ভগবদ্গীতা ১৪.১০ — সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণের পারস্পরিক প্রাধান্য ও অন্তর্জগতের পরিবর্তন
রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা।।১০।।
অনুবাদঃ হে ভারত! রজ ও তমোগুণকে পরাভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, সত্ত্ব ও তমোগুণকে পরাভূত করে রজোগুণ প্রভল হয় এবং সেভাবেই সত্ত্ব ও রজোগুণকে পরাভূত করে তমোগুণ প্রবল হয়।
ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের দশম শ্লোকের এই অংশটি মানুষের অন্তর্জগত ও প্রকৃতির তিন গুণের একটি গভীর গতিশীল সত্যকে প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মানুষের প্রকৃতিতে কোনো একটি গুণ সবসময় সমানভাবে সক্রিয় থাকে না। কখনো সত্ত্ব অন্য দুই গুণকে অতিক্রম করে প্রবল হয়, কখনো রজঃ সত্ত্ব ও তমঃকে অতিক্রম করে প্রধান হয়ে ওঠে এবং কখনো তমঃ সত্ত্ব ও রজঃকে আচ্ছন্ন করে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে। এই কারণে শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ ও আত্মবিকাশের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ।
রজঃ শব্দটি সংস্কৃত রজস্ শব্দ থেকে এসেছে এবং এর মধ্যে গতি, আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা, উদ্দীপনা ও আসক্তির ভাব নিহিত রয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে রজস্ শব্দের সঙ্গে ধূলি, আবরণ ও অস্থিরতার ধারণাও যুক্ত ছিল। গীতার গুণতত্ত্বে রজঃ মানুষের সেই মানসিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে যা তাকে ক্রমাগত কিছু অর্জন করতে, কিছু করতে, এগিয়ে যেতে এবং নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে তাড়িত করে। রজঃ নিজে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। কর্ম, উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও পরিবর্তনের জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যখন রজঃ অতিরিক্ত প্রবল হয় তখন আকাঙ্ক্ষা আসক্তিতে পরিণত হয়, কর্ম অস্থিরতায় পরিণত হয় এবং সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা মানুষের অন্তরের শান্তিকে গ্রাস করতে পারে।
তমঃ শব্দটি সংস্কৃত তমস্ থেকে এসেছে এবং এর মূল ভাব অন্ধকার, আবরণ, জড়তা ও অজ্ঞতা। তমোগুণ মানুষের চেতনার সেই অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং সত্যকে উপলব্ধি করার শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অলসতা, মোহ, উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, অতিরিক্ত নিদ্রা, বিভ্রান্তি এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা তমসিক প্রবণতার প্রকাশ হতে পারে। তমঃকে তাই শুধু বাহ্যিক অন্ধকার হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি মূলত অন্তরের সেই অন্ধকার যা মানুষকে নিজের প্রকৃত সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে বাধা দেয়।
সত্ত্ব শব্দের সঙ্গে সৎ বা অস্তিত্বশীল ও সত্যের ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সত্ত্বের মধ্যে স্বচ্ছতা, পবিত্রতা, জ্ঞান, সাম্য, প্রশান্তি ও আলোকিত চেতনার ভাব নিহিত। যখন সত্ত্ব প্রবল হয় তখন মানুষের মন তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার হয়, বিচারবুদ্ধি সুস্থির হয় এবং সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে সংযম, বিবেচনা, করুণা, জ্ঞান এবং অন্তরের শান্তি জাগিয়ে তোলে। এই কারণে তিন গুণের মধ্যে সত্ত্বকে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শ্লোকের অভিভূয় শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো অতিক্রম করে, অভিভূত করে, পরাভূত করে অথবা প্রাধান্য বিস্তার করে। এখানে ধ্বংস করার কথা বলা হয়নি। বরং একটি গুণ অন্য দুই গুণের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে। এই একটি শব্দ থেকেই বোঝা যায় যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। তিনটিই প্রকৃতির অংশ এবং মানুষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কখনো একটি গুণ সাময়িকভাবে অন্য দুই গুণকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষের মানসিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়।
এই সত্যটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সহজে দেখা যায়। একজন মানুষ সকালে খুব শান্ত ও মনোযোগী অবস্থায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেন। তার চিন্তা পরিষ্কার থাকে এবং তিনি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন। এই অবস্থায় সত্ত্বের প্রাধান্য বোঝা যায়। কিছু সময় পরে সাফল্য অর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং উদ্বেগ তার মনে জন্ম নিতে পারে। তখন রজঃ প্রবল হয়ে ওঠে। আবার দীর্ঘ ক্লান্তি, হতাশা বা অনীহার কারণে যদি সে কোনো কাজ করতে না চায় এবং নিজের দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যায়, তখন তমসিক প্রবণতা তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠতে পারে। একই মানুষের মধ্যে একই দিনেই এই তিন অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এই শ্লোকের গভীর মনোবৈজ্ঞানিক শিক্ষা এখানেই যে মানুষকে নিজের মানসিক অবস্থাকে চিনতে শিখতে হবে। যখন মনে অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা দেয় তখন বুঝতে হবে যে রজঃ প্রবল হয়েছে। যখন চিন্তা ভারী হয়ে যায় এবং কর্মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয় তখন তমঃ সক্রিয় হতে পারে। আর যখন মন শান্ত, স্বচ্ছ ও বিবেচনাশীল থাকে তখন সত্ত্বের প্রাধান্য অনুভূত হতে পারে। এইভাবে গীতার গুণতত্ত্ব আত্মপর্যবেক্ষণের একটি সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে পরিণত হয়। মানুষ তখন নিজের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম না হয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ প্রকৃতির তিন মৌলিক গুণ। সত্ত্বের ধর্ম প্রকাশ ও স্বচ্ছতা, রজঃর ধর্ম গতি ও কর্ম এবং তমঃর ধর্ম আবরণ ও জড়তা। এই তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়া থেকেই প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রকাশ ঘটে। গীতার দৃষ্টিতে মানুষ এই গুণগুলোর প্রভাবে কাজ করলেও তার প্রকৃত আত্মস্বরূপ এই গুণগুলোর অতীত। তাই শ্লোকটির শিক্ষা কেবল সত্ত্বকে বাড়িয়ে রজঃ ও তমঃকে দূর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সত্ত্বকে উন্নতির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত গুণত্রয়ের অতীত আত্মস্বরূপ উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়াই এর বৃহত্তর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।
সত্ত্বকে যদি আলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়, রজঃকে তুলনা করা যায় অগ্নির সঙ্গে এবং তমঃকে তুলনা করা যায় অন্ধকারের সঙ্গে। আলো জিনিসকে প্রকাশ করে, অগ্নি গতি ও পরিবর্তন সৃষ্টি করে এবং অন্ধকার জিনিসকে আচ্ছন্ন করে। মানুষের মনেও একইভাবে সত্ত্ব সত্যকে প্রকাশ করে, রজঃ মানুষকে কর্মের দিকে চালিত করে এবং তমঃ তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করতে পারে। একটি স্বচ্ছ হ্রদের জলে যেমন আকাশের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি সত্ত্বপ্রধান মনে সত্য ও বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়। প্রবল বাতাসে হ্রদের জল যেমন অস্থির হয়ে যায়, তেমনি রজঃপ্রধান মন এক আকাঙ্ক্ষা থেকে আরেক আকাঙ্ক্ষার দিকে ছুটে চলে। আবার কাদায় ঘোলা জল যেমন কোনো প্রতিবিম্ব স্পষ্টভাবে ধারণ করতে পারে না, তেমনি তমঃপ্রধান মন সত্যকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।
তবে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃকে সরলভাবে ভালো, মাঝারি এবং খারাপ এই তিনটি ভাগ হিসেবে বোঝা উচিত নয়। রজঃ মানুষের কর্মশক্তি জাগায় এবং তমঃ প্রকৃতির স্থিতি ও জড়তার একটি দিক প্রকাশ করে। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন কোনো গুণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রাধান্য লাভ করে এবং মানুষ তার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রজঃ যখন জ্ঞান ও কর্তব্যের অধীন থাকে তখন তা কর্মের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। সত্ত্ব যখন জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায় তখন তা আত্মোন্নতির পথ উন্মুক্ত করে। তমঃ যখন অজ্ঞতা ও জড়তার রূপ নেয় তখন তা আত্মবিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই কারণে শ্লোকটি মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি বাস্তব পথও নির্দেশ করে। তমসিক জড়তা থেকে জেগে উঠতে হবে। রজসিক শক্তিকে সঠিক কর্মে নিয়োজিত করতে হবে। তারপর সত্ত্বের স্বচ্ছতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে মনকে আরও নির্মল করতে হবে। কিন্তু এখানেও শেষ কথা নয়। কারণ সত্ত্বও প্রকৃতির একটি গুণ। আত্মার চূড়ান্ত উপলব্ধির জন্য গুণগুলোর কার্যকলাপকে অতিক্রম করে সেই চৈতন্যকে উপলব্ধি করতে হয় যা গুণগুলোর পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা তাই আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের মধ্যে কখনো সত্ত্ব জাগে, কখনো রজঃ জাগে এবং কখনো তমঃ জাগে। কিন্তু মানুষ নিজে কেবল সত্ত্ব নয়, কেবল রজঃ নয় এবং কেবল তমঃও নয়। এই গুণগুলোর পরিবর্তনকে যে চেতনা প্রত্যক্ষ করতে পারে তার মধ্যেই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা। যখন মানুষ বলতে শেখে যে আমার মধ্যে রজঃ প্রবল হয়েছে অথবা আমার মধ্যে তমঃ সক্রিয় হয়েছে, তখন সে ধীরে ধীরে গুণকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। এখান থেকেই সাক্ষীভাবের জন্ম হয় এবং আত্মজ্ঞান গভীর হতে থাকে।
অতএব রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত এই শ্লোকটি মানুষের মন ও প্রকৃতির এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। সত্ত্ব জ্ঞানের আলো, রজঃ কর্মের গতি এবং তমঃ অজ্ঞতার আবরণ হিসেবে মানুষের জীবনে ক্রমাগত ক্রিয়া করে। কোনো একটি গুণের প্রাধান্য মানুষের চিন্তা ও আচরণের রূপ পরিবর্তন করে। কিন্তু সচেতন মানুষ সেই পরিবর্তনের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে নিজের অন্তরের গুণগত অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ তাকে তমঃ থেকে জাগরণে, রজঃ থেকে শুদ্ধ কর্মে এবং সত্ত্ব থেকে জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। আর জ্ঞানের পরিণতিতে সে উপলব্ধি করতে পারে যে তার সত্যস্বরূপ প্রকৃতির পরিবর্তনশীল তিন গুণেরও অতীত। এই কারণেই শ্লোকটি শুধু গুণত্রয়ের একটি ব্যাখ্যা নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতকে জানার, নিজের প্রবণতাকে বুঝে তাকে রূপান্তরিত করার এবং শেষ পর্যন্ত আত্মস্বরূপের গভীর উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার এক অনন্ত আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!