ভগবদ্গীতা ১৪.১২ — রজোগুণের বিকাশে লোভ, কর্মপ্রবণতা, অশান্তি ও আকাঙ্ক্ষার উদয়
লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ।।১২।।
অনুবাদঃ হে ভরতশ্রেষ্ঠ! রজোগুণ বর্ধিত হলে লোভ, প্রবৃত্তি, কর্মে উদ্যম ও দুর্দমনীয় স্পৃহা বৃদ্ধি পায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রজোগুণের প্রকৃতি ও তার মানসিক প্রকাশ অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো
হে ভরতশ্রেষ্ঠ, রজোগুণ বৃদ্ধি পেলে মানুষের মধ্যে লোভ, কর্মপ্রবণতা, নানা কর্মের সূচনা, অন্তরের অশান্তি এবং অধিক কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের মন, আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা এবং অশান্তির একটি অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিহিত রয়েছে। এখানে রজোগুণকে কেবল একটি ধর্মীয় ধারণা হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং মানুষের অন্তর্জগতে কীভাবে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, কীভাবে সেই আকাঙ্ক্ষা মানুষকে কর্মে প্রবৃত্ত করে এবং কীভাবে কর্ম ও অর্জনের মধ্যেও মানুষের অতৃপ্তি থেকে যেতে পারে, তার একটি গভীর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো লোভঃ। লোভ শব্দটি সংস্কৃত লুভ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। লুভ্ ধাতুর মধ্যে কোনো কিছুর প্রতি প্রবল আকর্ষণ, অধিক পাওয়ার বাসনা এবং অধিকার করার তীব্র ইচ্ছার ভাব রয়েছে। সাধারণ অর্থে লোভ বলতে কোনো কিছু অতিরিক্তভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে লোভ কেবল অর্থসম্পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়। ধন, ক্ষমতা, সম্মান, খ্যাতি, পদ, প্রশংসা, ভোগ, জ্ঞান কিংবা সামাজিক মর্যাদা সবকিছুর ক্ষেত্রেই যখন চাওয়া সীমা অতিক্রম করে এবং মানুষ প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট না থেকে আরও অধিক পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, তখন সেই আকাঙ্ক্ষা লোভে পরিণত হয়। প্রয়োজনের সঙ্গে লোভের পার্থক্য এখানেই। প্রয়োজন পূর্ণ হলে থামতে পারে, কিন্তু লোভ সাধারণত পূর্ণতার পরিবর্তে আরও অধিক চাওয়ার জন্ম দেয়।
শ্লোকে এরপর এসেছে প্রবৃত্তিরারম্ভঃ। প্রবৃত্তি বলতে কোনো কাজের দিকে সক্রিয়ভাবে অগ্রসর হওয়া এবং আরম্ভ বলতে শুরু করা বোঝায়। অর্থাৎ রজোগুণ মানুষের মধ্যে কর্মে প্রবেশের প্রবল প্রবণতা সৃষ্টি করে। মন যখন কোনো কিছু পেতে চায়, তখন সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করার জন্য মানুষ কর্মে প্রবৃত্ত হয়। সে পরিকল্পনা করে, চেষ্টা করে, সংগ্রাম করে এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য নানা কর্মকাণ্ড শুরু করে। এই কর্মপ্রবণতা নিজে খারাপ নয়। মানুষের উন্নতি, সভ্যতার অগ্রগতি, বিজ্ঞান, শিল্প, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সমাজ নির্মাণের পেছনে কর্মশক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু কর্মের চালিকাশক্তি যখন কর্তব্য, জ্ঞান ও কল্যাণের পরিবর্তে অতিরিক্ত ভোগ, লোভ, প্রতিযোগিতা এবং ফলের প্রতি আসক্তি হয়ে ওঠে, তখন সেই কর্মপ্রবণতা অশান্তির কারণ হতে পারে।
কর্মণাম্ শব্দটি বিভিন্ন কর্ম বা কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে। মানুষের জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। কেউ জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করে, কেউ জ্ঞান অর্জনের জন্য গবেষণা করে, কেউ সমাজের কল্যাণে কাজ করে এবং কেউ নিজের ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। রজোগুণ প্রবল হলে মানুষের কর্মের সংখ্যা এবং কর্মের প্রতি মানসিক আকর্ষণ উভয়ই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে স্থির থাকতে চায় না। একটি কাজ শেষ হলে আরেকটি কাজ শুরু করে। একটি লক্ষ্য অর্জন হলে নতুন লক্ষ্য স্থাপন করে। তার জীবনের গতি ক্রমশ বহির্মুখী হয়ে ওঠে। এই প্রবল কর্মশক্তি যদি জ্ঞান ও আত্মসংযম দ্বারা পরিচালিত হয় তাহলে তা সৃষ্টিশীল শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি কর্মের সঙ্গে অতিরিক্ত ফলাকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয় তাহলে কর্মই মানুষের বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর এসেছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ অশমঃ। শম শব্দের অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, সংযম এবং অন্তরের স্থিরতা। তার বিপরীত হলো অশম। অর্থাৎ অন্তরের অশান্তি, অস্থিরতা এবং সংযমের অভাব। রজোগুণের প্রকৃতি এমন যে মানুষকে ক্রমাগত বাইরে নিয়ে যায়। তার মন এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে বেড়ায়। সে মনে করে কোনো একটি জিনিস অর্জন করতে পারলে সে শান্ত হবে। কিন্তু সেই জিনিস অর্জনের পর আবার নতুন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে শান্তি স্থায়ী হয় না। একজন মানুষ অনেক কিছু অর্জন করেও কেন অশান্ত থাকতে পারে, এই শ্লোক তার একটি গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করে। বাহ্যিক সাফল্য এবং অন্তরের শান্তি এক জিনিস নয়। মানুষের কাছে যত বেশি থাকতে পারে, তার চাওয়াও তত বেশি হতে পারে। তাই প্রাচুর্য সব সময় প্রশান্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
স্পৃহা শব্দটি এই মানসিক প্রক্রিয়াটিকে আরও গভীর করে। স্পৃহা অর্থ প্রবল আকাঙ্ক্ষা, তীব্র ইচ্ছা, কোনো কিছু পাওয়ার বাসনা বা কোনো বিষয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ। সাধারণ ইচ্ছার সঙ্গে স্পৃহার পার্থক্য হলো এর তীব্রতা। মানুষ কোনো কিছু চায় এবং সেই চাওয়াকে নিজের সুখের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। তখন সেই বস্তু বা অবস্থান না পাওয়া পর্যন্ত তার মনে অপূর্ণতার অনুভূতি থাকে। ফলে তার মন বর্তমান মুহূর্তে স্থির থাকতে পারে না। সে ভবিষ্যতের কোনো অর্জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজকের জীবন যেন আগামী দিনের কোনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এভাবেই স্পৃহা মানুষের চেতনাকে ভবিষ্যতমুখী করে এবং বর্তমানের শান্তিকে দুর্বল করে।
শ্লোকের শেষাংশে বলা হয়েছে রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ। অর্থাৎ হে ভরতশ্রেষ্ঠ, রজোগুণ বৃদ্ধি পেলে এগুলোর জন্ম হয়। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রজোগুণকে কারণ এবং লোভ, কর্মপ্রবণতা, অশান্তি ও স্পৃহাকে তার প্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। রজঃ প্রকৃতিগতভাবে গতি, ক্রিয়া এবং উদ্যমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রজোগুণ প্রবল হলে মানুষ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। সে কিছু করতে চায়, অর্জন করতে চায়, পরিবর্তন করতে চায় এবং নিজের ইচ্ছাকে বাস্তব রূপ দিতে চায়। কিন্তু সেই গতিশীলতা যখন আত্মজ্ঞান ও সংযম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা অস্থিরতা ও অতৃপ্তির রূপ ধারণ করে।
এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের আকাঙ্ক্ষার একটি চক্রও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জন্মায়। সেই ইচ্ছা থেকে কর্মের সূচনা হয়। কর্মের মাধ্যমে মানুষ কোনো ফল লাভ করে। কিন্তু ফল লাভের পর মন স্থির না হয়ে নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। আবার সেই আকাঙ্ক্ষা নতুন কর্মের জন্ম দেয়। এভাবে মানুষ একটি অবিরাম চক্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এই চক্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ ভাবে যে পরবর্তী অর্জন তাকে স্থায়ী সুখ দেবে। কিন্তু অর্জনের পরে নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেওয়ায় সেই স্থায়ী সুখ আর আসে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে লোভকে একটি অন্তহীন আগুনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আগুনে যত জ্বালানি দেওয়া হয়, আগুন তত জ্বলে ওঠে। একইভাবে লোভের ক্ষেত্রেও একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে তার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে না। বরং অনেক সময় নতুন আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। একজন মানুষ প্রথমে জীবিকা নির্বাহের জন্য সম্পদ অর্জন করতে পারে। পরে নিরাপত্তার জন্য আরও সম্পদ চায়। তারপর সম্মানের জন্য আরও সম্পদ চায়। এরপর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরও সম্পদ চায়। শেষ পর্যন্ত সম্পদ আর জীবনের একটি উপায় থাকে না, সেটিই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন মানুষ সম্পদের অধিকারী হওয়ার পরিবর্তে সম্পদের আকাঙ্ক্ষার অধীন হয়ে পড়ে।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকটির প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। বর্তমান ভোগবাদী সমাজে মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা হয়। একটি নতুন পোশাক, নতুন মোবাইল, নতুন গাড়ি, বড় বাড়ি, উচ্চ পদ, বেশি অর্থ, বেশি জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মনে ক্রমাগত সক্রিয় থাকতে পারে। একটি অর্জনের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী না হয়ে যখন নতুন অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে, তখন মানুষ বুঝতে পারে না যে সে আসলে নিজের প্রয়োজন পূরণ করছে নাকি নিজের আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। এই অবস্থাই রজোগুণের একটি আধুনিক প্রকাশ হিসেবে বোঝা যেতে পারে।
তবে এই শ্লোক কর্মকে নিন্দা করে না এবং কর্মজীবন থেকে পালিয়ে যেতে বলে না। গীতার সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে বরং কর্মের সঙ্গে মানসিক আসক্তির সম্পর্কটি বোঝা জরুরি। কর্ম মানুষের কর্তব্য। কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে ফেললে মানুষ ফলের দাস হয়ে যায়। সাফল্য তখন অহংকার সৃষ্টি করে এবং ব্যর্থতা গভীর হতাশা সৃষ্টি করে। কর্মযোগের শিক্ষা হলো কর্ম করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, কিন্তু ফলের প্রতি এমন আসক্ত হওয়া যাবে না যাতে ফলই মানুষের শান্তির একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোক মানুষের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। মানুষ কেন অশান্ত। বাহ্যিক জগতের অভাবের কারণে, নাকি অন্তরের অতৃপ্তির কারণে। গীতার দৃষ্টিতে অনেক সময় মানুষের অশান্তির মূল কারণ বাহ্যিক অভাব নয়, বরং নিজের পূর্ণতাকে বাহ্যিক বস্তু ও অর্জনের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা। মানুষ ভাবে আমি আরও অর্থ পেলে সুখী হব, আরও সম্মান পেলে পূর্ণ হব, আরও ক্ষমতা পেলে নিরাপদ হব কিংবা আরও সাফল্য পেলে শান্ত হব। কিন্তু একটি অর্জনের পর আরেকটি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিতে থাকলে মানুষ বুঝতে পারে যে সমস্যাটি কেবল বাহ্যিক বস্তুর মধ্যে নয়। সমস্যাটি আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতির মধ্যেও রয়েছে।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণ। সত্ত্ব প্রকাশ করে স্বচ্ছতা, জ্ঞান ও প্রশান্তি। রজঃ প্রকাশ করে গতি, কর্ম ও আকাঙ্ক্ষা। তমঃ প্রকাশ করে জড়তা, অন্ধকার ও অজ্ঞতার প্রবণতা। তাই রজোগুণ মানুষের মধ্যে কর্মশক্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু রজঃ যখন অতিরিক্ত প্রবল হয়ে ওঠে তখন কর্মশক্তির সঙ্গে লোভ, স্পৃহা এবং অশান্তি যুক্ত হয়। এই কারণে রজোগুণকে সম্পূর্ণ অকল্যাণকর বলা যায় না। তার মধ্যে সৃষ্টিশীল শক্তি রয়েছে। কিন্তু সেই শক্তির দিকনির্দেশনা যদি জ্ঞান ও সংযম দ্বারা নির্ধারিত না হয় তাহলে তা মানুষের অন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বেদান্তীয় দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও গভীর। আত্মা স্বরূপত পূর্ণ। কিন্তু মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে বাহ্যিক বস্তুতে পূর্ণতা খুঁজতে থাকে তখন আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। সে মনে করে বাইরের কোনো বস্তু তাকে সম্পূর্ণ করবে। ফলে সেই বস্তুর প্রতি স্পৃহা জন্মায় এবং তা অর্জনের জন্য কর্ম শুরু হয়। অর্জন সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু যেহেতু বাহ্যিক বস্তু স্থায়ী নয়, তাই আবার নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এইভাবে মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত পূর্ণতাকে ভুলে বাহ্যিক অর্জনের পেছনে ছুটতে থাকে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও লোভ মানুষের পতনের একটি চিরন্তন প্রতীক। ইতিহাস ও মহাকাব্যের অসংখ্য চরিত্রের জীবনে দেখা যায় যে সীমাহীন সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত সংঘাত ও ধ্বংসের কারণ হয়েছে। লোভ যখন প্রবল হয় তখন নৈতিক বিচার দুর্বল হতে পারে। মানুষ তখন নিজের স্বার্থকে সত্য ও ন্যায়ের ওপর স্থান দিতে শুরু করে। ফলে লোভ কেবল একটি ব্যক্তিগত মানসিক প্রবণতা নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটেরও কারণ হতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গভীরতা বিস্ময়কর। মানুষ কোনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জন করলে সাময়িক আনন্দ পায়। কিন্তু সেই আনন্দ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর নতুন কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। যদি মানুষের আত্মমূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সে ক্রমাগত নতুন অর্জনের প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। ফলে তার জীবনে বিশ্রাম কমে যায় এবং তুলনা বৃদ্ধি পায়। সে অন্যের সাফল্যকে নিজের অপূর্ণতার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই অবস্থায় বাহ্যিকভাবে সাফল্য থাকলেও অন্তরের শান্তি অনুপস্থিত থাকতে পারে।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো আকাঙ্ক্ষাকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে তার প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। মানুষকে কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে না। তাকে উন্নতি করতে হবে, কিন্তু উন্নতিই যেন তার অস্তিত্বের একমাত্র অর্থ না হয়ে ওঠে। তাকে সম্পদ অর্জন করতে হবে, কিন্তু সম্পদ যেন তার মনকে অধিকার না করে। তাকে সাফল্য কামনা করতে পারে, কিন্তু সাফল্য ও ব্যর্থতার ওঠানামায় যেন তার অন্তরের শান্তি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল না হয়।
সুতরাং লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা একটি ছোট শ্লোকাংশ হলেও এর মধ্যে মানুষের সমগ্র আকাঙ্ক্ষাময় জীবনের একটি গভীর প্রতিচ্ছবি রয়েছে। লোভ মানুষের অধিক পাওয়ার বাসনা, প্রবৃত্তিরারম্ভ তার কর্মে প্রবেশ, কর্মণাম তার বহুমুখী কর্মকাণ্ড, অশম তার অন্তরের অস্থিরতা এবং স্পৃহা তার ভবিষ্যৎমুখী আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এগুলো রজোগুণের প্রবলতার সঙ্গে যুক্ত। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে কর্মজীবন যতই সক্রিয় হোক, অন্তরের শান্তি যদি না থাকে তবে বাহ্যিক অর্জন মানুষকে পূর্ণ করতে পারে না। সত্যিকারের উন্নতি তখনই সম্ভব যখন কর্মের সঙ্গে জ্ঞান, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংযম এবং অর্জনের সঙ্গে অন্তরের স্থিরতার সমন্বয় ঘটে। রজোগুণ মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই শক্তিকে কোন দিকে পরিচালিত করা হবে সেটিই মানুষের প্রকৃত পরীক্ষা। তাই এই শ্লোক কেবল লোভ থেকে সাবধান হতে বলে না, বরং নিজের মনের গতি বুঝতে, আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি উপলব্ধি করতে এবং কর্মের মধ্যেও অন্তরের শান্তি রক্ষা করতে আহ্বান জানায়। এই উপলব্ধিই মানুষকে অন্তহীন চাওয়ার দাসত্ব থেকে ধীরে ধীরে আত্মসচেতনতা, সংযম এবং প্রকৃত স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!