ভগবদ্গীতা ১৪.১৩ — তমোগুণের বৃদ্ধি, অপ্রকাশ, অপ্রবৃত্তি, প্রমাদ ও মোহ
অপ্রকাশোহপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন।।১৩।।
অনুবাদঃ হে কুরুনন্দন! তমোগুণ বর্ধিত হলে অজ্ঞান-অন্ধকার, নিষ্ক্রিয়তা, প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হয়।
ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তমোগুণের প্রকৃতি এবং তার প্রভাবে মানুষের চেতনা ও জীবনে যে পরিবর্তন ঘটে তার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো অপ্রকাশোহপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ। তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন।। অর্থাৎ হে কুরুনন্দন, তমোগুণ যখন বৃদ্ধি পায় তখন অপ্রকাশ, অপ্রবৃত্তি, প্রমাদ এবং মোহের উদ্ভব হয়। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে মানুষের অন্তর্জীবনের এমন এক গভীর সত্য নিহিত রয়েছে, যা শুধু ধর্মীয় সাধনার ক্ষেত্রেই নয়, বরং দৈনন্দিন জীবন, মনস্তত্ত্ব, নৈতিকতা, দর্শন এবং আত্মঅন্বেষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ অপ্রকাশ। প্রকাশ বলতে আলো, উদ্ভাসন, স্পষ্টতা এবং জ্ঞানের প্রকাশ বোঝায়। তার বিপরীত অপ্রকাশ হলো আলোহীনতা, অস্পষ্টতা এবং চেতনার আবরণ। এখানে অপ্রকাশ কেবল বাহ্যিক অন্ধকারের কথা বলে না। মানুষের অন্তরে যখন সত্যকে দেখার ক্ষমতা ম্লান হয়ে যায়, নিজের ভুল উপলব্ধি করার শক্তি কমে যায় এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা হারিয়ে যেতে থাকে, তখন সেই অবস্থাকেই অপ্রকাশের গভীর অর্থে বোঝা যায়। একজন মানুষ জ্ঞানসম্পন্ন হয়েও যদি সেই জ্ঞানকে নিজের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে না পারেন, তবে তার মধ্যে এক ধরনের অপ্রকাশ সৃষ্টি হয়। আলো আছে, কিন্তু সেই আলো জীবনের পথকে আলোকিত করছে না।
এরপর এসেছে অপ্রবৃত্তি। প্রবৃত্তি হলো কর্মে এগিয়ে যাওয়া, কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং জীবনের প্রয়োজনীয় কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া। অপ্রবৃত্তি তার বিপরীত অবস্থা। তমস যখন মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায় তখন তার কর্মশক্তি ও উদ্যোগ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সে জানে কী করা প্রয়োজন, তবু কাজ শুরু করতে চায় না। কর্তব্য সামনে উপস্থিত থাকলেও সে তা এড়িয়ে যায়। সময় চলে যায়, কিন্তু তার মধ্যে যথার্থ কর্মের তাগিদ সৃষ্টি হয় না। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে বিশ্রাম এবং অপ্রবৃত্তি এক নয়। বিশ্রাম জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন, কিন্তু যখন নিষ্ক্রিয়তা মানুষের দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা এবং উন্নতির আকাঙ্ক্ষাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন সেটি তমসিক অপ্রবৃত্তির রূপ নেয়।
শ্লোকে তৃতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এসেছে তা হলো প্রমাদ। প্রমাদ সাধারণ ভুলের চেয়ে অনেক গভীর একটি ধারণা। এর মধ্যে অসতর্কতা, আত্মবিস্মৃতি, দায়িত্বের প্রতি উদাসীনতা এবং সচেতনতার অভাবের ভাব রয়েছে। মানুষ যখন জানে যে কোনো কাজ তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অসতর্কতা ও উদাসীনতার কারণে সেই কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করে না, তখন সেখানে প্রমাদের প্রকাশ ঘটে। একজন শিক্ষার্থী নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানে, তবু পড়াশোনার প্রতি দীর্ঘদিন উদাসীন থাকে। একজন মানুষ জানে কোনো অভ্যাস তার ক্ষতি করছে, তবু সে নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করে না। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানেন যে তার সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্যের ওপর পড়বে, তবু তিনি অসতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নেন। এই সব অবস্থার মধ্যেই প্রমাদের ধারণা প্রকাশ পেতে পারে।
এরপর আসে মোহ। মোহ শব্দটি ভারতীয় দর্শনে অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। সাধারণ অর্থে মোহ বলতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বোঝানো হলেও গীতার দৃষ্টিতে মোহ হলো বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে বিভ্রান্তি। মোহগ্রস্ত মানুষ শুধু ভুল করে না, অনেক সময় সে নিজের ভুলকেই সত্য বলে মনে করতে শুরু করে। অনিত্যকে নিত্য মনে হয়, ক্ষণস্থায়ীকে স্থায়ী মনে হয়, ক্ষতিকরকে কল্যাণকর বলে মনে হয় এবং আসক্তিকে সত্যিকারের ভালোবাসা বলে মনে হতে পারে। এই কারণে মোহ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে এবং তাকে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে সঠিকভাবে দেখতে বাধা দেয়।
এই চারটি ধারণাকে একত্রে দেখলে তমোগুণের একটি গভীর কার্যপ্রক্রিয়া বোঝা যায়। প্রথমে আসে অপ্রকাশ, অর্থাৎ চেতনার আলো ম্লান হয়ে যায়। এরপর অপ্রবৃত্তি আসে, ফলে মানুষ যথার্থ কর্ম থেকে পিছিয়ে যায়। কর্মে অনাগ্রহ ও সচেতনতার দুর্বলতা থেকে প্রমাদ জন্ম নেয়। প্রমাদ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিচারবোধ দুর্বল হয় এবং মোহ সৃষ্টি হয়। তখন মানুষ নিজের অবস্থাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। এভাবেই তমস একটি আবর্তের মতো মানুষের জ্ঞান, কর্ম এবং বিচারবোধকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে তমস প্রকৃতির তিনটি গুণের একটি। সত্ত্ব যেখানে জ্ঞান, স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্যের সঙ্গে যুক্ত, রজঃ সেখানে কর্মচাঞ্চল্য, আকাঙ্ক্ষা ও গতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তমস জড়তা, অজ্ঞতা, স্থবিরতা ও আচ্ছন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তমসকে কোনো বাহ্যিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং মানুষের চেতনার একটি বিশেষ প্রবণতা হিসেবে দেখায়। মানুষের মধ্যে তমসের উপস্থিতি থাকতেই পারে, কিন্তু যখন তা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় তখন তার প্রভাব চিন্তা, কর্ম এবং উপলব্ধির ওপর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে অপ্রকাশ হলো জ্ঞানের আবরণ, অপ্রবৃত্তি হলো কর্মশক্তির স্থবিরতা, প্রমাদ হলো সচেতনতার দুর্বলতা এবং মোহ হলো বাস্তবতার ভুল উপলব্ধি। এই চারটি স্তর মানুষের আত্মবিকাশের বিপরীত দিকে কাজ করে। মানুষ নিজের সত্যকে উপলব্ধি করতে চাইলে প্রথম প্রয়োজন স্বচ্ছতা। স্বচ্ছতা থাকলে যথার্থ কর্মের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। কর্মে সচেতনতা থাকলে প্রমাদ কমে যায় এবং বিচারবোধ শক্তিশালী হয়। বিচারবোধ শক্তিশালী হলে মোহের প্রভাবও হ্রাস পায়। তাই এই শ্লোককে শুধু তমোগুণের লক্ষণ বর্ণনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এটি একই সঙ্গে চেতনার অবক্ষয়ের একটি মানচিত্র এবং আত্মসচেতনতার প্রয়োজনীয়তার একটি শিক্ষা।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। অপ্রকাশ হলো অন্ধকারের প্রতীক, অপ্রবৃত্তি হলো স্থবিরতার প্রতীক, প্রমাদ হলো আত্মসচেতনতার পতনের প্রতীক এবং মোহ হলো সত্যকে ভুলভাবে দেখার প্রতীক। মানুষের জীবনকে যদি একটি পথচলার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে জ্ঞান হলো সেই পথের আলো। কর্ম হলো সেই পথে এগিয়ে চলা। সতর্কতা হলো পথের প্রতি সচেতন থাকা এবং বিবেক হলো সঠিক দিক নির্ণয়ের শক্তি। যখন আলো নিভে যায়, চলার ইচ্ছা হারিয়ে যায়, সতর্কতা নষ্ট হয় এবং দিক সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্ম নেয়, তখন মানুষ পথ হারিয়ে ফেলে। তমসের প্রকৃত অর্থ অনেকটা এমনই।
বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। একজন মানুষ জানেন যে তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে তিনি কাজটির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকলেও তা পিছিয়ে দেন। পরে কাজটির প্রতি আগ্রহ কমে যায়। ধীরে ধীরে তিনি নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন। এরপর নিজের বিলম্বের কারণকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করতে থাকেন। একসময় তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছান যেখানে তিনি আর নিজের সমস্যাটিকেই সমস্যা বলে মনে করেন না। এই পরিবর্তনের মধ্যে অপ্রবৃত্তি, প্রমাদ এবং মোহের ধারাবাহিক প্রকাশ দেখা যায়।
একটি অন্ধকার ঘরের উপমা দিয়েও এই শ্লোককে বোঝা যায়। একটি ঘরে যদি দীর্ঘদিন আলো প্রবেশ না করে, তাহলে সেখানে থাকা মানুষ প্রথমে কিছু দেখতে পাবে না। পরে সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে না। অসতর্কতার কারণে বিভিন্ন জিনিসে ধাক্কা খেতে পারে এবং একসময় ঘরের প্রকৃত অবস্থাই তার কাছে বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। মানুষের অন্তর্জগতেও তমস অনেকটা একইভাবে কাজ করে। অপ্রকাশ হলো ঘরে আলো না থাকা। অপ্রবৃত্তি হলো অন্ধকারে এগিয়ে যেতে অনিচ্ছা। প্রমাদ হলো অন্ধকারের মধ্যে অসতর্ক হয়ে যাওয়া এবং মোহ হলো সেই অন্ধকারের মধ্যেই ভুল জিনিসকে সত্য বলে মনে করা।
আধ্যাত্মিক অর্থে এই শ্লোক মানুষের জন্য একটি আত্মপর্যবেক্ষণের আহ্বান। মানুষের জীবনে তমস কখন প্রবেশ করছে তা বোঝার জন্য বাইরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। নিজের মধ্যে তাকালেই তার লক্ষণ দেখা যায়। আমি কি সত্যকে এড়িয়ে যাচ্ছি, আমি কি প্রয়োজনীয় কাজ বারবার পিছিয়ে দিচ্ছি, আমি কি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ছি, আমি কি নিজের ভুলকে দেখতে চাইছি না এবং আমি কি কোনো বিভ্রান্ত ধারণাকে সত্য বলে আঁকড়ে ধরে আছি, এই প্রশ্নগুলো মানুষকে নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকাতে সাহায্য করতে পারে।
এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি কোনো মানুষকে নিন্দা করার শিক্ষা দেয় না। বরং নিজের মধ্যে তমসের উপস্থিতি চিনে তাকে অতিক্রম করার জন্য সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয়। কারণ মানুষের মধ্যে তমস থাকলেও তার মধ্যে জ্ঞানের আলো এবং আত্মসচেতনতার সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্ধকারকে অতিক্রম করার প্রথম উপায় হলো অন্ধকারকে চিনতে পারা। নিজের অপ্রকাশকে উপলব্ধি করা, অপ্রবৃত্তিকে স্বীকার করা, প্রমাদের প্রতি সতর্ক হওয়া এবং মোহকে চিনতে শেখাই চেতনার পরিশুদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সুতরাং অপ্রকাশোহপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ এই পদসমষ্টি কেবল তমোগুণের কয়েকটি লক্ষণের তালিকা নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি গভীর দর্শন। এখানে অন্ধকার শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়, বরং সত্যকে দেখার ক্ষমতার ম্লান হয়ে যাওয়া। নিষ্ক্রিয়তা শুধু কাজ না করা নয়, বরং জীবনের যথার্থ আহ্বানে সাড়া না দেওয়া। প্রমাদ শুধু ভুল নয়, বরং সচেতনতার অবক্ষয়। আর মোহ শুধু আকর্ষণ নয়, বরং বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে বিভ্রান্তি। এই চারটি প্রবণতা যখন মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে তখন তার জীবন ধীরে ধীরে নিজের অন্তর্নিহিত আলো থেকে দূরে সরে যেতে পারে। তাই শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুধু বাহ্যিক সাফল্যের মধ্যে নয়, বরং নিজের চেতনার অন্ধকারকে চিনে জ্ঞানের আলোকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যেই নিহিত। তমসের অন্ধকার যত গভীরই হোক, সচেতনতা, জ্ঞান, বিবেক এবং যথার্থ কর্মের মাধ্যমে মানুষ আবার সেই অন্তর্গত আলোর দিকে ফিরে যেতে পারে। এই কারণেই শ্লোকটি মানবজীবনের পতনের একটি ব্যাখ্যা হওয়ার পাশাপাশি আত্মজাগরণেরও একটি নীরব আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!