিজের মনকে শুদ্ধ রাখে, সত্যের পথে স্থির থাকে এবং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে শেখে, তখন তার চেতনা সত্য জ্ঞান উপলব্ধির উপযোগী হয়ে ওঠে।
অমানিত্বম্ শব্দটির মূলের মধ্যে রয়েছে মান শব্দটি। সংস্কৃত মান শব্দের সঙ্গে সম্মান, মর্যাদা, মূল্য এবং নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণার সম্পর্ক রয়েছে। এর পূর্বে অ নিষেধাত্মক উপসর্গ যুক্ত হয়ে অমানিত্বম্ হয়েছে। এর অর্থ সম্মান পাওয়ার অহংকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষার অনুপস্থিতি। এখানে অমানিত্বম্ কখনোই আত্মঅবমাননা বোঝায় না। নিজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অন্যের কাছ থেকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দাবি করা এক বিষয় নয়। অমানিত্বম্ মানুষের সেই মানসিক প্রবণতার অবসান ঘটায় যেখানে সে সর্বদা চায় অন্যরা তাকে বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে দেখুক। যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা বা অবস্থানের জন্য অবিরাম প্রশংসা প্রত্যাশা করে, সে এখনো বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অমানিত্বম্ অর্জিত হলে মানুষ নিজের মূল্য সম্পর্কে স্থির থাকে, অথচ অন্যের প্রশংসা না পেলেও তার অন্তরের শান্তি নষ্ট হয় না।
অদম্ভিত্বম্ শব্দটি অ এবং দম্ভিত্ব এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। দম্ভ বলতে বোঝায় নিজের গুণ, জ্ঞান, মর্যাদা বা আধ্যাত্মিক অবস্থাকে প্রদর্শন করা এবং কখনো কখনো যা বাস্তবে নেই, তাও আছে বলে প্রকাশ করা। অদম্ভিত্বম্ তাই দম্ভহীনতা বা আত্মপ্রদর্শনহীনতা। অমানিত্বম্ এবং অদম্ভিত্বম্ পাশাপাশি ব্যবহারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। অমানিত্বম্ মানুষের সম্মান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর অদম্ভিত্বম্ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রবণতাকে দূর করে। কেউ সম্মান পেতে চাইতে পারে এবং নিজের গুণের বিজ্ঞাপনও করতে পারে। গীতা এই দুই প্রবণতারই শুদ্ধি চায়। প্রকৃত জ্ঞানী নিজের জ্ঞানকে নিজের অহংকারের অলংকার বানান না। তার জ্ঞান তার চরিত্রে প্রকাশিত হয়, প্রচারে নয়।
এরপর এসেছে অহিংসা। অহিংসা শব্দটি অ এবং হিংসা থেকে গঠিত। হিংসার মূলের সঙ্গে আঘাত, ক্ষতি, পীড়ন এবং হত্যার ধারণা যুক্ত। অ উপসর্গ সেই হিংসার নিষেধ নির্দেশ করে। আক্ষরিক অর্থে অহিংসা হলো আঘাত না করা বা ক্ষতি না করা। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে অহিংসা কেবল শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিন্তা, বাক্য এবং আচরণ তিন ক্ষেত্রেই অহিংসার প্রকাশ ঘটতে পারে। কারও প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ চিন্তা করা, ইচ্ছাকৃতভাবে অপমানজনক কথা বলা, প্রতিহিংসা পোষণ করা এবং অন্যের ক্ষতি কামনা করাও হিংসার সূক্ষ্ম রূপ। তাই অহিংসা মূলত অন্যের অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রতি সম্মান। একজন মানুষ যখন নিজের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য অন্যের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার প্রয়োজন অনুভব করে না, তখন তার মধ্যে অহিংসার চেতনা বিকশিত হয়।
ক্ষান্তি শব্দটি সংস্কৃত ক্ষম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্ষম্ ধাতুর মধ্যে সহ্য করা, ধারণ করা এবং ক্ষমা করার অর্থ রয়েছে। সেখান থেকে ক্ষান্তি হয়েছে সহিষ্ণুতা, ক্ষমাশীলতা এবং ধৈর্যের প্রতীক। ক্ষান্তি মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয় এবং দুর্বলতার কারণে সবকিছু নীরবে সহ্য করাও নয়। প্রকৃত ক্ষান্তি হলো আঘাত পাওয়ার পর প্রতিশোধের প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে নিজের ওপর কর্তৃত্ব করতে না দেওয়া। একজন দুর্বল ব্যক্তি কখনো কখনো প্রতিশোধ নিতে পারে না কারণ তার ক্ষমতা নেই। কিন্তু একজন শক্তিশালী ব্যক্তি প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েও ক্ষমা করতে পারেন। সেই ক্ষমাশীলতার মধ্যে যে অন্তর্গত শক্তি রয়েছে, সেটিই ক্ষান্তি। ক্ষান্তি মানুষের মনকে প্রতিহিংসার আগুন থেকে মুক্ত করে এবং তাকে প্রতিক্রিয়াশীল জীবন থেকে সচেতন জীবনের দিকে নিয়ে যায়।
আর্জবম্ শব্দটির উৎস ঋজু শব্দের মধ্যে নিহিত। ঋজু অর্থ সোজা, সরল এবং বাঁকাহীন। আর্জবম্ তাই সরলতা, অকপটতা এবং কপটতাহীনতার প্রতীক। এখানে সোজা হওয়া বাহ্যিক দেহের বিষয় নয়, এটি মনের সরলতা। মানুষের মুখে এক কথা এবং মনে আরেক কথা হলে সেখানে আর্জব নেই। একজন মানুষ যখন যা মনে করে, যা বলে এবং যা করে তার মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তখন তার মধ্যে আর্জবম্ প্রকাশ পায়। এই কারণে আর্জবম্ প্রকৃত অর্থে অন্তর ও বাহিরের ঐক্য। কপটতা মানুষের মনকে দ্বিখণ্ডিত করে। সে একদিকে নিজের প্রকৃত ইচ্ছা লুকিয়ে রাখে এবং অন্যদিকে সমাজের সামনে একটি কৃত্রিম পরিচয় তৈরি করে। আর্জবম্ সেই কৃত্রিমতার অবসান ঘটিয়ে মানুষকে নিজের সত্য সত্তার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আচার্যোপাসনম্ একটি সমাসবদ্ধ পদ। আচার্য এবং উপাসনম্ এই দুই অংশ নিয়ে এর গঠন। আচার্য বলতে এমন শিক্ষককে বোঝায় যিনি শুধু মুখে জ্ঞান দেন না, নিজের আচরণের মধ্য দিয়েও শিক্ষা দেন। উপাসনা শব্দটি উপ এবং আস্ ধাতু থেকে গঠিত। উপ অর্থ কাছে এবং আস্ অর্থ বসা। প্রাচীন অর্থে উপাসনা ছিল কারও নিকটে বসা। পরবর্তীকালে এর অর্থ হয়েছে শ্রদ্ধাভরে নিকটবর্তী হওয়া, সেবা করা এবং শিক্ষাগ্রহণ করা। তাই আচার্যোপাসনম্ কেবল গুরুকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা করার বিষয় নয়। এর গভীর অর্থ হলো জ্ঞানী ও সত্যদর্শী শিক্ষকের কাছে বিনয়ের সঙ্গে উপস্থিত হওয়া এবং শেখার জন্য নিজের অহংকারকে নত করা। যে ব্যক্তি মনে করে সে সব জানে, তার মধ্যে নতুন জ্ঞান গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়। তাই অমানিত্বম্ এবং আচার্যোপাসনম্ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিনয় না থাকলে প্রকৃত শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব হয় না।
শৌচম্ শব্দটি শুচ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। শুচ্ ধাতুর অর্থ উজ্জ্বল হওয়া, নির্মল হওয়া এবং পবিত্র হওয়া। শৌচম্ তাই শুচিতা বা পবিত্রতা। এর একটি বাহ্যিক দিক রয়েছে এবং একটি অন্তর্গত দিক রয়েছে। শরীর, পরিবেশ এবং জীবনযাপনের পরিচ্ছন্নতা বাহ্য শৌচের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তঃশৌচ। মানুষের মনে লোভ, বিদ্বেষ, কপটতা, অহংকার এবং প্রতিহিংসা জমতে জমতে অন্তরকে কলুষিত করে। বাহ্যিকভাবে একজন মানুষ যতই পরিচ্ছন্ন হোক, যদি তার মন বিদ্বেষ ও প্রতারণায় পূর্ণ থাকে, তবে তাকে প্রকৃত অর্থে শুচি বলা যায় না। তাই শৌচম্ মানুষের ভিতরের অন্ধকার ও অশুদ্ধতাকে ধীরে ধীরে দূর করার সাধনা।
স্থৈর্যম্ শব্দটি স্থির শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থিরতার মূল ভাব হলো দৃঢ়ভাবে অবস্থান করা এবং সহজে বিচলিত না হওয়া। স্থৈর্যম্ অর্থ দৃঢ়তা, স্থিরতা এবং অবিচলতা। জীবনে জ্ঞান অর্জন করা অপেক্ষাকৃত সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান অনুযায়ী জীবনযাপন করা কঠিন। মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের আদর্শ ভুলে যেতে পারে। সুখের সময় যে ব্যক্তি সত্যবাদী, দুঃখের সময়ও সত্যের পথে থাকতে পারা তার স্থৈর্যের পরিচয়। তাই স্থৈর্য জেদ নয়। জেদ অনেক সময় অজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, কিন্তু স্থৈর্য সত্য ও ন্যায়ের প্রতি সচেতনভাবে অবিচল থাকার নাম। পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও যে ব্যক্তি নিজের উচ্চতর আদর্শকে ধরে রাখতে পারেন, তার মধ্যে স্থৈর্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
শ্লোকটির শেষ শব্দ আত্মবিনিগ্রহঃ। আত্ম এবং বিনিগ্রহ এই দুই অংশে শব্দটির গঠন। বিনিগ্রহ শব্দটি বি, নি এবং গ্রহণের মূল ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রহণের মূল অর্থ ধরা বা গ্রহণ করা এবং উপসর্গের প্রভাবে এর অর্থ হয়েছে নিয়ন্ত্রণে আনা বা দৃঢ়ভাবে সংযত করা। আত্মবিনিগ্রহ তাই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ। এখানে আত্মবিনিগ্রহ বলতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে দমন করা বোঝায় না। বরং মানুষের মন, ইন্দ্রিয়, আবেগ এবং প্রবৃত্তিকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়। মন যা চাইছে তা সঙ্গে সঙ্গে করে ফেলা স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজের বুদ্ধি ও বিবেকের দ্বারা সিদ্ধান্ত নিতে পারা। যে ব্যক্তি রাগের সময় রাগের দাস হয় না, লোভের সময় লোভের দাস হয় না এবং ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষার সময় নিজের বিবেককে হারিয়ে ফেলে না, তার মধ্যেই আত্মবিনিগ্রহ প্রকাশিত হয়।
এই নয়টি গুণকে একসঙ্গে দেখলে শ্লোকটির মধ্যে একটি গভীর অন্তর্জাগতিক ক্রম স্পষ্ট হয়। প্রথমে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি ত্যাগ করে। এরপর নিজের গুণের প্রদর্শন থেকে সরে আসে। তারপর অন্যকে আঘাত না করার চেতনা জন্মায়। আঘাত পেলেও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করার শক্তি আসে। এরপর অন্তর ও বাহিরের মধ্যে সরলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ তখন জ্ঞানীর কাছে বিনয়ের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। শিক্ষা ও সাধনার মাধ্যমে অন্তর শুদ্ধ হয়। শুদ্ধ অন্তর সত্যের পথে স্থির হতে শেখে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। অর্থাৎ এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের চরিত্র গঠনের একটি ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া নিহিত রয়েছে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে মানুষের প্রধান সমস্যা হলো নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে না জেনে দেহ, মন, অহংকার এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখা। আমি বড়, আমি জ্ঞানী, আমি শ্রেষ্ঠ, আমি অপমানিত হয়েছি, আমার প্রতিশোধ নেওয়া দরকার, আমার ইচ্ছাই পূরণ হতে হবে এই ধরনের চিন্তা মানুষের চেতনাকে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে আবদ্ধ রাখে। অমানিত্বম্ ও অদম্ভিত্বম্ এই অহংকেন্দ্রিকতার ভিত্তি দুর্বল করে। অহিংসা ও ক্ষান্তি অন্যের সঙ্গে সম্পর্ককে শুদ্ধ করে। আর্জবম্ অন্তরের দ্বৈততা দূর করে। আচার্যোপাসনম্ জ্ঞান গ্রহণের দরজা খুলে দেয়। শৌচম্ চিত্তকে নির্মল করে। স্থৈর্যম্ সাধনাকে স্থায়িত্ব দেয় এবং আত্মবিনিগ্রহঃ মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রিত করে। এইভাবে গীতার জ্ঞান কেবল বুদ্ধিগত উপলব্ধি নয়, বরং চরিত্র ও চেতনার রূপান্তর।
যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও এই গুণগুলির গভীর গুরুত্ব রয়েছে। অহিংসা যোগের নৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান উপাদান। শৌচ অন্তরের ও বাহ্যিক পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আত্মসংযম যোগসাধনার জন্য অপরিহার্য। স্থৈর্য ছাড়া মনকে একাগ্র করা কঠিন। ফলে গীতার এই গুণগুলি মানুষের মনকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে চঞ্চলতা ধীরে ধীরে কমে এবং অন্তর্মুখী অনুসন্ধান সম্ভব হয়। বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গেও কিছু নৈতিক সাদৃশ্য দেখা যায়। অহিংসা, ক্ষমাশীলতা, আত্মসংযম এবং অহংকেন্দ্রিকতার হ্রাস উভয় ধারাতেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেদান্তের আত্মতত্ত্ব এবং বৌদ্ধ দর্শনের অনাত্মতত্ত্ব এক নয়। তাই এই সাদৃশ্যকে মৌলিক দার্শনিক অভিন্নতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অমানিত্বম্ মানুষের বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমায়। অদম্ভিত্বম্ কৃত্রিম সামাজিক পরিচয় নির্মাণের প্রবণতা কমায়। অহিংসা আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষান্তি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সচেতন প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর্জবম্ মানুষের চিন্তা, কথা ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করে। আচার্যোপাসনম্ শেখার মানসিকতা ও বিনয় সৃষ্টি করে। শৌচম্ অন্তরের নেতিবাচক প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করে। স্থৈর্যম্ মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে এবং আত্মবিনিগ্রহঃ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা গড়ে তোলে। এই অর্থে শ্লোকটি আধুনিক মানুষের মানসিক পরিপক্বতার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতে এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি যাত্রা হিসেবে দেখা যায়। অমানিত্বম্ যেন মাথা থেকে অহংকারের মুকুট নামিয়ে রাখা। অদম্ভিত্বম্ যেন মুখোশ খুলে নিজের প্রকৃত মুখের সামনে দাঁড়ানো। অহিংসা যেন অন্যের বিরুদ্ধে তোলা অস্ত্র নামিয়ে রাখা। ক্ষান্তি যেন প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে দেওয়া। আর্জবম্ যেন মনের সমস্ত বাঁকা পথ সরিয়ে একটি সোজা পথে এগিয়ে চলা। আচার্যোপাসনম্ যেন সত্যের শিক্ষকের সামনে বিনয়ের সঙ্গে বসা। শৌচম্ যেন অন্তরের আয়না পরিষ্কার করা। স্থৈর্যম্ যেন ঝড়ের মধ্যেও নিজের শিকড় ধরে রাখা। আর আত্মবিনিগ্রহঃ যেন জীবনের লাগাম নিজের হাতে তুলে নেওয়া।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষাগুলির প্রয়োগ অত্যন্ত সহজে দেখা যায়। একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার পর যদি সমস্ত কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেন, তবে তার মধ্যে অমানিত্বম্ অনুপস্থিত। যদি নিজের সামান্য গুণকে অতিরঞ্জিত করে সবাইকে প্রভাবিত করতে চান, তবে অদম্ভিত্বম্ অনুপস্থিত। কেউ সমালোচনা করলে সঙ্গে সঙ্গে অপমানজনক কথা বললে অহিংসা ও ক্ষান্তির অভাব প্রকাশ পায়। মুখে বন্ধুত্ব দেখিয়ে অন্তরে শত্রুতা পোষণ করলে আর্জব থাকে না। অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শেখার পরিবর্তে যদি কেউ মনে করেন তার আর শেখার কিছু নেই, তবে আচার্যোপাসনার অভাব রয়েছে। অসৎ উপায়ে সাফল্য অর্জন করলে শৌচের অভাব ঘটে। সামান্য প্রতিকূলতায় আদর্শ ত্যাগ করলে স্থৈর্যের অভাব দেখা যায়। আর রাগ, লোভ ও ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষার কাছে বারবার পরাজিত হলে আত্মবিনিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো জ্ঞানকে কেবল তথ্য হিসেবে না দেখে জীবনরূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা। মানুষের কাছে অনেক তথ্য থাকতে পারে, অনেক শাস্ত্র পড়া থাকতে পারে এবং অনেক ধর্মীয় কথা মুখস্থ থাকতে পারে। কিন্তু যদি তার মধ্যে অহংকার, দম্ভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, কপটতা, অশুচিতা, অস্থিরতা ও আত্মসংযমহীনতা থেকে যায়, তবে সেই জ্ঞান এখনো তার চরিত্রে পরিণত হয়নি। শ্রীকৃষ্ণ তাই জ্ঞানের আলোচনার শুরুতেই মানুষের চরিত্রের এই গুণগুলিকে সামনে আনছেন। কারণ সত্যকে জানতে হলে প্রথমে সত্যকে গ্রহণ করার মতো মন তৈরি করতে হয়।
অমানিত্বম্ মানুষকে শেখায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি থেকে সরে আসতে। অদম্ভিত্বম্ শেখায় নিজের গুণের প্রদর্শন না করতে। অহিংসা শেখায় নিজের উন্নতির জন্য অন্যের ক্ষতি না করতে। ক্ষান্তি শেখায় আঘাতের জবাবে প্রতিহিংসায় নিজেকে হারিয়ে না ফেলতে। আর্জবম্ শেখায় মন, বাক্য ও কর্মের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে। আচার্যোপাসনম্ শেখায় জ্ঞান গ্রহণের জন্য বিনয়ী হতে। শৌচম্ শেখায় শরীরের পাশাপাশি মনকেও নির্মল করতে। স্থৈর্যম্ শেখায় সত্যের পথে অবিচল থাকতে। আত্মবিনিগ্রহঃ শেখায় নিজের প্রবৃত্তির দাস না হয়ে নিজের জীবনের সচেতন পরিচালক হতে।
সবশেষে বলা যায়, অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্ দিয়ে শুরু হওয়া এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক আচরণের সংস্কার থেকে অন্তরের গভীরতম রূপান্তরের দিকে নিয়ে যায়। এর যাত্রা অহংকার থেকে বিনয়ে, দম্ভ থেকে সত্যতায়, হিংসা থেকে করুণায়, প্রতিশোধ থেকে ক্ষমায়, কপটতা থেকে সরলতায়, অজ্ঞতার অহংকার থেকে শিক্ষাগ্রহণে, অশুদ্ধতা থেকে পবিত্রতায়, চঞ্চলতা থেকে স্থিরতায় এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে আত্মসংযমে। এই কারণেই এই গুণগুলি কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, আত্মজ্ঞান লাভের প্রস্তুতিও। গীতার ভাষায় প্রকৃত জ্ঞান কেবল সেই জ্ঞান নয় যা মানুষ মুখে প্রকাশ করতে পারে। প্রকৃত জ্ঞান তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে যখন তা মানুষের চরিত্রকে পরিবর্তন করে, অহংকারকে নম্রতায় রূপান্তরিত করে, বিদ্বেষকে করুণায় পরিণত করে এবং অশান্ত মনকে আত্মসংযম ও স্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি মানুষের জীবনের জন্য একটি গভীর আহ্বান। নিজেকে জয় না করে জগতকে জয় করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ। কিন্তু যে মানুষ নিজের অহংকার, দম্ভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, কপটতা, অস্থিরতা এবং অসংযমকে অতিক্রম করতে শেখে, তার অন্তরেই জ্ঞানের প্রকৃত আলো উদিত হওয়ার পথ খুলে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!