ভগবদ্গীতা ১৩.৯ — ইন্দ্রিয়বিষয়ে বৈরাগ্য, অহংকারহীনতা ও জন্ম-মৃত্যুর দুঃখদর্শন
ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ।
জন্মমৃত্যুজরাব্যাধিদুঃখদোষানুদর্শনম্।।৯।।
অনুবাদঃ অমানিত্ব, দম্ভশূন্যতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, সৈর্য, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়-বিষয়ে বৈরাগ্য, অহঙ্কারশূন্যতা, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ আদির দোষ দর্শন, স্ত্রী-পুত্রাদিতে আসক্তিশূন্যতা, স্ত্রী-পুত্রাদির সুখ-দুঃখে ঔদাসীন্য, সর্বদা সমচিত্তত্ব, আমার প্রতি অনন্যা ও অব্যভিচারিণী ভক্তি, নির্জন স্থান প্রিয়তা, জনাকীর্ণ স্থানে অরুচি, অধ্যাত্ম জ্ঞানে নিত্যত্ববুদ্ধি এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন অনুসন্ধান-এই সমস্ত জ্ঞান বলে কথিত হয় এবং এর বিপরীত যা কিছু তা সবই অজ্ঞান।
ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের নবম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের আত্মজ্ঞান লাভের পথে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানসিক গুণের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো “ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ। জন্মমৃত্যুজরাব্যাধিদুঃখদোষানুদর্শনম্।” এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের ইন্দ্রিয়জ জীবন, আসক্তি, অহংকার, জন্ম, মৃত্যু, বার্ধক্য, রোগ এবং দুঃখ সম্পর্কে এক গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে জীবনকে অস্বীকার করতে বলেননি, সংসার থেকে পালিয়ে যেতে বলেননি এবং দেহ বা ইন্দ্রিয়কে ঘৃণা করতেও বলেননি। বরং তিনি মানুষকে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে বলেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ জগতের মধ্যে থেকেও জগতের প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে এবং পরিবর্তনশীল দেহ ও মনের অতীত নিজের গভীরতর স্বরূপকে অনুসন্ধান করতে পারে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ইন্দ্রিয়ার্থেষু। ইন্দ্রিয় বলতে মানুষের জ্ঞান গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্দ্রিয়সমূহকে বোঝায় এবং ইন্দ্রিয়ার্থ বলতে সেই ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহকে বোঝানো হয়। চোখের বিষয় রূপ, কানের বিষয় শব্দ, নাসিকার বিষয় গন্ধ, জিহ্বার বিষয় রস এবং ত্বকের বিষয় স্পর্শ। মানুষ এই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। দেখা, শোনা, ঘ্রাণ নেওয়া, স্বাদ গ্রহণ এবং স্পর্শের মধ্য দিয়ে তার অভিজ্ঞতার জগৎ গড়ে ওঠে। কিন্তু সমস্যা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন ইন্দ্রিয়বিষয় মানুষের স্বাধীনতাকে গ্রাস করে এবং মানুষ কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, আনন্দ, প্রশংসা, সম্পদ, ভোগ বা অভিজ্ঞতার প্রতি এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে তা ছাড়া তার মনে শান্তি থাকে না। এই অবস্থাকেই গীতা অতিক্রম করতে বলছে।
এরপর এসেছে বৈরাগ্যম্ শব্দটি। বৈরাগ্য শব্দটি সংস্কৃত বিরাগের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতার ভাব নিহিত রয়েছে। সাধারণভাবে বৈরাগ্য বলতে সংসার বা ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তিকে বোঝানো হয়। কিন্তু বৈরাগ্যের প্রকৃত অর্থ কোনো কিছু ঘৃণা করা নয়। বৈরাগ্য মানে হলো কোনো বিষয়কে ব্যবহার করা, তার মূল্য উপলব্ধি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু তার দ্বারা নিজের অন্তরকে নিয়ন্ত্রিত হতে না দেওয়া। একজন মানুষ অর্থ উপার্জন করতে পারেন, পরিবারকে ভালোবাসতে পারেন, সুন্দর জিনিস উপভোগ করতে পারেন, সম্মান গ্রহণ করতে পারেন এবং নিজের কর্তব্য পালন করতে পারেন। কিন্তু যদি সে মনে করে যে অর্থ, সম্মান, ভোগ বা সম্পর্ক হারিয়ে গেলে তার অস্তিত্বই শেষ হয়ে যাবে, তাহলে সে আসক্তির অধীন। বিপরীতে যে ব্যক্তি সবকিছুর মূল্য বোঝে কিন্তু জানে যে কোনো বাহ্যিক বস্তুই চিরস্থায়ী নয়, তার মধ্যে বৈরাগ্যের সূচনা ঘটে।
বৈরাগ্য এবং বিরাগের মধ্যে তাই গভীর পার্থক্য রয়েছে। বিরাগের মধ্যে কোনো বিষয়ের প্রতি ঘৃণা থাকতে পারে, কিন্তু বৈরাগ্যের মধ্যে থাকে স্বাধীনতা। একজন মানুষ কোনো খাবার পছন্দ করতে পারেন কিন্তু সেই খাবার না পেলে অস্থির হয়ে না উঠলে তিনি আসক্তির দাস নন। একইভাবে কেউ অর্থকে মূল্যবান মনে করতে পারেন কিন্তু অর্থকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে না করলে তিনি অর্থের দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত নন। বৈরাগ্যের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। এটি জীবনের আনন্দ কেড়ে নেয় না, বরং আনন্দের প্রতি মানুষের নির্ভরতা কমিয়ে তাকে আরও স্বাধীন করে।
এরপর শ্লোকে এসেছে অনহঙ্কার শব্দটি। অনহঙ্কার গঠিত হয়েছে অহঙ্কারের অস্বীকৃতি বা অনুপস্থিতি বোঝানো উপাদানের মাধ্যমে। অহঙ্কার শব্দের মূলের মধ্যে রয়েছে অহম্ অর্থাৎ আমি। গীতার দর্শনে অহঙ্কার কেবল গর্ব বা দাম্ভিকতার নাম নয়। এর অর্থ আরও গভীর। অহঙ্কার হলো সীমিত দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, কর্ম এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ সত্তাকে এক করে দেখা। মানুষ যখন ভাবে আমি এই দেহ, আমি এই পেশা, আমি এই সম্পদ, আমি এই সাফল্য, আমি এই মর্যাদা এবং আমিই সবকিছুর স্বাধীন কর্তা, তখন তার মধ্যে অহঙ্কারের বন্ধন শক্তিশালী হয়। অনহঙ্কার সেই বন্ধনকে শিথিল করে।
অনহঙ্কার মানে আত্মসম্মানের অভাব নয়। একজন মানুষ নিজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং নিজের কর্তব্যও পালন করতে পারেন, কিন্তু একই সঙ্গে বুঝতে পারেন যে তার বর্তমান পরিচয় একটি পরিবর্তনশীল ভূমিকা মাত্র। একজন শিক্ষক নিজেকে শিক্ষক বলতে পারেন। এটি তার কার্যগত পরিচয়। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন যে শিক্ষক হওয়ার কারণে তিনি অন্য সবার চেয়ে অস্তিত্বগতভাবে শ্রেষ্ঠ, তখন অহঙ্কার জন্ম নেয়। অনহঙ্কার মানুষকে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করতে বলে না। বরং নিজের ভূমিকার সীমা বুঝতে শেখায়।
শ্লোকের পরবর্তী অংশে এসেছে জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধির কথা। জন্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের দেহগত অস্তিত্বের সূচনা। সংস্কৃত জন্ম শব্দটি জন্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং উৎপত্তি বা আবির্ভাবের অর্থ বহন করে। জন্ম সাধারণত আনন্দের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে জন্মকে একক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন, বার্ধক্য, রোগ এবং মৃত্যুর সম্ভাবনাও শুরু হয়ে যায়। যে জন্মেছে তাকে পরিবর্তিত হতে হবে এবং দেহগত অস্তিত্বের ক্ষেত্রে একদিন মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে। তাই জন্মকে বুঝতে হলে তার সঙ্গে যুক্ত অনিত্যতার সত্যকেও বুঝতে হবে।
মৃত্যু শব্দটি সংস্কৃত মৃত বা মৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ জীবন বা দেহগত অস্তিত্বের অবসান। মানুষের সবচেয়ে গভীর ভয়গুলোর একটি হলো মৃত্যু। মানুষ সাধারণত মৃত্যুকে দূরের কোনো ঘটনা হিসেবে ভাবতে চায়। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো মৃত্যুকে ভয় করে অস্বীকার না করে তার প্রকৃতিকে বোঝা। মৃত্যুচিন্তা এখানে হতাশা সৃষ্টি করার জন্য নয়। বরং এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে দেহগত জীবন সীমিত এবং সময়ের সঙ্গে যা শুরু হয়েছে তার পরিবর্তন ও পরিণতি অনিবার্য।
জরা অর্থ বার্ধক্য বা ক্ষয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে সময়ের প্রভাবে দেহের পরিবর্তন ও জীর্ণতা। মানুষ যৌবনে নিজের শক্তিকে স্থায়ী বলে মনে করতে পারে। কিন্তু সময়ের প্রবাহ তাকে দেখিয়ে দেয় যে শরীরের শক্তি, সৌন্দর্য এবং কর্মক্ষমতা পরিবর্তনশীল। আজ যে দেহ শক্তিশালী, কাল তা দুর্বল হতে পারে। আজ যে সৌন্দর্য আকর্ষণীয়, সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলে যেতে পারে। জরা তাই কেবল বৃদ্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি অনিত্যতার একটি দৃশ্যমান শিক্ষা।
ব্যাধি বলতে রোগ বা দেহের স্বাভাবিক অবস্থার ব্যাঘাতকে বোঝায়। মানুষ নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অনেক কিছু করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে রোগের সম্ভাবনাকে দূর করতে পারে না। ব্যাধি মানুষকে তার দেহগত সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষ দেহকে যত্ন করতে পারে, চিকিৎসা করতে পারে এবং সুস্থ থাকার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু দেহ সম্পূর্ণভাবে তার ইচ্ছার অধীন নয়। এই উপলব্ধি অহঙ্কারের সীমা প্রকাশ করে।
এরপর এসেছে দুঃখ শব্দটি। সাধারণ অর্থে দুঃখ হলো কষ্ট, বেদনা বা যন্ত্রণা। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে দুঃখের অর্থ অনেক বিস্তৃত। শারীরিক ব্যথা যেমন দুঃখ, তেমনি প্রিয়জনকে হারানো, আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া, সম্পদ হারানো, সম্মান নষ্ট হওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা এবং অনিত্য জিনিসকে স্থায়ী করে ধরে রাখার চেষ্টা থেকেও দুঃখ জন্মায়। অর্থাৎ দুঃখ শুধু বাহ্যিক কোনো ঘটনা নয়। অনেক সময় মানুষের নিজের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার সংঘর্ষ থেকেই দুঃখ সৃষ্টি হয়।
এই দুঃখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দোষ শব্দটি। এখানে দোষ বলতে নৈতিক অপরাধ বোঝানো হয়নি। বরং জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধির মধ্যে যে সীমাবদ্ধতা ও অনিবার্য ক্লেশ নিহিত রয়েছে, তাকে দোষ বলা হয়েছে। মানুষ যদি অনিত্য জিনিসকে নিত্য মনে করে, পরিবর্তনশীলকে স্থায়ী ধরে নেয় এবং দেহগত পরিচয়কে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে, তাহলে তার মধ্যে আসক্তি জন্মায়। আর আসক্তি যত গভীর হয়, হারানোর ভয়ও তত গভীর হয়। তাই দোষদর্শন আসলে বাস্তবতার প্রকৃতি উপলব্ধি করার একটি পদ্ধতি।
এই পর্যায়ে অনুদর্শন শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অনুদর্শন মানে কেবল একবার দেখা নয়। অনু এবং দর্শনের সমন্বয়ে এর মধ্যে অনুসরণ করে দেখা, বারবার দেখা এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ভাব রয়েছে। একজন মানুষ জানে যে সবাই একদিন মারা যাবে। কিন্তু এই জ্ঞান সাধারণত তার দৈনন্দিন আচরণকে বদলে দেয় না। অনুদর্শন হলো সেই সত্যকে বারবার চিন্তা করা এবং এমনভাবে উপলব্ধি করা যাতে তা কেবল বুদ্ধির তথ্য না থেকে জীবনের প্রত্যক্ষ সত্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মৃত্যু আছে এই কথা জানা এক বিষয়, আর নিজের জীবনও অনিত্য এই সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।
এই কারণে জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি এবং দুঃখের দোষানুদর্শন কোনো নৈরাশ্যবাদী চিন্তা নয়। শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে বলছেন না যে জীবন অর্থহীন বা পৃথিবীকে ঘৃণা করতে হবে। তিনি বরং মানুষকে বাস্তবতার দিকে চোখ খুলে তাকাতে বলছেন। একটি ফুল সুন্দর এবং সেই ফুল একদিন ঝরে যাবে। একটি শিশুর শৈশব আনন্দময় এবং সেই শৈশব একদিন শেষ হবে। যৌবন শক্তিশালী এবং সেই যৌবনও স্থায়ী নয়। সুস্বাস্থ্য মূল্যবান এবং তবুও তা চিরস্থায়ী নয়। এই দুই সত্যকে একই সঙ্গে ধারণ করতে পারাই পরিণত জ্ঞান।
গীতার এই শিক্ষা মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয় তৈরি করে শরীর, পরিবার, পেশা, সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি এবং সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে। কিন্তু এগুলোর প্রত্যেকটি পরিবর্তনশীল। শরীর পরিবর্তিত হয়, পেশা পরিবর্তিত হতে পারে, সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে, সামাজিক মর্যাদা বদলে যেতে পারে এবং সম্পর্কের অবস্থাও পরিবর্তিত হতে পারে। তাহলে যে সত্তা এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে, সেই সত্তার প্রকৃতি কী, এই প্রশ্নই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা করে। গীতার ক্ষেত্র এবং ক্ষেত্রজ্ঞের আলোচনার সঙ্গে এই উপলব্ধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সাংখ্য ও বেদান্তীয় দৃষ্টিতে দেহ, ইন্দ্রিয়, মন এবং পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাগুলো ক্ষেত্রের অন্তর্গত। এগুলো পরিবর্তিত হয় এবং পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। ক্ষেত্রজ্ঞ সেই চৈতন্যসত্তা, যার মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো জানা যায়। এই দৃষ্টিতে বৈরাগ্যের উদ্দেশ্য পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং পরিবর্তনশীলকে পরিবর্তনশীল হিসেবে চিনতে শেখা এবং নিজের গভীরতর স্বরূপের অনুসন্ধান করা। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় তার জীবনের অংশ হলেও তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্গত স্বাধীনতা জন্মায়।
যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও ইন্দ্রিয়বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মনকে অস্থির করে। কোনো বিষয়কে বারবার স্মরণ করলে তার প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। আকর্ষণ থেকে আকাঙ্ক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষা থেকে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। মানুষ তখন নিজের শান্তিকে বাহ্যিক বস্তুর ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে। বৈরাগ্য এই নির্ভরতার শক্তিকে কমায়। তাই বৈরাগ্য মানসিক শূন্যতা নয়। বরং এটি এমন একটি স্বাধীনতা, যার ফলে মানুষ বিষয়কে ব্যবহার করতে পারে কিন্তু বিষয়ের দ্বারা ব্যবহৃত হয় না।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ অনেক সময় নিজের সুখকে বাহ্যিক সাফল্য, সম্পদ, সামাজিক স্বীকৃতি এবং ইন্দ্রিয়সুখের সঙ্গে যুক্ত করে। আবার নিজের পরিচয়কেও সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে এক করে ফেলে। ফলে কোনো কিছু হারালে শুধু বস্তু হারায় না, তার সঙ্গে আত্মপরিচয়ের একটি অংশও যেন ভেঙে পড়ে। অনহঙ্কার মানুষকে এই অতিরিক্ত আত্মপরিচয় থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করতে পারে। আর অনিত্যতার সচেতনতা মানুষকে পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি দিতে পারে।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এক অর্থে এটি মানুষের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। সাধারণ মানুষ আয়নায় নিজের বাহ্যিক রূপ দেখে। কিন্তু গীতা যেন এমন একটি আয়না দেখায় যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি দেখতে পায়। সে দেখতে পায় যে শরীর পরিবর্তিত হচ্ছে, যৌবন চলে যাচ্ছে, স্বাস্থ্য বদলাচ্ছে এবং জীবন ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধির উদ্দেশ্য ভয় সৃষ্টি করা নয়। বরং যে বিষয়কে মানুষ এতদিন চিরস্থায়ী বলে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটিকে তার প্রকৃত অবস্থায় দেখতে শেখানো।
বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে অর্থের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। একজন ব্যক্তি যদি মনে করেন তার সমস্ত মূল্য তার সম্পদের মধ্যে নিহিত, তাহলে অর্থের ক্ষতি তার আত্মপরিচয়কেও ধ্বংস করতে পারে। অন্য একজন ব্যক্তি অর্থকে মূল্যবান মনে করেন, তার যথাযথ ব্যবহার করেন এবং অর্থ হারালে দুঃখও পান, কিন্তু নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে অর্থের সঙ্গে এক করে দেখেন না। দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে বৈরাগ্যের সম্ভাবনা বেশি। কারণ তিনি সম্পদকে অস্বীকার করছেন না, বরং সম্পদের সীমা বুঝতে পারছেন।
এইভাবে শ্লোকটির প্রতিটি শব্দ যেন মানুষের অন্তর্জগতের একটি করে দরজা খুলে দেয়। ইন্দ্রিয়ার্থেষু আমাদের বাহ্যিক জগতের দিকে নিয়ে যায়। বৈরাগ্য আমাদের সেই জগতের প্রতি আসক্তির প্রকৃতি দেখায়। অনহঙ্কার আমাদের নিজের সংকীর্ণ আমি বোধের দিকে তাকাতে শেখায়। জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি আমাদের দেহগত অস্তিত্বের অনিত্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুঃখ ও দোষ আমাদের এই অনিত্যতার সঙ্গে জড়িত সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে সাহায্য করে। আর অনুদর্শন এই সমস্ত সত্যকে গভীরভাবে এবং পুনঃপুনঃ উপলব্ধি করার সাধনা।
অতএব এই শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা জীবনকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং জীবনকে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখা। ইন্দ্রিয় থাকবে, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব থাকবে না। সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদই আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হবে না। সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে এমন আঁকড়ে ধরা থাকবে না যে বিচ্ছেদ হলেই নিজের অস্তিত্ব অর্থহীন মনে হয়। দেহ থাকবে, তার যত্নও নিতে হবে, কিন্তু দেহকেই চূড়ান্ত আত্মপরিচয় মনে করা যাবে না। অহঙ্কার থাকবে না, কিন্তু আত্মসম্মান থাকবে। জন্ম ও মৃত্যুকে অস্বীকার করা হবে না, বরং তাদের অনিবার্য সত্যকে উপলব্ধি করা হবে।
সবশেষে বলা যায়, “ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ। জন্মমৃত্যুজরাব্যাধিদুঃখদোষানুদর্শনম্” শ্লোকটি মানুষের বাহ্যিক জীবনকে ধ্বংস করার শিক্ষা দেয় না। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ দাসত্বকে অতিক্রম করার শিক্ষা দেয়। বৈরাগ্য মানুষকে ইন্দ্রিয়বিষয়ের প্রতি স্বাধীন করে, অনহঙ্কার তাকে সংকীর্ণ আমি বোধের বন্ধন থেকে মুক্ত করে এবং জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি ও দুঃখের অনুদর্শন তাকে জীবনের অনিত্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যে মানুষ পরিবর্তনশীলকে পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখতে শেখে, সে আর পরিবর্তনের মধ্যে নিজের স্থায়ী পরিচয় খুঁজতে থাকে না। সে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শেখে যে জীবনের সমস্ত বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও সত্যের অনুসন্ধান মানুষের অন্তরে এক গভীরতর যাত্রার সূচনা করে। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের কাছে বৈরাগ্য, অনহঙ্কার এবং অনিত্যতার গভীর দর্শন কেবল নৈতিক গুণ নয়, বরং আত্মজ্ঞান লাভের পথের অপরিহার্য অঙ্গ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!