সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৪.১৬ — সৎকর্মের নির্মল ফল, রজোগুণের দুঃখ ও তমোগুণের অজ্ঞান

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্।রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্।।১৬।।
কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্।
রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্।।১৬।।

অনুবাদঃ সুকৃতি-সম্পন্ন সাত্তিক কর্মের ফলকে নির্মল, রাজসিক কর্মের ফলকে দুঃখ এবং তামসিক কর্মের ফলকে অজ্ঞান বা অচেতন বলা হয়।

ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কর্ম এবং সেই কর্মের অন্তর্নিহিত ফল সম্পর্কে এক গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্। রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্। অর্থাৎ সৎকর্মের ফল সাত্ত্বিক ও নির্মল বলে জ্ঞানীরা বলেন। রজোগুণের ফল দুঃখ এবং তমোগুণের ফল অজ্ঞান। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের কর্মজীবন, মানসিক প্রকৃতি, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক বিবর্তনের একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে কর্মফল বলতে শুধু বাহ্যিকভাবে কোনো কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত সুখ বা দুঃখ বোঝানো হয়নি। মানুষের কর্ম তার অন্তরকে কীভাবে গড়ে তোলে, তার চেতনা কোন দিকে প্রবাহিত করে এবং সত্য উপলব্ধির ক্ষমতাকে কীভাবে পরিবর্তিত করে, এই শ্লোক মূলত সেই গভীর বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কর্মণঃ। এই শব্দের উৎস সংস্কৃত কৃ ধাতু, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কোনো কাজ সংঘটিত করা। কর্ম শব্দের সাধারণ অর্থ কাজ হলেও গীতার দর্শনে কর্মের অর্থ অনেক বিস্তৃত। মানুষের চিন্তা, ইচ্ছা, অভিপ্রায়, সিদ্ধান্ত এবং সেই অভিপ্রায় থেকে সংঘটিত কার্যকলাপ সবই কর্মের বৃহত্তর পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করে এবং প্রতিটি কাজ তার বাহ্যিক জীবনে যেমন কোনো না কোনো পরিবর্তন আনে, তেমনি তার অন্তর্জগতেও একটি ছাপ রেখে যায়। তাই কর্ম শুধু পৃথিবীর ওপর মানুষের প্রভাব নয়, কর্ম মানুষের নিজের ওপরও মানুষের প্রভাব। আমরা যা করি, ধীরে ধীরে সেই কর্মের দ্বারা আমাদের মন, অভ্যাস, প্রবণতা এবং চরিত্র গঠিত হয়।

এরপর এসেছে সুকৃতস্য শব্দটি। সুকৃত শব্দটি সু এবং কৃত এই দুই ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। সু অর্থ শুভ, সুন্দর, উত্তম বা কল্যাণকর এবং কৃত অর্থ করা বা সম্পাদিত। তাই সুকৃত অর্থ শুভকর্ম, সৎকর্ম বা কল্যাণকর কর্ম। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে সৎকর্মের অর্থ শুধু সমাজের চোখে ভালো কোনো কাজ নয়। একটি কর্মের প্রকৃতি নির্ধারিত হয় তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং চেতনার দ্বারা। কেউ যদি অন্যকে সাহায্য করে কিন্তু তার অন্তরে থাকে অহংকার ও প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা, তাহলে বাহ্যিকভাবে কাজটি ভালো হলেও তার অন্তর্গত প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আবার কেউ যদি নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণে কাজ করেন এবং নিজের প্রশংসা বা স্বার্থের কথা না ভাবেন, তাহলে সেই কর্মের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রকাশ অনেক বেশি দেখা যায়।

আহুঃ শব্দটির অর্থ তাঁরা বলেন বা জ্ঞানীরা বলেছেন। এই একটি শব্দ শ্লোকটির বক্তব্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কোনো সাধারণ নৈতিক মতামত প্রকাশ করছেন না। তিনি এমন এক অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যের কথা বলছেন যা জ্ঞানীরা উপলব্ধি করেছেন। মানুষের কর্মের প্রকৃতি এবং সেই কর্মের অন্তর্গত ফলের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে তা আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এই শ্লোককে কেবল ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং খারাপ কাজ করলে খারাপ ফল এই সরল নৈতিক সূত্রে সীমাবদ্ধ করলে এর গভীরতা অনেকটাই হারিয়ে যায়।

সাত্ত্বিকম্ শব্দটি এসেছে সত্ত্ব থেকে। সত্ত্ব হলো প্রকৃতির তিন গুণের একটি। সত্ত্বের সঙ্গে আলো, স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য, পবিত্রতা এবং প্রশান্তির ধারণা যুক্ত। যে কর্মের মধ্যে সত্ত্বের প্রাধান্য থাকে তাকে সাত্ত্বিক কর্ম বলা হয়। সাত্ত্বিক কর্ম মানুষের অন্তরে জ্ঞান, সংযম, শান্তি এবং কল্যাণবোধ বৃদ্ধি করে। এই কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর মাধ্যমে মানুষ নিজের কাজকে শুধু ব্যক্তিগত লাভের উপায় হিসেবে দেখে না। তার কর্মের মধ্যে বৃহত্তর কল্যাণের অনুভূতি এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে। ফলে কর্ম শেষ হওয়ার পরে তার অন্তরে যে অনুভূতি জন্ম নেয় তা সাধারণ ভোগের আনন্দের মতো ক্ষণস্থায়ী নয়। তার মধ্যে একটি গভীর প্রশান্তি এবং অন্তরের স্বচ্ছতা তৈরি হয়।

এই কারণেই শ্লোকে সাত্ত্বিক ফলকে বলা হয়েছে নির্মলম্। নির্মল শব্দের অর্থ কলুষমুক্ত, পবিত্র, স্বচ্ছ এবং বিশুদ্ধ। এখানে নির্মলতা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নয়। এটি মনের নির্মলতা। মানুষের কোনো কাজের পরে যদি তার অন্তরে অহংকার, ঈর্ষা, হিংসা, প্রতিহিংসা কিংবা অস্থিরতা না বেড়ে বরং শান্তি, স্বচ্ছতা এবং আত্মিক প্রসন্নতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেই ফলকে নির্মল বলা যায়। একটি নির্মল মন নিজের সত্যকে দেখতে পারে, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে এবং নিজের কর্মের প্রকৃতি সম্পর্কে সৎভাবে বিচার করতে পারে। তাই নির্মলতা কেবল একটি অনুভূতি নয়, এটি আত্মজ্ঞান লাভের জন্য একটি উপযুক্ত মানসিক ভূমি।

ফলম্ শব্দের অর্থ ফল। কিন্তু এই শ্লোকে ফলের ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। কর্মের একটি বাহ্যিক ফল থাকতে পারে, যেমন পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থ, দক্ষতা বা সামাজিক সাফল্য অর্জন করা। আবার কর্মের একটি মানসিক ফলও থাকে। কোনো কাজ মানুষের মনে আনন্দ, শান্তি, অপরাধবোধ, অস্থিরতা বা অনুতাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর আরও গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক ফল। কোনো কর্ম মানুষের চেতনাকে জ্ঞানের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং কোনো কর্ম তাকে অজ্ঞতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই কর্মফল শুধু বাইরে কী পেলাম তা নয়। কর্মের পরে আমি কেমন মানুষ হয়ে উঠলাম, আমার মন কতটা স্বচ্ছ হলো এবং সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি পেল, সেটিও কর্মফলের একটি গভীর রূপ।

এর বিপরীতে শ্লোকে এসেছে রজসস্তু ফলং দুঃখম্। রজস হলো প্রকৃতির দ্বিতীয় গুণ। এর মধ্যে রয়েছে গতি, আকাঙ্ক্ষা, উদ্যম, আসক্তি, প্রতিযোগিতা এবং অর্জনের প্রবল বাসনা। রজস মানুষকে কর্মে প্রবৃত্ত করে এবং জীবনের অগ্রগতিতে শক্তি জোগাতে পারে। কিন্তু যখন কর্মের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, ফলের প্রতি আসক্তি, প্রশংসার বাসনা, ক্ষমতার আকর্ষণ এবং অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, তখন সেই রজস ধীরে ধীরে অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। মানুষ একটি লক্ষ্য অর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি লক্ষ্য স্থির করে। একটি ইচ্ছা পূরণ হলে নতুন ইচ্ছা জন্ম নেয়। ফলে সে ক্রমাগত ভবিষ্যতের কোনো অর্জনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এবং বর্তমানের শান্তি হারিয়ে ফেলে।

এই কারণেই রজসের ফল হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ দুঃখের কথা বলেছেন। রাজসিক জীবনে আনন্দ থাকতে পারে, সাফল্য থাকতে পারে, ভোগ থাকতে পারে এবং বাহ্যিক উন্নতিও থাকতে পারে। কিন্তু সেই সুখ প্রায়ই প্রত্যাশা ও অর্জনের ওপর নির্ভরশীল। যা পেয়েছি তা হারানোর ভয় থাকে এবং যা পাইনি তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। ফলে মানুষ একদিকে অর্জনের আনন্দ পায় এবং অন্যদিকে হারানোর ভয় ও না পাওয়ার অস্থিরতায় ভোগে। এই দ্বৈততার মধ্যেই রাজসিক দুঃখের জন্ম। রজসের দুঃখ তাই সব সময় প্রকাশ্য কান্না নয়। কখনো তা অস্থিরতা, অতৃপ্তি, উদ্বেগ, তুলনা, প্রতিযোগিতা এবং ক্রমাগত আরও কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার রূপে প্রকাশ পায়।

এরপর এসেছে তমসঃ এবং অজ্ঞানম্। তমস হলো অন্ধকার, জড়তা, অলসতা, মোহ, অবিবেক এবং অচেতনতার প্রবণতা। সত্ত্ব যেখানে আলো এবং স্বচ্ছতার প্রতীক, রজস সেখানে প্রবল আন্দোলনের প্রতীক এবং তমস হলো চেতনার অন্ধকারের প্রতীক। তমসিক অবস্থায় মানুষ সত্য জানতে আগ্রহী হয় না, নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না এবং বাস্তবতার পরিবর্তে নিজের অজ্ঞতা ও মোহের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে। তাই তমসের ফল হিসেবে বলা হয়েছে অজ্ঞান।

অজ্ঞান শব্দটি অ এবং জ্ঞান এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অ হলো নিষেধসূচক এবং জ্ঞান হলো সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি বা জানা। কিন্তু গীতার দর্শনে অজ্ঞান কেবল কোনো তথ্য না জানা নয়। এটি নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর, সম্পদ, সামাজিক পরিচয়, ক্ষমতা, সাফল্য কিংবা ইন্দ্রিয়সুখের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম করে দেখে এবং নিজের গভীরতর সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে আধ্যাত্মিক অর্থে অজ্ঞান বলা হয়। তমস এই অজ্ঞানের আবরণকে আরও ঘন করে তোলে।

এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি প্রতীকী মানচিত্র হিসেবেও দেখা যায়। সত্ত্ব হলো আলোর মতো যা মনকে স্বচ্ছ করে। রজস হলো বাতাসের মতো যা মনকে ক্রমাগত আন্দোলিত করে। তমস হলো অন্ধকারের মতো যা সত্যকে আড়াল করে রাখে। একটি পরিষ্কার আয়নায় নিজের মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু আয়না যদি ক্রমাগত কাঁপতে থাকে তাহলে প্রতিচ্ছবি অস্পষ্ট হয়ে যায়। আর আয়নার ওপর যদি অন্ধকারের আবরণ পড়ে তাহলে সেখানে কোনো প্রতিচ্ছবিই পরিষ্কার দেখা যায় না। মানুষের মনও তেমন। সত্ত্ব মনকে স্বচ্ছ করে, রজস মনকে অস্থির করে এবং তমস মনকে আচ্ছন্ন করে।

বাস্তব জীবনের দিকে তাকালেও এই তিন প্রবণতার প্রকাশ সহজে দেখা যায়। একজন মানুষ যদি অন্যকে সাহায্য করেন নিঃস্বার্থভাবে এবং সেই সাহায্যের বিনিময়ে প্রশংসা বা পুরস্কারের প্রত্যাশা না রাখেন, তাহলে তার কর্মের মধ্যে সাত্ত্বিকতার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে পারে। সাহায্য করার পরে তার অন্তরে যে শান্তি জন্মায় সেটিই তার কর্মের নির্মল ফল। অন্যদিকে কেউ যদি সব সময় অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, প্রশংসা পাওয়ার জন্য কাজ করে এবং নিজের সাফল্যের ওপর নিজের মূল্যবোধ নির্ভর করিয়ে ফেলে, তাহলে তার মধ্যে রজসের প্রাধান্য দেখা যায়। সে যত অর্জন করে ততই আরও অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্মাতে পারে। আবার কেউ যদি নিজের ভুল বুঝতে না চায়, সত্য যাচাই না করে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে এবং নিজের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে কোনো চিন্তা না করে জীবনযাপন করে, তাহলে তার মধ্যে তমসিক প্রবণতা সক্রিয় থাকতে পারে। এর ফলে তার জ্ঞান প্রসারিত না হয়ে বরং আরও সংকুচিত হতে পারে।

এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শিক্ষা হলো মানুষের কর্মকে কেবল বাহ্যিক ফল দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারেন, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভিন্ন হলে সেই কর্মের মানসিক ফলও ভিন্ন হতে পারে। একজন মানুষ দান করতে পারেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য। অন্য একজন একই দান করতে পারেন নিঃস্বার্থ কল্যাণবোধ থেকে। বাহ্যিক কাজ একই হলেও অন্তরের অবস্থার পার্থক্য কর্মের গুণকে পরিবর্তিত করে। তাই গীতার কর্মদর্শনে কর্মের সঙ্গে কর্তার চেতনা এবং উদ্দেশ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ তার কর্ম দ্বারা শুধু পৃথিবীকে পরিবর্তন করে না, নিজের চরিত্রকেও নির্মাণ করে। প্রতিটি কাজ একটি অভ্যাস তৈরি করতে পারে এবং প্রতিটি অভ্যাস ধীরে ধীরে চরিত্রে পরিণত হতে পারে। সৎ কর্মের পুনরাবৃত্তি মানুষের মধ্যে সততা ও করুণার প্রবণতা বৃদ্ধি করতে পারে। আকাঙ্ক্ষাকেন্দ্রিক কর্মের পুনরাবৃত্তি মানুষের মধ্যে আরও আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আবার অজ্ঞতা ও জড়তার পুনরাবৃত্তি মানুষকে আরও বেশি অচেতন করে তুলতে পারে। এই দিক থেকে কর্মফল কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয় নয়। কর্মের ফল কর্মের মধ্যেই মানুষের চেতনার ওপর কাজ করতে শুরু করে।

তবে গীতার শিক্ষা কেবল সাত্ত্বিক হয়ে থাকার মধ্যে শেষ হয় না। সত্ত্ব অবশ্যই রজস ও তমসের তুলনায় নির্মল এবং জ্ঞানপ্রদ। কিন্তু সত্ত্বও প্রকৃতির একটি গুণ। গীতার পরবর্তী আলোচনার বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো তিন গুণের প্রভাবকে বুঝে শেষ পর্যন্ত তাদের ঊর্ধ্বে ওঠা। তাই এই শ্লোক প্রথমে মানুষকে নিজের কর্মের প্রকৃতি চিনতে শেখায়। সে কি আলো ও স্বচ্ছতার দিকে যাচ্ছে, নাকি আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতার দিকে, নাকি অজ্ঞতা ও জড়তার দিকে, এই আত্মপর্যবেক্ষণই আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

অতএব ভগবদ্গীতার এই শ্লোককে কেবল কর্মের ফল সম্পর্কে একটি নৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি বিজ্ঞানও বটে। কর্ম আমাদের চেতনাকে প্রভাবিত করে এবং সেই চেতনা আবার আমাদের পরবর্তী কর্মকে প্রভাবিত করে। শুভ ও স্বচ্ছ কর্ম মনকে নির্মলতার দিকে নিয়ে যায়। আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তিনির্ভর কর্ম মনকে দুঃখ ও অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। অজ্ঞতা ও জড়তানির্ভর কর্ম মানুষকে আরও গভীর অজ্ঞতার মধ্যে আবদ্ধ করে। তাই জীবনের প্রকৃত প্রশ্ন শুধু আমি কী অর্জন করলাম তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো আমার কর্ম আমাকে কী বানিয়ে তুলছে।

এই উপলব্ধিই শ্লোকটির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। মানুষের জীবনে প্রতিটি কর্ম যেন একটি বীজের মতো। সেই বীজ থেকে শুধু বাইরের কোনো ফল জন্মায় না, মানুষের নিজের ভিতরেও একটি নতুন প্রবণতা জন্ম নেয়। সাত্ত্বিক কর্মের বীজ থেকে জন্ম নিতে পারে নির্মলতা ও জ্ঞান। রাজসিক কর্মের বীজ থেকে জন্ম নিতে পারে আকাঙ্ক্ষা ও দুঃখ। তামসিক কর্মের বীজ থেকে জন্ম নিতে পারে মোহ ও অজ্ঞান। তাই কর্মের পূর্বে যেমন আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কর্মের পর নিজের অন্তরের পরিবর্তনও লক্ষ্য করা প্রয়োজন। যে কর্ম আমাদের মনকে অধিক সত্যনিষ্ঠ, শান্ত, স্বচ্ছ, সহানুভূতিশীল এবং জ্ঞানমুখী করে তোলে, সেই কর্মের মধ্যেই নির্মলতার পথ প্রকাশিত হয়।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি অন্তর্মুখী প্রশ্ন রেখে যায়। আমি যে কাজ করছি তার বাহ্যিক ফল কী হবে তার পাশাপাশি সেই কাজ আমার অন্তরে কী রেখে যাচ্ছে। আমার কর্ম কি আমার চেতনাকে আলোকিত করছে, নাকি আমাকে আরও অস্থির করছে, নাকি সত্যকে দেখার ক্ষমতাই ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজতে পারলেই গীতার এই শ্লোক জীবনের একটি জীবন্ত সাধনায় পরিণত হয়। তখন কর্ম শুধু কর্তব্য থাকে না, কর্ম হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের আয়না। সেই আয়নায় মানুষ নিজের প্রকৃত অবস্থাকে দেখতে শেখে এবং ধীরে ধীরে নির্মলতা, জ্ঞান ও আত্মসচেতনতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 23, 2026 August 23, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি