ভগবদ্গীতা ১৪.১৯ — তিন গুণের অতীত কর্তার উপলব্ধি ও পরম তত্ত্ব লাভ
নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোহধিগচ্ছতি।।১৯।।
অনুবাদঃ জীব যখন দর্শন করেন যে, প্রকৃতির গুণসমূহ ব্যতীত কর্মে অন্য কোন কর্তা নেই এবং জানতে পারেন যে, পরমেশ্বর ভগবান এই সমস্ত গুণের অতীত, তখন তিনি আমার পরা প্রকৃতি লাভ করেন।
ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের ঊনবিংশ শ্লোক মানবজীবনের আত্মপরিচয়, প্রকৃতির কার্যপ্রবাহ এবং পরম সত্যের উপলব্ধি সম্পর্কে এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকটি হলো নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি। গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোহধিগচ্ছতি। অর্থাৎ যখন দ্রষ্টা উপলব্ধি করেন যে তিন গুণের অতিরিক্ত অন্য কোনো কর্তা নেই এবং যখন তিনি এই গুণসমূহের অতীত পরম তত্ত্বকে জানতে পারেন, তখন তিনি ভগবানের স্বরূপ বা মদ্ভাব লাভ করেন। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের বন্ধন ও মুক্তি সম্পর্কে এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
নান্যং শব্দটি ন এবং অন্যং এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ন অর্থ নয় এবং অন্যং অর্থ অন্য কোনো বা ভিন্ন কোনো। ফলে নান্যং বলতে বোঝায় অন্য কোনো নয়। গীতার এই প্রসঙ্গে শব্দটি মানুষের প্রচলিত কর্তৃত্ববোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সাধারণ মানুষ মনে করে আমি করছি, আমি ভাবছি, আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আমি সফল হচ্ছি অথবা আমি ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে মানুষকে তার এই সাধারণ আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রবেশ করতে আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বোঝাচ্ছেন যে প্রকৃতির ক্ষেত্রে যে সমস্ত কর্ম ও পরিবর্তন সংঘটিত হয়, সেগুলোর পেছনে তিনটি মৌলিক গুণের কার্যকলাপ রয়েছে।
গুণেভ্যঃ শব্দটি গুণ শব্দ থেকে এসেছে। সংস্কৃত গুণ শব্দের অর্থ বৈশিষ্ট্য, ধর্ম, স্বভাব অথবা প্রকৃতির কোনো মৌলিক শক্তি। আবার গুণের মধ্যে বন্ধনের ধারণাও নিহিত রয়েছে। ভগবদ্গীতায় সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণ প্রকৃতির মৌলিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত। সত্ত্ব প্রকাশ করে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য ও আলো। রজঃ প্রকাশ করে কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা ও আসক্তি। তমঃ প্রকাশ করে জড়তা, অজ্ঞান, মোহ, অলসতা ও অবসাদ। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ ও কর্মে এই তিন গুণ বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পায়। কখনো মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও শান্তি প্রবল হয়, কখনো আকাঙ্ক্ষা ও কর্মচাঞ্চল্য তাকে পরিচালিত করে এবং কখনো জড়তা ও অজ্ঞতা তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। এই পরিবর্তনশীল প্রবণতাগুলিকে নিজের চূড়ান্ত আত্মপরিচয় বলে মনে করাই অজ্ঞতার একটি প্রধান কারণ।
কর্তারং শব্দটি এসেছে কৃ ধাতু থেকে। কৃ অর্থ করা, সম্পাদন করা অথবা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। সেখান থেকেই কর্তা অর্থাৎ যে কাজ করে বা কার্য সম্পাদন করে। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্তা শব্দটি কেবল একজন কর্মসম্পাদনকারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। এর মধ্যে আমি কর্তা এই অহংকেন্দ্রিক ধারণাটিও নিহিত রয়েছে। মানুষ যখন নিজের শরীর, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে, তখন সে নিজেকে সমস্ত কর্মের স্বাধীন কর্তা বলে মনে করে। কৃষ্ণ সেই ধারণার গভীরে আঘাত করছেন। তিনি বলছেন যে প্রকৃতির ক্ষেত্রে প্রকৃতির গুণসমূহই বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করে। শরীরের কর্ম, মনের আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধির বিচার, ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ এবং মানুষের নানা প্রবৃত্তি প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আত্মা সেই সমস্ত কার্যকলাপের সাক্ষী।
এই কারণে শ্লোকের দ্রষ্টা শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দ্রষ্টা শব্দটি দৃশ্ ধাতু থেকে এসেছে। দৃশ্ অর্থ দেখা বা প্রত্যক্ষ করা। কিন্তু এখানে দ্রষ্টা বলতে শুধু চোখ দিয়ে দেখা কোনো মানুষকে বোঝানো হয় না। দ্রষ্টা হলো সেই চৈতন্যসত্তা যে শরীর, মন, অনুভূতি, চিন্তা, সুখ, দুঃখ এবং কর্মের পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে। মানুষের মন কখনো আনন্দিত হয়, কখনো বিষণ্ণ হয়, কখনো ক্রুদ্ধ হয়, কখনো শান্ত হয়। চিন্তা এক মুহূর্তে একরকম থাকে এবং পরের মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে যায়। কিন্তু যে সত্তা বুঝতে পারে যে আমার মধ্যে একটি চিন্তা এসেছে অথবা আমার মধ্যে রাগের অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে, সেই সচেতন প্রত্যক্ষকারীকে গীতার দ্রষ্টা ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়।
অনুপশ্যতি শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। এটি অনু এবং পশ্যতি এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। পশ্যতি অর্থ দেখে এবং অনু অর্থ অনুসরণ করে, যথাযথভাবে অথবা গভীরভাবে। তাই অনুপশ্যতি শুধু বাহ্যিকভাবে কোনো কিছু দেখাকে বোঝায় না। এটি গভীর পর্যবেক্ষণ, অন্তর্দৃষ্টি এবং সত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করার ভাব প্রকাশ করে। অর্থাৎ জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল বাহ্যিক কর্ম দেখেন না। তিনি কর্মের অন্তর্নিহিত প্রকৃতিও দেখতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে মানুষের মধ্যে যে প্রবৃত্তি কাজ করছে, তা প্রকৃতির গুণের প্রকাশ এবং আত্মা সেই প্রবাহের সাক্ষী।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি। এখানে পরং অর্থ অতীত, ঊর্ধ্ব, শ্রেষ্ঠ বা সর্বোচ্চ। গুণসমূহের অতীত যে পরম সত্য, তাকে জানতে হবে। এই অংশটি শ্লোকটির দর্শনকে আরও গভীর করে তোলে। কেবল প্রকৃতির গুণকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। মানুষকে গুণের অতীত সেই চৈতন্যসত্তাকেও জানতে হবে যার উপস্থিতিতে প্রকৃতির সমস্ত কার্যকলাপ প্রকাশিত হয়। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং তার গুণগুলিও পরিবর্তনশীল। কিন্তু আত্মতত্ত্বের অনুসন্ধান মানুষকে সেই পরিবর্তনের অন্তরালে অবস্থানকারী চৈতন্যের দিকে নিয়ে যায়।
বেত্তি শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে। বিদ্ অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। তবে ভারতীয় দর্শনে জানা মানে শুধু কোনো তথ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া নয়। সত্যকে জানা মানে সেই সত্যকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে উপলব্ধি করা। তাই গুণের অতীত পরম তত্ত্বকে জানা বলতে কেবল শাস্ত্র পাঠের মাধ্যমে একটি ধারণা অর্জন করাকে বোঝানো হয় না। এখানে জ্ঞান বলতে আত্মসাক্ষাৎকারের দিকে অগ্রসর হওয়া বোঝানো হয়েছে। যখন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে শরীর, মন ও প্রবৃত্তি পরিবর্তনশীল অথচ তাদের প্রত্যক্ষকারী চৈতন্যের প্রকৃতি ভিন্ন, তখন তার আত্মজ্ঞান গভীর হতে থাকে।
মদ্ভাবং শব্দটি শ্লোকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। মৎ অর্থ আমার এবং ভাব অর্থ অবস্থা, স্বরূপ, সত্তা বা অস্তিত্বের প্রকৃতি। তাই মদ্ভাব অর্থ আমার স্বরূপ, আমার ভাব অথবা ঈশ্বরীয় অস্তিত্বের উপলব্ধি। এখানে কৃষ্ণের বক্তব্য কেবল বাহ্যিকভাবে তাঁকে পাওয়ার কথা নয়। বরং গুণের অতীত পরম সত্যকে উপলব্ধি করে ঈশ্বরীয় চৈতন্যের স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন বেদান্তীয় দর্শনে মদ্ভাবের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। অদ্বৈত বেদান্ত এটিকে পরম চৈতন্য বা ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধির আলোকে দেখে। ভক্তিমূলক দর্শন এটিকে ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি ও ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই মূল বিষয় হলো প্রকৃতির গুণের সীমা অতিক্রম করে ঈশ্বরীয় সত্যের উপলব্ধি।
সোহধিগচ্ছতি শব্দের মধ্যে শ্লোকটির পরিণতি প্রকাশিত হয়েছে। সঃ অর্থ সে এবং অধিগচ্ছতি অর্থ লাভ করে, পৌঁছায় অথবা উপলব্ধি করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রকৃতির গুণসমূহের কার্যকলাপকে যথার্থভাবে দেখে এবং গুণের অতীত পরম তত্ত্বকে উপলব্ধি করে, সে মদ্ভাব লাভ করে। এখানে আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা রয়েছে। প্রথমে রয়েছে দেখা, তারপর জানা এবং শেষে উপলব্ধির মাধ্যমে লাভ করা। বাহ্যিক জ্ঞান থেকে অন্তর্দৃষ্টি এবং অন্তর্দৃষ্টি থেকে আত্মসাক্ষাৎকারের দিকে মানুষের অগ্রসর হওয়ার পথ এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রকৃতি ও আত্মার পার্থক্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন। প্রকৃতির স্তরে শরীর আছে, ইন্দ্রিয় আছে, মন আছে, বুদ্ধি আছে এবং নানা ধরনের প্রবৃত্তি রয়েছে। এগুলো পরিবর্তনশীল। মানুষের শরীর শৈশব থেকে যৌবন এবং বার্ধক্যের দিকে যায়। মনের ভাব পরিবর্তিত হয়। চিন্তা পরিবর্তিত হয়। ইচ্ছা পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে চৈতন্য এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে, সেই দ্রষ্টার অনুসন্ধান মানুষকে আত্মতত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। গীতার শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় স্থাপন না করে সেই চৈতন্যসত্তাকে উপলব্ধি করা।
মানুষের অহংকারের কেন্দ্রেও রয়েছে কর্তার ধারণা। আমি করেছি, আমি পেয়েছি, আমি হারিয়েছি, আমি জয় করেছি, আমি ব্যর্থ হয়েছি এই ধারণাগুলো মানুষের মনে কর্মের সঙ্গে একটি গভীর আত্মপরিচয় তৈরি করে। এই পরিচয় থেকেই অহংকার, আসক্তি, ভয় এবং দুঃখ জন্ম নিতে পারে। গীতার জ্ঞান মানুষকে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না। বরং নিজের কর্মের প্রকৃতি ও অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোকে যথার্থভাবে বুঝতে শেখায়। কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মের পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে নিজের চূড়ান্ত আত্মপরিচয় মনে করা উচিত নয়।
এই শিক্ষা একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন মানুষ কোনো এক সময় প্রচণ্ড রাগের মধ্যে একটি কঠিন কথা বলে ফেললেন। সেই মুহূর্তে তিনি যেন সম্পূর্ণভাবে রাগের মধ্যে আবদ্ধ। কিছুক্ষণ পরে রাগ কমে গেলে তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর আচরণ অন্যরকম হতে পারত। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ পায়। রাগ এসেছিল এবং চলে গেছে। কিন্তু যে ব্যক্তি পরে বুঝতে পারলেন যে তিনি রাগকে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন, সেই পর্যবেক্ষণকারী চৈতন্য রাগের পরিবর্তনের সাক্ষী। একইভাবে আনন্দ, দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অলসতা এবং উদ্যমও আসে ও চলে যায়। এগুলো মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হলেও এগুলোকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করা প্রয়োজন নেই।
এই বিষয়টি একটি নদীর উপমার মাধ্যমে আরও সহজভাবে বোঝা যায়। নদীর জল কখনো শান্ত থাকে, কখনো প্রবল স্রোতে চলে, কখনো ঢেউ ওঠে এবং কখনো ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়। নদীর স্রোত প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দর্শক সেই পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। প্রকৃতির তিন গুণ যেন নদীর স্রোত এবং দ্রষ্টা যেন সেই তীরে অবস্থানকারী সাক্ষী। অজ্ঞ ব্যক্তি স্রোতের সঙ্গে নিজেকে এক করে বলে আমি স্রোত। জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পারেন স্রোত চলছে এবং আমি সেই স্রোতকে প্রত্যক্ষ করছি। এই উপলব্ধিই মানুষকে নিজের মানসিক প্রবাহ থেকে কিছুটা দূরত্ব অর্জন করতে সাহায্য করে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। যখন মানুষ বলে আমি রাগান্বিত, তখন সে নিজের পরিচয়কে রাগের সঙ্গে এক করে ফেলে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে আমার মধ্যে রাগের একটি প্রবল অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে, তখন সে রাগকে পর্যবেক্ষণ করার অবস্থায় আসে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ধারণা এবং বেদান্তীয় আত্মতত্ত্ব এক নয়, তবু আত্মপর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ সাদৃশ্য দেখা যায়। নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখা মানুষকে তাদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হওয়া থেকে কিছুটা মুক্ত করতে পারে।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের আত্মঅনুসন্ধানের একটি পথ নির্দেশ করে। প্রথমে মানুষ নিজেকে শরীর মনে করে। পরে সে মন ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করে। কিন্তু গভীর অনুসন্ধানে প্রশ্ন জাগে যে যে শরীরকে আমি দেখতে পারি, আমি কি কেবল সেই শরীর। যে চিন্তাকে আমি পর্যবেক্ষণ করতে পারি, আমি কি সেই চিন্তা। যে অনুভূতি আসে ও চলে যায়, আমি কি সেই অনুভূতি। এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে দ্রষ্টা বা সাক্ষী চৈতন্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই সাক্ষীভাবের গভীর উপলব্ধিই গুণের অতীত পরম সত্যের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি করে।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে দ্রষ্টা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় সচেতনতার। গুণ প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি ও মানসিক প্রবণতার। কর্তা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় অহংকারের। গুণাতীত পরম তত্ত্ব প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় পরিবর্তনের অতীত চৈতন্যের। আর মদ্ভাব প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় ঈশ্বরীয় সত্যের উপলব্ধির। এই কারণে শ্লোকটি কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতকে বোঝার একটি গভীর প্রতীকী ভাষাও তৈরি করে।
ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা মানবজীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের জীবনে প্রতিদিন নানা অনুভূতি আসে। কখনো আমরা আনন্দিত হই, কখনো দুঃখিত হই, কখনো প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষায় আক্রান্ত হই, কখনো অলস হয়ে পড়ি এবং কখনো জ্ঞান ও শান্তির অনুভূতিতে পূর্ণ হয়ে উঠি। যদি আমরা প্রতিটি অবস্থাকে নিজের স্থায়ী পরিচয় বলে মনে করি, তাহলে আমরা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থার সঙ্গে নিজেদের বেঁধে ফেলি। কিন্তু যদি আমরা সেগুলোকে প্রকৃতির গুণের প্রকাশ হিসেবে দেখতে শিখি এবং তাদের সাক্ষী চৈতন্যকে অনুভব করতে শুরু করি, তাহলে আত্মপরিচয়ের একটি গভীরতর স্তর উন্মোচিত হয়।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা তাই নিজের কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, নিজের প্রকৃত পরিচয়কে গভীরভাবে জানা। মানুষ কর্ম করবে, চিন্তা করবে, অনুভব করবে এবং জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হবে। কিন্তু তার চেতনার গভীরে এমন একটি সাক্ষীসত্তার সন্ধান রয়েছে যা এই পরিবর্তনগুলিকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে প্রকৃতির গুণসমূহ তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল এবং আত্মা সেই কার্যকলাপের সাক্ষী, তখন তার অহংকেন্দ্রিক কর্তার ধারণা ধীরে ধীরে শিথিল হয়। আর যখন সে গুণের অতীত পরম সত্যকে উপলব্ধি করে, তখন সে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রকাশের সীমা অতিক্রম করে ঈশ্বরীয় চৈতন্যের দিকে অগ্রসর হয়।
সুতরাং নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি এই শ্লোকটি মানুষের সামনে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা স্থাপন করে। আমি কে, আমি কি আমার শরীর, আমি কি আমার মন, আমি কি আমার চিন্তা, আমি কি আমার আকাঙ্ক্ষা, নাকি আমি সেই চৈতন্য যে এই সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করছে। এই প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করলেই শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য উন্মোচিত হয়। গুণের কার্যকলাপকে গুণের কার্যকলাপ হিসেবে দেখা, অহংকারের কর্তার ধারণাকে পরীক্ষা করা, দ্রষ্টা চৈতন্যকে উপলব্ধি করা এবং গুণের অতীত পরম সত্যকে জানা এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই মানুষ মদ্ভাবের দিকে অগ্রসর হয়। এই উপলব্ধি শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায় এবং তার সামনে উন্মোচিত করে সেই গভীর সত্য যে মানুষের প্রকৃত সত্তা কেবল পরিবর্তনশীল শরীর, মন ও প্রবৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবর্তনের অন্তরালে যে চৈতন্য সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করে, সেই চৈতন্যের অনুসন্ধানই আত্মজ্ঞান এবং সেই আত্মজ্ঞানই গীতার ভাষায় পরম মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার অন্যতম প্রধান দ্বার।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!